সেপিয়েন্স থেকে হোমো ডিউস
মূলপাতা প্রকাশনাঅনুবাদ গ্রন্থ সেপিয়েন্স থেকে হোমো ডিউস

সেপিয়েন্স থেকে হোমো ডিউস

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
219 বার পঠিত হয়েছে

শান্তি ও অমরত্বের জন্যে মানুষ নিজেকে ঈশ্বরে পরিণত করার চেষ্টা করছে। সে ঈশ্বর হতে চায়, এটি এ জন্যে নয় যে, এর আছে স্বর্গীয় কোন গুণ বরং তারা তাদের বয়স ও দূর্ভোগকে অতিক্রম করতে চায়,  তাদের জৈবিক শরীরের উপাদানগুলোর উপর ঈশ্বরের মতো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যদি আমরা প্রকৌশলগতভাবে আমাদের ব্যথা ও মৃত্যুকে আমাদের সিষ্টেমের বাহিরে সরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখি,  তাহলে একই ক্ষমতা হয়তো আমাদের জন্যে পর্যাপ্ত আমাদের সিষ্টেমকেই প্রকৌশগতভাবে বদলে দেয়ার জন্য এবং আমরা আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আবেগ ও বুদ্ধিমত্তাকে অগণিত উপায়ে ম্যানিপুলেট করতে পারি। আপনি চাইলে হারকিউলাসের মতো শক্ত সামর্থ্য হতে পারেন, অ্যাফ্রোডাইটের মতো সংবেদনশীল হতে পারেন, এথেনার মতো জ্ঞানী হতে পারেন অথবা ডায়োনিসাসের মতো উন্মাদ হতে পারেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত মানুষের ক্ষমতার বৃদ্ধি নির্ভর করতো বাহিরের যন্ত্রপাতির উপর। ভবিষ্যতে এটি নির্ভর করবে শরীর ও মনের উন্নয়নের উপর অথবা শরীর ও যন্ত্রের সহ-অবস্থানের মাধ্যমে। জৈবিক প্রকৌশল এমন একটি অন্তঃদৃষ্টি নিয়ে শুরু হয় যে আমরা অর্গানিক বডিকে বুঝার ক্ষেত্রে এখনো অনেক দূরে।

৪ বিলিয়ন বছর ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদের শরীরে খামছি কেটে যাচ্ছে যার কারণে আমরা এমিবা থেকে সরিসৃপে পরিণত হয়েছি, মামেল থেকে পরিণত হয়েছি সেপিয়েন্সে। এটা ভাবার কারণ নেই যে সেপিয়েন্স শেষ গন্তব্য। খুব সামান্য পরিমাণ জিন,হরমোন ও নিউরাল পরিবর্তনের মাধ্যমে হোমো এরেক্টাসকে সেপিয়েন্সে পরিণত করা সম্ভব যারা চকচকে চাকুর চেয়ে আর অধিক আকর্ষণীয় কিছু তৈরি করতে পারতো না।  আর অন্যদিকে সেপিয়েন্সরা স্পেশশিপ ও কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে পারে, যারা জানে আমাদের ডিএনএ’তে আর অল্পকিছু পরিবর্তন ঘটলে এর পরিণতি কী হতো যারা জানে হরমোনাল সিষ্টেম ও ব্রেন স্ট্রাকচার সম্পর্কে। বিবর্তন কখন জাদুকরীভাবে সেপিয়েন্সদের মধ্যে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য যোগ করবে সে অপেক্ষায় বায়ো ইঞ্জিনিয়ার থেমে নেই। বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার সেপিয়েন্সদের প্রাচীন শরীরকে গ্রহণ করেছে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের জেনেটিক কোডকে নতুন করে লিখছে, তারা নতুন করে লিখছে সেপিয়েন্সদের ব্রেন সার্কিট এবং পরিবর্তন করে দিচ্ছে বায়োকেমিক্যাল ব্যালেন্স, এমনকি তারা তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যোগ করছে। তারা ঈশ্বরকে তৈরি করছে যারা সেপিয়েন্স থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ঠিক যেমনি সেপিয়েন্স সম্পূর্ণভাবে আলাদা হোমো এরেক্টাস থেকে।

 

সাইবর্গ ইঞ্জিনিয়ারিং অনেকদূর এগিয়ে গেছে, জৈবিক শরীরকে যান্ত্রিক শরীরের সাথে মার্জ করার মাধ্যমে যেমন- বায়োনিক হ্যান্ড, আর্টিফিশিয়াল আই অথবা মিলিয়ন মিলিয়ন ন্যানোরোবট যারা আমাদের রক্ত স্রোতে ঘুরে বেড়াবে, আমাদের শরীরের সমস্যাগুলো সমাধান করবে এবং ক্ষতিপূরণ করবে। তারা সবসময় আমাদের শরীর থেকে মৃত্যুকে খুঁজে বের করবে এবং মৃত্যুকে হত্যা করবে! আর অন্যদিকে একটি সাইবর্গ আমাদের জৈবিক শরীরের সীমারেখার বাহিরে এসে বিভিন্ন সুবিধাভোগ করবে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, জৈবিক দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে অপরের সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকে। যদি একটি হাতির ব্রেন ইন্ডিয়া থাকে, তার চোখ থাকে চায়না এবং পা অস্ট্রেলিয়া তবে সেটি নিশ্চিত মারা পড়বে। অথচ একটি সাইবর্গ একটি নির্দিষ্ট সময় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে পারবে। একজন সাইবর্গের ডাক্তার যদি তার শরীরের কোনো এমার্জেন্সি সার্জারী করতে চায়, তবে সে টোকিওর, শিকাগো এবং মার্চের স্পেস স্টেশনে এ কাজটি করতে পারবে তার স্টকহোমের অফিস ত্যাগ না করেই! এ জন্য তার শুধু অনেক দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট এবং কিছু বায়োনিক চোখ এবং হাত প্রয়োজন হবে। শুনতে সায়েন্স ফিকশনের মতো শোনালেও এটাই এখন বাস্তবতা। আপনার প্রেমিকার ব্রেন ইংল্যান্ড থাকবে , কিন্তু তার দু-হাত থাকবে আপনার পড়ার টেবিলের উপর যেগুলোকে সে ইংল্যান্ড থেকে চিন্তার মাধ্যমে কন্ট্রোল করতে পারবে! ইতোমধ্যে বানররা তাদের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন বায়োনিক হ্যান্ড তাদের ব্রেন সিগনাল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। প্যারালাইসড ব্যক্তিরা তাদের ব্রেন সিগনাল দিয়ে তাদের অঙ্গ সঞ্চালন করতে পারে কম্পিউটার অপারেটিং করার জন্যে। আপনি যদি পছন্দ করেন তবে আপনি রিমোট কন্ট্রোল ইলেক্ট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন একটা মাইন্ড রিডিং হেলমেট পরিধান করার মাধ্যমে। এই হেলমেটটটিকে আপনার ব্রেনের ভেতর ইমপ্লান্ট করার প্রয়োজন নেই, আপনার খুলির ভেতর দিয়ে নির্গত ইলেক্ট্রিক সিগনাল রিড করে এটি তার কাজ করতে পারবে। আপনি যদি আপনার রান্না ঘরে আলো জ্বালাতে চান তাহলে শুধু হেলমেট পরিধান করবেন। আপনি এখনো চাইলে এ ধরণের হেলমেট অনলাইন থেকে মাত্র ৪০০ ইউ এস ডলার খরচ করে ক্রয় করতে পারবেন! ২০১৫ সালে স্টকহোমের শতাধিক শ্রমিক তাদের মস্তিষ্কে মাইক্রোচিপ প্রবেশ করিয়েছিলো। এ মাইক্রোচিপগুলো ছিলো চালের দানার মতো ক্ষুদ্র, যেগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত সিকিউরিটি ইনফরমেশন থাকে,  যা কর্মীদের দরজা খুলতে সাহায্য করে এবং ফটোকপি মেশিনকে তাদের ঈশারায় কাজ করতে সাহায্য করে! খুব শীঘ্রই অর্থ পরিশোধ করার জন্যে এসব মাইক্রোচিপ ব্যবহার করা হবে। সাইবর্গ ইঞ্জিনিয়ারিং যদিও তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল, এর থেকে বোঝা যায় অর্গানিক ব্রেন জীবনের নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে, যদিও এখনো জৈব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উপস্থিত আছে,  তবে একসময় এটিকে সম্পূর্ণ নন-অর্গানিক সত্তায় পরিণত করা হবে। নিউরাল নেটওয়ার্কের বদোলে ইন্টিলিজেন্ট সফটওয়্যার বসানো হবে যা সম্ভবত ভার্চুয়াল এবং নন ভার্চুয়াল উভয় জগতে ছড়িয়ে যাবে, অর্গানিক কেমিস্ট্রির সীমারেখা পেরিয়ে। প্রায় চার বিলিয়ন বছর আমরা শারীরিক উপাদানের রাজত্বের মধ্যে বাস করেছি, জীবন এবার অজৈব বাস্তবতার বিশালত্বে ভেঙে পড়বে, এবং এমন একটি কাঠামো গ্রহণ করবে যা আমরা এমনকি কোনো নৃশংস স্বপ্নেও কোনোদিন কল্পনা করিনি। যা হোক, আমাদের নৃশংস স্বপ্নগুলোও আমাদের অর্গানিক কেমেস্ট্রির ফলাফল! আমরা জানিনা যে এ পথ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে এবং আমরা এটাও জানিনা যে আমাদের এ গডলাইক উত্তরসূরীরা দেখতে কেমন হবে। ভবিষ্যত প্রেডিকশন করা খুবই কঠিন এবং বৈপ্লাবিক বায়োটেকনোলজি এটাকে আরো কঠিন করে তুলেছে। এটাও ভবিষ্যতবানী করা কঠিন নতুন ট্রান্সপোর্টেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এনার্জি সম্পর্কে। মানব সভ্যতার অবস্থান পরিবর্তন তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করবে। হয়তো তারা মানুষের মন ও আকাঙ্খাকে পরিবর্তন করে দেবে, মানুষের বর্তমান মন ও আকাঙ্ক্ষার ডেফিনিশন তখন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যাবে! হাজার হাজার বছর মানব সভ্যতা প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর ছিলো কিন্তু সকল উথানের পরও একটা জিনিস অপরিবর্তিত ছিলো আর তা হলো, মানব সভ্যতা স্বয়ং! বাইবেলিকাল সময় থেকে আমাদের বর্তমান যন্ত্রপাতি ও প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু মানব মনের গভীর স্ট্রাকচার তাদের উভয়ের জন্যে অভিন্ন আর সে জন্যেই আমরা বাইবেলের পাতায় এখনো আমাদের খুঁজে পাই, আমরা আমাদের খুঁজে পাই কনফুসিয়াসের লিখায়, সোফোক্লেস এবং ইউরিপাইডের ট্রাজেডিতে। এসব ক্লাসিক আমাদের মতো মানুষরাই তৈরি করেছিলো, তাই আমরা বুঝতে পারি যে তারা আমাদের সম্পর্কেই কথা বলছে। মডার্ন থিয়েটারে অডিপাস, হেমলেট এবং অথেলো সম্ভবত টি শার্ট এবং জিন্স পড়ে এবং তাদের একটি ফেসবুক একাউন্ট আছে কিন্তু মূল নাটকে তাদের ইমোশনাল দ্বন্দ্ব এখনো আগের মতোই…! যা হোক, আমাদের টেকনোলজি আমাদের মানব মনের রি- ইঞ্জিনিয়ার করতে সক্ষম করে তুলবে। হোমো সেপিয়েন্স অদৃশ্য হয়ে যাবে। মানুষের ইতিহাস সমাপ্তির দিকে চলে যাবে এবং সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রক্রিয়া শুরু হবে যেখানে আমার আপনার মতো দেখতে মানুষ বোধগম্য নয়। অনেক স্কলার ২১০০ এবং ২২০০ সালের পৃথিবীকে প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এটি সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। মন সম্পর্ণ প্রাণীরা বায়োটেকনোলজির সাথে কি করবে? ভিন্ন রকমের মনসম্পন্ন সত্তারা বায়োটেকনোলজির সাথে কী করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। আমরা শুধু এটা বলতে পারি আমাদের মতো দেখতে মানুষরা বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে তাদের মনকে রি-ইঞ্জিনিয়ার করবে যাদেরকে আমরা এখন বুঝতেই পারবোনা।যেহেতু বিস্তারিত এখনো অস্পষ্ট অতএব আমরা ইতিহাসের জেনারেল ডিরেকশন সম্পর্কে জানতে পারি না। একুশ শতকে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রোজেক্ট হলো সৃষ্টি ও ধবংসের স্বর্গীয় ক্ষমতা অর্জন করা, হোমো সেপিয়েন্সকে হোমো ডিউসে পরিণত করা!

 

 

 

 

তথ্যসুত্রঃ

আমাদের প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলসমূহঃ

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!