স্তন্যপায়ীদের জগতে কতটা আলাদা আমাদের নিউরন?

স্তন্যপায়ীদের জগতে কতটা আলাদা আমাদের নিউরন?

স্বল্প আয়ন চ্যানেলের অ্যাক্টিভিটি যে শক্তি সাশ্রয় করে, তা মস্তিষ্ককে অন্য জটিল কাজগুলো করতে সাহায্য করে।

প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকু তাঁর ‘দ্য ফিউচার অব দ্য মাইন্ড’ বইতে বলেছিলেন, “The brain weighs only three pounds, yet it is the most complex object in the solar system.” কথাটা তিনি খুব বাড়িয়ে বলেননি নিশ্চয়ই; উন্নতির শিখরে থাকা মানবজাতিকে আজও তাই হন্যে হয়ে খুঁজতে হয় নিউরনের অত্যাশ্চর্য কার্যকলাপের খুঁটিনাটি! সেপিয়েন্স সহস্র বছর ধরে নিজেকে অন্য প্রাণীদের চেয়ে একেবারেই আলাদা কোনো সত্তা হিসেবে ভেবে এসেছে, এমনকি তারই মতো ম্যামেলদের কোনো কোনো সদস্যকে নিকৃষ্ট বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু সত্যিই কি আমরা একেবারেই বিশেষ কিছু? এ বিষয়ে আমাদের নিউরন কী বলে?

জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং নিউরাল কানেক্টিভিটি বিবেচনায় আমাদের এই দাবি যথার্থ নয়। আমাদের জিনোম প্রোফাইল বলছে কেবল ১.৫ শতাংশই আমরা অদ্বিতীয়ভাবে মানুষ, যেখানে ৯৮.৫ শতাংশই অন্য প্রাইমেটদের সাথে ম্যাচ করে; জিনগতভাবে শিম্পাঞ্জি,গরিলা আর ওরাংওটাং আমাদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয়। ডেটা স্থানান্তরের দক্ষতার দিক থেকেও অন্য ম্যামেলরা আমাদের সমকক্ষই , সম্প্রতি ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক গবেষণায় এমন ফলই মিলেছে। বহুদিন ধরেই এমন একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে মানব মস্তিষ্কের নিউরাল কানেক্টিভিটি অন্য প্রাণীদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি যার ফলে তার দক্ষতাও অধিক। এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রফেসর ইয়ুনাভ আসাফের এই গবেষকদল মানুষসহ ১২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীকে ‘Diffusion MRI’ নামক ব্রেইন স্ক্যানিং পদ্ধতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত করে। দলটি মূলত Mean-short Path বা  MSP ভ্যালু গণনা করে, যে ভ্যালু দুটো নেটওয়ার্কের মধ্যে তথ্য গমনের জন্য প্রয়োজনীয় নিউরনের ন্যূনতম সংযোগসংখ্যা নির্দেশ করে। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এই ভ্যালু তুলনা করে গবেষকেরা দেখতে পান, ব্রেইন কানেক্টিভিটি ব্রেইনের আকার এবং গঠনের ওপর নির্ভর করে না। প্রফেসর আসাফ বলেন,”আমাদের গবেষণা একটি বিশ্বজনীন নীতিকে উন্মোচিত করে: ব্রেইন কানেক্টিভিটির সংরক্ষণশীলতা। এই নীতি ইঙ্গিত করে যে নিউরাল নেটওয়ার্কে তথ্য স্থানান্তরের দক্ষতা মানুষসহ সব স্তন্যপায়ীর জন্য সমান।” এতে প্রমাণিত হয়, নিউরাল কানেক্টিভিটির দক্ষতার সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, আমাদের নিউরন কী কোনোভাবেই অন্যদের চেয়ে আলাদা নয়? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, তবে সেটা কার্যকারিতার দিক থেকে ততটা পরিষ্কার নয়, যতটা পরিষ্কার এর গঠনগত দিক থেকে। সহজ কথায়,সেপিয়েন্সের নিউরনের গাঠনিক কিছু ভিন্নতা আছে বটে, তবে এর সঙ্গে এফিশিয়েন্ট ব্রেইন ফাংশনের সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

আমাদের নিউরন কীভাবে অন্য ম্যামেলদের চেয়ে আলাদা, সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু টার্ম সম্পর্কে পরিচিত হওয়া দরকার।

  • নিউরন: স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষুদ্রতম একক যা মূলত এক ধরনের কোষ। এর তিনটি অংশ: কোষদেহ(Soma),ডেনড্রাইট ও অ্যাক্সন। ডেনড্রাইটের মাধ্যমে ইলেকট্রিক ইমপালস নিউরন গ্রহণ করে এবং কোষদেহ হয়ে তা প্রয়োজনে অ্যাক্সনের মাধ্যমে অন্য একটি নিউরনের ডেনড্রাইটে স্থানান্তরিত হতে পারে।
স্তন্যপায়ীদের জগতে কতটা আলাদা আমাদের নিউরন?
  • সিন্যাপ্স(synapse): একটি নিউরনের অ্যাক্সনের শেষ প্রান্ত (টার্মিনাল বাটন) এবং অপর একটি নিউরনের ডেনড্রাইটের মাঝে অতিসূক্ষ্ম ফাঁকা স্থানের বিশেষ গঠন হলো সিন্যাপ্স। সিন্যাপ্স মূলত এক নিউরন থেকে আরেক নিউরনে ইলেকট্রিক্যাল বা কেমিক্যাল সিগন্যাল পরিবহনের কাজ করে, এই কাজে সাহায্য করে নিউরোট্রান্সমিটার নামে বিশেষ কিছু কেমিক্যাল।
স্তন্যপায়ীদের জগতে কতটা আলাদা আমাদের নিউরন?
  • আয়ন চ্যানেল: বিশেষ ধরনের রিসেপ্টর যেগুলো বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপক কোষ (যেমন- নিউরন, পেশিকোষ, স্পর্শ সংবেদী কোষ) এর মেমব্রেনে উপস্থিত থেকে রাসায়নিক সংকেতকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করতে পারে।

ইমপালস স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটা মোটিমুটি এই — স্নায়ুতাড়না ইলেকট্রিক সিগন্যালরূপে একটি নিউরনের অ্যাক্সনের শেষ প্রান্ত টার্মিনাল বাটনে পৌঁছায় এবং নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণকে উদ্দীপ্ত করে। উৎপন্ন নিউরোট্রান্সমিটার তখন সিন্যাপ্সের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের নিউরনের ডেনড্রাইটের মেমব্রেনে উপস্থিত আয়ন চ্যানেল রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়। রিসেপ্টর ওপেন হওয়ার সাথে সাথে দুটো নিউরনের মধ্যে আয়ন চলাচল শুরু হয়ে যায় (যেমন Ca2+,Na+,K+) এবং এর মাধ্যমে ইলেক্ট্রিক্যাল সংকেত স্থানান্তরের কাজটি সম্পন্ন হয়।

এবার আসি নিউরনের স্বাতন্ত্র্য আলোচনায়।

২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত একটি পেপারে মানব নিউরনের ডেনড্রাইটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) নিউরোসায়েন্টিস্ট মার্ক হার্নেট ও তাঁর সহকর্মীরা ৯ জন এপিলেপসি রোগী ও ৩০টি ইঁদুরের ব্রেইনের টিস্যু সংগ্রহ করেন। পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, মানুষ ও ইঁদুরের ডেনড্রাইট অ্যাকশন পটেনশিয়াল তৈরির মতো মূল কাজগুলো একইভাবে করলেও মানুষের ডেনড্রাইটগুলোর সংকেত পরিবহন অধিকতর ‘কম্পার্টমেন্টালাইজড’ (compartmentalized)। হার্নেট বলেন, “এটা নির্দেশ করে ডেনড্রাইটগুলোর স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণ (নিউরনের) কোষদেহের উপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীনভাবে সম্পন্ন হয়”। মাইকেল হাউসার, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নিউরোসায়েন্টিস্ট ডেনড্রাইটের সিগন্যাল আলাদা করার বহু দশকের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বলেন,” বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা ছিল মানব ডেনড্রাইটের উচ্চ মাত্রার কম্পার্টমেন্টালাইজেশনের সম্ভাবনা আছে কেননা এই ডেনড্রাইটগুলো অন্য প্রাণীদের তুলনায় দীর্ঘতর”। বিষয়টা হলো, ম্যামেলদের মধ্যে সেপিয়েন্সের ডেনড্রাইটগুলো তুলনামূলক বড় এবং এগুলো প্রত্যেকটি বেশকিছু অঞ্চলে (কম্পার্টমেন্ট) বিভক্ত থাকে যেগুলো স্বাধীনভাবে বিভিন্ন সিগন্যাল বিশ্লেষণ, সমন্বয় এবং সংরক্ষণ করতে পারে বলে ধারণা করা হয়, ফলে বহু ডেনড্রাইটবিশিষ্ট একটি নিউরনে একই সময়ে অনেকগুলো ইনফরমেশন প্রোসেসিং সম্পন্ন হয়, যা তাকে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

অতি সম্প্রতি ‘নেচার‘ এর নভেম্বর,২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত মানব নিউরনের আরো একটি ব্যতিক্রমী দিক সামনে এসেছে। ‘Allometry’ হলো জীববিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যেখানে শরীরের কোনো অংশের আকারের সঙ্গে তার আকৃতি, এনাটমি, ফিজিওলজি এবং আচরণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। এমআইটি, ক্যামব্রিজ এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একদল গবেষক মানুষসহ ১০টি স্তন্যপায়ী প্রজাতির Layer 5 cortical pyramidal neuron এর allometric সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। HCN ও voltage-gated potassium নামক দুটি আয়ন চ্যানেলের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মানুষ ছাড়া বাকি ৯টি প্রজাতিতে নিউরনের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে আয়নিক পরিবাহিতাও বৃদ্ধি পায়। বিপরীতক্রমে, মানুষের নিউরনের ডেনড্রাইটের আকার তুলনামূলক বড় হলেও এতে আয়নিক পরিবাহিতা যথেষ্ট কম, যার অর্থ ডেনড্রাইটের মেমব্রেনে আয়ন চ্যানেলের ঘনত্বও তুলনামূলক কম। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ইলেকট্রিক সিগন্যালের বাকি শক্তি তাহলে যায় কোথায়? এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব না হলেও ড. বিয়েলি-লারোশ এবং তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বাস করেন, মানব নিউরনের স্বল্প পরিবাহিতা ব্রেইনের সেরিব্রাল কর্টেক্সকে অন্যান্য নিউরাল ফাংশন যেমন, সিন্যাপটিক ট্রান্সমিশনে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে অনুমোদন করে। মোদ্দাকথা, স্বল্প আয়ন চ্যানেলের অ্যাক্টিভিটি যে শক্তি সাশ্রয় করে, তা মস্তিষ্ককে অন্য জটিল কাজগুলো করতে সাহায্য করে।

সবশেষে একটা কথাই শুধু বলা যায়, নিজেদের চেনার পথে এখনো বহুদূর যাওয়া বাকি; মস্তিষ্কের ১০০ বিলিয়ন নিউরনের সব গোপন কথা যেদিন আমরা জানতে পারব, সেদিনই হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থেই নিজেদের চিনতে পারব।

তথ্যসূত্র:

আরও পড়ুনঃ

ব্রেন কিভাবে কাজ করে?

hsbd bg