এ মহাবিশ্বে সময়ের কোনো অভাব নেই কিন্তু মিডজেসের জীবনে সময়ের খুবই অভাব, এই পতঙ্গটি এক সেকেন্ড থেকে একমিনিট সার্ভাইভ করে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নতুন ডেটা অনুসারে, আমাদের ইউনিভার্সের বয়স ২৬ বিলিয়ন বছর। আজ থেকে আনুমানিক ১০ থেকে ১০০ ট্রিলিয়ন বছর পর আমাদের মহাবিশ্বেরও মৃত্যু হবে। কিন্তু আমাদের সময়ের খুবই অভাব। সমগ্র জীবন আমাদের মনে একটা চিন্তা লেগেই থাকে আর তা হলো, আমার টাইম নেই। মহাবিশ্ব তার ১০০ ট্রিলিয়ন বছর জীবনের এক ন্যানোসেকেন্ডও একজন ব্যক্তি মানুষকে দেয়নি। আসলে অসীম সময়হীন মাল্টিভার্সের চোখে হয়তো আমাদের ইউনিভার্সের বয়স এক সেকেন্ড থেকেও কম। আল্টিম্যাটলি কারও হাতেই সময় নেই…
একটি ব্ল্যাকহোলের কথাই চিন্তা করুন। থিওরিটিক্যালি একটি ব্ল্যাকহোলের সময় এতই স্লো হয় যে, একটি ব্ল্যাকহোলে যখন এক সেকেন্ড অতিবাহিত হয়, তখন পৃথিবীতে এক মিলিয়ন বছর শেষ হয়ে যায়। এখান থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মহাবিশ্ব আল্টিমেটলি সময়হীন। আমি যেটাকে এক মিলিয়ন বছর মনে করি, একটি ব্ল্যাকহোল সেটাকে মনে করে এক ন্যানোসেকেন্ড । আবার আমি যেটাকে এক সেকেন্ড মনে করি, একটি মিডজেসের কাছে তা হয়তো এক বছর। কিছু কিছু মানুষ এমনই সময়হীন মহাবিশ্বের নাগরিক।
তারা জীবনকে দেখে তাদের টাইমলেস ও ইনফিনিট চোখে। স্পিনোজা থেকে শুরু করে বুদ্ধ, আমরা পৃথিবীর প্রায় সকল বিখ্যাত দার্শনিকদের মধ্যে একটি টাইমলেস চোখ দেখেছি।
তারা সময়ের ভেতর থেকেও সময়ের বাহিরে। এটা অনেকটা শ্রডিঙ্গারের বেড়ালের মতো, একইসাথে বাক্সের ভেতরে এবং বাহিরে, একইসাথে অতীতে ও ভবিষ্যতে। এই সকল মানুষের মন অনেকটা কোয়ান্টাম এন্ট্যাংগলমেন্টের মতো, যেখানে দুটি কণিকা বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্ব দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একে অন্যের সাথে মুহূর্তেই তথ্য আদান-প্রদান করে, কিন্তু তাদের দুজনের সংবাদ বহনের দায়িত্ব যদি একটি স্পেসশিপকে দেয়া হতো, তবে কোটি কোটি বছর কেটে যেত।
কোয়ান্টাম জগতে মিলিয়ন মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্ব এক মুহূর্ত থেকেও ক্ষুদ্র। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের চোখ ব্ল্যাকহোলের মতো। তারা মহাবিশ্বের বিশালত্বে বুদ হয়ে থাকে। একটি ব্ল্যাকহোলের কাছে পৃথিবীর এক মিলিয়ন বছর যেমন এক ন্যানোসেকেন্ড থেকেও ছোট মনে হতে পারে, এই সকল মানুষের কাছে মানব জীবন ও পৃথিবী আসলে কিছুই না, তাঁরা অনন্ত গ্রহ-নক্ষত্রে ছুটে বেড়ায়, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন, হেঁটে চলে বীরশ্রেষ্ঠের মতো অন্তিম মৃত্যুর পথে। কবি মাহবুব সাঈদ মামুনের “একা এবং একাকীত্ব” কাব্যগ্রন্থটি পড়ে আমার এমনই এক দার্শনিক মনের সাথে পরিচয় হয়েছে।
কার্ল স্যাগান বলেছিলেন, আমরা নক্ষত্রের ধূলিকণা দিয়ে তৈরি, আমরা নক্ষত্রের সন্তান কারণ আমাদের দেহের উপাদানগুলো তৈরি হয়েছিল একটি সুপারনোভার কেন্দ্রে। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর একটি নক্ষত্র পদার্থবিদ্যার সমীকরণে ঘুমিয়ে থাকে। তার কোনো কনসাসনেস থাকে না, সে জানে না, সে কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে অথবা কোথায় যাচ্ছে। মহাবিশ্বে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গ্রহ, নক্ষত্র এবং ছায়াপথ থাকলেও, আসলে এই মহাবিশ্বে তাদের কেউই নেই। এর কারণ হলো এই সকল মহাজাগতিক বস্তুগুলো নিজেরাই জানে না যে, তারা আছে, ফিজিক্সের ইকুয়েশনই তাদের সৃষ্টি করে, ফিজিক্সের ইকুয়েশনই তাদের দৃশ্যমান করে আবার ফিজিক্সের ইকুয়েশনই তাদের পরিচালনা করে। এর অর্থ হলো, একটি নক্ষত্র ও ছায়াপথের কাছে তাদের নিজেদেরই কোনো খোঁজ নেই। তাদের নিউরন নেই, আর তাই তারা এখনো নিজেদের কোনো খোঁজ খবর পায়নি। তাদের থাকা ও না থাকা দুটোই এ মহাবিশ্বের কাছে সমান, কারণ তারা নিজেরাই মহাবিশ্ব থেকে নিজেকে পৃথক করে চিন্তা করতে পারেনি। এবার কল্পনা করে দেখুন, আপনিও একদিন এমনই এক মৃত নক্ষত্রের পরমাণু ছিলেন।
আপনিও একদিন কোনো এক পরমাণুর ইলেক্ট্রন ছিলেন, যে কেবল নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। ২৬ বিলিয়ন বছর আপনি রিলেটিভিটি এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সমীকরণের একটি রোবট ছিলেন। আপনি জানতেন না যে, আপনি ইউনিভার্সে আছেন, আপনি জানতেন না “তুমি” ও “আমির” পার্থক্য।
ডারউইনের বিবর্তন আপনার দেহে নার্ভাস সিস্টেম ও নিউরন জন্ম দিল, আপনি একদিন নক্ষত্রের কোল থেকে জেগে উঠে বুঝলেন, আপনি আছেন! আপনি উপস্থিত! আপনি বুঝলেন, আপনি মহাবিশ্বের মৃত কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি অথবা গ্যালাক্টিক ক্ল্যাস্টারের অংশ নন, আপনি হোমো স্যাপিয়েন্স, আপনার কনসাসনেস আছে।
এরপর থেকে আপনার নিজেকে একা মনে হতে শুরু করলো, আপনি বিচ্ছিন্নতা অনুভব করলেন। আপনি অনুভব করলেন যে, আপনি ফিজিক্সের সমীকরণ চালিত কোনো অবজেক্ট না, আপনি সচেতন, আপনি বিচ্ছিন্ন ও স্বাধীন। আপনি অসীম সমুদ্রের একটি বাবল, যেটি অসীমের মধ্যে থেকেও নিজেকে ফাটিয়ে অসীমে একীভূত হতে পারে না। তার কাঠামোই তাকে সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, এটাই তার একাকীত্ব।
আমি কবি মাহবুব সাঈদ মামুনের মধ্যে একটি ইলেক্ট্রন হওয়ার জন্য হাহাকার দেখেছি। তিনি আবারও গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্টির ক্লাস্টারের হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামে পরিণত হতে চান। তিনি আবারও ফিজিক্সের সমীকরণ মেনে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে চান। তিনি হিউম্যান কনসাসনেস চান না। একটি ইলেক্ট্রনের কোনো একাকীত্ব নেই কারণ তার কোনো চেতনা নেই যে, সে ফিজিক্সের সমীকরণের বাহিরে নিজের পৃথক অস্তিত্বের ইল্যুশন তৈরি করবে।
কবি মাহবুব সাঈদ মামুন এই হ্যালোসিনেশন ভেঙ্গে ফেলতে চান। তার কাছে একটি ইলেক্ট্রন আর ১০ বিলিয়ন নিউরন একই ব্যাপার। তিনি তার কবিতায় গভীর অন্তঃদৃষ্টি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, মহাবিশ্বের জীবন ও জীবনহীনতা দুটোই ন্যাচারাল ফ্যাক্ট, চেতনা ও চেতনাহীনতা দুটোই ন্যাচারাল ফ্যাক্ট। কিন্তু তাঁর সমস্ত কাব্যগ্রন্থজুড়ে তার একটাই কান্না ছিল আর তা হলো, তিনি সামগ্রিক মহাবিশ্ব থেকে খণ্ডিত অথবা বিচ্ছিন্ন।
আর এটাই তাঁর মধ্যে এক অন্তহীন একাকীত্ব তৈরি করে রেখেছে, একাকীত্বই যেন একটি ইগো। তিনি বারবার টোটালিজম বা সামগ্রিকতাবাদের দিকে জোর দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, একটি সামুদ্রিক বাবলের অবশ্যই উচিত সামগ্রিক বা অখণ্ড সমুদ্রকে অনুধাবন করা, এটা বোঝা যে সে নিজেই সমুদ্র। একটি ত্রিমাত্রিক বস্তুর দৈর্ঘ, প্রস্থ ও উচ্চতা যেমন বিচ্ছিন্ন নয়, তেমনি আমাদের ইউনিভার্সে কোনো বিচ্ছিন্নতার অস্তিত্ব নেই, সবকিছুর মধ্যেই আছে এক গভীর একত্ব ও সংযোগ।
কিন্তু কবি সবকিছু বুঝেও, অসীমের সাথে বিলিন হতে পারছে না, তিনি সমুদ্রের সাথে মিশে যেতে চেয়েও, পরিপূর্ণভাবে মিশে যেতে পারছেন না, ঠিক যেমনি বিজ্ঞানীরা খুঁজে পায়নি গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি। এটাই তাঁর একমাত্র দুঃখ, এটাই তাঁর যন্ত্রণা আর এটাই তাঁর অস্তিত্বের হাহাকার।
তাঁর অস্তিত্বটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নিজেই অস্তিত্বের এক অন্তহীন একাকীত্বে ক্রুশবিদ্ধ।
নিচে কবি মাহবুব সাঈদ মামুনের একা ও একাকীত্ব কাব্যগ্রন্থের বাংলা ও ইংরেজী ভার্সন উপস্থাপন করা হলো:


