ব্রেন ও রিয়ালিটি

ব্রেন ও রিয়ালিটি

''The Unexpected Visitor'' চিত্রকল্পটি খুলে দিয়েছে মস্তিষ্কের সিক্রেট! Part-9

Last updated:

১৯৬০ সালে একটি এক্সপেরিমেন্ট পরিচালিত হয়েছিল মানব মস্তিষ্কের উপর যা উন্মোচন করে দারুণ এক রহস্য। এ এক্সপেরিমেন্ট ছিলো আমাদের মস্তিষ্কের ইন্টারনাল মডেল নিয়ে। পরীক্ষায় দেখানো হয়েছিলো আমরা আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর বিশ্বের যে মডেল তৈরি করি সেটি অত্যন্ত লো-রেজুলেশন সম্পর্ন কিন্তু আপগ্রেডবল। আসলে আমাদের মস্তিষ্কের ইন্টারনাল মডেল আমাদেরকে পরিবেশ সম্পর্কে একটি কুইক সেন্স(Quick Sense) প্রদান করে। আর এ বিশ্বকে বোঝার জন্য এটাই আমাদের প্রাইমারি ফাংশন। আমাদের মস্তিষ্ক একটি বস্তুর বিস্তারিত ব্যাখ্যাকে ত্যাগ করে শুধুমাত্র অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একদম সংক্ষিপ্ত একটি বর্ণনা প্রদান করে আর এ বর্ণনা আমাদের নিকট একদম পারফেক্ট মনে হয়। আমাদের মধ্যে একপ্রকার ইলিউশন জাগ্রত হয় যে আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখছি সবকিছু একদম ফাইনার ডিটেইলস সহকারে জানছি।আর এ জন্য রাশিয়ার মনোবিজ্ঞানী পল ইয়ারবুস কয়েক জন ব্যক্তিকে একত্রিত করে একটি ছবি দেখান। এ চিত্রকল্পটি তারা আগে কোনোদিন দেখেনি। ইলিয়া রেপিনের The Unexpected Visitor চিত্রকল্পটি ব্যবহার করে তিনি তার সাবজেক্টদের বলেছিলেন তিন মিনিটের ভেতর এ চিত্রকল্পটিতে কি কি আছে তা বিস্তারিত দেখার জন্য। তারপর তিনি চিত্রকল্পটি লুকিয়ে রাখেন এবং তাদের একে একে প্রশ্ন করেন, চিত্রকল্পটিতে কি কি ছিল। এ এক্সপেরিমেন্টে মনোবিজ্ঞানী তাদের ব্রেনকে তিন মিনিট সময় দিয়েছিল যাতে তাদের ব্রেন এ স্কিনের একটি ইন্টারনাল মডেল তৈরি করতে পারে কিন্ত এ মডেল ঠিক কতটা বিস্তারিত ছিল? প্রত্যেকেই যারা এ চিত্রকল্পটি দেখেছিল সবাই জানতো এখানে কি কি আছে। কিন্তু যখন তাদেরকে স্পেসিফিক্যালি প্রশ্ন করা হয়, এ সত্য পরিচ্ছন্ন হয়ে যায় যে, তাদের মস্তিষ্ক অধিকাংশ বিস্তারিত পরিপূরণ করেনি। দেয়ালে কতগুলো পেইন্টিং ছিল? ফ্লোরে কার্পেট ছিলো নাকি কাঠ? Unexpected Visitor এর এক্সপ্রেসন কেমন ছিল?উত্তর দেয়ার অক্ষমতা আমাদের কাছে প্রমাণ করেছিল যে তারা শুধু ছবিটিকে সরাসরি সেন্স থেকে গ্রহণ করেছে। পরবর্তী সময়ে তারা যখন আবিষ্কার করলো তাদের এত low – regulation এর ইন্টারনাল মডেল সত্ত্বেও তাদের মনে হয়েছে তারা সবকিছু জানে তারা খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। এবার তাদেরকে পুনরায় সুযোগ দেয়া হয় ছবিটি দেখার জন্য, তাদের চোখ ইনফরমেশনগুলো তীক্ষ্মভাবে দেখতে থাকে এবং নতুন ও আপডেট ইন্টারনাল মডেল ডেভেলপ করে। এটি আসলে আমাদের মস্তিষ্কের ব্যর্থতা নয়। আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্বের পারফেক্ট সিমুলেশন তৈরি করতে চায়না। তারচেয়ে বরং আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত একটি আনুমানিক মডেল অংকন করে।অতএব কেনো আমাদের ব্রেন আমাদেরকে রিয়ালিটির Full Picture দেয়না? কারণ আমাদের ব্রেন খুবই এক্সপেন্সিভ এবং এনার্জি- ওয়াইজ (Energy Wise) ! আমরা যে এনার্জি শোষণ করি তার ২০ শতাংশ খরচ হয় আমাদের ব্রেইনকে পাওয়ার দেবার জন্য। আর এ জন্য মস্তিষ্ক যেনো এ সীমিত পরিমাণ শক্তির সবচেয়ে সাশ্রয়ী ব্যবহার করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখে। আমরা যদি আমাদের ফিফথ সেন্সের ইনফরমেশনগুলো প্রসেস করতে মিনিমাম এনার্জি ব্যবহার করি তবে এটি টিকে থাকার ক্ষেত্রে আমাদের উপযোগিতা দেয়। আমরা যদি কোনো একটি বস্তুর সম্পূর্ণ ইনফরমেশন সংগ্রহ করতে যাই তবে আমাদের মস্তিষ্ক এনার্জি ক্রায়সিসে পড়বে আর তার প্রভাব পড়বে আমাদের শরীর ও মনে। আমাদের প্রজাতি খুব শীঘ্রই ব্রেন এনার্জি ক্রায়সিসে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ব্রেন  ও রিয়ালিটি
ব্রেন ও রিয়েলিটি

