আমি কি আমার মেমরি?

কিভাবে ব্রেন কাজ করে?

চোখে দেখার জন্য দুটি চোখই যথেষ্ট নয়। তার চেয়েও বেশিকিছু প্রয়োজন। ছোট শিশুরা তাদের চারপাশের সব কিছু স্পর্শ করে, টেক্সচার ও শেইপ বুঝতে চায়। part-7

চোখে দেখার জন্য দুটি চোখই যথেষ্ট নয়। তার চেয়েও বেশিকিছু প্রয়োজন। ছোট শিশুরা তাদের চারপাশের সব কিছু স্পর্শ করে, টেক্সচার ও শেইপ বুঝতে চায়। আর এ স্পর্শ প্রক্রিয়া কোনোকিছু দেখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কাছে শুনতে অবাক লাগলেও ১৯৬৩ সালে MIT বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড হেল্ড এবং এলান হেইন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। আর এ জন্য তারা দুটি বিড়ালকে সিলিল্ডার রিঙের ভেতর প্রবেশ করান যারা একটি উলম্ব লোহার ফিতে দিয়ে যুক্ত ছিলো। নিচের চিত্রটি খেয়াল করুন। দুটি বেড়ালের একটির গলা ফিতার একটি ডিভাইসের সাথে আটকানো আর অন্যটির সমস্ত শরীর ছিল একটি গন্ডোলার ভেতর, তার চোখ দুটোই শুধু বাহিরের দিকে ছিলো। একটি বেড়াল যখন পথ চলতো একই সময় বাক্সের ভেতর থাকা অন্য বেড়ালটিও রিঙের ভেতর এমনি এমনিই পথ চলতো বা ফিতাটি একই সময় ও একইসাথে দুটি বেড়ালের মুভমেন্টকে বেধে দিয়েছিল। তাদের উভয়েরই চোখ ছিলো উন্মোক্ত। তাদের দুজনের চোখেই ফোটন হিট করেছিলো কিন্তু যে বেড়ালটির সমস্ত শরীর বাক্সের ভেতর তার চোখে ফোটন হিট করা সত্তেও সে তার চারপাশ ভালোভাবে দেখতে সক্ষম হয়নি। কারণ সে আসলে বাক্সের ভেতর মুভ করতেই পারছিলোনা, প্রথম বেড়ালটির মুভমেন্টের কারণে দ্বিতীয় বেড়ালটিকে বহনকারী বাক্সটি এমনি এমনিই মুভ করছিলো।

কিভাবে ব্রেন কাজ করে?

এ পরীক্ষা থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে আমরা তখনই সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে দেখি যখন আমরদের শরীর মুভ করতে পারে । চোখে দেখার জন্য শুধু চোখই নয় সমস্ত শরীরের মুভমেন্টই প্রয়োজন হয়। আপনার চোখে দেখার জন্য শুধু ফোটনই গুরুত্বপূর্ণ নয় যা ভিজুয়াল কর্টেক্স অনুবাদ করে। এটি সমস্ত শরীরেরই একটি অভিজ্ঞতা। যে সিগনাল আমাদের মস্তিষ্কে আসে তার সেন্স শুধু ট্রেনিং এর মাধ্যমেই তৈরি হতে পারে। এ জন্য আমাদের কর্ম ও সেন্সরি কনসিকোয়েন্সের ইনফরমেশন প্রয়োজন ক্রস রেফারেন্সিং সিগনাল হিসেবে। আপনার মস্তিষ্কই কেবল মাত্র ভিজুয়াল ডেটার মিনিং বের করে। জন্মের পর যদি আপনি পরিবেশের সাথে ইন্টারেক্ট করতে না পারতেন এবং সেন্সরি ইনফরমেশনের বিপরীতে ফিডব্যাক দিতে না পারতেন থিয়োরি অনুসারে আপনি চোখে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতেন। যখন শিশুরা তাদের শয্যায় আঘাত করে, তাদের পায়ের আঙুল চিবায়, তাদের ব্লক নিয়ে খেলে তখন তারা মূলত ভিজুয়াল সিস্টেমকেই উন্নত করার চেষ্টা করে। এমনকি গর্ভে থাকাকালীন অন্ধকার পরিবেশেও একটি শিশু তার মাথা নাড়াচাড়া করে। এসব করার একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো তাদের দৃষ্টিশক্তিকে প্রশিক্ষণ দেয়া।

