হোমো এরেক্টাসের ভালোবাসা

হোমো এরেক্টাসের ভালোবাসা

ডারউইন বলেছিলেন, মানুষের সকল শিল্পের মধ্যে আগুনের শিল্প সবচেয়ে মহান উদ্ভাবন, তবে ভাষা হলো ব্যতিক্রম। আমাদের পূর্বসূরীরা যখন আগুনের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিল তখন তারা রান্না করতে শেখে মাংস, শাকসবজি,  মূল ও কন্দ। রান্না নাটকীয়ভাবে তাদের খাবারের  ক্যালোরিক ভ্যালু বৃদ্ধি করে, গুরুত্বপূর্ণ সব নিউট্রিশন প্রদান করে। এটি আমাদের পূর্বসূরীদের অধিক ম্যাটাবলিক এনার্জি প্রদান করে। এটি স্বাস্থ্যবান সন্তান জন্ম দেয় এবং আমাদের জীবনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করে। (Wrangh 2009,10) 

আগুন উদ্ভাবনের পূর্বে ভাইরাস,ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের পূর্বসূরিরা গণহারে মৃত্যুবরণ করতো আর রান্না করা খাবার আমাদের শরীরকে সেই আদিম ইনফেকশন থেকে রক্ষা করেছিল। শুধু তাই নয়, এ শিল্প মানব মস্তিষ্ককে উন্নত করে তোলে। আমরা জানি, মস্তিষ্কের এনার্জির জন্য গ্লুকোজ প্রয়োজন। আমাদের আধুনিক মস্তিষ্ক শারীরিক এনার্জির ২০ শতাংশ ব্যবহার করে। মস্তিষ্কের এ এনার্জি অবশ্যই লাগবে আর নয়তো আমরা মারা যাবো। মানুষের ক্ষেত্রে যে সকল খাদ্য ক্যালোরি সম্পন্ন সেগুলোই এ এনার্জি প্রোভাইড করে__ কিন্তু শুধুমাত্র আমাদের অন্ত্রের আকার কমিয়ে যা আমাদের ডাইজেস্টিভ এফিসিয়েন্সির জন্য জরুরি।

আর এ জন্য নৃতাত্বিক রিচার্ড ওয়ারহ্যাংহ্যাম এবং অন্যান্যরা বলেন, রান্না করা খাবারই আমাদের দাঁতের আকার পরিবর্তন করে, পরিবর্তন করে চোয়াল, পাকস্থলী এবং অন্ত্র।

আমাদের দাঁত, চোয়াল, পাকস্থলি এবং অন্ত্র ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়ার ফলে, সে সকল খাতে শক্তি ক্ষয়ের পরিমাণ কমে যায় আর অন্যদিকে অবশিষ্ট শক্তি যা এসব অঙ্গ ছোট হয়ে যাওয়ার ফলে সাশ্রয় ঘটেছিল, সেগুলো আমাদের পূর্বসূরীদের মস্তিষ্কের নিউরাল কানেকশন ডেভেলাপ হতে সাহায্য করে। রাষ্ট্রের সরকার  যদি সামরিক খাতে বাজেটের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে শিক্ষাখাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে তবে সামরিক খাতের তুলনায় শিক্ষাখাতই উন্নত হয়(Sapiens,Nohah)। ঠিক তেমনি আদিম পূর্বসূরীদের পেশির জন্য বাজেটের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে মস্তিষ্কের জন্য যখন শক্তির বাজেট বাড়িয়ে দেয়া হয়, তাদের মস্তিষ্কের নিউরাল কানেকশন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠে এবং সেই প্রাক মস্তিষ্ক  রকেটের মতো উড়ে বিপুল গর্জনে তাদের আধুনিক মনের  নিউ এম্পায়ারে প্রবেশ করে! ( Ibid., 109,Aiello and Wheeler 1995) মনের এ নতুন রাজত্বে, মানব সভ্যতার সেকচুয়ালিটি পরিবর্তন হয়ে যায়, পরিবর্তন হয়ে যায় তাদের ভালোবাসা এবং পারিবারিক জীবন। আমরা জানিনা যে মানব সভ্যতা ঠিক কখন আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। নৃতাত্বিকরা এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কিন্তু কেউ একজন যে উত্তর কেনিয়ার লেক তুর্কানায় বাস করতো এবং সম্ভবত প্রথম ক্যাম্ফায়ার নির্মান করেছিল 1.5 মিলিয়ন বছর পূর্বে। ( Jhon M. harris. Rutgers University, Personal Communication)  

The Importance of Lake Turkana

হেলেন ফিশার ২০১০ সালে লেক তুর্কানায় তিনি এ ধরণের একটি উনুনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। তিনি এমন একটি স্থানে বসেছিলেন যেখানে আদিম পূর্বসূরীরা আগুন জ্বালাতেন।  ধারণা করা হচ্ছে , আনুমানিক ২.৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে এখানে আমাদের পূর্বসূরিরা আগুন জ্বালাতেন, রান্না করতেন যা তাদের চোয়াল ছোট করে দিয়েছিল।  আর আগুনের মাধ্যমে তাদের জিন ভবিষ্যত প্রজন্মে ভ্রমণ করেছিল। ( Brain and Sillen 1988) 

উনুনের পরিস্কার প্রমাণ এসেছিল সাউথ আফ্রিকার  স্বার্থক্রান্স গুহা থেকে। যেখান থেকে নৃতাত্বিকরা প্রাচীন প্রাণীদের ১৭০ টুকরো পোড়োনা হাড় খুঁজে পেয়েছিলো। ফসিলের এ হাঁড়গুলো পোড়ানো হয়েছিল ২০০-৮০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায়। এটি আমাদের আজকের উনুনের টেম্পারেচার রেঞ্জের কাছাকাছি।  কেউ কেউ হয়তো গাছের মৃত কান্ড সংগ্রহ করতো এবং এ এলাকায় সেগুলি পোড়াতো অন্তত ১.৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে। একবার যখন আমাদের পূর্বসূরিরা ক্যাম্ফায়ার তৈরি করতে শুরু করলো তারা এগুলো বারবার নির্মাণ করতে থাকলো। ২০ টি স্বতন্ত্র আগুনে দগ্ধ ধ্বংসাবশেষ স্বার্থক্রান্সে পাওয়া যায় (Swartkrans)।  তবুও ইথিওপিয়ায় আরো কিছু মানব নির্মিত চুলার অস্তিত্ব পাওয়া যায় এবং কেনিয়ার অন্যান্য প্রান্তে।


আজ থেকে ২.৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের আদিম পূর্বসূরীরা কী আগুনে হাঁড় পোড়াতো, রোধ পোহাতো এবং এ সকল চুলাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করতো? কিছুকিছু নৃতাত্ত্বিক ধারণা করেন এ সকল আদিম আগুন সর্বপ্রথম হোমো এরেক্টাসরাই জ্বালিয়েছে কারণ তারা ছিলো অধিক বুদ্ধিমান তাদের অন্য যে কোন পূর্বসূরিদের থেকে। তাদের মস্তিষ্ক প্রশস্ত হয়ে উঠেছিলো, বা তাদের ব্রেন ছিলো বুর্জোয়া।  তারা পথ চলেছিলো সে পথ ধরে যে পথের ভবিষ্যতে অস্তিত্বশীল মানব সভ্যতা!হোমো এরেক্টাসদের ফসিলও পাওয়া যায় অলডুবাই জর্জ, তানজানিয়ার, কবি ফ্লোরা, কেনিয়া এবং দক্ষিণ ইথিওপিয়ার ওমো নদীর উপত্যকায় আজ থেকে ১.৮ মিলিয়ন বছর পূর্বের। কিন্তু কথিত আছে প্রাচীন হোমো এরেক্টাসদের বসতি ছিল, নারিয়োকোটোম III !

Homo Naledi Shifts Paleoanthropology's Paradigm | JSTOR Daily
হোমো এরেক্টাস ব্রেন

কেনিয়ার লেক তুর্কানার পশ্চিম উপকূলে শুষ্ক পলিতে আজ থেকে ২.৬ মিলিয়ন বছর পূর্বের একটি মৃত লাশ পাওয়া গিয়েছিল। তার মুখের বলিষ্ঠতা এবং নিতম্বের আকৃতি নির্দেশ করেছিল যে এ ব্যক্তি সম্ভবত একজন বালক। যাকে নারিওকোটম ছেলে বলে। তার বয়স ছিল ১২ বছর,  যে ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির কাছাকাছি লম্বা।  তার হাত, বাহু, নিতম্ব এবং পা দেখতে প্রায়শই আমাদের মত।  তার বুক ছিল আধুনিক মানুষের তুলনায় অধিক বৃত্তাকার, তার ছিল পথ চলার জন্য একের অধিক কশেরুকা। এ তরুণ যদি আপনার সামনে দিয়ে হলোউনের মাস্ক পরে পথ চলতো আপনি এমনি তাকে সনাক্তই করতে পারতেননা। কিন্তু সে যদি একবার তার মাস্ক খুলে ফেলতো তবে আপনি আতঙ্কে পালাতেন। হোমো টউগি অথবা অন্য হোমো হ্যাবিলস থেকে যদিও সে মানুষের অনেক বেশি নিকটবর্তী। তার অসমতল প্রসারিত চোয়াল, বড় দাঁত, বিশাল ব্রুর সেতুবন্ধ, তার ঢালু ও চ্যাপ্টা কপাল, তার পুরুত্বসম্পন্ন মাথার খুলি, তার স্ফিত ঘাড় যা কিনারার দিকে টান টান হয়ে আছে। 

Turkana Boy (Illustration) - World History Encyclopedia

World History Encyclopedia
Turkana Boy (Illustration) – World History Encyclopedia

তবুও এ বালক ছিল খুবই স্মার্ট। তার মস্তিষ্কের ভলিউম ছিল ৯০০ কিউবিক সেঃমি। লুসি ও তার অন্তরঙ্গ বন্ধু অস্ট্রোলোপিথ থেকে অনেক বড়। যাদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৪৫০ কিউবিক সেঃমি। টউগি ও অন্যান্য হোমোহেবিলসদের ব্রেনের আয়তন ছিল ৬১২ কিউবিক সেঃমি। যা আধুনিক নারী ও পুরুষের কিছুটা নিচে, যাদের গড় ক্রেনিয়াল ক্যাপাসিটি ১,৩৫০ কিউবিক সেঃমি। তারপর হোমো এরেক্টাসদের ছিল বিশাল ক্রেনিয়াল ক্যাপাসিটি যা ১২০০ কিউবিক সেঃমি পর্যন্ত পৌঁছে।  

আধুনিক মানুষ আর হোমো এরেক্টাসদের মস্তিষ্কের ভলিউম প্রায় কাছাকাছি! তাদের চিন্তা ভাবনার মধ্যে কী কোন সামঞ্জস্য ছিলো? I Mean, তারা কী বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কোনো সিমিলারিটি প্রদর্শন করতো? মজার ব্যাপার হলো, শিম্পাঞ্জি আগুনকে বুঝতে পারে (Pruetz and Laduke 2009)। শিম্পাঞ্জির মধ্যে সিগারেটের প্রতি একপ্রকার আসক্তি দেখা যায়। তারা জলন্ত কাঠির দিকে নিপুণভাবে তাকিয়ে থাকে এবং ফুঁ দিতে থাকে ( Brink 1957)। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হচ্ছে, সেনেগালের একটি শিম্পাঞ্জি কুশলতার সাথে দেখেছিল, জঙ্গলের আগুন তার দিকে ধেয়ে আসছে, সে আগুনের আচরণের সাথে নিজের আচরণ সমন্বিত করে তুলেছিল এবং খুব শান্তভাবে মুভ করেছিল যেনো সে আগুনের ডিরেকশন পরিদর্শন করছিল। আমরা জানি যে হোমো এরেক্টাস নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক শিম্পঞ্জি থেকে অনেক বড় ছিল, যারা আগুনের স্বভাব বুঝতে পারতো, এটিকে শুরু করতে পারতো, ইন্ধন যোগাতে পারতো, তারা এটিকে প্রজ্বলিত করতে পারতো এবং হয়তোবা সাউথ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায় বসবাসকারী এ এরেক্টাসরা ১.৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে ক্যাম্ফায়ার থেকে আগুন নেভাতেও পারতো। তাদের উন্নত “Thinking Caps” দিয়ে এ হোমোরা হয়তো আধুনিক বিশ্বের সোশ্যাল ও সেকচুয়াল জীবনের সূচনা করেছিল।

Chimpanzee suffers from smoking addictionFongoli chimpanzees travel through a recently burned area. Note smoke... |  Download Scientific Diagram

বিকাশের পূর্বেই মস্তিষ্কের জন্মঃ 


১৯৬০ সালে, নৃবিজ্ঞানীরা যুক্তিপ্রদর্শন করেন  , মানুষের বিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে তাদের মস্তিষ্ক এত বড় হয়ে উঠেছিল যে নারীর জন্মনালীর ভেতর দিয়ে সে শিশুটির পক্ষে বের হওয়া ছিলো খুবই দুঃস্বাধ্য। আর এভাবে বড় মস্তিষ্কের সন্তান ছিলো মায়ের জন্য একটি ব্যাথা। কারণ বড় মস্তিষ্কের সন্তান জন্মনালী দিয়ে কিছুতেই বের হতে চায়না। এটাকে বলা হয় “Obstetrical Dilemma”! আর প্রকৃতি এ ডায়লেমা সমাধান করেছেন এভাবে যে, শিশুটি তার মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ বিকাশের পূর্বেই জন্মগ্রহণ করবে। যেটাকে এসলে মন্টেগু ইনফ্যান্ট প্রবলেম বলে আখ্যায়িত করেন। মূলত, আমরা খুব দ্রুত জন্মগ্রহণ করি, মানুষের নবাগত একটি শিশু পিটাস অবস্থাতেই জন্মগ্রহণ করে। সকল প্রাইমেটই অপরিপক্ক বা আল্ট্রিসিয়াল শিশু জন্ম দেয়। একটি সন্তান তার নিকটবর্তী আত্মীয়দের তুলনায় অধিক ইম্যাচিউর অবস্থায় জন্মে  যেটিকে বলে সেকেন্ডারি আল্ট্রিসিয়ালিটি। মানব সন্তানের ছয় থেকে নয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে মানব সন্তান লিভার, কিডনি ও ইমিউন সিস্টেম, কেমিক্যাল রেসপন্স অর্জন করতে পারেনা। ডাইজেস্টিব ট্র‍্যাক্ট, মোটর রি-একশন ও মস্তিষ্কের বিকাশ অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে জন্মের পরই দেখা যায়। (Montagu 1961, Golud 1977, Bromage 1987) 

আজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের প্রাচীন পূর্বসূরিদের ব্রেন খুবই অপরিপক্ক অবস্থায় জন্মগ্রহণ করতো, তারা ছিল হোমো এরেক্টাস, পরিণত বয়সে যাদের মস্তিষ্ক ক্রমশ বড় হতো আর আয়তন ছিল ৭০০ কিউবিক সেঃমি।

একটি ভ্রুণ পিটাস অবস্থাতেই এখন জন্ম নেয়। যেনো বড় মস্তিষ্কের সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে শিশু ও মায়ের মৃত্যু না হয়। কিন্তু ইম্যাচিউর এ শিশুটি একা একা সার্ভাইভ করতে পারেনা! একাকীত্ব ছিল তার জন্য মৃত্যু! আর শিশুর এ অসহায়ত্ব হোমো এরেক্টাস নারীদের মধ্যে Reproductive Burden বা প্রজননগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করে! শিশুর একাকীত্ব দূর গিয়ে, তাকে আদর, যত্ন, ভালোবাসা ও হিংস্র প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে আকস্মিক মায়ের মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিট চেঞ্জ হয়ে যায়! শিশুর একাকীত্ব হোমো এরেক্টাস নারীর মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিটকে রি-ইঞ্জিনিয়ার করে, শিশুটি মায়ের মস্তিষ্কের কর্টেক্সের ভেতর লিখে দেয়, মা, তুমি আমাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যেওনা, অন্য কোন পুরুষের সাথে DNA Exchange কোরো না। আর এভাবেই একটি হোমো এরেক্টাস শিশু তার মায়ের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক বদলে দিয়েছিলো, তার ব্রেন সার্কিটে লিখে দিয়েছিল রোম্যান্টিক ভালোবাসা, এট্যাচমেন্ট ও প্যায়ার বন্ডিং এর আরো আপডেড ম্যাকানিজম। 

নৃ-তাত্বিক ওয়েন্ডা ট্রিভ্যাথান চিন্তা করেছেন যে, শিশুদের জন্মের সময়ের এ প্রতিবন্ধকতার কারণেই সর্বপ্রথম ধাত্রীবিদ্যার জন্ম হয়। কারণ তৃতীয় একজনের সাহায্য ছাড়া শিশুটি পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারেনা আর ঠিক একই কারণেই বিবর্তন ঘটে সিজার ও গাইনি বিশেষজ্ঞের। Human Birth; An Evolutionary perspective নামক একটি গ্রন্থে ত্রাভাথন মানুষের প্রসব সময়কালীন আচরণকে প্রাণীদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে, যখন একজন মা তার নবজাতককে আঘাত করেন, এই অঙ্গভঙ্গি শুধুমাত্র বন্ধনের মনস্তাত্বিক প্রয়োজন থেকে নয়, এটি আসলে স্তন্যপায়ীদের একটি চর্চা থেকে আসে যেখানে মা সন্তানের শরীর চাটে তার নিশ্বাস ও অন্যান্য শারীরিক ফাংশন স্টিমুলেট করার জন্য। মানুষের নবাগত বাচ্ছা সম্ভবত ভার্নিক্স কেসোসা নামক একপ্রকার তরল দ্বারা আবৃত থাকে।  নতুন মায়েরা সম্ভবত শিশুটিকে থাপ্পড় মারে এ চর্বিযুক্ত জেলটি ঘষে ফেলে দেয়ার  অভ্যাস থেকে __ যা ত্বককে পিচ্ছিল করে,  যা শিশুকে রক্ষা করে ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া থেকে। ত্রাভাথন এ ও উল্লেখ করেন যে, একজন মা জন্মের পর তার শিশুকে বাম বাহুতে সরাসরি ধরে রাখে, এর কারণ সম্ভবত হৃদস্পন্দন শিশুকে প্রশান্ত করে। 

ত্রাভাথন আরো উল্লেখ করেন, হোমো এরেক্টাসদের সময় জন্মপ্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠে এবং সন্তানকে ধরার জন্য একজন হেল্পারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।  আর এভাবেই ধাত্রীর বিবর্তন ঘটে। সম্ভবত এ হেল্পার নবাগতের সাথে আবদ্ধ হয়ে যায়, যা প্রাপ্তবয়স্কদের সার্কেলকে প্রসারিত করে যে শিশুটির প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করে। দাদী বা নানী সম্ভবত একজন প্রয়োজনীয় হেল্পারে পরিণত হয় আর এভাবেই নারীদের বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্য মেনোপজের বিবর্তন ঘটে।( Trevathan 1987) 

এটাকে গ্র‍্যান্ডমাদার হাইপোথিসিস বলে। এ তত্ত্ব প্রস্তাব করে যে, মেনোপোজের বিবর্তনের ফলে, মধ্যবয়সের নারীরা তাদের নিজেদের সন্তান লালন পালনে প্রতিবন্ধকতা অনুভব করে আর এতে করে তারা তাদের সন্তানের সন্তানের দেখাশুনা করে। (Hawkes et al. 1998)।  কোয়ান্টিটি থেকে এখানে মূলত এখানে  কোয়ালিটি গুরুত্বপূর্ণ।  আর এ জন্য প্রাচীন হোমো এরেক্টাস নারীদের মধ্যে মেনোপোজের বিবর্তনের মাধ্যমে প্রজননের প্রতিযোগিতা কমিয়ে নিয়ে আসা হয়,  এতে তাদের দৃঢ়তা বাড়ে, এনার্জির সাশ্রয় ঘটে, তারা তাদের পারিবারিক জিন প্রমোট করার জন্য কাজ করতে পারে। মেনোপজ পরবর্তী নারীদের চেয়ে পৃথিবীতে আর কোন শক্তিশালী ক্ষমতা নেই। মার্গারেট মিট বারবার বলেছেন, মেনোপোজ পরবর্তী নারীরাই নতুন প্রাণশক্তিকে শাশ্বত  ডিএনএ স্তানান্তরের এ প্রক্রিয়ায় আগামীকালকের দিকে নিয়ে গেছে। 


টিনেজের উদ্ভব


হোমো এরেক্টাসের পূর্বসূরিরা আরো একটি প্রতিবন্ধকার শিকার হয়েছিল আজ থেকে আট থেকে নয় লাখ বছর পূর্বে আর তা ছিলো “টিনেজার”। এর মানে হলো বিবর্তনের একটি পর্যায়ে মানুষের Maturation Process স্লো হয়ে যায়। শুধুমাত্র এখন নারীরা অসহায় শিশুই বহন করেনা, তাদের শিশুকালও অনেক বিরাট হয়ে যায়।  টিনেজের উদ্ভবকে স্বাগত জানানোটা ছিল মানব প্রাণীদের আর একটি হলমার্ক, আর একটি স্বতন্ত্র বর্ত্যয় আমাদের আত্মীয় এপদের থেকে। একটি শিম্পাঞ্জি দশ বছর বয়সে বয়সন্ধীতে পদার্পন করে। শিকারী সংগ্রাহক নারীরা ১৬-১৭ বছরের পূর্বে আদ্যঋতুতে পদার্পন করতো না। পুরুষরাও দীর্ঘায়িত তারুণ্য গ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে এখনো, ২০ বছরের পূর্বে মানুষের শারীরিক  বিকাশ স্তব্দ হয়না। সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো যে, মা সন্তানদেরকে টিনেজে পা রাখার পরও ভরণ পোষন প্রদান করতে থাকে। শিম্পাঞ্জি মা যখন তার শিশুদের দুধ ছাড়ায়, এ তরুণরাই নিজেদের নিজেরা  খাবার প্রদান করে এবং নিজেদের বাসা তৈরি করে। তরুণ শিম্পাঞ্জি তারপরও অধিকাংশ সময় তাদের মায়ের সাথে থাকে কিন্তু মা তাদেরকে খাবার বা আশ্রয় দেয়না। 

কিন্তু মানব সভ্যতা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। পাঁচ বছর বয়সে একজন শিশু খুব কষ্টে হয়তো একটা শিকড় সংগ্রহ করতে পারে। এমনকি শিকারী সংগ্রাহক জীবনেও তরুণরা খাবার সন্ধান ও টিকে থাকতে পারতোনা। আর এ জন্য মানব পিতামাতা সন্তানের দুধ ছাড়ানোর বহু বছর পরও তাদের সন্তানদের নিরবচ্ছিন্নভাবে লালন পালন করে। মানুষের ম্যাচিউরেশন প্রসেস স্লো হওয়ার ফলে শিম্পাঞ্জিদের তুলনায় আমাদের বাল্যকাল ও বয়সন্ধির সময় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।  কেনো মানুষের এ ম্যাচিউরেশন প্রসেস এতটা দীর্ঘতর হয়ে গেলো? 

এর কারণ হলো “সময় জয়”! শিশুকালে একজন শিশু ক্রমবর্ধমান জটিলতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। ছেলেদের শিখতে হয় কিভাবে সুনির্দিষ্ট এঙ্গেলে পাথরে হিট করতে হয় স্তর দূর করার জন্য, কিভাবে তাদের অস্ত্রগুলো পরিপূর্ণভাবে নিক্ষেপ করতে হয়। ছেলেরা  প্রাণীদেরকে পর্যবেক্ষণ করে। তারা দেখে কিভাবে প্রাণীরা তাদের ঝাঁকের নেতৃত্ব দেয়, কিভাবে বাতাস ও ঋতু পরিবর্তন হয়। কোন শিকার ট্র‍্যাক করা যায়, কিভাবে ট্র‍্যাক করা যায়, কোথায় ঘিরতে হয় শিকারকে , কিভাবে শিকারকে ফাঁদে ফেলতে হয়, কিভাবে গেমটাকে কাটতে হয় এবং কিভাবে ধ্বংসাবশেষ ভাগ করতে হয় আর কিভাবেই বা আগুন বহন করতে হয়। আর নারীরা খুবই ভালো জ্ঞান রাখতো কোথায় বেরি গুল্ম জন্মে, কোন জলাভূমি উপেক্ষা করা উচিত, কোথায় ডিম পাওয়া যাবে, প্রায় শতাধিক উদ্ভিদের জীবন চক্র কেমন, কোথায় ক্ষুদ্র প্রাণী বা সরিসৃপ লুকিয়ে থাকে, কোন গুল্মগুলি ঠান্ডা,গলা ব্যাথা ও সর্দিকাশির জন্য উপকারী। 

এসব শিক্ষাই সময় গ্রহণ করে। ট্রায়াল এন্ড এরর এন্ড ইন্টিলিজেন্স। সম্ভবত, তরুণরা দীর্ঘকালীন স্মৃতিতে সংরক্ষিত হওয়ার মতো কিছু গল্প শুনতো, তারা গল্প শুনতো যা নৈতিকতার সাথে সম্পৃক্ত। এসব গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হতো তাদের চারপাশের আবহাওয়া, অভ্যাস, বৃক্ষ ও প্রাণীদের স্বভাব সম্পর্কে।  সমান গুরুত্বের সাথে তারা মেটিং গেমের গুরুত্বপূর্ণ নুইস্যান্সগুলো শিখেছিলো। টিনেজের বিবর্তনের সাথে সাথে তারা কোর্টিং, লাভ ও সেক্সের এক্সপেরিমেন্টগুলো শিখে যেতো। সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যেখানে নারী ও পুরুষের বন্ধন গঠনের প্রয়োজন হতো, তারা খাদ্য ভাগ করতো এবং দলবদ্ধ হয়ে সন্তান লালন পালন করতো! 


ভাতৃপ্রেম


শিশুদের মস্তিষ্ক প্রসারিত হওয়ার সাথেসাথে নারীদের পক্ষে তাদের সন্তান লালন পালন করা অসম্ভব হয়ে উঠলো কারণ বড় মস্তিষ্কের সমস্যা অতিক্রম করার জন্য সন্তান  মায়ের জন্মনালী দিয়ে অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করার ফলে সে খুবই নাজুক ও অসহায়গ্রস্ত পরিস্থিতিতে পতিত হলো, এ প্রতিবন্ধী শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য  মানব সভ্যতার মাঝে আর একটি বিশেষ হলমার্ক দেখা দেয় ;  আর তা হলো আমাদের প্রচলিত আত্মীয়তার প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ায় আমরা যুগ যুগ ধরে পথ চলছি। 


অসংখ্য প্রাণী, যার মধ্যে অন্যান্য উচ্চমাত্রিক প্রাইমেটরাও  অন্তর্ভুক্ত।  তাদেরকেও  নিজের মায়ের চারপাশে ঝুলে থাকতে দেখা যায়, বিশেষ করে ভাইবোনের সাথে এবং তাদের রয়েছে স্পেসিফিক রিলেশনশিপ গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের সাথে। হিউম্যান কিনশিপের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিকড় আমাদের স্তন্যপায়ী অতীতের একেবারে গভীরে লুকিয়ে আছে। কিন্তু যখন আমাদের পূর্বসূরীরা আত্মীয়তার শ্রেণীবিভাগ করতে শুরু করে তারা একে অপরের দায়িত্ব কর্তব্যগুলো যুক্ত করে, তারা মানব ঐতিহ্যের একটি সামাজিক-Glue নির্মান করে।  আত্মীয়তার সম্পর্কের বিবর্তন নৃ-তত্বের অত্যন্ত প্রাচীন একটি দাবী। সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো, কোনটি প্রথম এসেছে? মাতৃতান্ত্রিকতা নাকি পিতৃতান্ত্রিকতা। আজ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ, এমনকি শিল্পবিপ্লব পূর্বের লোকজন তাদের গোত্র অনুসরণ করে, মা ও বাবা দুদিক থেকেই, যেটাকে বলে বি-ল্যাটারিয়াল কিনশিপ সিস্টেম। কিন্তু সাধারণত প্রকৃতিতে এ ধরণের কিন স্ট্রাকচার পাওয়া যায়না। আর এজন্য আমাদের হোমো এরেক্টাস পূর্বসূরীরা হয়তো বাবার দিক থেকে বড় হয়েছে অথবা মায়ের দিক থেকে অথবা তাদের পিতার ব্লাড রিলেটিভদের সাথে এবং এ সম্প্রদায়টিতে যোগ দেয় অন্যরা। আমাদের পূর্বসূরিরা পিতৃতান্ত্রিক ছিলো নাকি মাতৃতান্ত্রিক এ ব্যাপারে জানার জন্য যখন আমাদের নিকটবর্তী প্রাইমেটদের অনুসন্ধান করি তখন আমরা কিছু দ্বান্দ্বিক সূত্র খুঁজে পাই। সাভান্নার বেবুনদের মধ্যে,  আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ কিছু নারী ইউনিট হিসেবে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে পুরুষরা পরিণত বয়সে তাদের দল ছেড়ে অন্যকোথাও চলে যায়। মাতৃত্বের কেন্দ্রস্থল,  এই কিনশিপ সিস্টেম নারীদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল। শিম্পঞ্জিদের ক্ষেত্রে বিপরীতটাই সত্য।  আত্মীয় পুরুষ শিম্পাঞ্জি তার কমিউনিটির সাথেই থেকে যায় তার দলকে প্রতিরক্ষা করার জন্য যেখানে নারীরা বয়সন্ধীতে সাধারণত তাদের দলত্যাগ করে এবং পাশ্ববর্তী কোনো গ্রুপে তাদের সঙ্গী অনুসন্ধান করে। আর এখানেই পিতৃতান্ত্রিকতার বীজ লুকিয়ে আছে। উৎসাহ উদ্দীপকভাবে, ২ মিলিয়ন বছর পূর্বের একটি ফসিলকে স্টাডি করে জানা যায়, নারীরা পুরুষের চেয়ে বিক্ষিপ্ত ছিল, সম্ভবত তারা ভিন্ন কোন গ্রুপের মহান কোন দলের সাথে যোগ দিতো যা আবারও আদিম পিতৃতান্ত্রিকতার একটি বৈশিষ্ট্য।  নারীরা বিক্ষিপ্তভাবে ছোটাছুটি করার কারণে তারা আসলে কোন জায়গায় স্থিতিশীল হতে পারেনি, যার ফলে পুরুষই তাদের গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর এভাবে পিতৃতান্ত্রিকতার বিবর্তন ঘটে। ( Copeland et al 2011

কিন্তু আধুনিক শিকারী সংগ্রাহক জীবনে। নারী ও পুরুষ উভয়েই জন্মগত গ্রুপে থাকা বা না থাকার ব্যাপারে মুক্ত।এমনকি যখন তারা বিয়ে করে, নব দম্পতি স্বামী বা স্ত্রী যেকোনো পক্ষের সাথেই জীবনযাপন করতে পারে। কিছু শিকারী সংগ্রাহক পিতার রেখা অনুসরণ করে এবং কিছু শিকারী সংগ্রাহক মায়ের রেখা অনুসরণ করে আবার কেউ কেউ একইসাথে ও একইসময় নিজেদের দুটি কিন গ্রুপের সদস্যই মনে করে। তাদের যখন ইচ্ছা তারা তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করে। (Wood and Marlow 2011)।

 
কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রাইমেটদের বিভিন্নতায় ভিন্ন ভিন্ন রকম হয়ে উঠে, যার মধ্যে মানুষও অন্তর্ভুক্ত। আমাদের পক্ষে আসলে অসম্ভব হোমো এরেক্টাসদের সময়ের আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক নিয়ে তথ্যবহুল কোনো অনুমান তৈরি করা। কয়েকটি ব্যতিক্রমসহকারে, প্রায় নিশ্চিতভাবে সকল সদস্যই একে অপরকে জানতো  এবং তারা নিজেদের মাকে সনাক্ত করতে পারতো। যুগল ভালোবাসার সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর তারা সম্ভবত তাদের মায়ের স্পেশাল ফ্রেন্ডের সাথে একটি আভ্যন্তরীণ  বৃত্ত রচনা করেছিলো। তারপর সময়ের একটি বিশেষ বিন্দুতে তারা মা ও বাবা উভয়পক্ষের জেনেটিক রিলেটিভদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা শুরু করলো এবং তাদের স্পেশাল ফ্রেন্ডদের এফিনাল রিলেটিভদের সাথে, শুধু মাত্র বিবাহের মাধ্যমে। আর এভাবে বায়োলজিক্যালি আনরিলেটেড পুরুষ ও নারীও তাদের পরিবারের সদস্য হতে থাকে। ইতিহাসে সর্বপ্রথম মায়ের পরকিয়া প্রেমিককেও আত্মীয় বলে আখ্যায়িত করেছিলো হোমো এরেক্টাস সন্তান। আর এখান থেকেই এই সামাজিক নেটওয়ার্ক আনুষ্ঠানিক রুপ লাভ করে এভাবেই বংশ (Clan) ও গোষ্ঠী (Tribe) বিবর্তিত হয়। 


হেলেন ফিশার বলেন, আমি মনে করি নারিওকোটব বালক এবং হোমো এরেক্টাস আত্মীয়রা একটি আনুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কে বেড়ে উঠতে থাকে। মা ও তার স্পেশাল ফ্রেন্ডদের ছিল এক্সট্রা রিলেটিভ ছোটদেরকে বেড়ে উঠতে সহযোগে করার জন্য, যেনো তারা অসহায় শিশুদেরকে টিনেজে পৌঁছে দিতে পারে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কনস্যাঙ্গুয়াল ও এফিনাল রিলেটিভরাই আবদ্ধ হয়েছিলো একটি অন্তর্জালে,  তারা সম্পৃক্ত হয়েছে দায়িত্বশীলতার সুতায়, এক শাশ্বত ও অটুট আত্মীয়তার প্রক্রিয়ার সূচনা হয় তাদের মিউচুয়াল DNA এ যত্ম করার জন্য। 

একজন হোমো এরেক্টাসের বাচ্ছা  হিসেবে একজন মেয়ে সম্ভবত তার মায়ের স্পেশাল ফ্রেন্ডের কাছ থেকে  মাংস প্রত্যাশা করতো , তাকে রক্ষা করতো এবং তাকে ধরতো যখন সে কান্না করতো।  এভাবে এ সম্পর্ক, মেয়ে ও বাবার সম্পর্কে পরিণত হয় এবং মেয়েটি তার ভাইবোনদের যত্ন করে আর এভাবে বোন-ভাইয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিবর্তিত হয়। এবং এভাবে তার মা ও বাবার বোন এবং ভাই এবং তাদের স্পেশাল ফ্রেন্ড তার আঙ্কেল ও আন্টিতে পরিণত হয়। 

ক্রমবর্ধমান বিশাল হান্টিং, সেক্সের মধ্যকার প্রসারমাণ শ্রমবিভাজন এবং অসহায় শিশুদের বয়সের উথানপথন সুদীর্ঘ টিনেজ। হোমো এরেক্টাস পূর্বসূরীরা আত্মীয়দের শ্রেণীবিভাগ করতে শুরু করে নির্দিষ্ট সামাজিক স্থানে। যাদের প্রত্যেকের রয়েছে স্বতন্ত্র দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা ও সামাজিক নিয়ম। তাছাড়া এ আনুষ্ঠানিক আত্মীয়তার সিস্টেমের মতো, আমাদের পূর্বসূরিরা তাদের প্রথম প্রেসক্রাইভড রুলস এবং ট্যাবু উন্নত করে,  সেক্স, রোম্যান্স, এটাচম্যান্ট এবং কে কাকে বিয়ে করবে যা ছিল মানুষের প্রজনন জীবনের ফাউন্ডেশন স্টোন।


হোমো এরেক্টাস নারীরা ছিল মূলত সংগ্রাহক এবং মা। তাদের স্ত্রী এবং প্রেমিকরা প্রতিটি উগ্রগন্ধ ফুল সম্পর্কে জানতো, জানতো বৃক্ষের মধু সম্পর্কে, ক্ষুদ্র বেরি গুল্ম সম্পর্কে, তারা প্রতিটি দিক সম্পর্কে জানতো যেখানে পাথরের লালা ঝরতো, প্রতিটি ক্ষুদ্র টিলা, গুহা এবং ঘাসের লেজ সম্পর্কে যা তাদের চারপাশে কয়েকশত মাইল জুড়ে বিস্তারিত। মাঝেমাঝে নারীরা তাদের সন্তানদের পিঠের সাথে ঝুলে থাকা একটি চামড়ার পকেটে রেখে ঘর থেকে বের হতো। প্রতি সকালে তারা ফিরে আসতো বাদাম, বেরি, আগুন জ্বালানোর কাঠ ও পশু চারণভূমির পশুদের সংবাদ নিয়ে। পুরুষ নারীকে তাদের টিকে থাকার উপাদান হিসেবে গণনা করতো। আর অন্যদিকে নারীরা দুঃসাহসী শিকারী পুরুষের প্রশংসা করতো, তাদের দেয়া মাংসের ফালি, কাবাব ও মাংসের টুকরার জন্য। তারা পুরুষের প্রশংসা করতো শত্রুর হাত থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য।  এ সকল প্রাণীদের চামড়া আমাদের শাল ও কম্বলের জন্য প্রয়োজন ছিল, হাড় প্রয়োজন ছিল অস্ত্রের জন্য, তাদের পেশি প্রয়োজন ছিল সুতা ও দড়ির জন্য। কোন সন্দেহ নেই এ সব পুরুষ ও নারীরা একে অন্যের সাথে মজা করতো, হাসতো, আগুন পোহাতো, ফ্লার্ট করতো, চুমু খেতো। কিন্তু এ সকল মানুষরা যা স্বপ্ন দেখতো, যাকে ভালোবাসতো, তাদের সকল চিন্তা আগুনের মতোই নিভে গেছে। 


তারা আমাদের আধুনিক মানুষদের রেপ্লিকা ছিলোনা। তারা দেয়াল বা গুহায় কোন বাইসনের ছবি অংকন করেনি। হাঁড়ের তৈরি এমন কোন সুঁই নেই যা বলবে তারা কোনোদিন টেইলর কোর্ট সেলাই করেছিলো। কোন মাদুলি বা কবজ পাওয়া যায়নি যা সাক্ষপ্রদান করে তারা সূর্যের উপাসনা করেছিল,  মহাকাশের নক্ষত্র অথবা মহাবিশ্বের ঈশ্বরের। তাদের কোন কবরস্থান ছিলোনা। তবুও তারা মানুষই ছিল। তাদের ছিলো বিশাল এক মস্তিষ্ক।  তারা চাষ করতো আগুনের। তারা লালন করতো অসহায় শিশু, আমাদের সদ্য ফোটা সোনামণিটির মতোই। টিনেজাররা পিতামাতা ও বৃদ্ধদের অনুসরণ করতো। তারা সম্পক্ত ছিল আত্মীয়তার এক পারস্পরিক  আন্তর্জালে। জ্বলন্ত আগুনকে ঘিরে তৈরি হয়েছিলো বাড়ির “সিনোনিমাস”!  


আমাদের পূর্বসূরীদের কিছুকিছু নারী ও পুরুষের পুরাকালীন রুপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আর আজ আমাদের Sex and Love অবধারণ করেছে সম্পূর্ণ মানবীয় রুপ। (ভালোবাসার ব্রেন সার্কিট)

hsbd bg