নিউরোসায়েন্টিস্টরাই যে আমাদের দৃষ্টির এ সমস্যাটি আবিষ্কার করেছেন তা একদম ঠিক নয়। ম্যাজিশিয়ানরা অনেক পূর্ব থেকেই আমাদের মস্তিষ্কের এ সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতেন। আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করে যাদুকরা তাদের সুক্ষ্ম হাতের কারসাজিতে আপনাকে হয়তো বিভ্রান্তও করেছিল । যদিও তারা আপনার সাথে খেলা করেছে কিন্তু তারা এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে যে আপনার ব্রেন শুধু বাস্তবতার অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিছু বিটই প্রসেস করতে সক্ষম। ম্যাজিক আপনাকে আপনার ব্রেন লিমিট বুঝিয়ে দেয়। এখান থেকেই আমরা ট্রাফিক এক্সিডেন্টের ভয়াবহ ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করতে পারি আর এটাও ব্যাখ্যা করতে পারি কেনো একজন ড্রাইভার ফাঁকা রাস্তায় পথচারী বা অন্য কোনো গাড়ীর সাথে কোলাইড করে। অনেক সময় আমাদের চোখ সঠিক পয়েন্টেই তাকিয়ে থাকে কিন্তু ব্রেইন বুঝতে পারেনা আসলে সেখানে কি আছে।

রিয়েলিটির সুক্ষ্ম একটি পর্দার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে থাকাঃ

আমরা মনে করি যে, কালার আমাদের চারপাশের বিশ্বের ফান্ডামেন্টাল রিয়েলিটি। কিন্ত বাহিরের বিশ্বে বাস্তবে কোনো কালার নেই। যখন কোনো একটি বস্তুকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন আঘাত করে। আমরা মিলিয়ন মিলিয়ন কম্বিনেশনের ওয়েভল্যাংথের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি__ কিন্তু কালার বা রঙের উপলব্ধি আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর। কালার হলো ওয়েভল্যাংথের ইন্টারপ্রিটেশন যেটি শুধুমাত্র আমাদের মধ্যে ইন্টারনালি অবস্থান করে।

