১৯৪০ সালে তার বয়স এখনো ত্রিশে পৌঁছায়নি। তার শরীরের চামড়া ছিল উজ্জ্বল, চোখ দুটি তরুণ যেন চোখ ঠিকরে কিছু একটা বেরিয়ে আসবে ।সে এতটাই দৃঢ় যে তাকে দেখলে মনেই হয়না যে সে কোনো এক ভয়ানক টিউমার নিয়ে বাস করছে শরীরে। অথচ যে টিউমার তার পাঁচজন সন্তানকে মাতৃহীন করেছে সেই টিউমারই পরিবর্তন করে দিয়েছে মেডিসিনের ভবিষ্যৎ! তার নাম হেনরিয়েটা ল্যাকস, হেলেন লেন অথবা হেলেন লার্সন নামেও বিশ্বের বিভিন্ন তথ্যকেন্দ্রে সে পরিচিত।

আমরা তার যে ছবিটি পেয়েছি, কেউই জানেনা সে ছবিটি প্রথম কে তুলেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত তার এই ছবি শতাধিক ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞানের টেক্সট বুক ও ওয়েবসাইট দখল করে আছে। তাকে সাধারণত হেলেন লেন ডাকা হয় কিন্তু আসলে তার কোনো নাম নেই। সায়েন্টিফিক কমিউনিটি তাকে HeLa বলেই জানে, এটি হলো বিশ্বের প্রথম অমর কোষের সাংকেতিক নাম, এ কোষটি শাশ্বত কাল একই স্থানে জীবিত হয়ে থাকবে__ তার জরায়ুর কিছু কোষ তার শরীর থেকে আলাদা করে নেয়া হয় __তার মৃত্যুর পূর্বে কিন্তু সে বা তার পরিবারের কেউ জানতোনা এ কোষটি এক সময় পৃথিবী অতিক্রম করে মহাকাশ ভ্রমণ করবে!
রেবেকা স্কলুটের পূর্বে হেনরিয়েটা ল্যাকস সম্পর্কে কেউই সুস্পষ্টভাবে কোনোকিছু জানতো না, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তার সম্পর্কে বিভিন্ন রকম তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। যখন রেবেকা হেলা সম্পর্কে তার শিক্ষকের কাছে প্রথম শুনতে পান তিনি তার ব্যাপারে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করেন কিন্তু কোথাও সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। অবশেষে তিনি বাধ্য হয়ে হেনরিয়েটা ল্যাকসের পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের কাছে ছুটে যান এবং প্রায় বিশ বছর গবেষণা করে তিনি হেলার প্রকৃত পরিচয় তার “The Immortal Life of Henrietta” নামক বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থটিতে তুলে ধরেন। ( জনপ্রিয়তায় এই বই সেপিয়েন্সকেও ছাড়িয়ে)

তিনি বলেন, আমি বহু বছর হেনরিয়েটার ছবিটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম, আমি বিস্মিত হয়েছিলাম তিনি কীভাবে জীবন যাপন করতেন, তার সন্তানদের সাথে কি ঘটেছিল? তিনি তার জরায়ুর কোষটি সম্পর্কে কি কখনো ভাবতে পেরেছিলেন যে এটি চিরকাল জীবিত থাকবে? একবার ভেবে দেখুন, আত্মায় বিশ্বাসীরা এখানে কি বলবেন? মৃত্যুর পরও একজন মানুষের সেল আজ ৭০ বছর টিকে আছে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কপি নিয়ে, বিশ্বের বড় বড় রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে হেনরিয়েটার কোষ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
১০০ ট্রিলিয়ন সেল দিয়ে মানব দেহ তৈরি যে সেলের স্তুপকে আমরা একজন ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করি। হ্যানরিয়েটার সেলগুলোকে কী তার অমর চেতনা হিসেবে সম্মান জানানো উচিত? হেনরিয়েটার আত্মার অর্ধেক কি তবে পৃথিবীতে আর অন্য অর্ধেক প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে ?
হেনরিয়েটা এসবের কিছুই জানতেন না। তিনি জানতেন না যে, তার দেহের এ সেল একদিন বিশ্বের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ল্যাবরেটরিতে বিক্রি হবে। তিনি জানতেন না, তার দেহের কোষ সর্বপ্রথম স্পেস মিশনে ভ্রমণ করবে জিরো গ্রেভেটিতে মানুষের কোষের সাথে কি ঘটে তা জানার জন্য? তিনি জানতেন না, তারই অজান্তে তার শরীরের কিছু সেল পোলিও ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করবে, কোমোথেরাপিতে বিপ্লব ঘটাবে, তিনি জানতেন না তার মৃত্যুর শত বছর পর তার দেহের সেলগুলো ক্লোনিং, জিন ম্যাপিং, ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনে একের পর এক অবদান রেখে যাবে এবং এটাও জানতেন না যে তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা কিছু সেল শত শত বছর পর মানব সভ্যতাকে হয়তোবা অমরত্বের দুয়ার খুলে দেবে। শাশ্বত কোষ থেকে বেরিয়ে আসবে শাশ্বত আর এক মানব সভ্যতা।
বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না বর্তমান পৃথিবীতে হেনরিয়েটার শরীরের ঠিক কতগুলো কোষ জীবিত। একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এ পর্যন্ত যে পরিমাণ হেলা কোষ তৈরি হয়েছে সেগুলোর ওজন যদি পরিমাপ করা হয় তবে তার ওজন হবে ৫০ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা ছিলো একটি দুর্বোধ্য সংখ্যা। একটি স্বতন্ত্র সেল যার ওজন একেবারে নাথিং, তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে আনকাউন্টেবল ট্রিলিয়ন কোষ, যেনো একদম শূন্য থেকে মহাকাশের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গ্রহ তারকা! এ পর্যন্ত যতগুলো হেলা কোষ নিজেদের ক্লোন তৈরি করেছে তাদেরকে যদি একের পর এক বসানো হয় তবে তারা তিনবার আমাদের পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে আসতে পারবে যাদের স্প্যানিং হবে ৩৫০ মিলিয়ন ফুট থেকেও বেশি। মাত্র ৫ ফুট লম্বা একজন নারীর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিছু ক্যান্সার কোষ সমস্ত পৃথিবীকে End-to-End তিনবার পাড়ি দিতে পারে।

১৯৫১ সালে হেনরিয়েটা মারাত্মক জরায়ু ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। মৃত্যুর পূর্বে একজন সার্জন তার টিউমারের একটি স্যাম্পল সংগ্রহ করেছিলেন, যেটিকে তিনি পেট্রি ডিশের মধ্যে রাখেন। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই মানুষের দেহের কোষকে জীবিত রাখার চেষ্টা করছেন , সেগুলো মরে যায় কিন্তু হেনরিয়েটার সেলগুলো ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। এরা প্রতি চব্বিশ ঘন্টায় তাদের সম্পূর্ণ জেনারেশনকে রিপ্রডিউস করতে পারে এবং এ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতেই থাকে। এগুলোই ল্যাবরেটরিতে জীবিত প্রথম অমর মানব কোষ।
তার এ কোষগুলো আজ জিন গবেষণার একটি অংশ যা ক্যান্সারের কারণ এবং সেগুলোর সাথে যা এটিকে অবদমন করতে পারে। এ সেলগুলো হার্পিস, লিউকেমিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হোমোফিলিয়া এবং পারকিনসন রোগের কারণ __ এবং লেকটোজ ডাইজেশনের জন্যও ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সেক্সচুয়ালি ট্রান্সমিটেট ডিজিজ, এপেন্ডিসাইটিস এবং মস্কুইটো(mosquito) মেটিং নিয়ে স্টাডি করার সময় এ কোষগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে সমস্ত বিশ্বজুড়ে।
কীভাবে হেনরিয়েটা আসলে মৃত্যুবরণ করেছিলোঃ
দীর্ঘকাল ধরেই গবেষকরা যারা উৎসাহী তারা বলে আসছিলেন, হেলা সেলের নামকরণ করা হয়েছে “হেলেন লেন” অথবা “হেলেন লার্সনের” নামানুসারে। একই সরল রেখায় অনেকগুলো মেডিক্যাল জার্নাল লেখা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনই হেনরিয়েটার আসল নাম ব্যবহার করেছিলেন। এ অংশটিকে আসলেই কেউই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। রিয়েল হেনরিয়েটা ছিলেন একজন তরুণী আফ্রিকান-আমেরিকান মা, যিনি ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোরের বাহিরে বাস করতেন। তিনি তার কাজিনকে বলেছিলেন, তার শরীরে কোনো গিঁট( Knot) পড়েছে। একজন সন্তান জন্ম দেয়ার পর হেনরিয়েটা এবনরমাল ব্লিডিং-এর শিকার হয়েছিলেন। তার ডাক্তার তার জরায়ুতে একটি পিণ্ড খুঁজে পেলেন এবং তার একটি স্যাম্পল ল্যাবে প্রেরণ করলেন। যার ফলাফল ছিল জরায়ু ক্যান্সার। তখন সেই এরিয়ায় আফ্রিকান ও আমেরিকান পেশেন্টদের জন্য একমাত্র মানসম্মত হসপিটাল ছিল জন হপকিন্স, আর সেখানেই ল্যাকসের ট্রিটমেন্ট করা হয়। যখন তার স্বামী ও তার সন্তানরা তার জন্য বাহিরে গাড়িতে অপেক্ষা করতো, তাকে রেডিয়েশন( জরায়ুর চারপাশে একটি রেডিয়াম টিউব ইনসার্ট করে সেই জায়গায় সেলাই করে দেয়া হত) ও এক্স-রে ট্রিটমেন্ট দেয়া হতো। এসব ট্রিটমেন্টের পরও ক্যান্সার বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ল্যাকসের শরীরে, যা তার মধ্যে অমানবিক যন্ত্রণার জন্ম দেয়। তিনি ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর ৩১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার এ রোগ শনাক্ত হওয়ার নয় মাস পর।

রেডিয়েশন ট্রিটমেন্টের সময়, ডাক্তার ল্যাকসের জরায়ু থেকে কিছু টিস্যুর স্যাম্পল সরিয়ে নেন। তাকে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টের জন্য সম্মতিসূচক একটি ফর্মে সাইন করতে হয় কিন্তু টিস্যু সেম্পল সংগ্রহের ব্যাপারে তার সম্মতি নেয়া হয়নি এবং তাকে এটাও জানানো হয়নি যে তার শরীর থেকে কিছু টিস্যু নেয়া হয়েছে এবং তখন এটা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। জন হপকিন্স-এর টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরির ড. গের কাছে এ টিস্যুগুলো প্রেরণ করা হয়।।
ড. গে কয়েক দশক ল্যাবরেটরিতে হিউম্যান সেল জন্মানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কয়েকদিন পরই সেলগুলো মারা যায়। কিন্তু ল্যাকসের সেলগুলো ছিল ইউনিক। সে এ সেলগুলোর একটিকে আলাদা করেন আর তারপর ভাগ হতে দেন আর এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। তিনি এই লাইনের নাম প্রেরণ করেন HeLa!
কেনো এ কোষটি মৃত্যুবরণ করে না?
আমাদের দেহের প্রতিটি সেলই বয়সের ইফেক্ট ফিল করে। যেটাকে বলা হয় Cellular Senescence. । বারবার সেল বিভক্ত হওয়ার ফলে ডিএনএ অস্থিতিশীল হয়ে যায় এবং মাঝেমধ্যে টক্সিন ধারণ করে। এরমানে হলো, অবশেষে সেলগুলো রেপ্লিকেট অথবা ডিভাইড হতে পারেনা এবং সেল মারা যায়। এটাকে বলা হয় Programmed Cell death (PCD), এপোপোটোসিস অথবা সেলুলার সুইসাইড। এটি প্রতিটি সেলের একটি নর্মাল প্রসেস, তবে সেলের তারতম্যে বৈচিত্রতা দেখা যায়। PCD গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ পদ্ধতিতেই জরায়ুতে আমাদের হাত ও পায়ের আঙুল গঠিত হয় এবং আমাদের ইমিউন সিস্টেম ইনফেক্টেড সেলকে হত্যা করে। অতিরিক্ত পরিমাণ PCD এর কারণে টিস্যু ডেমেজ হয় এবং এটি বিভিন্ন রোগের নেতৃত্ব দেয়, কিন্তু তা খুবই ক্ষুদ্র। উদাহরণস্বরূপঃ যদি একটি সেল নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায় তবে এটি ক্যান্সারাস হয়ে উঠে।

ল্যাবরেটরি সেটিংসে পিসিডি ৫০ টি সেল ডিভিশনের পর ঘটে। কিন্তু HeLa কোষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উলটো। সঠিক পরিস্থিতিতে হেলা কোষ ইমোর্টাল সেল লাইন তৈরি করতে পারে__তারা অসীম ভাগে ভাগ হতে পারে। আর ঠিক এ জন্যই ল্যাকসের জরায়ু টিউমারের কোষ PCD-এর অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। হেলা সেল খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কেউই জানেনা এটা কেনো হয়। কিন্তু ল্যাকের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস এবং সিফিলিস ছিল আর এজন্য একটি তত্ত্ব অনুসারে, এটা তার কোষের PCD-কে অবদমন করে রেখেছিল। হেলা সেল সমস্ত বিশ্বজুড়েই ব্যবহার হয়েছিল। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০,০০০ মেডিক্যাল জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে এ সেলটির উপর, অন্ততপক্ষে ১১,০০০ প্যাটেন্ট রয়েছে এগুলোর ব্যবহারের উপর। হেলা এত জনপ্রিয় কারণ এটা বৃদ্ধি পায়, সংরক্ষণ করা যায় এবং স্থানান্তর করা যায়।
মৃত্যুর পর যার সেল মিলিয়ন মানুষের প্রাণ রক্ষা করছেঃ
আমরা হেলা সেল ও অন্যান্য সেলের তারতম্য ক্রোমোজমের দিকে তাকালেই দেখতে পাই। হেলা সেল, অন্যান্য টিউমারের মতো, ভুলে পরিপূর্ণ জিনোম দ্বারা ভর্তি। অসংখ্য ক্রোমোজমের মধ্যে এক বা একাধিক কপিতে। একটি সাধারণ সেল ৪৬ টি ক্রোমোজোম ধারণ করে সেখানে হেলা সেল ধারণ করে ৭৬-৮০ টি ক্রোমোজোম, যাদের মধ্যে কয়েকটি মারাত্মকভাবে মিউটেটেড হয়। এটি সাধারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কারণেই হয়ে থাকে, যা অন্যান্য জরায়ু ক্যান্সারের কারণ। নাসার Museum & Informal Education Alliance– এ বলা হয়, হেনরিয়েটা ল্যাকসকে নিয়ে লেখা রেবেকার বইটি NASA-র সিরিজ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে কারণ গবেষকরা নভচারীদের উপর স্পেস ট্রাভেলের প্রভাব গবেষণা করতে এটি ব্যবহার করে। রাশিয়ান ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা HeLa সেলকে স্পেসেও নিয়ে গেছে। রাশিয়ান স্পেস প্রোগ্রামের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট যেটি ১৯৬০ সালে ভ্রমণ করেছিলো সেটি হেলা সেলকে তাদের সঙ্গে নিয়ে গেছে। এরপর নাসার ডিস্কোভারার স্যাটেলাইট হেলা সেল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছেন। গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- ডাক্তাররা ভাইরোলজির ফিল্ড উন্নত করেছেন তারা হাম্পস থেকে মাম্পস পর্যন্ত হেলা কোষে সংক্রমিত করে পর্যবেক্ষণ করে কীভাবে ভাইরাস সেলের উপর কাজ করে। আর এটি বর্তমানে কিছু ভ্যাক্সিন উন্নত করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। জেনেটিক মেডিসিন হেলা কোষ ছাড়া সম্ভব নয়। ১৯৬০ সালে ইঁদুরের ভ্রুণে হেলা কোষ মিশ্রিত করে প্রথম হাইব্রিড সেল তৈরি করা হয় যা গবেষকদের হিউম্যান জিনোম নিয়ে রিসার্চ করতে সহযোগিতা করেছিলো।

১৯৬০ সালে ইউনাইটেড স্টেট Infectious Paralytic Disease বা পোলিওর আতঙ্কে ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। গবেষক জোনাস সাল্ক হেলা সেল পরীক্ষার একটি অংশ হিসেবে এ রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন। এছাড়া টিউবারকিউলোসিস, এইচআইভি, এইচপিভি গবেষণায় হেলা কোষ একটি ইনস্ট্রুমেন্টাল। গবেষকরা বর্তমানে এ সেল ক্যান্সার ও পারকিনসন রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে, এমনকি কসমেটিক্সের মতো পণ্য পরীক্ষা করার জন্যও হেলা কোষ ব্যবহার করা হয়।
ড. গে সর্বপ্রথম যখন হেলা সেলকে এয়ার প্লেন ব্যবহার করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে শেয়ার করতে শুরু করেন, তিনি দেখেন, অন্যান্য সেলগুলো যদিও অত্যন্ত লিমিটেড টাইমফ্রেমে জীবিত থাকে কিন্ত হেলা কোষ এত বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিয়েও সার্ভাইভ করতে পারে।
যখন আপনার সেল আপনার নয়ঃ
প্রথম দৃষ্টিতে এটি অকল্পনীয় মনে হতে পারে যে ল্যাকসের পরিবার হেলা কোষ সম্পর্কে জানতেন না।এমনকি কেউই কখনো হেলা কোষ সম্পর্কে তার পরিবারকে জানায়নি। কারণ গবেষক জন হপকিন্স আইনগতভাবে এটি তাকে জানাতে বাধ্য ছিলো না। ডাক্তাররা তাদের দৈনান্দিন রুটিন অনুযায়ী রোগীদের নিকট থেকে ব্লাড সেল এবং টিস্যু সংগ্রহ করতো। তখন রোগীকে এ ব্যাপারে জানানোর কোনো প্রয়োজনই ছিলনা। কেউই জানতো না যে ল্যাকসের সেলের সাথে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালের পূর্বে হেনরিয়েকা ল্যাকসের পরিবার হেনরিয়েটার উত্তরাধিকার সম্পর্কে কোনো ধারণা পাননি। একদিন তার স্বামী জন হপকিন্স হসপিটাল থেকে একটি কল পান, কেউ একজন তাকে বলেন, আপনার স্ত্রী এখনো ল্যাবে সেল হিসেবে জীবিত। তিনি বিশ্বাস করেন গবেষকরা তাকে বলেছিল, তার সন্তানদের পরীক্ষা করা উচিত। ল্যাকসের সন্তানরা তাদের টেস্টিং সাবমিট করে কিন্তু ডাক্তার কখনো তাদেরকে এর ফলাফল জানাননি। ২০১০ সালে লেখিকা, রেবেকা স্কলুট “The immortal Life of Henrietta Lacks” গ্রন্থটিতে বলেন, তার পরিবারকে গবেষণা সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি, যা তাদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ছিলো না , তারা শুধু হেনরিয়েটার জেনেটিক্স বুঝতে চেয়েছিল। স্কলুট মেয়ে ডেভোরা -ল্যাকস পুল্লাম সহ ল্যাকের পরিবারের সদস্যদের সাথে বন্ধুত্ব করেন। এমনকি জন হপকিনসের একটি ল্যাব পরিদর্শন করেন, হেলার কোষের একটি শিশি ধরে ফিশফিশ করে বলেন, আপনি বিখ্যাত! ( সূত্র- New York Times)

গে ও জন হপকিন্স হেলা কোষ থেকে লাভবান হয়নি তবে এর সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রোডাক্টগুলো ১৯৫৪ সাল থেকেই বিক্রি হচ্ছে। ল্যাকসের পরিবার কোনো অর্থ পায়নি। তারা কোনো হেলথ ইনসিউরেন্স পায়নি। তার সন্তানরা খুব সামান্যই শিক্ষা অর্জন করতে পেরেছে এবং তাদের অনেকেরই স্বাস্থ্যগত সমস্যা। তারা রাগান্বিত এবং সমালোচকরা যুক্তি দিয়েছিলেন, তারা প্রান্তিক ও অসম্মানিত হয়েছেন। আজ কোনো গবেষণায় রোগীর টিস্যু নিতে হলে তাদের সম্মতির প্রয়োজন হয় কিন্তু মেডিক্যাল কমিউনিটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, যখন একবার আপনার ব্লাড ও টিস্যু অপসারণ করা হবে, এটি আর আপনার নয়। এটি ছিলো অত্যন্ত জটিল একটি প্রেক্ষাপট। অবশেষে হেনরিয়েটা ল্যাকস কিছুটা সম্মান পেয়েছিলেন। তার অবদানকে মোরহাউজ কলেজ অব মেডিসিন এবং স্মিতসনিয়ান সম্মানিত করেছিল। স্কলুটের গ্রন্থের উপর HBO একটি মুভিও তৈরি করেছেন এবং স্কলুট হ্যানরিয়েটা ল্যাকসকে নিয়ে ল্যাকস ফাউন্ডেশন গঠন করেন মানুষকে ল্যাকস সম্পর্কে শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং তার পরিবার ও অন্যান্যদের সাহায্য করার জন্য।
লিখেছেনঃ লিহন , লেখক ও গবেষক , হ্যালিক্স।


