আমাদের মস্তিষ্ক একটি বায়োলজিক্যাল ওয়েটওয়্যার যা আমাদের মাঝে অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়! কিন্তু কিভাবে?কেনো পান্না দেখতে সবুজ? দারুচিনির আছে স্বাদ এবং মাটির ভেজা গন্ধ? আমি যদি বলি আপনি আপনার বিশ্বে যে রঙ, টেক্সার, শব্দ ও ঘ্রাণ অনুভব করছেন তা ইলিউশন, যা আপনার মস্তিষ্ক আপনার কাছে উপস্থাপন করছে? আপনি যদি বাস্তবতাকে বাস্তবে অনুভব করতে পারতেন তবে আপনি দেখতেন আপনার মস্তিষ্কের বাহিরে বাস্তবতার কোনো রঙ নেই, নেই স্বাদ অথবা ঘ্রাণ। এখানে আছে শুধুই এনার্জি ও ম্যাটার। কীভাবে চার বিলিয়ন বছরের বিবর্তন মানুষকে এমন একটি মস্তিষ্ক উপহার দিয়েছে যেটি এনার্জি ও ম্যাটারকে সমৃদ্ধ সংবেদনের অভিজ্ঞতায় পরিণত করার জন্য অভিযোজিত যেটিকে আপনি বিশ্ব বলেন?
সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর থেকে আপনার মস্তিষ্ক আলো, শব্দ ও গন্ধে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আপনার সংবেদনের মাঝে জোয়ার আসে। আপনি কোনো প্রকার চিন্তা বা পরিশ্রম ব্যতীতই এক অলঙ্গনীয় বিশ্বে প্লাবিত হয়ে উঠেন। এ বিশ্বের কতটুকু আপনার মস্তিষ্কের কনস্ট্রাকশন যা আপনার মস্তিষ্কের ভেতর সংঘটিত হয়?
নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন, ঘূর্ণায়মান স্ন্যাক। যদিও এই পেজে কোনোকিছুই মুভ করছেনা, তবুও আপনার কাছে মনে হচ্ছে এটি ঘূর্ণায়মান। আপনার মস্তিষ্ক কিভাবে মোশনের অভিজ্ঞতা লাভ করছে যদিও আপনি জানেন যে এখানে সবকিছু স্থির?


এডওয়ার্ড এডেলসনের চেকবোর্ড ইলিউশনের কথাই একবার ভাবুন। A দিয়ে চিহ্নিত করা স্কয়ারটির রঙ B দিয়ে চিহ্নিত করা স্কয়ারের রঙের সমরুপ কিন্তু তবুও আপনার নিকট দুটোকে সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা রঙের মনে হচ্ছে! জানি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছেনা আপনার। কিন্তু আপনি যদি এর প্রমাণ পেতে চান A এবং B ; এ দুটি স্কয়ার ব্যতীত বাকি সবকিছু কম্পিউটারের সাহায্যে ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলেন, আমি চ্যালেঞ্জ করছি যে আপনি চমকে উঠবেন! যাক, এত কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই আপনার জন্য এখানে একটি ভিডিয়ো যোগ করে দিলাম। ২ মিনিট সময় খরচ করে একবার দেখবেন কি?
এ ধরণের ইলিউশনগুলো আমাদের বলছে যে আমরা মস্তিষ্কের বাহিরের জগতে যা কিছু দেখি তা আসলে যথাযথ রিপ্রেজেন্টেশন নয়। আমরা যা কিছু খুলির ভেতর অনুভব করি বাহিরের জগতে তার অনেককিছুই নেই। এক্সটারনাল বিশ্বে আছে শুধু এনার্জি ও ম্যাটার, দশ কোয়াড্রিলিয়ন ভিগিনটিলিয়ন থেকে একশ হাজার কোয়াড্রিলিয়ন ভিগিনটিলিয়ন এটম আপনার সমস্ত শরীর থেকে শুরু করে দুই ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সির প্রতিটি গ্রহ নক্ষত্রে ছুটাছুটি করছে, এক্সটারনাল মহাবিশ্বে আছে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স, স্ট্রং ফোর্স, উইকফোর্স ও গ্রেভিটেশনাল ফোর্স! এখানে আপনার হাত, পা, বাবা, মা, সাদা, কালো, স্বাদ বা গন্ধ কিছুই নেই এনার্জি, ম্যাটার ও ফোর্স ছাড়া। প্রশ্ন হলো তাহলে অন্যসবকিছু কার তৈরি? কিছুক্ষণ পূর্বে চিত্র-১ এ আপনি হয়তো একটি ইলিউশন দেখেছেন, চলমান সাপ যদিও ছবিটি পুরোপুরি স্থির! চিত্র- ১ এর সম্পূর্ণ মুভমেন্ট ঠিক যেমনি আপনার মস্তিষ্কের কনস্ট্রাকশন ঠিক একইভাবে এনার্জি ও ম্যাটার ছাড়া মহাবিশ্বের সবকিছু হয়তো আপনার ব্রেনের ভেতরই সংঘটিত হচ্ছে!
আপনার বাস্তবতার অভিজ্ঞতাঃ
আমার কথাগুলো আপনার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছেনা! জানি! বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। আপনার হয়তো মনে হতে পারে এ বিশ্বের উপর আপনার ফিফথ সেন্সের ডিরেক্ট এক্সেস আছে। আপনি হয়তো এ মুহূর্তে আপনার বই অথবা চেয়ার স্পর্শ করে বলছেন, এই তো সবকিছু কত শক্ত, কত সলিড আর বাস্তব। আপনার নিকট যদিও মনে হচ্ছে সেন্স অব টাচ আপনার হাতের আঙুলের মধ্যে ঘটে, আসলে এ ঘটনাটি ঘটে আপনার মস্তিষ্কের মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে। মহাবিশ্বের কোয়াড্রিলিয়ন এটমের ৯৯% এম্পটিস্পেস আর আপনিও এটমের একটি স্ট্রাকচার। খালি জায়গার ভেতর রয়েছে ফোর্স ফিল্ড। বস্তুর সলিডিটি আপনার খুলির ভেতর, অনুভূতিতে! আপনার অন্যসব সেন্সরি এক্সপেরিয়েন্সের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। আপনি চোখে যা দেখছেন তা চোখের ভেতর ঘটেনা, আপনি কানে যা শুনছেন তা কানের ভেতর ঘটেনা, আপনি নাক দিয়ে যা কিছুর ঘ্রাণ নিচ্ছেন তা নাকের ভেতর ঘটেনা। সবকিছু ঘটে আপনার মস্তিষ্ক নামক এই কম্পিউটেশনাল ম্যাটারিয়ালসে। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে কি নাক, কান, চোখ বা ত্বক ছাড়াও ব্রেন সরাসরি এ বিশ্বকে অনুভব করতে পারে? না! আপনার মস্তিষ্ককে যদি একটি অন্ধকার চ্যাম্বারে অবরুদ্ধ করে রাখেন, তাহলে আপনি এক্সটারনাল ওয়ার্ল্ডের কোনোকিছুই আর অনুভব করতে পারবেন না, এটি কখনোই ঘটবে না।
আসলে আপনার ফিফথ সেন্সই একমাত্র পথ যে পথ দিয়ে এক্সটারনাল ওয়ার্ল্ড আপনার মস্তিষ্কের ভেতর প্রবেশ করে। আপনার সেন্সরি অর্গান নাক, কান, চোখ ও স্কিন শুধু ইন্টারপ্রেট করে। তারা বাহিরের জগত থেকে ফোটন, এয়ার কম্প্রেসন ওয়েভ, মলিকিউলার কনসেন্ট্রশন, প্রেসার, টেক্সার ও টেম্পারেচার গ্রহণ করে আর সেগুলোকে মস্তিষ্কের কমন কারেন্সিতে অনুবাদ করে। আর আপনার মস্তিষ্কের কমন কারেন্সি হলোঃ ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সিগনাল! হ্যাঁ, হ্যাঁ! এ মহাবিশ্বে যা কিছু দেখছেন, আপনার প্রেমিকার উড়ন্ত চুল, তার ডাগর চোখের অন্তহীন অতলতা থেকে শুরু করে ঐ গ্যালাক্সির আনকাউন্টেবল ট্রিলিয়ন নক্ষত্র আপনার মস্তিষ্ক ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সিগনাল হিসেবেই জানে।

এই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সিগনাল ড্যাস আপনার মস্তিষ্কের নিউরনের ঘন নেটওয়ার্কের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করে যাকে বলে মস্তিষ্কের প্রধান সিগনালিং সেল। মানব মস্তিষ্কে প্রায় একশত বিলিয়ন সেল আছে, প্রতিটি নিউরন থেকে দশ থেকে শতাধিক ইলেক্ট্রিক্যাল সিগনাল বের হয়, যা আরো শত শত নিউরনের কাছে ছুটে চলে এব্রি পিকো সেকেন্ড।
আপনি যা কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করেন। প্রতিটি দৃষ্টি, শব্দ ও গন্ধ, সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতা নয়, সবকিছু একটি ডার্ক থিয়েটারের ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল উপস্থাপনা। কীভাবে মস্তিষ্ক এ ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল প্যাটার্নকে উপকারী ওয়ার্ল্ড আন্ডারেস্টেন্ডিং এ পরিণত করে? এটা করে অন্যান্য সেন্সরি অর্গান থেকে যে সকল তথ্য আসে সেগুলোকে তুলনা করার মাধ্যমে যা দ্বারা আমাদের ব্রেন বাহিরের জগতে কী ঘটছে তা অনুমান করতে পারে। এ অপারেশন এতটাই ক্ষমতাবান যে আমরা বুঝতেই পারি না। চলুন, আমরা একবার দেখে আসি কি ঘটে আমার ব্রেনের ভেতর! প্রথমেই শুরু করা যাক, সবচেয়ে প্রভাবশালী সেন্স দৃষ্টিশক্তি দিয়ে। আমরা খুব সহজেই সবকিছু দেখি যদিও এই দেখার পেছনে একটি বিশাল যান্ত্রিক প্রক্রিয়া কাজ করে। আলোর ফোটন আপনার চোখ দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করার পর আপনার মা হয়ে যায়, হয়ে উঠে প্রিয় বেড়াল অথবা প্রেমিকার রক্তিম ঠোঁট। আমাদের চোখের ভেতর আসলে কি ঘটে সেটি বোঝার জন্য চলুন একজন অন্ধ ব্যক্তির গল্প শুনে আসি।
আমি অন্ধ ছিলাম কিন্তু আমি দেখিঃ
মাইক নামক একজন ব্যক্তি তিন বছর বয়সে তার দৃষ্টি হারিয়েছিল। তার কর্নিয়ায় একটি কেমিক্যাল এক্সপ্লোসন ঘটে যার ফলে তার চোখে কোনো ফোটন প্রবেশ করতে পারতোনা। তিনি ব্যবসায় সফল ছিলেন, প্যারালিম্পিক স্কাইয়ার হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল, সে সাউন্ড মার্কার দিয়ে স্লোপ বা ঢালের ভেতর নেভিগেট করতে পারতো। প্রায় চল্লিশ বছর পর মাইক স্টিম সেলের কথা জানতে পারে যা তার অন্ধত্ব দূর করে দিতে সক্ষম হবে। সে একটি সার্জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও তার এ অন্ধত্ব ছিলো শুধুমাত্র অপরিচ্ছন্ন কর্ণিয়ার কিন্তু এর সলিউশন ছিলো খুবই সহজ। একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। মাইক বলে, যখনই আমার চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয় সাথে সাথে আলোর বিস্ফোরণ ঘটে। সহসাই ভিজুয়াল ইনফরমেশনের বন্যা উঠে। এটি ছিল দুর্দমনীয়।

নিউরোসায়েন্স এখনো যে সমস্যাটি সমাধান করতে পারেনি তা হলো “বাইন্ডিং প্রবলেম”; কীভাবে ব্রেন বিশ্বের একটি সিঙ্গেল, ইউনিফায়েড পিকচার তৈরি করে, দৃষ্টি এক দিক থেকে, শ্রবণ অন্যদিক থেকে এবং ঘ্রাণ আর এক? এ সমস্যাটি এখনো অমিমাংসিত। নিউরনের ভেতরকার কমন কারেন্সি__এবং তাদের বিশাল ইন্টার কানেক্টিভিটিই সমস্যা সমাধানের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু। “
মাইকের কর্নিয়া আগের মতোই আলো গ্রহণ করছে। কিন্তু তার ব্রেন যে সব ইনফরমেশন গ্রহণ করছে তার কোনো সেন্স তৈরি করতে পারছিলো না। মাইক শিশুদের দিকে তাকাচ্ছে ও হাসছে কিন্তু সে জানেনা যে তারা দেখতে কেমন। সে বলেছিল, আমি আসলে কোনোকিছুই সনাক্ত করতে পারছিলাম না।
সার্জিক্যাল টার্ম থেকে, ট্রান্সপ্লান্ট সফল। কিন্তু মাইকের পয়েন্ট থেকে সে যা অভিজ্ঞতা লাভ করছে সেটাকে ভিশন বলা যায় না। সে বারবার বলছিলো, হায় ঈশ্বর, আমার ব্রেন শেষ হয়ে গেলো! সে ডাক্তারের সাহায্যে কার্পেটের দিকে তাকালো, তাকালো দেয়ালের দিকে, দরজার বাহিরে। মাইক গাড়ির দিকে তাকালো, বিল্ডিং, মানুষ সবকিছুর দিকে সে চেয়ে আছে কিন্তু সে বুঝতে পারছিলোনা যে সে কি দেখছে। তার এই সেন্স ছিলোনা যে কোনটা কোন অবজেক্ট এবং তাদের গভীরতা বা উচ্চতাও সে ধরতে পারছিলো না। মাইক বলতে লাগলো, আমি তো এর চেয়ে অন্ধ থাকাকালীনই বেশ ভালো ছিলাম। সে গাছ, পালা, ছায়া বা গর্ত কোনোকিছুই আলাদা করতে পারছিলো না। সবকিছু তার কাছে সাদা তুষারের উপর কালো একটি বিন্দু মতো মনে হয়েছিল।
মাইকের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যা জানলাম তা হলো ভিজুয়াল সিস্টেম মূলত ক্যামেরার মতো নয়। এটি এমন নয় যে দৃষ্টিশক্তি ক্যামেরার লেন্স পরিবর্তন করার মত। চোখে দেখার জন্য চোখ ছাড়াও আরো অনেক বেশি ফাংশন প্রয়োজন হয়। আপনার চোখ থাকলেই যে আপনি চোখে দেখবেন তা একদম কাজের কথা নয়।
আসলে চল্লিশ বছর অন্ধ থাকার কারণে তার মস্তিষ্কের ভিজুয়াল কর্টেক্স অন্যান্য সেন্স দখল করে নিয়েছে যেমন শব্দ ও ঘ্রাণ। আমাদের ব্রেনের কোন একটি অংশ ব্যবহার না করতে করতে এটি তার কানেশনগুলো হারাতে থাকে এবং অন্যকোনো কানেকশন উন্নত হয়। ঠিক এ ব্যাপারটাই ঘটেছিলো মাইকের সাথে। চল্লিশ বছরের অন্ধত্বের কারণে তার ভিজুয়াল কর্টেক্স তার কানেকশনগুলো লস করেছে এবং অন্যান্য সেন্সগুলো তার জায়গা দখল করে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেছে। যার ফলে সে আর সিগনালগুলো এসোসিয়েট করতে পারছিলো না। আমরা জানি যে আমাদের দৃষ্টির জন্ম হয় বিলিয়ন নিউরনের একসাথে সমন্বিত হয়ে জটিল সিম্ফোনি সৃষ্টির মাধ্যমে। নিউরনের ভেতর যদি এ সমন্বয় তৈরি না হয় তবে আপনার চোখ থাকার পরও ব্রেন অন্ধ থেকে যাবে। সার্জারির পনের বছর পরও মাইক আজও ভালোভাবে পড়তে ও লিখতে পারে না, সে মানুষের চেহারার এক্সপ্রেসন বুঝতে পারেনা। সে তার দেখার সত্যতা যাচাই করার জন্য ক্রসচেক ব্যবহার করে তার অন্যান্য সেন্সগুলোকে ইউজ করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে। আমরা ছেলেবেলায়ও এ কম্পারিজন করে থাকি, যখন মস্তিষ্ক সর্বপ্রথম বিশ্বের সেন্স তৈরি করে!
তথ্যসূত্রঃ
- The Brain: The Story of You
- “Reality” is constructed by your brain. Here’s what that means, and why it matters. Standford Edu
- The Brain with David Eagleman – What Is Reality – BBC Documentary 2016
আগের পর্বগুলোঃ
- ব্রেন; দি স্টোরি অব ইউ
- একজন টিনেজারের চোখে বিশ্ব!
- আইনস্টাইনের ব্রেনে ওমেগা সাইন!
- আমি কি আমার মেমরি?
- নিউরোলজিক্যালি আপনি এ মহাবিশ্বে প্রথম!