এবং এটি কিছুটা অদ্ভুত কারণ আমরা যে ওয়েভল্যাংথের কথা বলছি তা শুধুমাত্র দৃশ্যমান আলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত, ওয়েভ ল্যাংথের স্প্রেক্ট্রাম যা রেড ভায়োলেট থেকে পথ চলে। কিন্তু দৃশ্যমান আলো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্প্রেক্ট্রামের ক্ষুদ্র একটি ফ্র্যাকশন মাত্র __ দশ ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ। আর এ এক ভাগের মধ্যে আছে রেডিও ওয়েভ, মাইক্রোওয়েভ, এক্স-রে, গামা-রে, সেল ফোন কনভারসেশন, ওয়াই-ফাই এবং ইত্যাদি। এগুলোর সবগুলোই এ মুহূর্তে আমাদের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে কিন্ত আমরা এগুলোর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কারণ আমাদের কাছে কোনো স্পেশালাইজড বায়োলজিক্যাল রিসেপ্টর নেই যে আমরা এ সকল সিগনাল স্প্রেক্ট্রামের অন্যান্য অংশ থেকে গ্রহণ করতে পারব। আমরা রিয়েলিটির যে টুকরো দেখি সেটি আমাদের বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টর দ্বারা সীমাবদ্ধ।

প্রতিটি সৃষ্টির রিয়েলিটির নিজস্ব স্লাইস রয়েছে। অন্ধ ও বধীররা এনভায়রণমেন্ট থেকে টেম্পারেচার ও ঘ্রাণ নিয়ে থাকে। বাদুড় এয়ার কম্প্রেসন তরঙ্গ থেকে ইকোলোকেশন ব্যবহার করে। গোস্ট নাইফফিশ ইলেক্ট্রিক্যাল ফিল্ডের মাধ্যমে তাদের বিশ্বকে ডিফাইন করে। তারা ইকোসিস্টেমের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি স্লাইসই কেবল ডিটেক্ট করতে পারে। কারো কাছেই অবজেক্টিভ রিয়েলিটির প্রকৃত অভিজ্ঞতা নেই যা আসলেই বাস্তব। প্রতিটি সৃষ্টি ততটুকু অনুভব করতে পারে যতটা না অনুভব করার জন্য তারা বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সম্ভবত প্রতিটি সৃষ্টিই তার রিয়ালিটির অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি স্লাইসকেই সামগ্রিক রিয়ালিটি মনে করে। কেনো আমরা এটা কল্পনা করতে পারবোনা যে আমরা যা জানি তার বাহিরেও একটা কিছু আছে?

আমাদের মাথার বাহিরের জগত সত্যিকার অর্থে কেমন দেখতে? বিশ্বে যে শুধুমাত্র কোনো কালার নেই তাও না, এখানে কোনো শব্দও নেই। বাতাসের সংকোচন ও সম্প্রসারণ আমাদের কানে প্রবেশ করে এবং সেটা পরে ইলেক্ট্রিক্যাল সিগনালে পরিণত হয়ে যায়। তারপর ব্রেন এসব সিগনালকে মেলিফ্লুয়াস টোন হিসেবে উপস্থাপন করে এবং পরিণত করে শব্দে। রিয়েলিটির কোনো গন্ধ নেই, আমাদের মস্তিষ্কের বাহিরে ঘ্রাণ অবস্থান করেনা। বাতাসের মধ্যে মলিকিউলস ভেসে বেড়ায় আমাদের নাকের রিসেপ্টর বেধে দেয় এবং আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন স্মেল ইন্টারপ্রেট করে। রিয়েল ওয়ার্ল্ড সেন্সরি ইভেন্ট পরিপূর্ণ নয়; তার পরিবর্তে আমাদের মস্তিষ্ক এ বিশ্বকে Light Up করে তার নিজস্ব সেন্সচুয়ালিটি দিয়ে।

আপনার বাস্তবতা ও আমার বাস্তবতাঃ

আপনি কিভাবে বুঝবেন যে আমাদের সবার বাস্তবতা সমান? আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে এটা বলা প্রায় অসম্ভব যে আমাদের নিজেদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। তবে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ক্ষুদ্র একটি ফ্র্যাকশন আছে যাদের রিয়ালিটির উপলব্ধি আমাদের থেকে সম্পূর্ণ  আলাদা। আমরা এক্ষেত্রে Hannah Bosley এর কথা আলোচনা করতে পারি। তার কাছে এক একটি এলফাভেট এক এক রকম কালার সেন্স তৈরি করত। J দেখতে ছিলো বেগুনি এবং T ছিল লাল। বর্ণমালা স্বতস্ফুর্ত এবং অনৈচ্ছিকভাবেই কালার এক্সপেরিয়েন্স ট্রিগার করতো এবং তার এসোসিয়েশন চেঞ্জ হতো না। তার ফার্স্ট নেইম তার কাছে হলুদ রঙের মনে হয় যা ধীরে ধীরে লাল হয়ে যায় আর তারপর মেঘাচ্ছন্ন এবং পরবর্তীতে আবার লাল রঙে ফিরে আসে। “Iain” নামটি দেখলেই তার বমি হতো কিন্তু এতকিছুর পরও মানুষের সাথে তার সম্পর্ক ছিলো সুন্দর। হানাহ আসলে পোয়েটিক বা মেটাফোরিক্যাল ছিল না। তার মধ্যে যে পারসেপচুয়াল অভিজ্ঞতা দেখা গিয়েছিল সেটাকে বলে ” সিনেসথিসিয়া”! সিনেসথিসিয়া এমন একটি কন্ডিশন যেখানে সেন্স ব্লেন্ডেড বা মিশ্রিত হয়ে যায়। এ রোগের বিভিন্ন ভার্সন আছে। এক ধরণের সিনেসথিসিয়া আছে যেখানে “শব্দকেও স্বাদ” লাগে। কেউ কেউ শব্দের মধ্যে রঙ দেখে। আবার কেউ কেউ গতি বা ভিজুয়াল মোশনের শব্দ শোনে। বিশ্বের প্রায় ৩% মানুষ সিনেসথিসিয়ায় আক্রান্ত। ডেভিড ইগলম্যান তার ল্যাবে এ পর্যন্ত ৬০০০০ সিনেসথেসিসকে পরীক্ষা করেন। হানা তার ল্যাবে দু-বছর কাজ করছেন। সিনেসথেসিসদের থেকে আমরা যা জানতে পারি তা হল এ বিশ্ব আমাদের সবার জন্য সমান নয়। বিশ্ব সবার সাথে সমানভাবে ফিট হয়না। সিনেসথেসিয়ার কারণ হলো আমাদের মস্তিষ্কের দুটি সেন্সরি এরিয়ার সাথে ক্রস-টক (cross talk) , প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্রের ছিদ্রযুক্ত বর্ডারের মত। সিনেসথেসিয়া আমাদের বলে যে, এমনকি আমাদের মস্তিষ্কে একদম আণুবীক্ষণিক পর্যায়ের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও আমাদের ব্রেনকে চেঞ্জ করে দিতে পারে। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, ব্রেন থেকে ব্রেনে আমাদের সবার ইন্টারনাল এক্সপেরিয়েন্স আলাদা।

তথ্যসূত্রঃ

আগের পর্বগুলোঃ

  1. ব্রেন; দি স্টোরি অব ইউ
  2. একজন টিনেজারের চোখে বিশ্ব!
  3. আইনস্টাইনের ব্রেনে ওমেগা সাইন!
  4. আমি কি আমার মেমরি?
  5. নিউরোলজিক্যালি আপনি এ মহাবিশ্বে প্রথম!
  6. হোয়াট ইজ রিয়ালিটি?
  7. ব্রেন কিভাবে কাজ করে?
  8. ব্রেন কিভাবে কাজ করে? (দ্বিতীয়)
hsbd bg
%d bloggers like this: