
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ফাংশনিং এর জন্য কি প্রয়োজন? আপনি বলতে পারেন পুষ্টি, অক্সিজেন, পানীয় এবং নিঃশ্বাস। কিন্ত এসবের বাহিরে কী আর কোনোকিছু প্রয়োজন নেই? হ্যাঁ আছে! নিউরোসায়েন্স বলছে, মস্তিষ্কের সঠিক ফাংশনিং এর জন্য নিউরন প্রয়োজন, সমাজের অন্যান্য মানুষের ব্রেন নিউরন। নরমাল ব্রেন ফাংশন সোশ্যাল ওয়েভের উপর নির্ভর করে। আমাদের ব্রেন নিউরনের টিকে থাকা ও উন্নতির জন্য অন্য মানুষের নিউরন গুরুত্বপূর্ণ! আমাদের ভালো থাকার জন্য শুধু খাবার ও অক্সিজেন নয়, অন্য মানুষের নিউরন চাই।
বর্তমানে সমস্ত পৃথিবীতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ব্রেন ট্রাফিক রয়েছে। আমরা নিজেদেরকে যদিও স্বাধীন ভাবি, আমাদের প্রত্যেকের ব্রেন একে অন্যের সাথে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ওয়েভ অব ইন্টারেকশনের ভেতর কাজ করে, আমরা আমাদের হিউম্যান স্পিসিজের নিউরাল নেটের উপর এত বেশি নির্ভরশীল যে, সমস্ত প্রজাতি যেনো একটি মেগা জীব।
একটা সময় ছিলো বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ককে আলাদা ভাবে স্টাডি করতো কিন্তু তারা যে বিষয়টা উপেক্ষা করতো তা হলো আমাদের ব্রেন সার্কিটের বিশাল একটি অংশ অন্য মানুষের সাথে জড়িত। আমাদের স্পিসিজ অত্যন্ত গভীর ভাবে একটি সামাজিক ক্রিয়েসার। আমাদের ফ্যামিলি, ফ্রেন্ড থেকে শুরু করে কো-ওয়ার্কার এবং বিজনেস পার্টনার পর্যন্ত, আমাদের সমস্ত সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল আবরণযুক্ত সামাজিক ইন্টারেকশন দ্বারা তৈরি। আমাদের চারপাশে আমরা শুধু একটা জিনিসই দেখি, সর্বত্র সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে এবং ভেঙে যাচ্ছে, পারিবারিক বন্ধন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কের প্রতি আমাদের আসক্তি এবং বিভিন্ন জোট। এই যে সুইঙ্গামের এ সকল সামাজিক বন্ধন আমাদের মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট সার্কিট থেকে তৈরি হয়। আমরা অন্য মানুষদের পর্যবেক্ষণ করি, আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করি, আমরা অন্যের ব্যাথা অনুভব করি, আমরা তাদের ইনটেনশন বিচার করি এবং আমরা অন্যের ইমোশন পাঠ করি। আমাদের সামাজিক দক্ষতা অত্যন্ত গভীরভাবে আমাদের নিউরাল সার্কিটের ভেতর প্রোথিত__ আর এ নিউরাল সার্কিট বোঝার জন্য বর্তমানে নিউরোসায়েন্সের যে তরুণ শাখা কাজ করছে তাকে বলে “সোশ্যাল নিউরোসায়েন্স”!
নিচের আইটেমগুলোর কথা ভাবুনঃ খরগোশ, ট্রেন, দৈত্য, বিমান এবং শিশুদের খেলনা। এগুলো আমাদের চেয়ে কত ভিন্ন, এগুলো যেকোন জনপ্রিয় এনিমেটেড ফিল্মের প্রধান চরিত্র। আমাদের কোনো কষ্ট হয়না তাদের ইনটেনশন বুঝতে। একজন দর্শকের মস্তিষ্ক সামান্য ঈশারাতেই বুঝতে পারে তাদের চরিত্র আমাদের মতো আর এজন্য আমরা তাদের দেখে হাসি এবং কান্না করি। এই যে নন-হিউম্যান ক্যারেক্টারিস্টিকের আকাঙখার প্রতি আমাদের অনুরাগ এ বিষয়টি হাইলাইট করা হয়েছিলো ১৯৪৪ সালে সাইকোলজিস্ট ফ্রিজ হেইডার তৈরি একটি ফিল্মে। ফিল্মে দুটি সরল আকৃতির কাঠামো ছিলো__ ত্রিভুজ ও বৃত্ত। একটি ত্রিভূজ একটি বৃত্তের কাছাকাছি এসে ঘুরতে থাকে। কয়েক মুহূর্ত পর স্কিনের ভেতর চুপিসারে একটি বড় ত্রিভুজ আসে। এটি ছোট ত্রিভুজটির বিপক্ষে লাগে এবং তাকে ধাক্কা দিতে থাকে। বৃত্তটি ধীরে ধীরে একটি আয়তাক্ষেত্রে ফিরে আসে এবং পেছন দিক থেকে এটি বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে বড় ত্রিভুজটি ছোট ত্রিভুজকে তাড়া করতে থাকে। বড় ত্রিভুজটি তখন ভয়ানকভাবে দরজার কাছে আসে। ত্রিভুজটি দরজা খুলে ফেলে এবং বৃত্তের কাছে আসে।৷ যে উন্মাদের মতো পালানোর জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করতে থাকে। যখন পরিস্থিতি ঘোলাটে তখন ছোট ত্রিভুজটি ফিরে আসে। সে দরজাটি খুলে দেয় এবং বৃত্ত বের হয়ে তার সাথে দেখা করে। তারা দুজন মিলে পেছনদিক থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় এবং বড় ত্রিভুজটিকে ভেতরে আবদ্ধ করে ফেলে। বড় ত্রিভুজটি দেয়ালটি ভেঙে চুরমার করে দেয়। বাহিরে ক্ষুদ্র ত্রিভুজ ও বৃত্ত একে অন্যের চারপাশে ঘুরতে থাকে।
যারা ফিল্মটি দেখেছিলো তাদের প্রশ্ন করা হয়েছিলো তারা কি দেখেছে। আপনি প্রত্যাশা করতে পারেন তারা হয়তো বলবে, সিম্পল কিছু শেইপ চারপাশে মুভ করেছে। মূলত , বৃত্ত আর ত্রিভুজ তো শুধুমাত্র তাদের কো-অর্ডিনেট বা স্থানাঙ্কই পরিবর্তন করেছিলো। কিন্তু দর্শকরা এ ধরণের কিছু বলেনি। তারা বলতে শুরু করেছিলো, তারা এখানে রোম্যান্টিক প্রেমের গল্প দেখেছে, যুদ্ধ দেখেছে, সংঘর্ষে দেখেছে এবং দেখেছে বীজয়!
হেইডার এবং সিমেল এই এনিমেশন ব্যবহার করেছিল এটা বর্ণনা করার জন্য যে, আমরা কীভাবে আমাদের চারপাশে সোশ্যাল ইনটেনশন দেখি। বিভিন্ন রকমের গতিশীল জ্যামিতিক আকার আমাদের রেটিনায় আঘাত করেছিল আর আমরা দেখেছি মিনিং, মোটিভ এবং ইমোশন এবং সবকিছুর মধ্যেই আমাদের সামাজিক ব্যাখ্যা ছিলো। আমরা জ্যামিতিক আকারের উপর মন গড়া একটি গল্প আরোপ করেছি। স্মরণাতীত কাল থেকে আমাদের পূর্বসূরিরা পাখিদের যুদ্ধ দেখেছে, তারা দেখেছে আকাশের নক্ষত্রদের গতিশীলতা , তারা দেখেছে গাছের দোল এবং তারা মহাকাশের নক্ষত্রের উপরও আরোপ করেছে প্রেম, ভালোবাসা, যুদ্ধের গল্প, তারা জ্যামিতিক স্ট্রাকচারগুলোর মতোই মহাকাশের তারকাদের উপর আরোপ করেছে সামাজিক ইনটেনশন।
এ ধরণের গল্প বলা বিদ্রুপ ছিলোনা কোনো! এটি আমাদের মস্তিষ্কের সার্কিটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
এটি আমাদের কাছে এই সত্য আনমাস্ক করে যে আমাদের ব্রেন সোশ্যাল ইন্টারেকশন করার জন্য প্রাইমড(Primed)। আসলে আজ থেকে ৩.৪ মিলিয়ন বছর পূর্বেও আমাদের পূর্বসূরি অস্ট্রোলোপিথদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো কে তার বন্ধু আর কে তার বন্ধু নয়। আমরা সামাজিক জগতে অন্যের ইনটেনশন মূল্যায়ন করার মাধ্যমেই নেভিগেট করি। এখনো শিম্পাঞ্জি একে অন্যের ইনটেনশন বুঝেনা আর হয়তো অস্ট্রোলোপিথরাও পরস্পর ইনটেনশন বুঝতে খুব একটা পারদর্শী ছিলোনা। কিন্তু আজ থেকে ২ মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের পূর্বসূরি হোমো হেবিলসরা দলবদ্ধ হয়ে বিশাল বিশাল বাইসন শিকার করতো আর এখান থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে তারা হয়তো অন্যদের ইনটেনশনও বুঝার জন্য অভিযোজিত হয়েছিল। আমরা বোঝার চেষ্টা করি, সে কি আমাকে সহযোগীতা করতে চায়? আমার কি তাকে নিয়ে চিন্তা করা উচিত? তারা কি আমাদের স্বার্থের ব্যাপারে চিন্তা করে?