চোখে দেখতে আপনার অনেক সহজ লাগে কিন্তু আসলে তা নয়ঃ

ক্যালিফোর্নিয়া ব্রিউয়ার ইউনিভার্সিটির ড. আলিসা ব্রিউয়ার আমাদের মস্তিষ্ক ঠিক কতটা অভিযোজিত এ ব্যাপারটি বুঝতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি তার অংশগ্রহণকারীদের একটি প্রিজম গুগলস পরিধান করাতেন যা বাম দিক ডানে ও ডান দিক বামে কনভার্ট করতে পারত । তিনি জানতে চেয়েছিলেন কিভাবে ভিজুয়াল সিস্টেম এটি কপি করে। একবার ডেভিড ইগলম্যান এ প্রিজমটি পরিধান করেছিলেন। সাথে সাথে তার বিশ্বের দিকগুলো পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিলো।

কিভাবে ব্রেন কাজ করে?

তিনি তার অন্যান্য সেন্সরি অর্গান থেকে আসা সিগনালগুলোর সাথে চোখের সিগনাল সমন্বয় করতে পারছিলেন না। কারণ তার কান যা শুনছে তা তার চোখের ইনফরমেশনের সাথে ম্যাচ করেনি। তিনি কোনো অবজেক্ট স্পর্শ করতে চাইলেও সেটি সরে যেতে থাকে। দুই মিনিট পরই তার শরীর থেকে টপ টপ করে ঘাম ঝরতে শুরু করে । যদিও চোখ ঠিকই তার ফাংশন চালিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু ভিজুয়াল ডেটা স্ট্রিম অন্যান্য ডেটা স্ট্রিমের সাথে মিল ছিলোনা। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি। চোখে দেখার জন্য শুধু চোখের ফাংশনই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের অন্যান্য সেন্সের ইনফরমেশনও আপনার দৃষ্টিশক্তিকে প্রভাবিত করে। একবার যদি আপনি সমন্বয় হারিয়ে ফেলেন তবে আপনার দৃশ্যমান জগত জটিল হয়ে উঠে। কিছুক্ষণ পর ঠিক একই প্রিজম গুগল আর একজন অংশগ্রহণকারী পরিধান করেছিলেন। কিন্তু তার কোনো সমস্যাই হয়নি। কিন্তু কেনো? কারণ সে এক টানা সাত দিন এই প্রিজম গুগল পরিধান করেছিল। এ সময়ের ভেতর তার মস্তিষ্ক ডান ও বামের একটি ইন্টারনাল সেন্স ডেভেলাপ করতে সক্ষম হয়ে উঠে যে ইন্টারনাল কনসেপ্ট অন্যান্য সেন্সরি অর্গান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে সমন্বিত হতে পারে। কারণ প্রশিক্ষণ নেয়ার কারণে তাদের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক বদলে যায় যা ক্রমশ তাদের কাছে সবকিছু সহজ করে তোলে। আপনি যদি প্রিজম গুগল পরিধান করেন তবে আপনি বুঝতে পারবেন যে চোখে দেখাটা আপনার কাছে এখন যতটা সহজ মনে হয় তা আসলে ঠিক কতটা সহজ নয়।।

টাইমিং প্রবলেমঃ

আমরা জানি আলোর গতি শব্দের গতির চেয়ে বেশি কিন্তু তারপরও আমাদের ব্রেন আমাদের এ সময়গত ব্যবধান বুঝতে দেয়না। মনে করুন, আপনার সামনে একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু আলোর গতি শব্দের চেয়ে বেশি, তার চেহারা ও তার মুখের শব্দ ভিন্ন ভিন্ন গতিতে আপনার মস্তিষ্কে প্রবেশ করার কথা ছিল কিন্তু সেটি বাস্তবে ঘটছেনা! আপনি সবকিছুকে একই সাথে দেখছেন ও শুনছেন। আপনার ব্রেন সময়গত পার্থক্য বুঝতেই পারছেনা। আপনারা হয়তো দেখেছেন স্প্রিঙ্গাটারদের দৌড় প্রতিযোগীতা শুরুর পূর্বে বন্ধুকের শব্দ ব্যবহার করা হয়।

কিভাবে ব্রেন কাজ করে?

আমরা জানি আলোর গতি শব্দের গতির চেয়ে বেশি। আমরা চাইলে দৌড় প্রতিযোগীদের সামনে এক ধরণে ফ্ল্যাশলাইটও জ্বালাতে পারতাম যার মাধ্যমে তারা দৌড়ানোর সিগনাল পেতো। কিন্তু গবেষণায় জানা গেছে, যদিও আলোর গতি সর্বোচ্চ তবুও অডিটরি ডেটার চেয়ে আমাদের মস্তিষ্কে ভিজুয়াল ডেটা প্রসেস হতে অনেক বেশি সময় লাগে! কিন্তু এর কারণ কি?

কারণ একটাই আর তা হলো আলো যদি দ্রুত প্রসেস হয়ে যেতো তবে আপনার চোখে একজন ব্যক্তির ইমেজ পূর্বে ও তার শব্দ পরে প্রবেশ করতো আর আপনার মস্তিষ্ক ব্যক্তির ছবি ও শব্দকে এসোসিয়েট করতে পারতো না! এ জন্য ন্যাচরাল সিলেকশন আমাদের মস্তিষ্কের ভিজুয়াল ডেটা প্রসেসিং প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে যেনো সে সময়ের মধ্যে শব্দটাও আমাদের কানে এসে পৌঁছে যেতে পারে। এ ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। আমরা এটা জানি যে শব্দ আলোর চেয়ে দ্রুত প্রসেস হয় আর এর ফলে স্প্রিঙ্গটাদের দৌঁড় প্রতিযোগিতা শুরুর সময় ফ্ল্যাশ লাইট দিয়ে সিগনাল প্রেরণ না করে সিগনাল প্রেরণ করা হয় শব্দের মাধ্যমে! আমাদের এক একটি অর্গানের ভেতর তথ্য প্রবেশ করতে এক এক রকম সময় লাগে। আর এজন্য আমাদের ব্রেন আগেই প্রতিটি সেন্স থেকে ইনফরমেশনগুলো সংগ্রহ করে। অনেক পরে আমাদের মস্তিষ্ক সব গুলো তথ্য একত্রিত করে মহাবিশ্বের ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা প্রস্তুত করে। আমাদের ব্রেন ডিলেইড ভার্সনের রিয়েলিটি দেখায় আমাদের কাছে। আপনি এবার ভাবতে পারেন তাহলে তো আমাদের ব্রেন আমরা যা দেখছি তা দেখানোর পরিবর্তে যা আরো অনেক আগে ঘটে গেছে তাই দেখাচ্ছে! আসলেই তাই। আপনি যা দেখছেন তা অতীতের গল্প। কারণ আপনার ব্রেন প্রতিটি সেন্সের আলাদা আলাদা টাইমিং সিনক্রোনাইজ করার জন্যই আপনার সাথে এ ট্রিক্সটি করেছে। এছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায় ছিলোনা। আমাদের ব্রেন অতীতের গল্প উপস্থাপন করার মাধ্যমেই মূলত টাইমিং প্রবলেমটি সমাধান করে! আর এ জন্য ঘটনা ও সচেতন অভিজ্ঞতার মাঝখানে একটি গ্যাপিং থেকেই যায়।

তথ্যসূত্রঃ

আগের পর্বগুলোঃ

  1. ব্রেন; দি স্টোরি অব ইউ
  2. একজন টিনেজারের চোখে বিশ্ব!
  3. আইনস্টাইনের ব্রেনে ওমেগা সাইন!
  4. আমি কি আমার মেমরি?
  5. নিউরোলজিক্যালি আপনি এ মহাবিশ্বে প্রথম!
  6. হোয়াট ইজ রিয়ালিটি?

hsbd bg