বিবর্তনে লিঙ্গ-সমতা

বিবর্তনে লিঙ্গ-সমতা

ম্যান দ্য হান্টার- ওম্যান দ্য গ্যাদারার ও বিবর্তনে লিঙ্গ-সমতা

শৈশব থেকে আমরা হিউম্যান অ্যানথ্রোপলজির নানা বিষয় বিক্ষিপ্তভাবে জেনে বড় হই, তার মধ্যে অন্যতম সাধারণ একটা চিত্র হলো — পরিবারের বা গোষ্ঠীর পুরুষ সদস্যরা অস্ত্র হাতে শিকারে বের হতো, দলবদ্ধভাবে জন্তু শিকার করে ক্যাম্পে ফিরে সবার প্রোটিনের ব্যবস্থা করত আর নারী সদস্যরা বাচ্চা দেখাশোনা ও ফলমূল সংগ্রহের কাজ করত। অনুমান করা যায়, ১৯৬৬ সালে আমেরিকার তৎকালীন বড় বড় অ্যানথ্রোপলজিস্ট কর্তৃক অনুষ্ঠিত এক সিম্পোজিয়ামে ‘Man The Hunter’ থিওরি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয় এবং শিকারের কৃতিত্ব একচেটিয়াভাবে পুরুষের দখলে চলে যায়। কিন্তু এ চিত্র কতটা বাস্তবসম্মত? আজকের অলিম্পিক গেমসকে আমরা উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

১৮৯৬ সালে যখন আধুনিক অলিম্পিক গেমসের যাত্রা শুরু হয়, তখন নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। সেসময় এটা মনে করা হতো যে শারীরিক কসরত যেমন- দৌড়ানো, লাফানো নারীদের প্রজননতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে এবং পুরুষের কাছে তাকে আবেদনহীন করে তোলে। পিয়েরে দ্য কুবারতিন, আধুনিক অলিম্পিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, যুক্তি দেখান যে নারীদের অংশগ্রহণ বাস্তবর্জিত, অসুন্দর এবং শিল্পগুণবিহীন। যাই হোক, অ্যালিস মিলিয়াটের উদ্যোগে ১৯৩৪ সাল থেকে নারী অ্যাথলেটদের জন্য ‘উইমেন’স ওয়ার্ল্ড গেমস’ নামে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অলিম্পিক গেমসের সাথে সমন্বিত হয় এবং ১৯০০’র অলিম্পিকে ৯৯৭ জন অ্যাথলেটের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ইভেন্টে যেখানে মাত্র ২২ জন ছিলেন নারী, সেখানে ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো সকল ইভেন্টে নারীরা অংশগ্রহণ করে। ২০১৬ সালের রিও ডি জেনেরিও অলিম্পিকে মোট অ্যাথলেটের ৪৫ শতাংশই (৪৭০০ জন) ছিলেন নারী। কিন্তু এই পরিসংখ্যান আসলে কী নির্দেশ করে? এই পরিসংখ্যান এটাই নির্দেশ করে যে শারীরিক কসরত কিংবা সামর্থ্যের দিক থেকে নারীরা পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। এতো গেল পরিসংখ্যান, আর্কিওলজিক্যাল ইতিহাস কী বলে এ ব্যাপারে? নারীরা কী শুধুই ছিল সংগ্রাহক, নাকি শিকারেও তাদের ছিল স্বাধীন অংশগ্রহণ?

পুরুষ যখন শিকারী এবং নারী যখন সংগ্রাহক

লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের বেশ কয়েকটি বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা প্রস্তাব করা হয়েছে:

  • শিকারী- সংগ্রাহক নারী-পুরুষ উভয়ের কাছেই তাদের রিসোর্স বিনিয়োগের দুটো অপশন থাকে: উৎপাদিত সন্তানের সার্বিক পরিচর্যা, অথবা অধিক পরিমাণে সন্তান উৎপাদন। ‘Life History Theory’ অনুসারে, যদিও নারী পুরুষ উভয়ই রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের জন্য লাভ-ক্ষতি হিসেব করে দুটো বিকল্পের একটা বেছে নেয়, এই বাছাইয়ের মধ্যেও তফাৎ রয়েছে। আদিম বহুগামী সমাজে নারীরা প্যারেন্টাল কেয়ারের প্রতি যত্নবান যেহেতু তারা জানে কোন সন্তানগুলো তাদের নিজেদের এবং তাদের সন্তান উৎপাদনের অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ রয়েছে কেননা প্রতিটি সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়াই কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে পুরুষেরা নিজেদের সন্তানদের পিতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চিত, কিন্তু তাদের রয়েছে কম কষ্টসাধ্য ও কম ঝুঁকিপূর্ণ বেশি সংখ্যক মিলনের সুযোগ। ফলে নারীরা স্বাভাবিকভাবেই সন্তানদের দেখাশোনা করে, নিজেদের এবং সন্তানদের জন্য উদ্ভিজ্জ খাবারের ব্যবস্থা করে, যা বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরির অধিকতর নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং পুরুষেরা স্বচ্ছন্দে শিকারে ব্যর্থতার ঝুঁকি নিতে পারে।
  • লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজনের আরেকটি প্রথাগত ব্যাখ্যা হলো, নারী ও পুরুষ এমনভাবে খাদ্যের উৎস নির্ধারণ করে যেন পরিবারের সকলেই লাভবান হয়। নারীরা যেখানে হয়তো এমন খাদ্যকে টার্গেট করে যা তাদের প্রজনন এবং সন্তান দেখাশোনার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেখানে পুরুষেরা সেইসব খাদ্যকে টার্গেট করে যেগুলো নারীরা সংগ্রহ করে না; ফলে দৈনিক খাদ্যগ্রহণে বৈচিত্র্য বেড়ে যায় এবং পরিবারের জন্য সুষম খাবারের ব্যবস্থা হয়। মোটকথা, নারী-পুরুষ পরস্পরের সংগৃহীত পৃথক পৃথক খাদ্যের সর্বোত্তম মিশ্রণ নিশ্চিত হয়।
  • শো-অফ বা সিগনালিং হাইপোথিসিস অনুসারে, পুরুষেরা শিকারকৃত প্রাণী ব্যাপকভাবে শেয়ার করার মাধ্যমে সামাজিক মনোযোগ আকর্ষণে এবং মিলনের সুবিধার জন্য শিকার করে। এই মডেল প্রস্তাব করে যে শিকারের কার্যক্রম পরোক্ষ জেনেটিক গুণের একটি সত্যিকারের বার্তাবাহক, যা পুরুষকে পরবর্তীতে মিলনের সুবিধা দেয়। নারীরা যেখানে নির্ভরযোগ্য খাদ্যের ব্যবস্থা করে, সেখানে পুরুষেরা শ্রম ও কষ্টার্জিত খাদ্যকে টার্গেট করে, অর্থাৎ শিকারকে মিলন বা পুরুষের সাথে পুরুষের ভাবমূর্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা উপায় হিসেবে দেখা হয়।

তবে বিদ্যমান এই থিওরি ও হাইপোথিসিসগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে, এমন বহু প্রমাণও পাওয়া গেছে, এখন সেগুলো নিয়েই আলোচনা করব।

নারী শিকারীর দেহাবশেষ: আর্কিওলজিক্যাল প্রমাণ

একটা চিত্র কল্পনা করুন– পেরুর আন্দিস পর্বতমালার বিশাল শূন্যতার মাঝে শিকারী-সংগ্রাহকদের একটা দল, এক পাল ভিকুয়াঁকে ( হরিণসদৃশ প্রাণী) সতর্ক পদক্ষেপে অনুসরণ করছে; শিকারীরা কিছু পাথুরে প্রোজেক্টাইল নিক্ষেপ করে অনায়াসে কয়েকটাকে ধরাশায়ী করল, বাকিগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে পালিয়ে গেল। অতঃপর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিকারীরা তাদের শিকারকে পরীক্ষা করতে ছুটল। ট্রাডিশনালিস্টদের কাছে নারীদের শিকারে অংশগ্রহণ একটা কষ্ট-কল্পনা, কিন্তু আন্দিস পর্বতমালার সন্নিকটে উইলামায়া পাজাক্সটা নামক এক সাইটে ৯০০০ বছরের পুরনো এক শিকারীর কবরের সন্ধান মেলে। ২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সহকারী অধ্যাপক রেন্ডি হাস্ ও তাঁর দল ছয়টি সমাধির সন্ধান পায় এই সাইটে, যার দুটো ছিল শিকারের অস্ত্রে সমৃদ্ধ, বিশেষভাবে ষষ্ঠ সমাধিটা। দাঁতের বৃদ্ধি পরীক্ষা করে এই শিকারীর বয়স নির্ধারিত হয় ১৭-১৯ বছর। খোঁড়াখুঁড়ির কাজ যত এগোতে লাগলো, মানুষ সবিস্ময়ে বলতে লাগল,”Wow, he must’ve been a great hunter, a really important person in the community.” অর্থাৎ প্রথমে এটাকে একজন পুরুষ শিকারীর সমাধি হিসেবেই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু হাস্ এবং তাঁর টিম বিস্মিত হয়েছিল যখন মাথার খুলি এবং দাঁতের প্রোটিন বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে এটা ছিল একজন নারীর দেহাবশেষ।

বিবর্তনে লিঙ্গ-সমতা
পেরুর Wilamaya Patjxa সাইটে খনন
Image source: https://cdn.mos.cms.futurecdn.net/xNuLUvEkcUThn72uDCepkQ-970-80.jpg.webp

এরপর হাস্ তাঁর দলকে নিয়ে নামেন অনুসন্ধানে। লেইট প্লাইস্টোসিন (১১৭০০ বছর পূর্বে সমাপ্তি)  এবং আর্লি হলোসিন (১২০০০ থেকে ১১৫০০ বছর পূর্বে সূচনা) যুগের শিকারী- সংগ্রাহকদের সমাধির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, ১০৭টি প্রাচীন সমাধির মধ্যে ২৭ টি বড় শিকারের হাতিয়ারে সজ্জিত ছিল, যার মধ্যে ১১টি ছিল নারীর এবং ১৫ টি পুরুষের। স্ট্যাটিসটিক্যাল বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, মোট পপুলেশনের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ শিকারী ছিল নারী।

ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার অ্যানথ্রোপলজির প্রফেসর মেরিন পিলৌড মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মাঝে অস্বাভাবিক কিছু নয়, “যদি একই আর্টিকেল কোনো পুরুষ কঙ্কালের সাথে সম্পৃক্ত হতো, কোনো প্রশ্নই হয়তো উঠত না যে সে আদৌ কোনো শিকারী ছিল কিনা”। বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ক্যাথলিন স্টার্লিং এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ অন্য রকম একটি দিক ব্যাখ্যা করেন। কেন শিকারের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য ছিল না এ বিষয়ে তাঁর মত, বয়স সম্ভবত লৈঙ্গিক পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বয়োপ্রাপ্ত শিশু বা কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের প্রয়োজন হতো পশুর পালকে খাদের কিনারায় তাড়া করতে, ফাঁদে ফেলতে কিংবা একই ডিরেকশানে চালিত করতে যাতে প্রোজেক্টাইল নিক্ষেপে সহজেই ধরাশায়ী করা যায়, ফলে নারী-পুরুষ বিভেদের সুযোগ এখানে ছিল না।

বিবর্তনে লিঙ্গ-সমতা
শিকারে ব্যস্ত  অ্যাগটা নারীরা

[image source: https://tspace.library.utoronto.ca/bitstream/1807/43145/1/Dobe1987%285%29.jpg ]

ফিলিপাইনের মাগায়ান, ইসাবেলা এবং কুইরিনো প্রদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অ্যাগটা জনগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী মূলত শিকার- সংগ্রহকেন্দ্রিক হলেও পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের বিচরণ ভূমি পরিবর্তন করছে এবং নতুন নতুন কাজে যুক্ত হচ্ছে; কোথাও কোথাও তারা মাংস, মাছ বিক্রি করছে, কেউবা ক্ষেতমজুর হিসেবে কাজ করছে। তবে কৃষিসমাজের সাথে ইন্টারেকশন সত্ত্বেও তারা নিজেদের সর্বাগ্রে শিকারী এবং মৎস্যজীবী হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। কৃষিকাজের সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও শিকারী- সংগ্রাহকদের জীবন এখনো পরিত্যাগ করেনি বলেই হয়তো তাদের মধ্যে এখনও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিকার ও সংগ্রহে অংশগ্রহণ করে। অ্যাগটা পুরুষ, নারী ও শিশুরা শিকার করে, মাছ ধরে, শস্য উৎপাদন করে অথবা নিত্যদিনের খাবার সংগ্রহ করে। অ্যাগটা নারীরা দৈনন্দিন জীবিকা এবং ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ অংশগ্রহণ করে। তারা কুকুর, ছুরি, তীর-ধনুকের সাহায্যে উল্লেখযোগ্য অনুপাতে বন্য শূকর ও হরিণ শিকার করে। ১৮৫ দিনের এক পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, নারী শিকারীর দল মোট শিকারের প্রায় ২২ শতাংশ শিকার করে, সাফল্যের হার ৩০.৪ শতাংশ। অন্যদিকে, নারী- পুরুষের সম্মিলিত দল মোট মাংসের ৩৫ শতাংশ জোগাড় করতে সক্ষম, যেখানে সাফল্যের হার ৪১ শতাংশ। কিশোরী-যুবতী নির্বিশেষে মাছ শিকার করে। নারীরা বিশেষভাবে লক্ষণীয় বর্শা দিয়ে মাছ শিকারের দক্ষতার জন্য, গভির- অগভীর যেকোনো জলস্রোতে‌। কদাচিৎ নদী বা সমুদ্র থেকে মলাস্ক পর্বের প্রাণীও তারা সংগ্রহ করে। পুরুষেরা সাধারণত মধু সংগ্রহে বেশি আগ্রহী। অ্যাগটা নারীরা ধান, ভুট্টা, মিষ্টি আলু, কাসাভা এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনে পুরুষের পাশাপাশি যথেষ্ট সক্রিয়; নারী পুরুষ নির্বিশেষে ফসলের অবশেষ পরিষ্কার করে, ফসল রোপণ এবং চাষাবাদ করে। মোটাদাগে, অ্যাগটা সমাজে শিকার, সংগ্রহ কিংবা ফসল উৎপাদনে কোনো লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন দেখা যায় না, বা অন্য কথায়, ‘Man the hunter, woman the gatherer’ থিওরি এখানে অচল। এছাড়া কালাহারি মরুভূমির কুং জনগোষ্ঠীর কথাও যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই শিকার ,সংগ্রহ ও বাচ্চা লালন-পালনের কাজ করে, যদিও পুরুষেরা শিকার এবং নারীরা সংগ্রহের প্রতি প্রবণতা দেখায়।

লিঙ্গ-সমতা: বিবর্তনের সহায়

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অ্যানথ্রোপলজিস্ট মার্ক ডিবল তাঁর পরিচালিত এক স্টাডির আলোকে বলেন,” এখনো এই ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে শিকারী- সংগ্রাহক সমাজ পুরুষশাসিত। আমরা বরং এটা বলব যে এই অসাম্য শুধুমাত্র কৃষির আবির্ভাবের কারণে উদ্ভূত হয়েছে, যখন মানুষ সম্পদ সঞ্চয় করতে শুরু করে”। ডিবলের মতে, সাম্প্রতিক আবিষ্কার সাজেস্ট করে যে, লিঙ্গ- সমতা হয়তো একটি সার্ভাইবাল সুবিধা ছিল এবং মানবসমাজ ও বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। লিঙ্গ- সমতা সামাজিক সংগঠন যেমন- জোড়বদ্ধ হওয়া, বৃহৎ এবং সামাজিক মস্তিষ্ক, ভাষার উৎকর্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিজ্ঞানীরা  সমতাভিত্তিক অ্যাগটা ও এমবেন্ডজেল শিকারী-সংগ্রাহক গোষ্ঠী এবং পিতৃতান্ত্রিক প্যারানান কৃষিগোষ্ঠীর জিনোলজিক্যাল ডেটা সংগ্রহ করেন। তারা একটা কম্পিউটার মডেল প্রস্তুত করেন ক্যাম্প সম্পৃক্ততা সিমুলেট করার জন্য। সমতাভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলোতে বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত গ্রুপগুলোতে ডায়াড (পরস্পর সম্পর্কযুক্ত জোড়া যেমন স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন ইত্যাদি) বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫% ডায়াড ছিল রক্তের সম্পর্কে আত্মীয়, ২৫% ডায়াড ছিল বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়, ৫০% ডায়াড ছিল দূর সম্পর্কের বৈবাহিক আত্মীয় বা একেবারেই অনাত্মীয়। বিপরীতে, কৃষিভিত্তিক প্যারানান গোষ্ঠীতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় বা অনাত্মীয়দের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলেন, প্যারানান গোষ্ঠীর মতো কৃষিভিত্তিক সমাজে যেখানে পুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা থাকায় পুরুষের মতামত প্রাধান্য পায়, সেখানে নিকটাত্মীয়দের উপস্থিতি বেশি থাকে। পক্ষান্তরে নিকটাত্মীয়দের গড় উপস্থিতি অ্যাগটা বা এমবেন্ডজেলের মতো গোষ্ঠীর একেকটা গ্রুপে আনুপাতিক হারে কম থাকে যেখানে গ্রুপের সদস্য নির্বাচনে নারী- পুরুষ উভয়ের মতামত সমান প্রাধান্য পায়। গবেষণাটির লেখকগণ যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, লিঙ্গ-সমতা একটি বিবর্তনীয় উপযোগ, যেহেতু এটি অনাত্মীয়দের সাথে বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে। ডিবল বলেন, “এটা আপনার জন্য বিস্তৃত পছন্দের সঙ্গীর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সহজলভ্য করে, যা অন্তঃপ্রজননের ঝুঁকি হ্রাস করে “। উল্লেখ্য, ইনব্রিডিং বা কাছাকাছি আত্মীয়দের মধ্যে প্রজনন শিশুর বিভিন্ন জেনেটিক রোগ বা অক্ষমতার কারণ হতে পারে।

