শোকের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা
মূলপাতা বিজ্ঞান শোকের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা

শোকের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
87 বার পঠিত হয়েছে

অবহেলিত প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি, কেনো আমরা প্রিয়জনের মৃত্যুতে ব্যাথা পাই?

 
 
 
 
 
কেনো আমরা প্রিয়জনের  শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনা? কেনো মৃতকে  কেন্দ্র করে  নিদারুণভাবে মানব সভ্যতা লাখ লাখ বছর কান্না করে যাচ্ছে ? আর কেনোই কেনো মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এত অতল সংস্কৃতি গড়ে উঠে? কেনো তাকে এত সুন্দর করে সাজানো হয় ও সমাহিত?  আর কেনোই’বা  একটি কবরের কাছে এসে ধার্মিক  উপাসনা করে , মাজার গড়ে তোলে , ফুল দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায় ? কেনো তার আত্মার শান্তি চায়? আমরা এটা খুব ভালো করেই জানি অভিজিত রায় অথবা হুমায়ুন আজাদ মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করতেন না! কিন্তু তাদেরকে স্মরণ করার সময়ও সমাধিতে পুষ্প অর্পন করা হয়! তাদের জন্য আমরাও কষ্ট পাই! আমরা অবচেতনে এমনভাবে আচরণ করি মনে হয় যেনো, স্টিফেন হকিং এখনো জীবিত, কারণ তাকে স্মরণ করার সময় আমরা অনেক শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তিনি নাস্তিক হওয়ার পরও তার সমাধিতে মোমবাতি জ্বালাতে হয়, তার কফিনকেও ফুল দিয়ে সজ্জিত করে দেয়া হয়! সমস্ত গ্রহ জানে তিনি ঈশ্বর বা আত্মায়  বিশ্বাস করতেন না! কিন্তু কেনো? আপনি বলতে পারেন , দূর, এটাতো একটি শিশুসূলভ প্রশ্ন! ঠিক আছে, চলুন তাহলে,  দেখা যাক!
 
 
 
 

People.com Stephen Hawking’s Funeral: Eddie Redmayne Among Attendees

 
 
 
 
 
বিবর্তন কী এর ব্যাখ্যা জানে? আমরা কিভাবে ডারউইনের বিবর্তনের আলোকে প্রাণীদের এ শোক ব্যাখ্যা করতে পারি? রিচার্ড ডকিন্সের সেলফিশ জিন তত্ব অনুসারে, জিন স্বার্থপর, জিনের উদ্দেশ্য জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। আমরা এটা খুব ভালো করেই জানি, একটি মৃত লাশ প্রজনন ও বংশবিস্তার করতে পারেনা, অতএব এখানে জিনের কোন স্বার্থ নেই, তাহলে কেনো জিন এমন একটি ব্রেন তৈরি করেছে যে মস্তিষ্কটি মৃত মানুষকে কেন্দ্র করে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে? আমরা একে অন্যকে গালি দেই! কারণ গালি দিলে ব্রেন শান্ত হয়! মস্তিষ্কের উপর চাপ কমে যায়। শিম্পাঞ্জিরাও একে অন্যকে গালি দেয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীদের মতে, গালি Actual Violence এর প্রভাবিলিটিকে নিয়ন্ত্রণ করে! আমরা যদি কথায় কথায় রাগ করে একে অপরকে মার দিতাম তবে আমাদের গ্রহে কারো চোখ থাকতো তো কারো হাত থাকতোনা, আর হাত থাকতো তো চোখ থাকতোনা! প্রজাতি ভয়াভহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যেতো! গালি একটি বিবর্তনীয় অভিযোজন যেটি আমাদেরকে এক্সুয়াল ভায়োলেন্স থেকে দূরে রাখে, গালির মাধ্যমে মস্তিষ্কে এমনকিছু নিউরো-ট্রান্সমিটার রিলিজ হয় যা আমাদেরকে শান্ত ও স্থিতিশীল রাখে! বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, গালি আমাদের ব্যাথার অনুভূতি কমায়! আমরা যখন আগুন স্পর্শ করি আমরা ব্যাথা পাই, যদি আমাদের মস্তিষ্কে ব্যাথার সিগনাল না থাকতো, তবে আমরা এক্সট্রারনাল জগতের তাপ, চাপের পার্থক্য অনুধাবন করতে পারতাম না! আর আমরা অসচেতন ও অসতর্কভাবে আচরণ করতাম! যা প্রজাতিকেই ধবংস করে দিতো!তারমানে দেখা যাচ্ছে নিছক গালি আর  ব্যাথাও প্রজাতির জন্য কল্যাণকর, একটি এডাপসন !
 
ব্যাথাও আমাদের শরীরকে প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিগনাল দেয়।  কিন্তু একটা মৃত শরীরের জন্য কান্না করার মাঝে উপযোগীতা কী, কী উপযোগীতা প্রিয়জনের জন্য অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ার মাঝে , যে আর কোনোদিন এ মহাবিশ্বে ফিরে আসবেনা? তার জন্য সুইসাইড করার মাঝে কী স্বার্থ থাকতে পারে জিনের? What’s The point of Grief  শিরোনানে “দি কনভারসেশন”এ  একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয় যেখানে বলা হয়, অন্যান্য স্তন্যপায়ী, বিশেষ করে প্রাইমেটরা তাদের মৃত শিশু ও আত্মীয়ের পাশে থাকে! এমনকি তাদেরকে কোলে নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ায় যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ডিপ্রেসন দূর হয়!
 
 
একবার BBC,  The Truth about Animal Grief  নামক একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেছিলো । যেখানে ২০১৮ সালে সারা বিশ্ব জুড়ে নিউজ হওয়া একটি ঘটনার কথা জানা যায়, একটি অর্কা বাছুরের মৃত্যুর পর তার মা তার লাশ ১৭ দিন পর্যন্ত নিজের কাছে রেখে দেয়। এর দুই বছর আগে জাম্বিয়ান Chimfunsi Wildlife Orphanage এ দেখা যায় নোয়েল নামক একটি শিম্পাঞ্জি তার দত্তকপুত্র থমাসের মৃত লাশের দাঁত পরিস্কার করে দিচ্ছে। হাতিরা তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যুর পর তাদের হাড় গুলোকে বারবার দেখতে যায়, সুড় দিয়ে স্ট্রোক করে।
 
 
শোকের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা

Chimp Seen Cleaning Body Of Dead Son – The Dodo

 
 
 
 
১৯৭২ সালে, ফ্লিন্ট নামক তরুণ এক পুরুষ শিম্পাঞ্জি তার মা ফ্লোয়ের মৃত্যুর এক মাস পর মৃত্যুবরণ করে। প্রথমে শিম্পঞ্জিটি খাওয়া ছেড়ে দেয়, তারপর সমাজ থেকে আইসোলেট হয়ে যায় ও সেখানেই বিদায় নেয়। সে মায়ের মৃত্যু মেনেই নিতে পারেনি। এটাকে আমরা বলি Broken Heart! মানুষের মধ্যেই এ বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কিন্তু উইলিয়াম এন্ড মেরি কলেজের এন্থ্রোপোলোজিস্ট ড. বারবারা জে. কিং বলেন, শুধু আমরা মানুষরাই ভালোবাসা ও শোক অনুভব করিনা এটা প্রাণী জগতের সর্বত্র সম্প্রসারিত! How animal Grief   নামক একটি আর্টিকেলে তিনি দেখান, শোক সব প্রাণীর মধ্যেই সাধারণ! ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে Rare Footage: Wild Elephants “Mourn” Their Dead নামক একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়, সেখানে একটি দূর্লভ ছবি প্রকাশিত হয় যেখানে হাতি তাদের  পরিবারের মৃত এক সদস্যের হাড় দেখে তাকে সনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
 
 
শোকের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা

Rare Footage: Wild Elephants “Mourn” Their Dead, National Geography

 
 
 
 
 
ডারউইন নিজেও বিশ্বাস করতেন প্রাণীদের শোক ও দূর্ভোগের আবেগ আছে। প্রাণীদের মধ্যে শোকের উপস্থিতি দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের গভীর প্যারাডক্সে ফেলে দয়! কারণ একটি মৃত প্রাণী আমাদের টিকে থাকা ও বংশবিস্তারে কোনো সাহায্য করেনা! কিন্তু প্রিয়জনের মৃত্যুতে জীবিত প্রাণীরা সুইসাইডও করে! জিন যদি স্বার্থপর হয় তবে জিন নিশ্চয় প্রাণীদের ব্রেনে এমন কোন প্রবণতা তৈরি করতোনা যা একটি প্রাণহীন মৃত দেহের জন্য এত অফুরন্ত সময় ও শক্তি অপচয় করে এবং জলাঞ্জলি দিতে পারে নিজের জীবনও! তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, যার কোনো উপযোগীতাই নেই তা আমাদের মাঝে কিভাবে বিকশিত হলো! জীববিজ্ঞান আমাদেরকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা আর এ জন্যই  আমাদের আশ্রয় নিতে হয় বিবর্তনের কাছে।
 

Monkey appears to mourn ‘dead’ infant in moving photograph, The independent

 
 
 
 
 
 
 
 
প্রাণীদের মধ্যে এটা একেবারে সাধারণ যে, কাছের কেউ মারা গেলে তার খাবার ও ঘুম পরিত্যাগ করে, তারা নির্দিষ্ট আবেগ প্রকাশ করে। প্রাণীদের মধ্যে মৃত্যুর প্রতি ইমোশনাল রেসপন্স খুবই সুবিস্তৃত একটি বাস্তবতা। শোক ও দুঃখের সাপেক্ষে একের পর এক এতবেশি প্রমাণ আসতে শুরু হয় যে Journal Philosophical Transection of Royel B মানুষ ও প্রাণীদের মৃত্যুর প্রতি প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য Evolutionary Thanatology নামক নতুন একটি স্টাডির প্রস্তাব প্রদান করে। এর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র, প্রাণীদের আচরণ ও মানব সংস্কৃতি বোঝা নয়, মৃত্যু ও মরণশীলতার উপর একটি বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ গড়ে তোলা।
 
আমরা দেখতে পাই যে মানুষ ও প্রাণীরা তাদের প্রিয়জনের মৃত্যুর পর বৈচিত্র্যময় উপায়ে শোক দিবস পালন করছে যা তাদের টিকে থাকার জন্য একদম উপযোগী নয়ঃ নির্জনে ফিরে যাওয়া, সামাজিকীকরণ থেকে পিছু হটানো, ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়া, কম খাওয়া, সেক্সের প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়া, মৃত দেহের জন্য সময় অপচয় করা, প্যাথোজেনের কাছে নিজেকে প্রকাশ করা, শিকারীদের কাছে নিজেকে অরক্ষিত করে তোলা। আমরা কবর খুড়ি , লাশকে গোসল করাই, তাকে পরিস্কার করি, সাজাই, হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে তাকে অসীমে সমর্পন করি , সাত আটজন মিলে তার লাশ কাধে বহন করি! এমনকি কবরস্থানেও  আমরা সময় দেই, উপাসনা করি, সেটাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলি! জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এতে আমাদের জৈবিক কোনো উপকার সাধিত হয়না! আমরা যদি মনে করি যে,  প্রাণীরা টিকে থাকা ও বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পরিচালিত তবে মৃতদেহ নিয়ে তারা যা করছে এটাকে আমরা কী বলবো?  কৌতুক নাকি কোনো মজার কোনো উপহাস?
 
 মূলত শোক থেকে কী অর্জন করছি আমরা…? আমরা জানি যে আমাদের জীবনে অনেক ব্যথা আছে কিন্তু তার মানে এই না যে , সে সব ব্যাথা ক্ষতিকর! আমাদের যখন হাত পুড়ে যায় , তখন আমরা ফিজিক্যাল পেইন ফিল করি,  যার জন্য আমরা আগুন থেকে দূরে থাকি, ব্যথা আমাদেরকে ব্যথার সোর্সগুলো থেকে দূরে রাখে। মানুষ জন্মগতভাবেই ব্যথার সেনসিটিভিটি নিয়ে জন্ম নেয় যা তাদেরকে ইনজুরি ও ইনফেকশন থেকে দূরে রাখে কিন্ত একজন মানুষের মৃত্যুর ব্যাথায় আমরা  যে সব আচরণ করছি, এর কোন ধরণের উপযোগীতা থাকতে পারে? আমরা এর মধ্যে উপকারের বদৌলে ক্ষতিটাই তো বেশি দেখছি। যেমন- ঘুম কমে যাওয়া, খাওয়া বন্ধ করে দেয়া এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া?
 
 
প্রাণী ও মানুষরা কিভাবে একটি মৃত শরীরের প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে এটি আমাদেরকে প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা বা আমাদের বিবর্তন সম্পর্কে কিছু বলেনা- এটি শুধুমাত্র আমাদেরকে সাহায্য করে শোক কী সেটা বুঝতে। শোকের বিষয়টি যদি শুধু বড় মস্তিষ্কের প্রাণী যেমন- তিমি ও ডলফিন অথবা প্রাইমেটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো তবে আমরা বলতে পারতাম যে শোক ব্যাপারটি শুধু বুদ্ধিমান ও জটিল মস্তিষ্কের প্রাণীদের ভেতর কাজ করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখেন যে, সীল, ম্যানাটিস, ডিঙ্গো, হর্স এবং পোষ্য বেড়ালের মধ্যেও শোক কাজ করে। সবচেয়ে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হলো ২৭ টি জিরাফ একটি মৃত জিরাফের জন্য সারারাত জাগ্রত থাকে। ৫ টি ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের হাতি তাদের পরিবারের কোন সদস্যের মৃত শরীরের হাড়গুলোর পরিদর্শন করার জন্য মাঝেমাঝেই সেখানে বেড়াতে যায়! যদি স্বয়ং হাতি তার প্রতিবেশীর মৃত হাড়ের প্রতি শোক প্রকাশ করে, বারবার পরিদর্শন করতে যায়, তবে মানুষ যখন তার পরিবারের কোন সদস্য বা প্রিয়জনের জন্য কবরের পাশে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে উপাসনা করে তখন ব্যাপারটিকে কী স্রেফ মানবিক সংস্কৃতির একটি প্রভাব বলা যায়? শোকদিবস কী কোন ধর্মীয় আচরণ? যদি তাই হয় তবে সে সকল ডলফিনদের ব্যাপারে কী বলবেন যারা তারা মা ডলফিন যখন তার সন্তানের লাশ বহন করে তখন নিজেদের গতি ধীর করে ফেলে এবং শোক যাত্রায় অংশগ্রহণ করে? BBC  এবং Cosmos Magazine ‘  এ এমন ১৫’টি ডলফিন এর কথা জানা যায়, যারা মৃত সন্তানের লাশবহনকারী মাকে সাহচর্য দেয়ার জন্য নিজেদের গতি ধীর করে ও তার সাথে একপ্রকার শোক মিছিল করে। একবার ফোই গ্রাস নামক দুটি হাঁস উদ্ধার করা হয়েছিলো যারা ছিলো একে অপরের বন্ধু, এদের একজন যখন মারা যায় অন্যজন তার কাঁধে মাথা রেখে এক ঘন্টা চুপ করে থাকে! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এ ধরণের শোকের ছায়া শুধু স্তন্যপায়ী নয়, পাখিদের মধ্যেও দেখা যায় যেমন – Foie Gras এবং Wild Scrub Jays!
 

Dolphins grieve for their dead – Cosmos Magazine

 
 
 
 
ড. কেইল সুইফট Philosophy Transaction of the Royal Society B নামক একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে কাকরা মৃত কাকের প্রতি রেসপন্স করে, পায়রা ও কাঠবিড়ালিরা মৃত প্রতিবেশীর শোকে পরিবেশ ত্যাগ করে। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে এ সকল আচরণের টিকের থাকার উপযোগীতা বা এডাপ্টিভ ভ্যালু বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি দেখান, একটি কাকের মৃত্যুর পর অন্য কাকরা সবাই দলবদ্ধ হয় এবং অন্যান্য কাকদেরকেও ডেকে এনে নিয়োগ করে, মৃত দেহের প্রতি তারা ভয়াভহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে! ইইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এর ড. ডোরা বিরো বলেন, To Understand the Extent to which non-human posses any of These Component can tell us a Great deal about the Evolutionary origin of our own Cognition.
 
 

 

 

 

 

মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের শোক কী একইরকম?

 
আমরা যদি প্রাণীদের শোককে বুঝতে পারি,  তবে আমরা আমাদের শোকও বুঝতে পারবো। মানুষ ও প্রাণীদের মধ্যে যদিও শোকের তারতম্য দেখা যায় কিন্তু একটি প্রাণী যত বেশি সামাজিক হয় , তার মধ্যে শোক পালন করার প্রবণতা তত বেড়ে যায়। আমরা এক্ষেত্রে ডলফিনের কথা বলতে পারি,  যারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সামাজিক। অতএব এটা বিষ্ময়ের বিষয় নয় যে , তারা একজন শিশুর মৃত দেহ দেখার জন্য উপস্থিত হবে এবং মৃত লাশ বহনে তারা শরীক হবে, তেলেকুয়া অর্কার এর  ক্ষেত্রে যেটি ঘটেছিলো। কিন্তু এছাড়াও রয়েছে তাদের আরো বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় আচরণ যখন তারা অন্য একটি ডলফিনের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলে তাকে সমূদ্র পৃষ্ঠে নিয়ে আসে, সদলে টেনে, ঘুরিয়ে, এর সাথে জলে ডুবে। আয়োনিয়ান প্রজেক্টের ড. জোয়ান গোন ( যে প্রজেক্টটি Tethys Research Institute এর ফান্ডিং এ পরিচালিত) বলেন, ডলপিনরা তাদের বাছুরকে কয়েকদিন বহন করে, একবার তারা শিশুটিকে প্রাণপণে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করে এবং সেখানেই অবস্থান করে যতক্ষণ না মৃত বাছুরটি ডুবে না যায়।
 
 
 
 
 
এখান থেকে তিনি হাইপোথিসাইড করেন যে, একজন মা তার সন্তানকে মৃত্যুর পরও কয়েকদিন রেখে দেন, এর কারণ বাছুরটি নবাগত। আর এ জন্য মৃত্যু ছিলো অপ্রত্যাশিত ও আকষ্মিক।  এখান থেকেই মা দীর্ঘ সময় শোক পালন করে। একটি শিশুকে মৃত্যুশয্যায় সে প্রাণপণ বাঁচানোর চেষ্টা করে, তাকে ভাসানোর চেষ্টা করে কিন্তু যখন বাছুরটি মারা যায়,  তখন তার মস্তিষ্কে এক রকম রিলিফ কাজ করে! অজস্র প্রাইমেট রয়েছে যারা তাদের সন্তানের মৃত্যুর পরও তার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেনা। মা লাশটিকে দিনের পর দিন কোলে পিঠে করে ঘুরে বেড়ায়, তার ব্রেন বিশ্বাস করতে পারেনা যে তার সন্তান মারা গেছে, একটা সময় উত্তাপে সে মমি হয়ে যায়, শুধুমাত্র তাদের স্কেলিটন অথবা মেরুদন্ডটাই অবশিষ্ট থাকে! প্রাইমেটদের মধ্যে এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা! আমরা যদি প্রাইমেটদের সাইকোলজি বিশ্লেষণ করি তবে আমাদের কাছে এটা পরিচ্ছন্ন হয়ে যায় যে কেনো মিশরের পিরামিড তৈরি হয়েছে, আর কেনোই বা সেপিয়েন্সদের মধ্যে মমি তৈরি করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু অল্পকিছু প্রাইমেট আছে যারা মৃত্যুর প্রতি রেসপন্স করে লাশকে বুকে জড়িয়ে ধরে, তাদের দাত পরিস্কার করে, ভদ্রভাবে তাদেরকে স্পর্শ করে এবং উচ্চস্বরে কান্না করে, এমনকি যারা কেনিভাল বা নিজের মাংস নিজেরাই খায় তারাও…!
 
 

মৃত্যুশোক জন্ম দেয় পিরামিডের

 

 

 

মৃত্যু একটি সামাজিক ঘটনা যা সামাজিক প্রাণীদের ক্ষেত্রেই ঘটেঃ

ম্যাক্সপ্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট এর ড. এডউইন ভ্যান লিউইন বলেন, যখন আমি দেখি যে নোয়েল তার মৃত দত্তকপুত্রের দাঁত পরিস্কার করছে, এটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হলো। তিনি বলেন যে এ ধরণের আচরণ শুধুমাত্র সোশ্যাল ডায়মেনশন থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি আরো  বলেন, আমার মতে, মৃত শরীরের সাথে তারা এটা করে সামাজিক বন্ধন প্রকাশ জন্য। মৃত্যু সামাজিক জীবের জন্য অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা। যখন অনেক ম্যাচিউর কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করে,  তখন সামাজিক বন্ধন পূনরায় সংস্কার করতে হয়। অথবা হয়তো সমস্ত গ্রুপটিই  সমগ্রিকভাবে মায়ের চরিত্রে সে শিশুটির মৃত্যুতে রেসপন্স করে, এটি সামাজিক কোহেসন বা ঐক্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমাদের মতে,  স্তন্যপায়ী প্রাণীর সোসাইটি হলো টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এজন্য এ সমস্ত সমাজে সামাজিক সম্পর্ক ও ঐক্যের মাধ্যমে গঠিত কাল্পনিক সমাজ ব্যবস্থাকেও একটি জীবন্ত শরীর বা কর্পোরেসন হিসেবে দেখার মানসিক প্রবণতা সৃষ্টি হয়। অতএব সমাজের কারো মৃত্যু মানে, একটি সামাজিক দেহের ভেতর কোন একটি অঙ্গেরই মৃত্যু। কারণ সম্পূর্ণ সমাজটাই ব্যক্তির টিকে থাকার পেছনে ভূমিকা রাখে ঠিক যেমনি ব্যক্তির শরীরের একটি অঙ্গ তার টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে! আর এ জন্যেই আমরা প্রাইমেটদের মধ্যে দত্তক সন্তানের মৃত্যুর পর দাঁত পরিস্কার করে দেয়ার প্রবণতা দেখি, এটা মূলত উচ্চমাত্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের টিকে থাকার যন্ত্র সমাজিক ঐক্যেরই একটি প্রতিফলন, যেখানে সমাজ জীবন্ত ব্যক্তির মতো একজন মৃত প্রাণীর পাশে দাঁড়ায়।
 
যদি শোক এমনকিছু হয় যা উচ্চমাত্রিক সমাজের প্রাণীদের মাঝে দেখা যায় এবং বিশেষ করে দেখা যায় সে সব ব্যক্তিদের মধ্যে যারা আত্মীয়তার দিক থেকে একে অন্যের নিকটবর্তী তবেই আমরা বুঝতে পারি কেনো এটি বিবর্তিত হয়েছে । শোক এসেছে “The idea of Loss” থেকে, ডঃ গাঞ্জালভো বলেন। বুদ্ধিমান প্রাণীদের ব্রেনকে এটা প্রসেস করতে হয়। আবার Layan বলেন, Grief is Price we pay for love! আমরা প্রায়শ দেখি বিবর্তনীয়ভাবে আমরা উপকারী কোন বৈশিষ্ট্য অর্জন করলেও তার সাথে একটি ক্ষতিকর প্রভাব জড়িত থাকে। যেমন- আমরা আজ থেকে ৭০,০০০ বছর পূর্বে বড় মস্তিষ্কের কারণে যদিও উন্নত মাপের চিন্তা করতে সক্ষম হয়েছি, আর তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্ট নিয়ে আজকের এ সিভিলাইজেশন ০.৭ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি কিন্তু এটাও ঠিক যে এ বড় মস্তিষ্কটিকে সচল করার জন্য আমাদের শরীরকে অজস্র শক্তি খরচ করতে হয়েছে, আমাদের পেশি ক্ষয় হয়েছে!
 
আমরা জানি ভালোবাসা আমাদেরকে সামাজিক ফেব্রিকের কাছাকাছি রাখে, সমাজের মানুষকে একই ফেব্রিকের ভেতর থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সাহায্য করে , দুজন মানুষ প্রজননের জন্য ভালোবাসার সম্পর্কেই আবদ্ধ হয়। কিন্তু এত শক্তিশালী একটি উপযোগীতার জন্য আমাদেরকে দন্ডও দিতে হয় আর তা হলো ভালোবাসার মানুষের মৃত্যুর শোক… প্রশ্ন হলো, কেনো?
 
এক্ষেত্রে আমার একটি প্রস্তাবনা আছে। আমার মতে মিচিও কাকুর স্পেস-টাইম থিওরি অব কনসাসনেস দিয়ে মৃত্যুশোক ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মিচিও কাকু বলেন, Consciousness is the Process of creating Model of the world using multiple feedback loops in various Parameters (e.g Temperature, space, time and in relation to others), in order to accomplish a goal( e.g Find mates, Food, Shelter)। কাকু তার future of the mind গ্রন্থে লেখেন, মানুষের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স প্রতিনিয়ত ফিউচারকে সিমুলেট করছে, সে অজস্র বিকল্প ভবিষ্যত ঘটনাকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে সিমুলেট করে পূর্ব থেকেই তার ভবিষ্যত আউটপুট নির্ণয় করার চেষ্টা করছে, যেনো সে সফলতার সাথে ভবিষ্যতে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে! যেমন- আমরা দেখি যে শিশুরা বড়দের জগত বুঝেনা, কারণ বড়দের জগত খুবই কমপ্লেক্স, এ জন্য শিশুরা বড়দের জগতের সিম্পল ভার্সন নিয়ে পড়ে থাকে, যেমন- তারা ছোট ছোট বাস, ট্রাক, বিমান অথবা পুতুল নিয়ে খেলে। শিম্পাঞ্জির বাচ্ছাদের মধ্যেও খেলার মানসিকতা দেখা যায়। মেয়েরা ছোটকাল থেকেই গাড়ি বা গোড়ার তুলনায় পুতুল বা হাড়ি পাতিলকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। এখন প্রশ্ন হলো, কেনো শিশুরা সহয সরল ব্যাপারগুলো নিয়ে পড়ে থাকে? একজন সেনাপতি যুদ্ধ করার পূর্বে কাগজের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের নকশা এঁকে যেমন যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো সহযভাবে বুঝতে চায় ঠিক তেমনি হতে পারে, শিশুরাও খেলাধুলার মাধ্য দিয়ে বড়দের কমপ্লেক্স জগতটাকে সহয সরলভাবে সিমুলেট করে বুঝতে চায়। আর এভাবেই তারা বড়দের আচরণগুলো শেখে। কৌতুক বললে আমরা হাসি! কিন্তু কেনো? এর উত্তর হলো, কৌতুকের যে ভবিষ্যত আউটকাম সেটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত! আপনি যখন কাউকে একটি জোক্স বলবেন, তখন তার মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স আপনার জোক্সটাকে সিমুলেট করে এর সম্ভাব্য ভবিষ্যত বোঝার চেষ্টা করবে কিন্ত যখন এমন কোনো আউটকাম আসে যার সাথে তার মস্তিষ্কের সিমুলেশনের কোনো মিল নেই, তখন সে  হেসে উঠে! কারণ স্পেস-টাইম থিওরি অব কনশাসনেস অনুসারে, মানুষের ব্রেন ফোর্থ ডায়মেনশন বা সময়কে বুঝে, তারমধ্যে Sense of tomorrow রয়েছে, আর তাই আপনি যখন তাকে কোন একটি গল্প শোনাবেন, তখন সে গল্পের পরের অংশটি কেমন হবে তার একটা আউটকাম বের করার চেষ্টা করবে, সেই আউটকাম কখনো তার সাথে মেলে আবার কখনো একদম মেলেনা!
 
 
এবার মনে করুন, আপনি একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছেন, আপনার জিন তার অনুলিপি তৈরির জন্য আপনার মস্তিষ্কে ঐ মেয়েটার প্রতি মোহ ও ভালোবাসার প্রবণতা তৈরি করে রেখেছে। স্পেস-টাইম থিওরি অব কনশাসনেস অনুসারে, সমাজে যাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক আছে, আমরা আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তাকে নিয়ে মনে মনে অনেক কল্পনা তৈরি করি, আমাদের ব্রেন ফোর্থ ডায়মেনশনের ভেতর দিয়ে আগামীকালকের সম্ভাব্য বাস্তবতাগুলোকে সিমুলেট করে। আপনি কল্পনা করবেন, তাকে কোন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবেন, কিভাবে প্রপোজ করবেন, কিভাবে সেক্স হবে এবং অবশেষে কিভাবে সন্তান জন্ম দেবেন আর সন্তানের নামই বা কী হবে! এভাবে আপনার ব্রেন তাকে নিয়ে একটি ফিউচারের মডেল সিমুলেট করে ফেলবে, আর এ মডেলটা সিমুলেট করতে তার বিপুল পরিমাণ সময় ও শক্তি অপচয় হবে। এখন আকষ্মিক ঐ মেয়েটি যদি গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়, তবে আপনার মস্তিষ্কের Future Simulation এর সাথে Real World এর আউটকাম কলাপ্স করবে, আপনার সিমুলেশন ভেঙে যেতে চাইবে, আর এখান থেকে মস্তিষ্কের ভেতর এক প্রকার ভায়োলেন্স তৈরি হবে, মস্তিষ্কের ভেতরের ফিডব্যাক লুপের ভেতর অসঙ্গতি দেখা দেবে, আপনার ব্রেন এ বিষয়টি মেনে নিতে চাইবেনা, কারণ তার মধ্যে তৈরি হওয়া সিমুলেশন এখনো নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলছে, যে মডেলটি সিমুলেট করতে আপনি বছরের পর বছর সময় খরচ করেছেন, আকষ্মিক সেই মডেলের পতন আপনার ব্রেন মানতে পারেনা! আসলে ব্রেন বিশ্বাসই করেনা যে তার সিমুলেশনের একটি উপাদান স্লাইডিং করেছে! আর তাই একজন ব্যক্তি মারা গেলেও তাকে কেন্দ্র করে তৈরি Future Simulation এর মৃত্যু হয়না, আর এখান থেকেই দেখা যায় একজন ব্যক্তি তার প্রিয়জনকে অনেক যত্ম করে দাপন করে, পুষ্প অর্পন করে, মোমবাতি জ্বালায়, তার জন্য উপাসনা করে এবং এমনকি তারা অনেক সময় কবরের পাশে সকাল ও সন্ধ্যা সময় কাটায়! আমরা জানি, যে ডলপিন, তিমি ও প্রাইমেটদের বুদ্ধিমত্তা উচ্চমাত্রিক, তাদের ব্রেনেও হয়তো একপ্রকার সিমুলেশন কাজ করে! যে সকল প্রাণী মৃত দেহের প্রতি অত্যধিক রেসপন্স করে, আমার মতে তাদের ব্রেনেও কিছু না কিছু মাত্রায় Sense of Tomorrow আছে!
 
 
 
যদি অন্য প্রাণীদের মধ্যে Sense of Tomorrow নাও থাকে তবুও আমরা মৃত্যুশোককে ব্যাখ্যা করতে পারি। রিচার্ড ডকিন্স তার The Extended Phenotype গ্রন্থে শামুকের একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন। শামুকের শরীরে একপ্রকার ফ্লুক সংক্রমিত হয় , যারা শামুকের শরীরটিকে তার টিকে থাকার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। আবার শামুকের শরীরের ভেতর যে জিনগুলো আছে সে জিনগুলোর উদ্দেশ্যও কিন্তু শামুকের দেহটিকে ব্যবহার করে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করা! তারমানে দেখা যাচ্ছে, এখানে শামুক একটি হোস্ট মাত্র! তার নিজস্ব কোন ভূমিকা নেই, তার জন্য কোন একটি পরিস্থিতি নির্বাচন করার! ফ্লুক হলো প্যারাসাইট যারা শামুকের দেহে বাহির থেকে এসেছে, জিনও প্যারাসাইট কিন্তু তারা শামুকের দেহের ভেতর একত্রিত হয়ে এই দেহটিতে সংঘটিত হয়েছে, একে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করার জন্য। শামুকের জিনগুলো খুবই co-operative কারণ তারা শামুকের ডিম্বানু ও শুক্রানুর ভেতরই পরবর্তী প্রজন্মে যায়। মানুষের সমাজে এই co-operation কে ধর্ম ও মানবতা বলে আখ্যায়িত করা হয়! মানবতাবাদীরা যেমন মানবতাবাদ নামক একটি কনসেপ্টের উপর ভর করে দলবদ্ধ ও মানবিক হয় ঠিক তেমনি শামুকের জিনগুলোও নিজেদের কপি করার জন্য শামুক নামক ক্ষণস্থায়ী একটি দেহের ভেতর কিছুক্ষণের জন্য স্থিতিশীল হয়। শামুক যাতে সঠিকভাবে টিকে থাকতে পারে এ জন্য এ জিনগুলো শামুকের দেহে প্রয়োজনীয় প্রকৌশল প্রয়োগ করে। কিন্তু ফ্লুক যদিও শামুকের শরীরে সার্ভাইভ করে কিন্তু তারা শামুকের জিনের মতো সেই দেহটার শুক্রানু বা ডিম্বানু ব্যবহার করে বংশবৃদ্ধি করেনা! এ জন্য শামুকের শরীরের প্রতি তার জিনের যতটুকু দায়িত্বশীলতা ( মানবতা) ফ্লুকের ঠিক ততটুকু দায়িত্বশীলতা নেই! আমরা জানি যে শামুকের শরীরের ভেতরের জিনগুলো একত্রিত হয়েছে কারণ Cooperation এর মাধ্যমে কাজ করলে তারা ফিউচার জেনারেশন তৈরি করতে পারবে! একা তাদের পক্ষে সার্ভাইভ করা সম্ভব না। মনে করুন, এ জিনগুলো একটি নির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিকতার ভেতর দীর্ঘদিন কাজ করে এসেছিলো, আকষ্মিক তাদের একটা দল  দূর্বল হয়ে গেলো , তাহলে তাদের এত মিলিয়ন বছরের কর্মের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে, এ ভাঙনের ফলে তাদের ভেতর একটি চাপ সৃষ্টি হবে, এ চাপটাকেই আমরা নিন্মশ্রেণীর প্রাণীদের শোক বলে চিহ্নিত করতে পারি! মূলত, আমি মনে করি নিচু শ্রেণীর প্রাণীরা শামুকের শরীরের জিনগুলোর মতোই,  যখন তাদের ধারাবাহিক কর্ম প্রক্রিয়ায় আঘাত লাগে তখন কিছুটা অস্থির হয়ে যেতে পারে, তারা ধাক্কাটা সামলে আগের গতিতে সামনে যেতে পারেনা, গতি স্থির হয়ে যায় কারণ তাদের একটি শক্তি কমে গেছে আর এ জন্য তারা যতদিন নতুন শক্তি জোগাড় করতে পারছেনা , ততদিন তারা  শোক পালন করবে! কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা আসলেই কোনো সঙ্গীর দুঃখ্যে এমন হয়ে গেছে, তারা মূলত এ পরিবর্তনটা বুঝতে সময় নেয়, নিজের ব্রেনকে মোডিফাই করে, আর এজন্য প্রয়োজন একাকীত্ব ও মানসিক শক্তি।  তারা একা হয়ে যায়, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়, নিজেদেরকে পরিবেশের সাথে সমন্বয় করে নেয়ার উপায় অনুসন্ধান করে!
 
আমরা স্পেস-টাইম থিওরি অব কনশাসনেস অনুসারেও দেখেছি, শোক হলো ভালোবাসার দন্ড! আর্চিওলোজিক্যাল সাইটগুলো আমাদের দেখিয়েছে যে, ১০০,০০০ বছর পূর্ব থেকেই, আমরা গিরিমাটিতে মৃত মানুষের ছবি অংকন করছি, সমস্ত বিশ্বজুড়ে মৃত মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিষ্ময়কর সব রিচুয়াল, অন্তুষ্টিক্রিয়া থেকে শুরু করে কবরস্থান, সজ্জিত কফিন থেকে পিরামিড, তোরাজানদের বিষ্ময়কর অনুষ্ঠান যারা মমিফায়েড লাশের সাথে এক সপ্তাহ বাস করে।
 
 
 
 
 
৬’ই নভেম্বর ২০১৮ সালে দি কনভারসেশনে Why everyone should know their attachment Style নামক একটি লিখা প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয় মানুষের উত্তেজনা, ডিপ্রেসন ও সম্পর্ককে Attachment থিওরি দ্বারা ব্যখ্যা করা যায়। এ তত্ত্বটি ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট জন বোলবি উন্নত করন। এ তত্ব আমাদের বলে কিভাবে হিউম্যান ব্রেন তার পরিবেশের সাথে টিকতে ও নিজেকে উন্নত করতে বিবর্তিত হয়েছে।
 
 
আমরা সবাই জানি যে, একটি শিশু যখন একা ঘরের বাহিরে যায়,  প্রতিটি বাবা মা প্রতিবাদ করে। এ আচরণটি বিবর্তিত হয়েছে লাখ লাখ বছর পূর্ব থেকেই কারণ একজন শিশু একা বাহিরে যাওয়ার অর্থই শিকারী প্রাণীর কবলে পড়া বা পানিতে ডুবে মরার সম্ভাবনা। আমাদের আদিম শিকারী সংগ্রাহক জীবনে এমন অজস্র ঘটনা ঘটেছিলো।  যে স্মৃতি এখনো জেনেটিক লেভেলে রয়ে গেছে, আর এ জন্য আমরা দেখি বাবা- মায়েরা সবসময় তাদের সন্তানের কাছাকাছি থাকে ! বাবা-মায়ের আচরণ ঠিক এভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সুদূর অতীতে  যদি এমন হতো যে কোনো একটি শিশুর বাবা-মা যদি ফিরে আসতে ব্যার্থ হয়েছে ,  তবে তাদের সন্তান একাকীত্ব ও হতাশাবোধ করে! শোক তত্বের গুরু Colin Murry Parker শোক ও এ আচরণের মধ্যে একটি মিল খুঁজে পান!
 
মূলত প্রতিটি শিশুর মস্তিষ্ক এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে,  তারা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে পছন্দ করবে, কারণ তাদের সঙ্গ ছাড়া প্রতিকূল পরিবেশে তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আবার পিতা-মাতার মস্তিষ্কও এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যেনো তারা শিশুদের পাশাপাশি থাকে কারণ নয়তো শিকারী প্রাণী থেকে তাদের সন্তানকে রক্ষা করা সম্ভব নয়! লক্ষ লক্ষ বছর পূর্ব থেকেই সেপিয়েন্সদের মধ্যে এ মানসিকতা কাজ করছে, প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রাকৃতিক নির্বাচন এ মনস্তত্ব তৈরি করেছে। এটা এমন কোন প্রোগ্রাম নয় যে আমরা বড় হওয়ার পর চাইলেই মুছে ফেলতে পারবো, এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি এলগোরিদম! আর তাই সন্তান বড় হওয়ার পর যখন মা-বাবা মারা যায় , সে তখনও তার লক্ষ লক্ষ বছর অতীতের সেই সহযাত প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনা, সে তখনও তার চারপাশে বিপদ দেখে, তার মনে হয়,  বাবা-মা চলে যাওয়ার অর্থ হয়তো সে  কোন মহাসংকটে পতিত হয়েছে, যদিও কোনো  বাঘ বা  সিংহের ভয় নেই, তার আর্থিক অবস্থাও একদম ঠিক আছে কিন্তু তবু্ও তার মন কিছুইতেই মানতে চায়না কারণ তার মস্তিষ্কের বিবর্তন ঘটেছিলো লাখ লাখ বছর অতীতে যেখানে মা-বাবা ছাড়া সন্তানের পক্ষে সার্ভাইভ করা অসম্ভব, তখন তার চারপাশে ছিলো বিপজ্জনক পরিবেশ ও বিপজ্জন সব প্রাণী! যেকোনো সময় তাকে সে হিংস্র প্রাণীগুলো খেয়ে ফেলতে পারতো ! ঠিক এ কারণেই আমরা এখনো বাবা-মায়ের মৃত্যুকে অশুভ মনে করি, নানানরকম দুঃস্বপ্ন ও বিপদের সম্ভাবনা দেখি, মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নানান ধর্মীয় আচরণ পালন করি কারণ আমাদের ডিএনএ এখনো লাখ লাখ বছর অতীতের হিংস্র প্রাণীদের মনে রেখে দিয়েছে, সে এখনো অবচেতনে সে জগতেই বাস করে। মৃতকে কেন্দ্র করে যেসব  সংস্কার , আসলে এসব ধর্মীয় সংস্কার আসে আমাদের লাখ লাখ বছর পূর্বের সেই আদিম প্রিয়জন  হারানোর ভয় থেকে! এটি যখন চুড়ান্তে পৌঁছে তখন হয়তো শিম্পাঞ্জির মতো যেকেউ সুইসাইডও করে!
 

শোকের বিজ্ঞানঃ

Bareavment Counsellor and Researchers হিসেবে মিশেল কিশেল বলেন, আমি আমার ক্লায়েন্টদের মধ্যে দেখেছি, তারা প্রথমে কান্না করে, তারপর হতাশ হয় আর একটা সময় বুঝতে পারে তাদের ভালোবাসার মানুষ আর ফিরে আসবেনা। শোক একটি মানসিক অভিজ্ঞতা মাত্র। এর সাইকোলজিক্যাল এফেক্ট রয়েছে। এটি Stress hormone cortisol এর মাত্রা বাড়িয়ে তোলে, এখান থেকে আমি বুঝতে পারি কেনো আমার ক্লায়েন্টদের প্যানিক এটাক হয়। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদেরকে শোকের বাস্তব ছবি দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এমআরই স্ক্যান দেখিয়েছে, আমরা যখন কাউকে ভালোবেসে কথা বলি তখন আমাদের মস্তিষ্কের Nucleus Accumbens , Light up হয় এবং ঠিক একই এরিয়া উদ্দীপিত হয় যখন আমরা কাউকে হারিয়ে শোক বোধ করি। তার মানে এমআরআই’তে দেখা যাচ্ছে শোকের সাথে নিউরোলজিক্যালি ভালোবাসার সম্পর্ক আছে।
 
 

আমরা কেনো শোকে পাথর হয়ে যাই?

 
 
 
কিন্তু আমরা কেনো শোকে পাথর হয়ে যাই? কেনো ডিপ্রেসনে আক্রান্ত হই? কেনো নিজেদেরকে সমাজ থেকে আলাদা করে ফেলি? ইভল্যুশনারী বায়োলজিস্টরা বলছেন, শোকে পাথর হওয়ার কারণ ডিপ্রেসন। এ নিয়ে আমি সায়েন্টিফিক আমেরিকানের একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেছি ” ডিপ্রেসন” শিরোনামে। মূলত, আমরা যখন ডিপ্রেসনে থাকি তখন মস্তিষ্কের অর্বিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স নিরবিচ্ছিন্নভাবে ফায়ার হয়, আর শোকগ্রস্ত রোগীদের নিউক্লিয়াস একুম্বেন্সও লাইট আপ হয়। মস্তিষ্কের এ দুটি অংশে নিরবিচ্ছিন্ন ফায়ারিং এর জন্য শক্তি প্রয়োজন, আর সে শক্তির জন্য আসে দেহ থেকে। তাই শোকগ্রস্থ ব্যক্তিরা ব্রেনকে শক্তি দিতে যেয়ে ফিজিক্যালি দূর্বল হয়ে উঠে। দূর্বলতার কারণে তারা কারো সাথে মেশেনা, কথা কম বলে কিন্তু আবার তাদের খাওয়ার পরিমাণও কমে যায়! Depression’s Evolutionary Root নামক একটি আর্টিকেলে পল এন্ড্রো ও জে এন্ডারসন ও  থমসন ২০০৯ সালের ২৫ শে আগস্ট লিখেন, ডিপ্রেসন আক্রান্ত ব্যক্তিরা একটি সমস্যাকে অজস্র বিন্দুতে ভাগ করে আর তারপর সবগুলো বিন্দু মিলিয়ে সমস্যাটি সমাধান করে৷। এ জন্য তাদের ব্রেনে নিরবিচ্ছিন্ন শক্তি প্রয়োজন। তাই তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে যেনো কারো সাথে কথা বলে তাদের সময় ও শক্তি নষ্ট না হয়। তারা কম খায়, কম ঘুমায় এবং সেক্স করতে চায়না। কারণ তারা যদি খাবার চিপায় বা সেক্স করে তবে তাদের এনার্জি লস হবে, আর তাদের ব্রেনের অর্বিটোফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিরবিচ্ছিন্ন ফায়ারিং বন্ধ হয়ে যাবে, তারা কোনো ডিসিশনে আসতে পারবেনা! আমি পূর্বেই বলেছিলাম যে আমাদের ব্রেন প্রতিনিয়ত ফিউচার সিমুলেট করছে, আর যখন তার কোন রিলেটিভ মারা যায় তখন এই সিমুলেশন কলাপ্স করে আর এতে করে ব্যক্তি ডিপ্রেসনে চলে যায় , যাতে করে সে তার মানসিক মডেলটিকে রি-ইঞ্জিনিয়ার করতে পারে! এ সময় তাকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করতে হয়, এ জন্য তার প্রয়োজন শক্তি। আর শক্তি বাচাতেই সে সামাজিক দূরত্ব, খাবার ও যৌনতা থেকে দূরে থেকে। এ সময়টিতে একজন ব্যক্তি নিজের জীবনকে ভিন্নভাবে প্রোগ্রাম করে এবং নতুন কোনো সঙ্গীর সাথে প্রজনন ও বংশবিস্তারের জন্য প্রস্তুত হয়! আর এছাড়া মৃত লাশকে কেন্দ্র করে কান্নাকাটি ও হতাশা প্রকাশের মাধ্যমে তাদের পরিবার এবং গোষ্ঠী এক বিন্দুতে চলে আসে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হয়।
 
APA Psycnet নামক ( American Phychological Association) একটি জার্নালে Psycho-Social transition ; A field For study নামক একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। সেখানে শোকের ব্যাখ্যায় Assumptive World নামক একটি তত্ব প্রস্তাব করা হয়। সেখানে বলা হয়, আমরা শুধু মৃত মানুষের জন্যই শোক প্রকাশ করিনা। আমরা রেডিও, টেলিভিশন ও কম্পিউটার নষ্ট হয়ে গেলেও শোক প্রকাশ করি। মূলত, কোনোকিছু হারানোর পূর্বে আমাদের জগত একরকম থাকে আর কোনোকিছু হারানোর পর আমাদের জীবন দুটি জগতে ভাগ হয়ে যায়। আমরা এতদিন যে জগতটিকে কল্পনা করে এসেছিলাম, যে জগত আমাদের পরিচিত ছিলো, সে জগতের সাথে সাম্প্রতিক জগত সরাসরি কন্ট্রাডিক্ট করে। আমরা যখন কাউকে হারাই তখন শুধুমাত্র আমরা একা হয়েই যাইনা, আমাদের কল্পনার ভেতর অস্তিত্বশীল পূর্বের জগতটিকে হারিয়ে ফেলি! কিন্তু সময়ের সাথে আমরা নতুন এ জগতটির সাথে নিজেদের সমন্বয় করে নিতে পারি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমি মিচিও কাকুর স্পেস-টাইম থিওরি অব কনশাসনেস অনুসারে, শোকের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছি তার সাথে APA এর Assumptive World তত্বের মিল রয়েছে! আসলে অনেক সময় শোক তৈরি হয় আমাদের মস্তিষ্কের সিমুলেশনের সাথে বাস্তব বিশ্বের ফলাফলের অসঙ্গতি থেকে…!
 
 

তথ্যসুত্র-

 
 
 
 
 
 
 
 

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!