স্বপ্নে টাইম ডায়ালেশন

Last updated:

ক্রিস্টোফার নোলান ঘুমের উপর অনেক হাই-প্রোফাইলের একটি মুভি তৈরি করেছিলেন। ২০১০ সালের Inception মুভি ১৯৮৫ সালের ড্রিমস্ক্যাপকেও অতিক্রম করেছিল। নোলান কয়েক বছর পর ইন্টারস্টেলার ফিল্ম নির্মান করেন। নোলান তার মুভিতে ঘুম সম্পর্কে কিছু কনসেপ্ট ও মিসকনসেপ্ট তুলে ধরেছিলেন। এগুলোর মধ্যে একটি ছিল ঘুমের মাঝে টাইম ডায়ালেশন! মুভির একটি চরিত্র আর্থার আবিষ্কার করেছিলেন যে, রিয়েল ওয়ার্ল্ডের ৫ মিনিট ঘুমের মধ্যে এক ঘন্টায় পরিণত হয়! কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কী স্বপ্নে সময় থেমে যায়? ঘুমের কিছু বিশ্বজনীন ইন্ডিকেটর আছে। প্রথমত, বাহিরের জগতের সচেতনতা হারিয়ে ফেলা, আপনি আউটসাইট ওয়ার্ল্ডকে অনুধাবন করতে পারবেননা। আপনার চারপাশ সম্পর্কে আপনি চেতনা হারিয়ে ফেলবেন, অন্তত স্পষ্টভাবে আপনি আর কিছুই ফিল করতে পারবেননা।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, আপনার কান তখনও শুনবে, আপনার চোখ যদিও বন্ধ কিন্তু সে দেখবে। একই ব্যাপার আপনার অন্যান্য সেন্সরি অর্গান নাক, গলা ও স্কিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ সকল সিগনাল আপনার মস্তিষ্কে তখনও প্লাবিত হয়, কিন্তু এখানে একটি সেন্সরি কনভার্জেন্স জোন আছে, যেখানে এ সিগনাল গুলোর ভ্রমণ থেমে যায় যখন আপনি ঘুমিয়ে থাকেন। এ সিগনালগুলোকে একটি পারসেপচুয়াল ব্যারিকেড ব্লক করে রাখে যেটাকে বলে “থালামাস”! একটি মসৃণ, ওভাল সেপড অবজেক্ট লেমন থেকে কিছুটা ক্ষুদ্র। থালামাসই হলো আপনার মস্তিষ্কের সেনসরি গেইট। থালামাসই বলে দেবে গেটের ভেতর কোনো সেন্সরি সিগনাল প্রবেশ করবে আর কোন সেন্সরি সিগনালগুলো প্রবেশ করতে পারবেনা।

থালামাস মস্তিষ্কে সেন্সরি ব্লাকআউট তৈরি করে, যা এ সকল সিগনালকে কর্টেক্সে প্রবেশ করতে প্রতিরোধ করে। যার ফলে আপনি সচেতনভাবে সে সকল ইনফরমেশন সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেননা যে ইনফরমেশনগুলো আপনার সেন্সরি অর্গান ট্রান্সমিট করছে। আর ঠিক এ সময় আমাদের মস্তিষ্ক আউটসাইট ওয়ার্ল্ডের সাথে কানেকশন হারিয়ে ফেলে। অন্য একভাবে বললে, আপনি এখন ঘুমাচ্ছেন।

এরপরই যে বিষয়টি আসে সেটি হলো সময়ের বিকৃতি। সবচেয়ে সুস্পষ্ট বিষয়টি হলো, আপনি সাথেসাথে সচেতন সেন্স অব টাইম হারিয়ে ফেলেন এবং সমপরিমাণে একটি ক্রোনোমেট্রিক ভয়েড তৈরি হয়। কল্পনা করুন, শেষ কোনদিন আপনি বিমানে ঘুমিয়েছেন। যখন আপনি জাগ্রত হন, আপনি সম্ভবত ঘড়ি চেক করেন এটা পরিমাপ করার জন্য যে ঠিক কতক্ষণ আপনি ঘুমিয়েছেন। কেনো? কারণ আপনার সময়ের সুস্পষ্টবোধ বাহ্যত হারিয়ে যায়। যখনই সময়ের এ শূন্যতা তৈরি হয় তখন আপনার মধ্যে একটি আত্মবিশ্বাস জন্ম হয় যে আপনি ঘুমিয়েছেন। কিন্তু যখন ঘুমের সময় আপনার কনশাস ম্যাপিং ভেঙে যায়, তখন অবিশ্বাস্য যথার্থতার সাথে মস্তিষ্কের দ্বারা তালিকাভুক্ত সময় অচেতনভাবে কাজ করে। আপনি ঠিকই পরবর্তী দিন নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার জন্য তাড়নাবোধ করেন। সম্ভবত সকালবেলায় আপনি একটি ফ্লাইটও ঠিক সময় ধরতে পারেন। বিছানায় যাওয়ার পূর্বে আপনি সযত্মে ৬.০০ a.m এর সময় সেট করতে পারেন। এবং আশ্চর্যজনকভাবেই ৫.৫৮ মিনিটে ঘুম থেকে জেগে যান।

আপনার ব্রেন অবিশ্বাস্য যথার্থতার সাথে ঘুমের মাঝেও সময়ে লগ-ইন করতে পারে। আমাদের মস্তিষ্কের অন্যান্য অপারেশনের মতো, ঘুমের সময় সময় জ্ঞান সম্পর্কে আপনার সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এটি চেতনার রাডারের তলায় চলে যায়, শুধুমাত্র যখন প্রয়োজন হয় তখন ছাড়া। সর্বশেষ সময়ের বিকৃতির কথাই নোলান তার মুভিতে দেখিয়েছিলেন, স্বপ্নের মধ্যে টাইম ডায়ালেশন, যেটি ঘুমের ঊর্ধ্বে। মনে করুন, শেষ যখন আপনি আপনার এলার্মের Snooze button হিট করেছিলেন এবং স্বপ্ন ভেঙে জাগ্রত হয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত, আপনি আরো ৫ মিনিট আরামদায়ক একটি ঘুমে ফিরে গেলেন। ৫ মিনিট পর আপনার এলার্ম বিশ্বাসযোগ্যভাবে বেজে উঠলো কিন্তু আপনার কাছে সময়ের উপলব্ধি ভিন্ন রকম মনে হতে শুরু করেছিল । ঘুমের সময় আপনার সেন্স অব টাইম হারিয়ে যায়, আর স্বপ্ন দেখার সময় সেন্স অব টাইম ফিরে আসে। কিন্তু স্বপ্নের সময়ের সাথে বাস্তব সময়ের কোনো মিল নেই __ বেশিরভাগ সময়ই স্বপ্নের সময় রিয়েল সময়ের সাথে সম্পর্কযুক্তভাবে দীর্ঘতর হয়। এখনো এই টাইম ডায়ালেশনের কারণ জানা যায়নি।

এরই মধ্যে আমাদের সাম্প্রতিক এক্সপেরিমেন্টাল রেকর্ড কিছুটা আশা জাগিয়েছে। একটি পরীক্ষায় ইঁদুরকে ধাঁধার চারপাশে ভ্রমণ করতে বলা হয়। যখন ইঁদুর স্থানিক বিন্যাস শিখে তখন গবেষকরা তার মস্তিষ্কের সেলগুলোর ফায়ারিং রেকর্ড সংগ্রহ করে। বিজ্ঞানীরা মেমরি ইমপ্রিন্ট করার সাথে সম্পৃক্ত এই সেলগুলোর ফায়ারিং রেকর্ড করা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত রাখে যতক্ষণ পর্যন্ত না ইঁদুর ঘুমিয়ে যায়। তারা তন্দ্রার বিভিন্ন সময় মস্তিষ্ককে আড়ি পেতে শুনতে থাকে, যার মধ্যে র‍্যাপিড আই মুভমেন্টও জড়িত ছিল, এমন একটি স্টেজ যখন একজন মানুষ প্রিন্সিপ্যালি ঘুমায়। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ধাঁধা শেখার সাথে সম্পৃক্ত ব্রেন সেলের উদ্দীপনার সিগনেসার প্যাটার্ন ঘুমের মধ্যেও বার বার পুনরায় প্রতীয়মান হতে থাকে। সেই মেমরিটি ব্রেন সেলের একটি লেবেলে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে যখন ইঁদুরটি ঝিমায়। দ্বিতীয় আবিষ্কার হলো মেমরি রি-প্লেয়িং স্পিড। REM- স্লিপের সময় তাদের মেমরি রিপ্লেয়িং স্পিড ছিলো খুব ধীরগতির, যেটা তার জাগ্রত অবস্থার গতির চেয়ে প্রায় অর্ধেক বা তার একটু বেশি। আর এখান থেকে আমরা মানুষের মস্তিষ্কের সময়ের অভিজ্ঞতাকেও ব্যাখ্যা করতে পারি। নিউরাল টাইমের নাটকীয় হ্রাসপ্রাপ্তি থেকে আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে করতে পারি, কেনো আমাদের মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস কাজ করে রিয়েল সময়ের চেয়ে আমাদের ব্রেন টাইম স্বপ্নের সময় স্লো কাজ করে। মূলত, স্বপ্নের সময় আমাদের নিউরাল টাইম ডায়ালেট হয় আর এ জন্যই আমরা এলার্ম ক্লকের সাথে আমাদের মনস্তাত্বিক সময়ের মিল খুঁজে পাইনা।

তথ্যসূত্রঃ

hsbd bg