আমাদের ব্রেন ধারাবাহিকভাবে সামাজিক জাজমেন্ট তৈরি করে। কিন্তু আমরা কি এগুলো আমাদের লাইফ এক্সপেরিয়েন্স থেকে শিখি নাকি আমরা এগুলো নিয়ে জন্মগ্রহণ করি? এটি জানার জন্য আমরা শিশুদের উপর একটি এক্সপেরিমেন্ট রিপ্রোডিউস করে দেখতে পারি। যে পরীক্ষাটি ইয়েল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী কিলেয় হ্যামলিন, কারেন ওয়েন এবং পল ব্লোম করেছিলো। একবার ডেভিড ইগলম্যান কিছু শিশুকে পুতুল প্রদর্শনীতে ডেকেছিল। এদের বয়স ছিলো এক বছরের চেয়েও কম, যারা সবেমাত্র তাদের চারপাশের জগতকে অনুসন্ধান করছে। তাদেরকে তাদের মায়ের কোলে রেখেই পুতুল খেলা দেখানো হয়।

একটি হাঁস তার তার পাশে আরো কয়েকটি পুতুল সহ বাক্সের দরজা খোলার চেষ্টা করছিলো। হাঁস ঢাকনাটি আঁকড়ে ধরতে চায় কিন্তু পারছিলোনা।। দুটি ভাল্লুক যারা ভিন্ন ভিন্ন রঙের শার্ট পরিহিত ছিলো তারা এ ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে। কয়েক মুহূর্ত পর একটি ভাল্লুক তাকে সাহায্য করে আর অন্য আর একটি ভাল্লুক ঢাকনার উপর তার নিজের ভর দিয়ে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এটাই ছিলো মূল প্রদর্শনী। সম্পূর্ণ শব্দহীন এ প্রদর্শনীতে আমরা যা দেখলাম একটি ভাল্লুক সহযোগিতা প্রবণ আর অন্যটি তা নন। এবার দুটি ভাল্লুককে দর্শক শিশুদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। ইগলম্যান তাদের নির্দেশনা দিলেন তারা কোন ভাল্লুকটিকে নিয়ে খেলতে চায়। ইয়ালের গবেষকরা যে ফলাফল পেয়েছিলেন তিনিও একই ফলাফল পান। বেশিরভাগ শিশুই সেই ভাল্লুক পছন্দ করেছিলো যেটি সহযোগিতাপ্রবণ।

এ শিশুরা হাঁটতে বা কথা বলতে পারেনা কিন্তু অন্যদের সম্পর্কে জাজমেন্ট তৈরি করার জন্য তাদের কাছে টুলস ছিলো। মাঝেমাঝে এটা ধরেই নেয়া হয় যে বিশ্বস্ততা হলো এমনকিছু যা আমরা মূল্যায়ন করতে শিখি বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পর। কিন্তু এ ধরণের সিম্পল এক্সপেরিমেন্ট আমাদের কাছে বর্ণনা করে যে, আমরা জিনগতভাবেই এ ধরণের সামাজিক ফিলিংসের জন্য অভিযোজিত। আমাদের ব্রেন জন্মগতভাবেই বিশ্বাসযোগ্যতা সনাক্ত করার প্রবণতা নিয়ে আসে। আর আমরা এটাও সহজাতভাবে বুঝতে পারি কে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
- ব্রেন; দি স্টোরি অব ইউ
- একজন টিনেজারের চোখে বিশ্ব!
- আইনস্টাইনের ব্রেনে ওমেগা সাইন!
- আমি কি আমার মেমরি?
- নিউরোলজিক্যালি আপনি এ মহাবিশ্বে প্রথম!
- হোয়াট ইজ রিয়ালিটি?
- ব্রেন কিভাবে কাজ করে?
- ব্রেন কিভাবে কাজ করে? (দ্বিতীয়)
- ব্রেন ও রিয়ালিটি
- আপনার মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রক কে?
- ফ্রয়েডের অবচেতন মন
- চেতনা ও স্বাধীন ইচ্ছা