ডিবল মনে করেন, লিঙ্গ-সমতাই  সম্ভবত অন্যান্য প্রাইমেট কাজিন থেকে আমাদের পৃথক করেছে। বেশি সংখ্যক মানুষের সাথে ইন্টারেকশনের ফলে নতুন নতুন উদ্ভাবনগুলো শেয়ার করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা টিকে থাকার পক্ষে সহায়ক। শিম্পাঞ্জিরা আগ্রাসী, পুরুষশাসিত সমাজে বাস করে, সুনির্দিষ্ট হায়ারার্কি যেখানে অনুসৃত হয় এবং ফলে তারা তাদের জীবদ্দশায় কোনো প্রযুক্তি টেকসই হওয়ার মতো খুব বেশি প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের দেখা পায় না।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের আচরণ বিষয়ক সায়েন্টিস্ট ড. টমাস ডেভিড ব্যারেট এর আরো একটা দিক উন্মোচন করেন, তাঁর মতে অনাত্মীয় বা আত্মীয় — বিশাল নেটওয়ার্কের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্কের ফলে এমনকি কোনো ক্যাম্পে খাদ্যাভাবের সময়ও দূরবর্তী কোনো ক্যাম্পে আপনি নিজের আহারের বন্দোবস্ত করতে পারবেন।

শ্রমবিভাজন অসাম্য: কৃষির উদ্ভব

শিকারী- সংগ্রাহক যুগে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম নারী পুরুষ সমানভাবে ভাগ করে নিতো এবং এর ফলে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে সমতা বজায় ছিল। হয়তো একমাত্র নয়, তবে লিঙ্গবৈষম্যের পেছনে কৃষির উদ্ভব এবং এর ফলে উদ্ভূত শ্রমবিভাজনকে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। শিকারী- সংগ্রাহক যুগে সব কাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকায় কোনো কাজকে সামাজিকভাবে ছোট বা কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবার সুযোগ ছিল না। তানজানিয়ার হাদজা, কালাহারির কুং, ফিলিপাইনের অ্যাগটা জনগোষ্ঠীতে  অর্জিত সম্পদ নারী- পুরুষ সমানভাবে শেয়ার করে‌। আরও পড়ুনঃ নারীবাদ ও পুরুষতন্ত্রের বিবর্তনীয় বিশ্লেষণ

প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে যখন কৃষির উদ্ভব হয়, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই অনেকগুলো স্তরে ভাগ হয়ে যায়। শিকার-সংগ্রহের তুলনায় কৃষির বড় সুবিধা হলো, কৃষি উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম, এই উদ্বৃত্ত খাদ্যের নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়ে। প্রশাসক, ভৃত্য, যাজক এবং সৈন্যের ভূমিকা অবতীর্ণ হয়। লৈঙ্গিক ভূমিকাও তখন ভিন্ন হয়ে পড়ে। একবিংশ শতকে যদিও আমরা নারীদের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ দেখতে পাই ( তাও কেবল ক্ষেতমজুর হিসেবে, নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাদের সংখ্যা নগণ্য) কৃষির উদ্ভবযুগে পরিস্থিতি এ রকম ছিল না। আবাদী জমির বেশিরভাগ কাজ করত পুরুষ এবং নারীকে গৃহে সন্তান লালন-পালন এবং গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। খাদ্যের ব্যবস্থাপনায় অবদান অভাবে নারী হয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। নারীদের সন্তান উৎপাদনের হারও বেড়ে যায়; শিকারী- সংগ্রাহকের যেখানে প্রতি চার বছরে একটি সন্তানের জন্ম দিত, কৃষিসমাজে সেটা দুই বছরে একটিতে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে উদ্ভব হয় রাজা ও রাজত্বের ধারণার, ফলে পাশাপাশি রাজ্যে সম্পদ দখলের জন্য দেখা দেয় যুদ্ধ, যেখানে নারীর পদমর্যাদা আরো নিচে নেমে যায়, স্বাধীন নারী পরিণত হয় বিজেতা রাজা ও তার সহযোগীদের ভোগ্যপণ্য দাসীতে।

hsbd bg
%d bloggers like this: