একজন টিনেজারের চোখে বিশ্ব!

কয়েক দশক আগেও মানুষ মনে করতো শিশুকাল শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই মস্তিষ্কের ডেভেলপমেন্ট শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আজ আমরা জানি সম্পূর্ণ মানব মস্তিষ্ক তৈরি হতে পঁচিশ বছর সময় লাগে। দশ বছর প্রয়োজন হয় নিউরাল রি-অর্গানাইজেশনের জন্য এবং যার সাথে আমার আমিও নাটকীয়ভাবে বদলে যাই। আমাদের দেহে হর্মোন ঘোরাঘুরির কারণে আমাদের মধ্যে স্পষ্ট শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয় কিন্তু আমাদের সবার চোখের আড়ালে আমাদের ব্রেনও বিস্ময়করভাবে বদলে যায়। এ পরিবর্তনই আমাদের বলে দেয় আমরা বিশ্বের সাথে কিভাবে আচরণ ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবো। এ পরিবর্তনগুলোর সাথে আমার আমিও( Sense of Self)  ভবিষ্যতের দিকে উদিত হতে থাকে, আমার আত্মসচেতনতা ধারাবাহিক ভাবে পরিবর্তন হয়। 


টিনেজদের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে এ ব্যাপারটি জানার জন্য ইগলম্যান ও তার সহকারীরা একটি পরীক্ষা সেট করেছিলেন। তারা একজন অল্পবয়স্ক তরুণ স্বেচ্ছাসেবককে একটি দোকানের ভেতর জানলার পাশে বসার জন্য নির্দেশনা দেন যেটি ছিলো পর্দা দ্বারা আবৃত, পর্দাটি সরানোর পর তরুণের চোখে কয়েকজন পথচারী প্রতিফলিত হয়, যারা একত্রে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বেচ্ছাসেবক ছেলেটি জানলার বাহিরে চেয়ে থাকে। সামাজিকভাবে এ বিশ্রি পরিস্থিতিতে পাঠানোর পূর্বে সকল ভলান্টিয়ারের ইমোশনাল রেসপন্স পরিমাপ করা হয়। তাদের গ্যালভানিক স্কিন রেসপন্স পরিমাপ করার জন্য(GSR) একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, উত্তেজনার একটি প্রয়োজনীয় প্রক্সি, আপনার ঘাম যত বেশি হবে, আপনার ত্বকের পরিবাহিতাও তত বেশি হয়। পলিগ্রাফ টেস্ট বা লাই ডিটেক্টর মেশিনের মতো এটিও ছিল একই প্রযুক্তি। এ এক্সপেরিমেন্টে তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েই অংশগ্রহণ করে।

No description available.

প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে কোনো আগন্তুককে দেখার পর যতটুকু ইমোশনাল রেসপন্স তৈরি হওয়ার কথা ছিল ঠিক ততটাই ইমোশন তৈরি হয়েছে। কিন্তু টিনেজারদের মধ্যে একই অভিজ্ঞতা সোশ্যাল ইমোশনকে বাড়িয়ে তুলেছে। তরুণরা অনেক বেশি উত্তেজিত ছিল__কখনো তারা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল যখন তারা  আগন্তুকের ভীড় দেখে। প্রশ্ন হলো কেনো তরুণ ও বৃদ্ধদের মধ্যে এ পার্থক্য দেখা যায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মেডিয়াল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ভেতর( mPFC) !  এই এরিয়া তখনই সক্রিয় হয় যখন আপনি আপনাকে নিয়ে চিন্তা করেন এবং বিশেষ করে আপনার সাথে জড়িত আবেগীয় গুরুত্বগুলো। হার্ভাড ইউনিভার্সিটির  ড. লিয়াহ ও তার সহকারীরা দেখেন যে তরুণ থেকে কিশোরে প্রবেশ করার সময় mPFC খুব বেশি একটিভ হয়ে যায় এবং পনের বছর ধরে এটি উর্ধ্বে উঠতে থাকে। এ বিন্দুতে, সামাজিক পরিস্থিতি অনেক বেশি আবেগীয় ওজন তৈরি করে যার ফলে তীব্রতাসম্পন্ন আত্মসচেতনতামূলক চাপ তৈরি হয়, যে কারো নিজের সম্পর্কে চিন্তা বা আত্ম-মূল্যায়ন এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি পায়। কিন্তু বৃদ্ধরা তার সেন্স অব সেল্ফের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়__ এক জোড়া নতুন জুতা ছিড়ে যাওয়া অথবা জানলার বাহিরে কিছু লোক দাঁড়িয়ে থাকা এগুলো বড়দের মধ্যে খুব একটা তারতম্য তৈরি করেনা। শিশুকালের পরে, বয়সন্ধী শুরু হওয়ার আগে আরো একটি ওবারপ্রোডাকশন পিরিয়ড দেখা দেয়, প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ভেতর নতুন সেল অঙ্কুরিত হয় এবং নতুন কানেকশন( সিন্যাপ্স),  আর এ জন্য মোল্ডিং- এর জন্য নতুন Pathway তৈরি হয়। এ বাড়াবাড়ি প্রায় এক দশকের প্রুনিং দ্বারা অনুসরণ করাঃ আমাদের কিশোরের পুরো সময়, দুর্বল সংযোগগুলো ছাঁটাই হয়ে যায় এবং আরো শক্তিশালী সংযোগ জন্ম হয়। 

No description available.


এ ছাটাইয়ের পরিণতিতে, আমাদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ভলিউম প্রতি বছর কমতে থাকে টিনেজের সময়জুড়ে। কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের সার্কিট সেট আপ হয় যাতে আমরা বয়স্ক হওয়ার পথের প্রয়োজনীয় পাঠগুলো শিখি। কারণ এ সময় অনেক বিশাল পরিবর্তন ঘটে আমাদের মস্তিষ্কের সেই এলাকায় যা উচ্চতর যুক্তি ও তাড়নার নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পর্কযুক্ত, বয়সন্ধীকাল হলো খাড়া জ্ঞানীয় পরিবর্তনের একটি সময়। ডর্সোল্যাটারিয়াল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, ইমপালস নিয়ন্ত্রণ করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেটি ম্যাচিউর হতে অনেক বিলম্ব হয়, বিশ বছরের আগে এটি ম্যাচিউরিটিতে প্রবেশ করেনা। নিউরোসায়েন্টিস্টরা সচেতন হওয়ার অনেক আগে থেকেই গাড়ী বিমা কোম্পানীরা অসম্পূর্ণ মস্তিষ্কের ম্যাচিউরেশন সম্পর্কে জানতো আর এ জন্য তারা আরো বেশি কিশোর ড্রাইভার অনুসন্ধান করতো। এছাড়া ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমও অনেক পূর্ব থেকেই এই ইনটুইশনের সাথে পরিচিত যে কারণে তারা বৃদ্ধদের থেকে তরুণদের ভিন্নভাবে ট্রিট করতো। সামাজিক বিশ্রিভাব এবং মানসিক অতি-সংবেদনশীলতার বাহিরে কিশোর মস্তিষ্ক ঝুঁকি গ্রহণ করতে সেট আপ হয়। দ্রুত গাড়ি চালানো হোক, মোবাইল ফোনে নগ্ন ছবি পাঠানো হোক, ঝুকিপূর্ণ আচরণ কিশোর মস্তিষ্ককে বৃদ্ধদের চেয়ে বেশি প্রলুব্ধ করে। এ অধিকাংশ আচরণ সে দিকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত যে আমরা পুরস্কার ও প্রণোদনায় সাড়া দিতে পছন্দ করি। আমরা যতই শিশুকাল থেকে কিশোরে প্রবেশ করি, আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড এরিয়ার রেসপন্স বাড়তেই থাকে যেটি সুখ অনুসন্ধানের সাথে সম্পর্কযুক্ত।  এ ধরণের একটি এরিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়াস একিউম্বেন্স। কিশোরদের মধ্যে বৃদ্ধদের চেয়ে এই এলাকার কার্যকারীতা বেশি। কিন্তু এখানে একটি লক্ষ্যনীয় ব্যাপার আছে, অর্বিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স__ যেটি আমাদের ডিসিশন মেকিং, মনোযোগ, ভবিষ্যত সিমুলেশনের সাথে জড়িত সেটি শিশু ও কিশোরদের মধ্যে প্রায় একই থাকে। আমরা যদি ম্যাচিউর প্লেজার সেকিং সিস্টেমকে ইম্যাচিউর অর্বিটোফ্রন্টাল কর্টেক্সের সাথে জোড়া দেই এর মানে হলো যে, কিশোররা আবেগীয়ভাবে হাইপারসেনসেটিভ এবং তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা খুব দুর্বল। সোমারভিল ও তার দল আরো একটি ব্যাপার দেখিয়েছেন কেনো কিশোরদের মধ্যে কঠিন প্রেসার তাদের আচরণকে বাধ্য করে; সোশাল কনসিডারেশনের সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্রেন এরিয়া mPFC অন্যান্য ব্রেন এরিয়ার সাথে জোড় হয়ে মোটিভেশনকে একশনে রুপদান করে। আর  তারা সাজেস্ট করেন যে, এটা ব্যাখ্যা করে , কেনো তরুণরা অনেক বেশি ঝুঁকি গ্রহণ করে যখন তাদের বন্ধুরা তাদের চারপাশে থাকে। 

No description available.

একজন টিনেজার হিসেবে আমি কিভাবে বিশ্বকে দেখবো এটি শিডিউল অনুযায়ী আমার মস্তিষ্কের পরিবর্তনেরই পরিণতি। এ পরিবর্তন আমাদের অনেক বেশি সেল্ফ কনশাস করে তোলে, অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, এবং পিয়ার মোটিভেটেড আচরণের প্রতি অধিক প্রবণতা।  বিশ্বের সকল ফ্রাস্টেটেড পিতামাতার জন্য একটি মেসেজ হল, আমরা যারা কিশোর তারা তাদের পছন্দ বা মানসিকতার  জন্য টিনেজ নই; এটি আমাদের তীব্র ও অপরিহার্য নিউরাল পরিবর্তনের ফলাফল!  

তথ্যসূত্রঃ

Related Article:

hsbd bg