অর্ধেক ব্রেন যে শিশুর

অর্ধেক ব্রেন যে শিশুর

আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণ কোনো কম্পিউটারের মতো নয় কারণ কোনো কম্পিউটার তার নিজের ভেতরের কানেকশন নিজে নিজে পরিবর্তন করতে পারেনা, আমাদের মস্তিষ্ক হলো একপ্রকার ক্যাটোমের মতো যেটি নিজের নিউরাল নেটওয়ার্ক নিজেই পরিবেশের পরিবর্তনে বদলে নিতে জানে!

এস ভ্যালারিস প্রতিদিনের মতো আজও কাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার তিন বছরের শিশু ম্যাথিউ ফ্লোরে ধসে পড়েছে । তিনি অসহায়! তার ঠোঁট নীল হয়ে যায়। ভ্যালারিস তার স্বামীকে আতঙ্কে ডাকতে থাকেন। তার স্বামী প্রশ্ন করেন , ডাকছো কেনো? তিনি শুধু এতটুকুই বলতে পারলেন যে, ডাক্তার ডাকো।

A magnetic resonance imaging scan of a slice of an adult’s brain who had an entire hemisphere removed during childhood because of epilepsy. Video by Caltech Brain Imaging CenterCreditCredit…Caltech Brain Imaging Center

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর একজন কার্ডিওলজিস্ট তার সন্তানের হৃদপিণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন । বিশেষ কোনো কিছুই হয়নি।পরবর্তী মাসে একদিন খাবার টেবিলে ম্যাথিউর মুখের এক্সপ্রেসন সহসাই বদলে যায়৷ তার চোখ দৃঢ় হয়ে উঠে, তার ডান হাত মাথার উপর স্থির হয়ে যায় , প্রায় এক মিনিট তার শরীর সাসপেন্ডেড এনিমেশনে ছিলো। আবারও তিনি ডাক্তার কাছে ছুটে যান কিন্তু এবারও দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ পাওয়া যায়নি।

তারপর একই ঘটনা পরবর্তীদিনও ঘটে। এবার একজন নিউরোলজিস্ট তার মাথায় একটি ইলেক্টট্রোডের ক্যাপ বসান এবং তার ব্রেন একটিভিটিজ পরিমাপ করেন আর ঠিক তখনই তার মস্তিষ্কে এপিলেস্পির সন্ধান পান। ম্যাথিউকে সিজারের মেডিকেশন দেয়া হয়। ওষুধ ম্যাথিউকে সাহায্য করেছিল কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। খুব শীঘ্রই ম্যাথিউ এক ধারাবাহিক সিজারের কবলে পড়েন। প্রথমে এক ঘন্টা, পরে ৪৫ মিনিট এবং তারপর ত্রিশ মিনিট। একটা সময় সে প্রতি দু-মিনিটেই সিজারের কবলে পড়ে। ভ্যালারি ও তার স্বামী সন্তানকে ডাক্তার কাছে নিয়ে যান। এভাবে যখনই ম্যাথিউর এমন সমস্যা হতো তাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হসপিটালে থাকতে হতো। ম্যাথিউ এমন এক জীবনে প্রবেশ করে যে জীবনের অর্ধেকই সিজারে আক্রান্ত।

ভ্যালারিস আর তার স্বামী কান্নায় ভেঙে পড়েন। এর কারণ এই নয় যে তাদের সন্তান মারা যাচ্ছে কারণ ছিলো এই যে তাদের সন্তান এক অস্বাভাবিক জীবন ভোগ করছে। তাদের মানসিক পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হতে শুরু করে। স্বাভাবিক জীবন শেষ হয়ে গেলো তাদের। প্রায়শই রাগারাগি,বিরক্তি ও ঝগড়া! একবার হসপিটালে প্রায় তিন সপ্তাহ অবস্থান করার পর ডাক্তার তাদের বললেন, আপনারা এ সমস্যাটিকে যতটা ভাবছেন এটি তার থেকেও জটিল, লোকাল হসপিটালে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ম্যাথিউর বাবা মা বাল্টিমোরের একটি হসপিটালে ছুটে যান। ম্যাথিউকে বেহুশ করা হয়। একটি ব্লেড যত্মের সাথে তার চুলহীন মাথার খুলি কেটে ফেলে। একটি ড্রিল তার খুলির ভেতর বৃত্তাকার গর্ত তৈরি করে। কয়েক ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করার পর একজন সার্জন তার মস্তিষ্কের গোলাফি রঙের অর্ধেক ম্যাটারিয়ালস রিমুভ করে দেয় যে অংশটির সাথে ম্যাথিউর বুদ্ধি, আবেগ, ভাষা, রসবোধ, ভয় ও ভালোবাসা সম্পৃক্ত ছিলো। নিষ্কাশিত ব্রেন টিস্যু, জৈবিক পরিবেশের বাহিরে একটি কনটেইনারের ভেতর রাখা হয়। তারপর ম্যাথিউর খুলির অর্ধেক খুব ধীরে ধীরে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুয়িড দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেয়া হয় যা নিউরো-ইমেজিং এর সময় একটি ব্লাক-ভয়েড বা কালো শূন্যস্থান হিসেবে দেখা যায়। Read more: How a 6-year-old had half his brain removed and recovered in 3 months

  অর্ধেক ব্রেন যে শিশুর

রিকভারি রুমে তার মা বাবা হসপিটালের কফি পান করতে করতে সন্তানের কথা ভাবছিলেন । কখন ম্যাথিউ চোখ খুলবে? তাদের সন্তান কেমন আছে? শুধুমাত্র অর্ধেক মস্তিষ্ক নিয়ে এ মুহূর্তে তাদের সন্তান কি ভাবছে?

আপনার ল্যাপটপকে ভেঙে দুই-টুকরা করে ফেললে সেটি আর কাজ করেনা! প্রশ্ন হলো ম্যাথিউর মস্তিষ্ক কি এ মুহূর্তে কাজ করছে? আমাদের জনপ্রিয় বইগুলোতে মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের মতো যন্ত্র মনে করা হয়। তাদের মতে ব্রেনের এক একটি অংশ এক একটি উদ্দেশ্যে কাজ করে। যদি মস্তিষ্ক সত্যি সত্যি কম্পিউটারের মতো যন্ত্র হয়ে থাকে তবে ম্যাথিউর মস্তিষ্কের কাজ করার কথা নয়? তাই নয় কি? কিন্তু সৌভাগ্যবশত, মানুষের মস্তিষ্ক কম্পিউটারের মতো কোনো যন্ত্র নয়! আমাদের ট্রেডিশনাল মডেল অসম্পূর্ণ। মস্তিষ্ক একটি ডায়নামিক সিস্টেম। এটি প্রতিনিয়ত পরিবেশের সাথে সমন্বিত হওয়ার জন্য তার ব্রেন সার্কিট পরিবর্তন করে ফেলে। আপনার যদি যাদুকরী কোনো ভিডিয়ো ক্যামেরা থাকতো যার মাধ্যমে আপনি এই মাইক্রোস্কোপিক মহাবিশ্বকে জুম করে দেখতে পারতেন তবে আপনি দেখতেন যে, একজন রাষ্ট্রের নাগরিক যেমন তার সমাজের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে, বিয়ে করে, প্রতিবেশী তৈরি করে, পলিটিক্যাল পার্টিতে যোগ দেয় এবং সামাজিক নেটওয়ার্কে অংশ নেয় ঠিক তেমনি আপনার মস্তিষ্কও প্রতিটি পরিস্থিতিতে নতুন নতুন নিউরাল কানেকশন সার্চ করছে।

David Eagleman: Neuroplasticity and the Livewired Brain

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই যে, আপনার মস্তিষ্ক একপ্রকার ক্রিপ্টিক কম্পিউটেশনাল ম্যাটারিয়ালস, একটি জীবন্ত থ্রি-ডায়মেনশনাল টেক্সটাইল যেটি স্থানান্তরিত হতে পারে, প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে এবং তার কার্যকারীতা ম্যাক্সিমাইজ করার জন্য নিজেকে এডজাস্ট করতে পারে। মস্তিষ্কের এ বিস্তৃত সংযোগের _ সার্কিটের জীবন আছে। নিউরনের ভেতরের সংযোগ নিয়মিত বিকশিত হয়, মরে যায় আবার পুনর্গঠিত হয়। গত বছর আপনি যা ছিলেন আপনি আজ তা নয়, গতকাল আপনি যে ছিলেন আজ আপনি তার থেকে একটু ভিন্ন! আপনি নিজেই একজন এলিয়েন! মস্তিষ্ক কম্পিউটারের মতো কোনো জড়বস্তু নয়! এর ভিন্ন ভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে এটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়।

  অর্ধেক ব্রেন যে শিশুর
The very large number of connections between neurons

আপনি মস্তিষ্ককে এমন এক হার্ডওয়্যারের সাথে তুলনা করতে পারেন যা অনেকটা প্রোগ্রাম্যাবল ম্যাটারের মতো। ব্যাপারটি বোঝার জন্য মাইকেল বে ও স্টিভেন স্পেইলবার্গের ২০০৭ সালের Transformer মুভির কথা চিন্তা করতে পারেন। যেখানে এমন কিছু অটোবোটের যুদ্ধ দেখা যায় যারা নিজেদেরকে চাইলে গাড়ি অথবা অন্য কোনো বাহনে রুপান্তর করতে পারে।

Transformers': All seven movies (including 'Bumblebee'), ranked

বিজ্ঞানীরা একপ্রকার এটম নিয়ে কাজ করছেন যাকে বলা হয় ক্যাটোম, এগুলো এক একটি প্রোগ্রাম্যাবল ম্যাটার, যেখানে হার্ডওয়্যার নিজেই আপনার দেহের সেলের মতো নিজের অনুলিপি নিজে তৈরি করতে পারবে যেগুলোকে বলা হয় এক একটি জীবন্ত রোবট যারা নিজেদের শেইপ পরিবর্তন করে অন্য কোনো শেইপে ট্রান্সফার হতে পারে। আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণ কোনো কম্পিউটারের মতো নয়, কারণ কোনো কম্পিউটার তার নিজের ভেতরের কানেকশন নিজে নিজে পরিবর্তন করতে পারেনা, আমাদের মস্তিষ্ক হলো একপ্রকার ক্যাটোমের মতো যেটি নিজের নিউরাল নেটওয়ার্ক নিজেই পরিবেশের পরিবর্তনে বদলে নিতে জানে! (যদিও এটি তুলনা মাত্র)

gif4_woodcurl
gif1-intro

আর ম্যাথিউর মস্তিষ্কের সাথেও ঠিক তাই হয়েছে। তার মস্তিষ্কের অর্ধেক কেটে ফেলার পরও সে মোটামুটি স্বাভাবিকই ছিলো কারণ তার ব্রেন পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে নিজেকে সমন্বয় করার জন্য নিউরোলজিক্যালি পরিবর্তিত হয়েছে! ২০১৯ সালে Intrinsic Functional Connectivity of the brain in adults with a single cerebral Hemisphere শিরোনামে এ বিষয়টির উপর Cell Journal এ একটি পেপার প্রকাশিত হয়, সেখানে বলা হয় এ ধরণের এনাটমিক্যাল হেমিসপেরেক্টমি বা অর্ধ মস্তিষ্ক অপসারণ করার পরও কিছু কিছু ব্যক্তি তাদের অর্ধেক মস্তিষ্ক রি-অর্গানাইজ করার মধ্য দিয়ে পুনরায় সেরে উঠেছে।

নিউইয়র্ক টাইমে How the brain Can Rewire Itself after half of it Removed শিরোনামে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ডরিট ক্লিম্যান বলেন, ” লক্ষণীয়ভাবে মস্তিষ্ক প্লাস্টিক”! এটি নাটকীয়ভাবে মস্তিষ্কের কোন একটি স্ট্রাকচার লস হলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, কিছুকিছু ক্ষেত্রে অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক সাধারণ জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার মতোই কাজ করে। একটি ব্যান্ড মিউজিক কম্পোজ করার জন্য দলের সকল মেম্বারদেরই প্রয়োজন হয়। সবার ইনস্ট্রুমেন্ট সিনক্রোনাইজ হওয়ার পরই একটি সুসঙ্গত মিউজিক তৈরি হয় কিন্তু গবেষকরা দেখেন, যাদের মস্তিষ্কে শুধু একটি মাত্র হেমিস্ফিয়ার তাদের মধ্যেও এক ধরণের নিউরাল কানেকশন একই থাকে। ভিন্ন ভিন্ন এলাকা যা সেন্সরি মোটর ইনফরমেশন, দৃষ্টি, মনোযোগ এবং সামাজিক সম্পর্কের সাথে জড়িত তা বিদ্যমান সংযোগুলো শক্তিশালী করে এবং একে অপরের সাথে যোগাযোগের পরিমাণ সাধারণ মস্তিষ্ক থেকে আরো বেড়ে যায়। যে সকল শিশুদের ৪ থেকে ৫ বছর বয়সে একটি হেমিস্ফিয়ার অপসারণ করা হয় তারা বয়স বাড়ার সাথে সাথে নরমাল ব্রেন ফংশন অর্জন করে। কারণ নিউরোপ্লাস্টিসিটি শিশুকালে অনেক শক্তিশালী হয়। যাইহোক।

সার্জারির পর ম্যাথিউ হাঁটতে পারতোনা এবং তার কথা বলার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তারপর নিয়মিত ফিজিক্যাল ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির মাধ্যমে ম্যাথিউ তার এবিলিটি ফিরে পায়!

ব্রেন; দি স্টোরি অব ইউ

hsbd bg