জন ন্যাশ।
Princeton.Edu

জন ন্যাশের গেম থিওরি ফলিত গণিত ও অর্থশাস্রের একটি শাখা।অর্থনীতিতে এটি এমন একটি প্রতিযোগীতামূল খেলাকে নির্দেশ করে যে খেলাটিতে প্রত্যেকটি খেলোয়াড় সর্বোচ্চ মূনাফা অর্জন করার চেষ্টা করে।বাস্তবজগতে এ থিওরি প্রয়োগের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত এবং জীবনের প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এ থিওরিটিকে প্রয়োগ করা যায়!যে যুগান্তরকারী তত্বের আবিষ্কারক হিসেবে জন ন্যাশ ১৯৯৪ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন!

 

 

ফুটবল খেলায় যদি নেইমার প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার জন্যে প্রতিপক্ষের কাউকে কুনুই দিয়ে ধাক্কা দেয় তবে সেটি খেলার নিয়মের একটি অংশ হয়ে যায় এবং প্রত্যেকে সেটাকে কপি করে নিজেদের সুবিধামত ব্যাবহার করার চেষ্টা করে।যেমনঃ নেইমার যদিও প্রথমবার কাউকে অনৈতিকভাবে আঘাত করে একটা গোল দিয়ে দেয় এবং তাকে অনুকরণ করে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রাও একে অপরকে আঘাত করতে থাকে তবে এতে করে নেইমার আর বিশেষভাবে কাউকে ধাক্কা দিয়ে গোল দিতে পারবেনা কারণ প্রতিপক্ষের প্লেয়ার তাকে এর আগেই ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে নয়তোবা তাদের কেউ নেইমারের সাথে এ প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে পারবেনা, দলের ভারসম্য রক্ষা করার জন্যেই অন্যদেরকেও একই প্রতিযোগীতায় যোগ দিতে হয়।এতে দেখা যায় খেলার ভারসাম্য পূর্ব থেকে যেমন ছিলো তেমনি রয়ে গেছে কিন্তু মাঝখানে যুক্ত হয়েছে অনৈতিক একটি নিয়ম এবং শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উভয় দলের বিভিন্ন প্রতিযোগি।অনেকের ভাগ্যে জুটেছে হলুদ ও লাল কার্ড কিন্তু তারা কেউই রিলেটিভলি বিশেষ কোন সুবিধা অর্জন করতে পারেনি!এটাকে গণিতের ভাষায় বলা হয় ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম!

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও আমরা গেম থিওরিকে প্রয়োগ করতে পারি।মনে করুন, স্যান্ড্রালিন নামক একটি থুটপেস্ট কোম্পানী প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার টুথপেস্ট বিক্রি করে।তারা তাদের এ বিক্রির পরিমাণ ১০০০ কোটি করতে চায়।স্যান্ড্রালিন কোম্পানি ন্যাশের মতো কোনো বিখ্যাত আইডিয়া সেলারের কাছ থেকে আইডিয়া ক্রয় করতে গেলো, কিভাবে তাদের টুথপস্টের বিক্রি দ্বিগুণ বাড়ানো যায়!ন্যাশ তাদের পরামর্শ দিলো, স্যান্ড্রালিন যাতে তাদের টুথপেস্ট টিউবের মুখ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ মোটা করে দেয়।কারণ টুথপেস্টে টিউবের মুখ যদি পূর্বের তুলনায় অধিক মোটা হয় তবে প্রতি প্রেসে দ্বিগুণ টুথপেস্ট বেরিয়ে আসবে এবং যে পেস্ট পূর্বে একমাসে শেষ হতো একই পেস্ট পনেরদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে যা তাদের বিক্রির পরিমাণ দেবে কল্পনাতীত ভাবে বাড়িয়ে এবং একবছরে একই পেস্ট বিক্রি করে তারা ৫০০ কোটি টাকার পরিবর্তে এক হাজার কোটি টাকা উপার্জন করবে!

আর অন্যদিকে ক্লোজ আপ এদিকে পিছিয়ে পড়ে।কিন্তু তারা বুঝতে পারলোনা যে আকষ্মিক সেন্ড্রালিনের বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কারণ কী।একটা সময় তারা এ কৌশলটি বুঝে এবং সফলভাবে প্রয়োগ করতে সমর্থ হয়।এবার প্রতি বছর তারাও ১০০০ কোটি টাকার ক্লোজ-আপ বিক্রি করতে বাজারে সরবরাহ করতে থাকে।আল্টিমেটলি উভয় প্রতিযোগি এখানে লাভবান হলেও তাদের রিলেটিভ লাভ “শূন্য” অবস্থায়ই থেকে যাবে!!

এই জিনিসটা আরেকটু গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। ১৯৯৪ সালে কর্ণেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক কৌশিক বসু এই অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ‘গেম থিওরি’র একটা মজার সমস্যা প্রস্তাবনা করেন। যা ‘ট্রাভেলারস ডিলেমা’(travelers dilemma) বা, ভ্রমণকারীর উভয়সঙ্কট নামে পরিচিত।আরো জানতে ক্লিক করুন, এখানে

 

লুসি এবং পিট দুজন যাত্রী। যারা শখের বসে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শেষে প্লেনে করে ফিরছিল। দুইজনই একদম একই রকম ও একই দামের একটা মূর্তি কিনেছিল। যাত্রাশেষে দেখা গেল, জিনিস দুটোই ভেঙে গেছে। এয়ারলাইন ম্যানেজার তাদেরকে বলল যে, তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছেন। কিন্তু তিনি ঠিক কতটা ক্ষতিপূরণ দেবেন তা বের করার জন্য তিনি একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তাদের দুজনকে আলাদা জায়গায় রেখে বলা হল জিনিসটার দাম লিখে ম্যানেজারকে লিখে দিতে। কিন্তু সেখানে কিছু শর্ত ছিলঃ

১। দামটা ২ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে হতে হবে।
২। যদি ২ জন একই দাম লিখে দেয়, তাহলে ম্যানেজার সেই ডলারই দুইজনকে দিয়ে দিবে। যেমনঃ লুসি এবং পিট দুইজনই যদি ৫০ ডলার লেখে, তাহলে দুইজনকেই ৫০ ডলার দিয়ে দেওয়া হবে।
৩। যদি দুইজনের মধ্যে কোন একজন আরেকজনের চেয়ে কম দাম লেখে, তাহলে ম্যানেজার কম পরিমানের ডলারটাকে আসল বা বেস ধরবে। একইসাথে যে কম ডলারটা লিখল তার ডলারের পরিমাণকে সত্যি ধরে সততার পুরস্কার হিসেবে তাকে ২ ডলার বেশি দিয়ে দিবে এবং যে বেশি পরিমাণ ডলার দাবি করল তাকে ২ ডলার কম দিবে। যেমনঃ লুসি যদি দাবি করে ৪৪ ডলার এবং পিট দাবি করে ৪৬ ডলার; তাহলে বেস ধরা হবে ৪৪ ডলার। লুসি যেহেতু কম বলল, সে পাবে (৪৪+২) বা ৪৬ ডলার। পিট যেহেতু বেশি বলল, সে পাবে (৪৪-২) বা ৪২ ডলার।

এই হল শর্ত। এগুলো আলাদা আলাদাভাবে বুঝিয়ে দিয়ে লুসি এবং পিটকে দু’টি আলাদা আলাদা ঘরে রাখা হলো এবং বলা হলো দামটা লিখে ম্যানেজারকে দিতে। এখানে ধরে নেওয়া যাক, লুসি এবং পিট দুজনই সমান এবং বেশ ভাল মানের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। অর্থাৎ দুজনেই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে। এবং তারা দু’জন দুজনের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও অবগত। সেইসাথে দুজনই অধিক মুনাফা লাভের ব্যাপারে আগ্রহী। এখন আমরা যুক্তির বিচারে তাদের দুজনের অবস্থাকে বর্ণনা করব। লুসি কাগজ পাওয়ার সাথে সাথেই হয়ত ১০০ ডলার লিখে ফেলবে। কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি মানের ডলার যা সে পেতে পারে। জিনিসটার দাম যদি ১০০ ডলারের কম হয় তাহলে ১০০ ডলার পেলে তো তার লাভই হয়! কিন্তু ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপারও আসবে। সে তখন ভাববে, পিটও হয়ত ১০০ ডলারই লিখবে। এর চেয়ে বরং আমি এক কাজ করি। আমি লিখে দেই ৯৯ ডলার। এতে করে সে সততার পুরস্কার হিসেবে (৯৯+২) বা ১০১ ডলার পেয়ে যাবে। ওদিকে পিট পাবে (৯৯-২) বা ৯৭ ডলার। ফলে, কৌশলগত কারণে লুসি পিটের চাইতে ৪ ডলার বেশি পাচ্ছে! এই ভেবে সে যখনই ৯৯ ডলার লিখে ফেলবে ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপার খেলা করবে। সে ভাববে, পিটও নিশ্চয়ই আমি যা ভাবছি তা ভাবছে (কারণ দুজনই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে এবং তা উভয়েই জানে) তাহলে সেও তো ৯৯ ডলারই লিখবে! তাহলে আমি ৯৯ ডলার না লিখে বরং ৯৮ ডলার লিখি তাহলে আমি পাব (৯৮+২) বা ১০০ ডলার আর পিট পাবে (৯৮-২) ডলার বা ৯৬ ডলার! এখানেও ৪ ডলার বেশি। এই যুক্তিকে আরো আগে বাড়তে দিলে দেখা যায় এই ব্যাপারটা একটা সিরিজের মত করে চলতে থাকবে আর লুসিও তার ডলারের পরিমানটা আস্তে আস্তে কমাতেই থাকবে! ৯৮ থেকে ৯৭, ৯৭ থেকে ৯৬, ৯৬ থেকে ৯৫- তাত্ত্বিকভাবে ডলারের পরিমানটা কমেই যেতে থাকবে। একটা সময় কমতে কমতে এটা তাত্ত্বিকভাবে ২ ডলারে গিয়ে থামবে! যেহেতু পণ্যের মূল্য সর্বনিম্ন ছিল ২। এই চিন্তাভাবনাগুলো কিন্তু পিটের মাথায়ও খেলা করতে থাকবে! কিভাবে নিজে একটু বেশি ডলার পাওয়া যায়, সেটার জন্য লুসি কম পেলে পাক! এখানেই ‘গেম থিওরি’র শুরু। ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে লুসি এবং পিটের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য অনেকেই বলতে পারে, দুজনেই যদি সত্যিটা লিখে, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যবসার ক্ষেত্রে হিসেব-নিকেশগুলো এরকময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। যাহোক, লুসি এবং পিটের বিভিন্ন স্ট্রাটেজি ও তার ফলাফলকে আমরা বোঝার সুবিধার্তে নিচের ম্যাট্রিক্স আকারে সাজিয়ে লিখতে পারি-

গেম থিওরিতে এ ধরণের ম্যাট্রিক্সকে বলা হয় পে-অফ ম্যাট্রিক্স। পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা খেয়াল করলে দেখা যাবে- এখানে লুসি এবং পিটের লেখা বিভিন্ন ডলার পরিমানের সাপেক্ষে তাদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণকে দেখানো হয়েছে। যেমনঃ লুসি এবং পিট দু’জনই যদি ১০০ ডলার লেখে, আমরা জানি যে দুজনই ১০০ ডলার করে পাবে। একদম নিচে সবচেয়ে ডানের ঘরে তাই আমরা (100 100) দেখতে পাচ্ছি। আবার ধরি, লুসি লিখল ৩ ডলার, পিট লিখল ৪ ডলার। তাহলে আমরা জানি যে ম্যানেজার ৩ ডলারকে বেস হিসেবে ধরে লুসিকে দিবে (৩+২) বা ৫ ডলার। আর পিটকে দিবে (৩-২) বা ১ ডলার। (5 1) লেখা ঘরটা কিন্তু তাই নির্দেশ করে। এই পুরো ব্যাপারটা থেকে আসলে যে সিদ্ধান্তটা নেওয়া যায় তা হচ্ছে, সবসময় অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেয় না। সহযোগিতাপূর্ণ এবং নৈতিক চিন্তাভাবনা আমাদের জন্যে বেশি লাভজনক। ‘গেম থিওরি’র আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, তা হল- ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ । পুরো পে-অফ ম্যাট্রিক্সের মধ্যে একটা বিশেষ ঘরের দিকে লক্ষ্য করা যাক। ঘরটা হচ্ছে (2 2)। মনে করে দেখি পিট এবং লুসির শেষমেশ দুইজনই ২ ডলার করে লিখেছিল। এই ঘরটার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য ঘরগুলোর নেই। পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে, যে কোন একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে যদি আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে থাকে তাহলে এই (2 2) বাদে বাকি সব ঘরের জন্যই দুই প্লেয়ারের অন্তত একজন হলেও লাভবান হয় অর্থাৎ বেশি ডলার পায়। ব্যাপারটা একটু বিস্তারিতভাবে বলা যাক। (2 2) ছাড়া ম্যাট্রিক্সের যে কোনো একটা ঘর নিই। ধরা যাক, লুসি লিখল ৩ এবং পিটও লিখল ৩। তাহলে আমরা পে-অফ ম্যাট্রিক্সের যে ঘরটায় থাকব তা হচ্ছে (3 3)। ধরে নিই পিট তার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখবে অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। এখন লুসি যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে তাহলে কি হয় দেখা যাক। একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাব যে লুসি যদি ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (4 0) ঘরে অর্থাৎ লুসি ৪ ডলার (২+২) পাবে, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। আর পিট পাবে ০ ডলার (২-২)। আবার ধরি লুসি তার সিধান্তের পরিবর্তন করবেনা অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। পিট যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (0 4) ঘরে অর্থাৎ পিট পাবে ৪ ডলার, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। এখান থেকে আমরা যা বুঝতে পারি (3 3) ঘরে থাকলে লুসি তার পাওয়া ডলারের পরিমানটাকে কিন্তু বাড়িয়ে নিতে পারবে, যদি পিট তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। একই কথা পিটের জন্যেও খাটবে। কিন্তু এবার (2 2) ঘরটার কথা ভাবা যাক। আমরা যদি পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব, একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে সে কখনোই লাভবান হতে পারবেনা। ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যায় যে লুসি যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে পিট যাই লিখুক না কেন কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা আর সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। আবার পিটও যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে লুসি কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা এবং সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। কারণ, ২ ডলারই বেস। ২ ডলার যে-ই লিখুক না কেন, ম্যানেজার তখন ২-কে বেজ ধরবে। তাই (2 2) ঘরেই এসে শেষমেশ তারা স্থির হবে। ফলে (2 2) ঘরটা একটা সাম্যাবস্থা নির্দেশ করবে। একেই বলা হয় Nash Equilibrium বা ‘ন্যাশের সাম্যাবস্থা’। এই তত্ত্বটি শুধুমাত্র কাগজে কলমে সত্যি এমন নয়। কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আচরণের কারণে তার সমসাময়িক অন্য প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা না করে কোনো পণ্যের দাম কমিয়ে আনে এবং অন্য কোম্পানি না কমায়, তখন আলটিমেটলি লস হয়। এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।(১)

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রবি ইয়োন্ডার মিউজিক অ্যাপ তাদের নতুন ক্যাম্পেইন ‘নো মানি ফর মিউজিক’ এর ঘোষণা দিয়েছে। এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে শ্রোতারা এখন ইন্টারনেট চার্জ ছাড়াই গান শুনতে পারেন। অন্যদিকে গ্রামীনফোনে মাসিক ৪২.৬১ টাকা দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে গান শোনা যায়। এখানে একক বা ইনডিভিজুয়ালি রবির লাভ হলেও সামগ্রিকভাবে ‘মিউজিক অ্যাপ’ তৈরির যে ক্ষেত্র বাংলাদেশে হতে পারত, রবির কারণে তা অনেকাংশেই ব্যাহত হবে। কারণ, বিখ্যাত একটা ব্রান্ড যেখানে ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছে, সেখানে টাকা দিয়ে গান শোনার মতো অ্যাপ আর কে বানাতে যাবে? বানালেও মানুষ তো ফ্রি টা দিয়েই শুনবে! একই কথা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জিরো ডট ফেসবুক এবং ফ্রি ম্যাসেঞ্জারের (ফ্রি বলতে ডেটা ছাড়াই ইউজ করা যায়) কারণেই বোধহয় বাংলাদেশ, এমনকি ভারতের টপ লিস্টেও এমন কোনো চ্যাট অ্যাপ দেখা যায় না, যেটা লোকাল ডেভেলপারদের তৈরি। যাহোক, ট্রাভেলারস এলগোরিদম দিয়ে শেষ একটা তথ্য দেওয়া প্রয়োজন, তা হল- এই ডিলেমা বা, উভয়সঙ্কট নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা আসলেই করা হয়েছে। ইসরায়েলের একজন ইকোনোমিস্ট Ariel Rubinstein একবার একটা ওয়েব বেসড পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যেখানে ৭টি দেশের ২৫০০ জনের মত মানুষ অংশ নিয়েছিল। একদম একই রকম পরীক্ষা, শুধু তাদের ১৮০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে কোন একটা ডলারের পরিমান লিখতে বলা হয়েছিল এবং শাস্তি বা পুরস্কার হিসেবে আমাদের উদাহরণের ২ ডলারের জায়গায় ছিল ৫ ডলার। দেখা গিয়েছিল সাতজনের মধ্যে একজন মাত্র ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের ডলার পরিমানটা লিখেছে। ৫৫ শতাংশ ৩০০ ডলার লিখে দিয়েছে। নিচে একটা পাই চার্টে ঐ পরীক্ষার রেসাল্ট এবং একইসাথে রেসপন্সের সময়টাও বার চার্ট দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আছে। এটার দিকে একটু তাকালেই বোঝা যায় কতভাগ মানুষ আসলেই চিন্তা ভাবনা করে উত্তর করেছে, কতভাগ করেনি!(২)

 

 

 

এখানে মনে হতে পারে, স্বতস্ফূর্তভাবে দাম লেখার সংখ্যা যেহেতু বেশি, তাই এটিই বেশি লাভজনক। আপাত দৃষ্টিতে এটা ঠিক। কারণ একক ব্যক্তির জন্যে হেড-টু-হেড ডিসিশনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার চাইতে স্বার্থপরতা অনেক সময় বেশি সাফল্য এনে দেয়। কিন্তু একের অধিক খেলোয়াড়, যারা পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত একজন আরেকজনের প্রতি, যেমনঃ একটা গোষ্ঠী বা অনেক মানুষের কথা চিন্তা করা হলে, তখন সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ বা ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ই আমাদেরকে অধিক লাভের দিকে নিয়ে যায়। এখানে অধিক লাভ শুধুমাত্র একক ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে ঘটে, এমন নয়। সিস্টেমে সকলের জন্যে তা মঙ্গলজনক হবে। এটাই ‘গেম থিওরি’র মূলকথা। ধ্রুপদী অর্থনীতিতে যেমন সবসময় পরিপূর্ণভাবে স্বার্থবাদী চিন্তা করা হয়, ‘গেম থিওরি’তে তা করা হয় না। ‘গেম থিওরি’ আমাদেরকে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ চিন্তা করতে শেখায়। কারণ, ট্রাভেলারস ডিলেমা থেকে আমরা দেখেছি দু’জন মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়ে চিন্তা করেও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারছেন না। এখানে মানুষের চিন্তাজগৎতে আমূল পরিবর্তন ঘটায় ‘গেম থিওরি’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বুদ্ধি খরচ করে যে সিদ্ধান্তটি নেব, তা আমাদেরকে যে অভীষ্ট লক্ষ্য পোঁছে দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই সহজ সত্যটা এই যুগে ক’জন বোঝে!(৩)

আমরা ট্রাভেলার্স ডিলেমা ব্যাপারটি পরমাণবিক বোমার তৈরির প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারি!যেমন- যুক্তরাষ্ট্র যদি পরমাণবিক বোমা তৈরি করে তবে রাশিয়া স্থির থাকবেনা, তারাও পরমাণবিক বোমা তৈরির জন্যে মিলিয়ন ডলার খরচ করবে।আবার এদিকে চায়নিজরাও কোনো অংশে কম যায়না তারা হতে পারে নতুন প্রজাতির কোনো বায়োলজিক্যাল অস্র তৈরি করবে সেটি হতে পারে ভাইরাস!এভাবে দেখা যাবে প্রতিটি রাষ্ট্রের কাছেই ভয়াভহ মরনাস্র মজুত থাকবে যার ফলশ্রুতিতে তারা একে অপরের সাথে আর যুদ্ধে জড়াবেনা!তখন যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির মূল্য বিশ্ব শান্তির তুলনায় বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বেড়ে যাবে আর তাই আন্তর্জাতিক ভাবে রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধ না করে শান্তিরক্ষার দিকে গুরুত্ব দেবে!কারণ Nature Selection ঠিক এ পদ্ধতিতেই কাজ করে।আমরা এটা(বাস্তব প্রয়োগ) এখন খুব ভালোভাবেই দেখছি যে বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে যার জন্যে শান্তিটাই আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের মানদন্ডে পরিণত হয়!তার মানে আমরা বুঝতে পারছি আন্তর্জাতিক শান্তি প্রকৃত পক্ষে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামেরই গাণিতিক প্রকাশ!

পরমাণবিক বোমা তৈরির জন্যে প্রতিটি দেশ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, অপচয় করেছে বিপুল সময় অর্থ ও জনসম্পদ কিন্তু রিলেটিভটি রাষ্ট্রগুলির ভারসাম্য পূর্বের চেয়ে একটুও এদিক ওদিক হয়নি!যে অর্থ,সময় ও শক্তি আমরা বিনিয়োগ করতে পারতাম মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে, টাইমমেশিন তৈরির পদ্ধতি ত্বরাণ্বিত করতে নয়তোবা কোয়ান্টাম কম্পিউটার অথবা কানেক্টম প্রজেক্টের গবেষণায় সে অর্থ আমরা অপচয় করেছি একেবারে অনর্থক ও অহেতুক!যেখানে আমাদের আল্টিমেটলি লাভ হলেও রিলেটিভলি কোন পরিবর্তনই সংঘঠিত হয়না!

তথ্যসুত্রঃ

১.মুক্তমনা, মাজহারুল ইসলাম 

২.মুক্তমনা

৩. জন ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম

৪. জন ন্যাশের ছবি, প্রিন্সটন এডু

৫. Nytimes

hsbd bg