ল্যাবে জন্ম নেয়া ক্ষুদ্র ব্রেনের ইলেক্ট্রিক্যাল সিগনাল!

ল্যাবে জন্ম নেয়া ব্রেন

স্টেম সেল থেকে ল্যাবে জন্ম নেয়া ব্রেন ইলেক্ট্রিক্যাল সিগনাল!

১৯৪০ সালে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা একটি কুকুরের মাথাকে তার শরীর থেকে আলাদা করে মেশিনের মাধ্যমে ১০ মিনিট জীবিত রেখেছেন বলে ডেইলি মেইলে বলা হয়। মূলত এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৪০ সালের একটি ভিডিয়োর উপর ভিত্তি করে। সোভিয়েত ফিল্ম এজেন্সি ভিডিয়োটিতে দেখিয়েছিলেন কয়েকজন বিজ্ঞানী একটি কুকুরের মাথাকে মেশিনের সাথে সংযুক্ত করে সে মাথাটির উপর বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট পরিচালনা করছেন । এ মেশিনের কাজ ছিলো মূলত ব্লাড সার্কুলেশন করা এবং মস্তিষ্কের মৌলিক মোটর ফাংশন পুনরুদ্ধার করা। সাম্প্রতিক প্রকাশিত  জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ১৯৪০ সালের এ ভিডিয়োটি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত কোনো তথ্য পাইনি । তবে উইকিপিডিয়া ও NCBI জার্নালে এ সংক্রান্ত অল্পবিস্তর জানতে পেরেছি। 1941 সালে  আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশের পূর্বেই এ ভিডিয়ো প্রকাশ হয়েছিল জানা যায়।

সার্গেই সের্গেইভিচ ব্রুখোনেনকা ১৯২৮ সালে একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন যা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীদের আর্টিফিশিয়াল ব্লাড সার্কুলেশন করতে পারে। ডিভাইসটির নাম ছিল “অটোজেক্টর” এবং এতে দুটি যান্ত্রিকভাবে চালিত ডায়াফ্রাম পাম্প রয়েছে যার রয়েছে একটি ভালভ সিস্টেম । এই আলাদা মাথাটি পরিবেশের সাথে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল, নিজের মুখ খুলেছিল এবং একটি পনিরের টুকরাও গিলে ফেলেছিল বলে ডেইলি মেইলে জানা যায়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়ো টেকনোলজি ইনফরমেশন বা NCBI জার্নালে Off with Your Heads; Isolated organ in Early Soviet Science and Fiction শিরোনামে প্রকাশিত এ গবেষণাপত্রে বলা হয়, ব্রুখোনেনকার এই এক্সপেরিমেন্টের উদ্দেশ্য ছিলো একটাই আর তা হলো এটা প্রমাণ করা যে জীবন ও মৃত্যু একটি ফিজিক্যাল প্রসেস।

PDF) Sergei Sergeievich Brukhonenko (1890-1960): Pioneer of cardiopulmonary  bypass in the Soviet Union

১৯২৫ সালের দিকে সায়েন্স ফিকশন লেখক Aleksandr Beliaev একটি গল্প লিখেছিলেন “The Head of Professor”  নামে। এ বইটি প্রথম প্রিন্ট হওয়ার সাথেসাথেই ৪০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়। গল্পটি ছিলো মূলত এমনঃ  ইউনাইটেড স্টেটের নাম না জানা কোনো শহরে মিস এডাম নামক একজন মহিলা তার বৃদ্ধ মা ও তরুণী বোনের ভরণপোষণের জন্য একটি চাকরি অনুসন্ধান করছিলেন । সে শহরে  প্রফেসর কার্ন নামক একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি সদ্য একজন মেডিক্যাল গ্রেজুয়েট।

Alexander Belyaev - Wikipedia

কার্ন মহিলাটিকে একটি শর্তে চাকরি দিতে রাজি হন আর তা ছিলো, তিনি সবসময় মাছের মতো চুপ করে থাকবেন। মিস এডাম মিস্টিফায়েড হলেন। একদিন ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করার পর তিনি অদ্ভুত একটি ব্যাপার খেয়াল করলেন। আকস্মিক মাথা ঘোরানোর পর তিনি দেখলেন, একটি জীবন্ত মাথা তার দিকে তাকিয়ে আছে, একটি মাথা, যার শরীর বিচ্ছিন্ন। তিনি এত বেশি আহত হলেন যে যেনো ইলেক্ট্রিক শক। মাথাটি একটি স্কয়ার প্লাটফর্মের উপর ছিল যেটি গ্লাসের তৈরি চারটি দীর্ঘ মেটালের পায়ের উপর দাঁড়ানো। সেখানে ছিলো ম্যানোমিটার, থার্মোমিটার এবং তার অজানা আরো অনেক যন্ত্র। মাথার খুলিটি তার দিকে তাকিয়েছিল চোখ দুটো ফিটফিট করে এবং দেহ থেকে আলাদাভাবে এটি বিচ্ছিন্ন ও সচেতন একটি অস্তিত্বে অবস্থান করছিল। তিনি দেখলেন, মাথাটির চোখের মধ্যে তার চিন্তাগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে।

এত বিরাট একটি শকের পরও তিনি মাথাটি শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি চিনতে পেরেছিলেন এটি প্রফেসর ডোয়েলের মাথা। প্রফেসর ছিলেন একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী। ডোয়েল তার নিজের ইচ্ছায় তার সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট সম্পাদন করার জন্য নিজের শরীরটি ডোনেট করেছিলেন আর প্রফেসর কার্ন তার ইচ্ছা পালন করেছিলেন। প্রফেসর কার্ন দুঃখের সাথে বলেন, আমি শুধু তার মাথাটিকে রক্ষা করতে পেরেছি সম্পূর্ণ শরীর রক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমরা বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির অটল নিয়মে প্রবেশ করি, মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করি এবং ঈশ্বর ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের থেকে জীবিকা কেড়ে নেই। কার্ন মিসেস এড্যামসকে বলেন, আপনার চাকরি হলো প্রফেসর ডোয়েলের মাথাটির দেখাশুনা করা এবং তিনি এ চাকরি গ্রহণ করেন।

কার্ন তাকে কিভাবে মেশিনটি অপারেট করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন এবং দৃঢ়ভাবে নিষেধ করেছিলেন বড় সিলিল্ডারটির ভালভ স্পর্শ না করতে। বিস্ময়করভাবে কিছুদিন পর এ মাথাটি এড্যামসের সাথে এক প্রকার সিম্পল কমিউনিকেশন করার চেষ্টা করে, সে তাকে বারবার মিনতি করে বোঝানোর চেষ্টা করে বড় সিলিল্ডারের ভালভটি স্পর্শ করার জন্য। কিন্তু এডামস ভেবেছিলেন , মাথাটি তার এক্সজিসটেন্স থেকে সুইসাইড করতে চায়। যাইহোক, একটা পর্যায়ে, মিস এডামস মাথাটির কথা শুনতে রাজি হন এবং ভালভটি  টাচ করেন  আর সাথে সাথে এটি মুখ খুলে কথা বলতে শুরু করে। ভয়ানকভাবে এডামসকে এটি  বলে, তিনি একসময় মানুষের মস্তিষ্ককে পূনরুজ্জীবন করার উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন আর কার্ন ছিলো তার এজিসটেন্স। আরো বলল, সে একবার এজমা আক্রান্ত হয়েছিল যা তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু মহিলাটি সন্দেহ করতে শুরু করেন যে, কার্ন আসলে ডোয়েলকে মার্ডার করেছিল মরপিন ইনজেকশন দ্বারা। যাইহোক, ফিকশনের শেষে কি হয়েছিলো তা জানানো আমার উদ্দেশ্য না।

An external file that holds a picture, illustration, etc.
Object name is nihms103461f2.jpg

তবে গল্পটি এখানে শেষ করছি। NCBI এর গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় সায়েন্স ফিকশনটি প্রকাশিত হওয়ার তিনমাস পর ল্যাবরেটরিতে মাথা জীবিত রাখার ফিকশনটি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল । ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে Chemical Pharmaceutical Institute এর এক তরুণ ডাক্তার সার্গেই সের্গেইভিচ ব্রুখোনেনকা, রাশিয়ান মস্কোর প্যাথোলজিস্টদের সেকেন্ড কংগ্রেসে একটি বিশেষ যন্ত্রের কথা বর্ণনা করেন , উদ্ভাবক যেটিকে বলেছিলেন অটোজেক্টর যেটি তৈরি করা হয়েছিলো ল্যাবরেটরিতে মাথাকে জীবিত রাখার জন্য। দীর্ঘ গবেষণাপত্রটিতে এমন আরো কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে যার মধ্যে ১৯০৭ সালের একটি মাছের মাথা পূনরুজ্জীবিত করার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। ১৯৫০ সালে রাশিয়ার বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির ডেমিখো যাকে অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশনের অগ্রদূত বলা হয় তিনি একবার দুই মাথা সম্পর্ণ একটি কুকুর ল্যাবে তৈরি করেছিলেন।

An external file that holds a picture, illustration, etc.
Object name is nihms103461f6.jpg

২০২০ সালে ন্যাচার জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিলো Can lab-Grown Brain become Conscious শিরোনামে। এ ধরণের অতি-ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক তৈরি হয় স্টেম সেল থেকে। ক্ষুদ্র গঠনের এই মস্তিষ্ককে বলা হয় অর্গানয়েড। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিগোর নিউরোসায়েন্টিস্ট মিউট্রি  ব্রেনগুলো রোবটের সাথেও সংযুক্ত করেছিলেন। তাদের জিন মোডিফাই করেছিলেন নিয়ান্ডারথালের জিন দিয়ে।

Reproducible Brain Organoids Could Offer New Models for Research | ALZFORUM

এ ব্রেনগুলোকে তিনি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে প্ররণ করেছিলেন এবং হিউম্যান আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স উন্নত করার জন্য মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এবং তিনি অর্গানয়েড মস্তিষ্কের মধ্যে কোভিড-১৯ ও সার্স সংক্রমিত করেও দেখেছেন।  ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে মিউট্রি ও তার অন্যান্য সহযোগীরা মিলে সেল জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেখানে বলা হয়, হিউম্যান ব্রেন অর্গানয়েড এমনকিছু সমন্বিত ব্রেন একটিভিটি তৈরি করে যা একমাত্র অপরিণত শিশুদের মস্তিষ্কে দেখা যায়। গবেষকরা এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করার পূর্ব পর্যন্ত এই ওয়েভ শুধু নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে তৈরি হয়েই চলেছিল বলে ন্যাচার জার্নালে জানা যায়। এ ধরণের সুসমন্বিত ইলেক্ট্রিক্যাল একটিভিটি শুধুমাত্র কনশাস ব্রেনেরই একটি প্রপার্টি। এখান থেকে অর্গানয়েড ব্রেন ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন জন্ম লাভ করে। যদি ল্যাবরেটরিতে চেতনা তৈরি করা যায় তবে প্রশ্ন আসে-  ঈশ্বর কোথায়? কোথায় আত্মা? কোথায় মহাজাগতিক চেতনা? কোথায় পরকাল?

আরও পড়ুনঃ প্রযুক্তিগত স্বর্গ-অমরত্ব ও ঈশ্বরের মনস্তত্ব

তথ্যসূত্রঃ

hsbd bg