হেইকার বিবর্তন
মূলপাতা বিজ্ঞানবিবর্তন হেইকার বিবর্তন

হেইকার বিবর্তন

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
43 বার পঠিত হয়েছে

হেইকার বিবর্তন ( THE EVOLUTION OF HEIKEA

 
 
 
 
 
বিবর্তনের বিপক্ষে একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় হেইকা জাপোনিকা নামক একটি ক্রেব বা কাঁকড়ার প্রজাতিকে। যেটি দেখতে জাপানের সামুরাই যোদ্ধার মতো। অন্ধ বিবর্তন কিভাবে কোনো বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতা ছাড়া স্থানীয় যোদ্ধার মতো দেখতে অবিকল একটি প্রাণী তৈরি করতে পারে ? এটি ছিলো এমন একটি ক্র্যাব যাদেরকে জাপানের সমূদ্র ও জলাশয়ে পাওয়া যায়। এর জিনাস বা গণ-এর নাম হচ্ছে Heikea, এ শব্দটির উৎস জাপানি গোত্র বা ক্ল্যান, যার নাম Heike, হেইকিরা ১১৮৫ সালে ডনো উরা সমূদ্রযুদ্ধে পরাজিত হয়, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র জেনজিদের কাছে। প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে, হেইকি যোদ্ধাদের অশরীরী আত্মা বা ভূত সমূদ্রের তলদেশে বসবাস করে, হেইকা জাপোনিকা (Heikea japonica) নামক কাকড়াদের শরীরে। এই কাঁকড়াদের শরীরের পেছনের দিকের খোলস বা কারপেসের নকশাটা, হিংস্র কোন এক মুখভঙ্গির মতো করে রাখা সামুরাই যোদ্ধাদের মতো!
 
 
 
 
বিখ্যাত প্রাণী বিজ্ঞানী জুলিয়ান হাক্সলিও এ কাঁকড়াদের নকশা দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সামুরাই যোদ্ধাদের সাথে এ প্রাণীটির সামঞ্জস্য এতটাই সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত যে জুলিয়ান হাক্সলি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন- বিষয়টিকে আকষ্মিক বলা একেবারেই ঠিক হবে না! কিন্তু এরকম কেনো হলো? কেনো হেইকা জাপোনিকা কাঁকড়ারা দেখতে অবিকল সামুরাই যোদ্ধাদের মতো? এর উত্তর অনেকের কাছেই জানা ছিলো না! তবে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা হয়, যে সব কাঁকড়াগুলোর খোলস যোদ্ধাদের চেহারার সাথে অনেক বেশি সাদৃশ্যতা বহন করতো, অন্য কাঁকড়ারা তাদের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের খাদ্যে পরিণত হয়েছিলো। ১৯৫২ সালে এই কাঁকড়াটির নাম ছিলো ডরিপপে (Dorippe), যখন হাক্সলি এটি লিখেছিলেন। ১৯৪০ সালে এর নাম পূণরায় হেইকা রাখা হয়। কাঁকড়াগুলোর মধ্যে হয়তো বিভিন্ন ভেরিয়েশন ছিলো, প্রতিটি কাঁকড়া প্রাথমিকভাবে দেখতে সামুরাই যোদ্ধাদের মতো ছিলো তা নয়, কিছুকিছু কাঁকড়া দেখতে প্রায় সামুরাই যোদ্ধাদের মতো ছিলো, যাদের মধ্যে এ সাদৃশ্য বেশি ছিলো তাদেরকে স্থানীয় জাপানিরা যোদ্ধার আত্মা ভেবে ছেড়ে দিতো, আর যাদের মধ্যে সে সাদৃশ্য ছিলোনা তাদেরকে তারা খেয়ে ফেলতো। আর এভাবে এই কাঁকড়াদের মানুষ কৃত্রিমভাবে নির্বাচন করেছিলো। অপেক্ষাকৃত যোদ্ধা সদৃশ হেইকারা টিকে থাকলো আর অবশিষ্টরা বিলুপ্ত হয়ে গেলো কারণ নির্বাচন তাদের প্রতি আনুকূল্যতা প্রদর্শন করেছিলো যারা এ উপযোগী বৈশিষ্ট্যটি তৈরি করতে পারে!
 
 
 
 

বহু প্রজন্মের কুসংস্কার আচ্ছন্ন জেলেরা সামুরাই যোদ্ধাদের মুখের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া কাঁকড়াদের না খেয়ে পানিতে ছুড়ে ফেলে দিতো- এ তত্বটি নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পায় ১৯৮০ সালে যখন কার্ল স্যাগান তার চমৎকার প্রামাণ্য চিত্র Cosmos – এ বিষয়টি পূনরায় আলোচনায় নিয়ে আসেন। স্যাগানের ভাষায়- মনে করুন, আকষ্মিকভাবে, শুধুমাত্র সুযোগের কারণে, এই কাঁকড়াগুলোর কোন একটি পূর্বসূরি জন্ম হয়েছিল যার সাথে মানুষের চেহারার খুব সামান্যই সাদৃশ্য ছিল, ডানো উরা, যুদ্ধের বহু আগে থেকে জেলেরা এ ধরণের কাঁকড়া খেতে চাইতো না, ধরা পড়ার পর তাদেরকে পানিতে ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে জেলেরা একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার শুরু করেছিলো। কাঁকড়া ও জেলের বহু প্রজন্ম অতিক্রান্ত হবার সময়ে যে কাঁকড়াদের খোলসের নকশা দেখতে সামুরাই যোদ্ধার মুখের মতো, তারা বিশেষ সুযোগ পেয়েছে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে, যতদিন অবধি তাদের এ নকশা শুধু মানুষের মুখই তৈরি করে শেষ হয়নি, এমনকি চেহারাও না, বরং এরা হিংস্র সামুরাই- এর চেহারা সদৃশ হয়! ( কসমসের সে প্রামাণ্য চিত্রটি দেখুন এখান থেকে) হেইকার বিবর্তন

     হেইকার বিবর্তন


 
পাঠকদের সুবিধার্থে আমি বিষয়টি সামান্য সহয করি। মনে করুন, আপনি একটি মাটির পুতুল তৈরি করেছেন যার চেহারাটা ট্রাম্পের মতো হবে, কিন্তু আপনি সম্পূর্ণ মুখটি ভালোভাবে ডিজাইন করার সময় পাননি, এ জন্য মুখের অভয়বটিকে কেমন হিংস্র ও ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছে, সেটা ট্রাম্পের চেহারা না হয়ে, হিংস্র কোন রাক্ষসের চেহারা হয়ে গেছে! মূলত, কাঁকড়াগুলো দেখতে প্রথমে সামুরাই যোদ্ধার মতো ছিলোনা, ছিলো কিছুটা মানুষের মতো, আর তাই জেলেরা তাদের পানিতে ফেলে দিতো, ক্রমাগত এ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় চলমান থাকার পরও কাঁকড়াদের মুখ পুরোপুরিভাবে মানুষের মতো হয়নি, বরং কিছুটা বিদঘুটে ও হিংস্র টাইপের দেখাচ্ছে তাদের যা এক্সিডেন্সিয়ালি সামুরাই যোদ্ধাদের চেহারার সাথে মিলে যায়!
 
 
 
রিচার্ড ডকিন্স বলেন, হাক্সলি ও স্যাগানের তত্বে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জেলেরাই এই কাঁকড়াদের বিবর্তন প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিলো, যত সামান্যই হোক, খোলস ও মাংসপেশির সাথে প্রতিসাম্যমূলক সংযোগ হচ্ছে ঠিক সে জিনিসটি যা কি না এ নির্বাচনের প্রাথমিক কারণ ছিলো। একজন সন্দেহবাদী বলেছিলেন, আসলে কাঁকড়াগুলো মানব সদৃশ এটা মূল ব্যাপার ছিলোনা, এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র ছিলো যে এদেরকে মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার কোন আগ্রহই বোধ করতোনা যার কারণে তাদের বিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু ডকিন্স বলেন, একবার তার বন্ধুর সাথে একটি নৈশভোজে নিমন্ত্রণদাতা এক ডিস কাঁকড়া অর্ডার করেছিলো, যে কাঁকড়াগুলো ছিলো হেইকা থেকে অনেক বড়, তাদের খোলসও মোটা, শক্ত কিন্তু নিমন্ত্রণদাতা সুপারম্যানের মতো একটার পর একটা পুরো কাঁকড়া ধরে মুখে পুরে কচকচ করে চিবাতে লাগলেন! এখান থেকে তিনি বুঝতে পারেন, এমন ভোজনরসিক ব্যক্তিদের কাছে ছোটখাটো কাঁকড়া ছেলেখেলা মাত্র, নিঃস্বন্দেহে কোন ভ্রুক্ষেপ ছাড়াই এরা আস্ত গিলে খেতে পারবে ওদের!  আউটগ্রোয়িং গডহেইকার বিবর্তন 
 
 
 
হাক্সলি ও স্যাগানের তত্বে সন্দেহ পোষণ করার কারণ হিসেবে রিচার্ড ডকিন্স বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে এটা প্রমাণিত সত্য যে, মানুষের মস্তিষ্ক মহাবিশ্বের বিভিন্ন নকশার মধ্যে নিজের চেহারা দেখতে বেশি আগ্রহী। এমন বহু উদাহরণ আছে, যেমন যিশুর বা ভার্জিন মেরি বা তেরেসার মুখ ইত্যাদি দেখা গেছে, পাওয়ারুটির টোস্টের উপর, পিজার মধ্যে, দেয়ালে লেগে থাকা স্যাঁতস্যাঁতে অংশে; এই অতিউৎসাহ আরো জোরালো ও পরিবর্ধিত হয় যদি প্যাটার্নটি কোন একটি দিকে এলোমেলো না হয়ে একটি প্রতিসাম্য বজায় রাখে, এছাড়া সব কাঁকড়াই আসলে প্রতিসম (শুধু হারমিট ক্রেব) ছাড়া। ডকিন্স বলেন, আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও সন্দেহ প্রকাশ করছি, সামুরাই যোদ্ধার মুখের সাথে হেইকা কাঁকড়াদের সদৃশ্য একটি আকষ্মিক দূর্ঘটনা ছাড়া কিছুই না; যতটা আমি বিশ্বাস করতে চাই এটি পরিবর্ধিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। হেইকার বিবর্তন
 
 
Reference
 
Image
  • The Ghost of Taira no Tomomori, Utagawa Kuniyoshi, 17th century, public domain.
  • H. japonica photo, cafe.naver.com, accessed Jan. 26, 2010.
  • Samurai Kubuki print, Utagawa Toyokuni Ill, 19th century, public domain
হেইকার বিবর্তন
হেইকার বিবর্তন
 
 

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!