জানা যায় ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ প্ল্যানচেট করে ভিন্ন মাত্রিক জগতের চেতনার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।। ভারতীয় উপমহাদেশের এমন সংবেদনশীল একজন ব্যক্তি প্যারানরমাল রিয়েলিটির প্রতি আসক্ত ছিলেন, এটা ভাবতেই কেমন যেনো একটা খটকা লাগে? কালের শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্ক স্যার আইনস্টাইনের সাথে যিনি কথা বলার অনবদ্য সুযোগ পেয়েছিলেন! তাঁর মতো মানুষ প্ল্যানচেট করে এক্সট্রা ডায়মেনশনাল সত্তার সাথে কথা বলতেন এটা শোনার পর অতি-বাস্তবের প্রতি এক প্রকার কৌতুহল জন্ম নেয়, এমনকি আমাদের মতো কাঠখোট্টা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের মনেও! কথিত আছে হুমায়ুন আহমেদও প্ল্যানচেট করে মৃত আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন। প্ল্যানচেট ব্যাবহার করে তিনি বেশ বিপদেও পড়েছেন বলে জানা যায়। কে জানে! প্লাঙ্কের ওপারে হয়তো কিছু একটা আছে! রবীন্দ্রনাথের দেশ-কালহীন বিশ্বজনীন চেতনার মাঝেই বুঝি সব আত্মার বসবাস!
কিন্তু প্ল্যানচেট ব্যাপারটা আসলে কী? আর রবীন্দ্রনাথই কেমন করে এমন অদ্ভুত এক পদ্ধতিতে মৃত আত্মা ডেকে নিয়ে এসেছিলেন? ব্যাপারটা খুবই কৌতুহল উদ্দীপক! আমার এখন নিজেরই ইচ্ছে করছে প্ল্যানচেট করে বিশ্ব কবিকে ডেকে নিয়ে আসি আর আমার বন্ধু নিনিষের মতো বলি; কী রবীন্দ্রনাথ? কেমন আছিস? শুনেছি, তুই নাকি প্ল্যানচেট করে একবার ভূত নামিয়েছিস? অথবা হুমায়ুন আহমেদকে বলি- এই যে হিমু! তোর পরী ভালো আছে তো? নিনিষের সেদিনের প্ল্যানচেট অনুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম! ফিটফিট করে তাকিয়ে ছিলাম “ওইজা বোর্ডের” দিকে! কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো রবীন্দ্রনাথ তাকে কোন সদুত্তর তো দেয়নি, রাগে গদগদ করতে করতে ঠাকুর সাহেব তাকে “রাবেশ” বলে হারিয়ে যায়! এরপর প্ল্যানচেট শেষ! একজন রবি ভক্ত চটে গিয়ে তার ঘাড়ের উপর বসিয়ে দেয় কয়েকটা ঘুষি! এরকম বিশ্বমাপের ব্যক্তিকে প্ল্যানচেটে ডেকে নিয়ে এসে তুই তুকারি করার মানেটা কী! শত হোক রবি ঠাকুরের মহাজাগতিক মন( Universal Mind) বলে কথা! আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি উনাকে এভাবে সম্বোধন করলে কেন? আর একটু সুন্দরভাবে কথা বলা যেত না? কৌতুহল উদ্দীপক ছেলেটি বলে কি, সে নাকি আইনস্টাইন বা ম্যাক্স প্লাঙ্ক এলেও তাকে তুই তুকারি বলেই সম্বোধন করতো! যাচ্ছেতাই!
যাক, বাদ দেই সেসব কথা! আমিও আর কথা বাড়াইনি! কথা বাড়ালে কোয়ান্টাম ফিজিক্স অথবা ম্যানি মাইন্ড থিওরি থেকে হয়তো কিছু কথা শুনিয়ে দিত! বলতো, কোয়ান্টাম ম্যানিওয়ার্ল্ডের কোন না কোন একটিতে আমি আর রবীন্দ্রনাথ দুজন একে অন্যের প্রাণের বন্ধু, একে বারে গলাগলি বন্ধুত্ব যাকে বলে ! কোন একটিতে আমি রবি বাবুর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পের সাথে ছুটিয়ে প্রেম করছি এবং রবি বাবু দুঃখিত চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে! আহ.. কি মায়া ছেলেটার চোখে! হয়তোবা, অন্য কোন প্যারালাল ইউনিভার্সে দুজন দুজনের গলা জড়িয়ে শুয়ে আছি! রবীন্দ্রনাথ একজন Gay Man আর আমি লোকচক্ষুর অন্তরালে তার সাথে গভীর প্রণয়ে আবদ্ধ হয়েছি!
সর্বনাশ! একুশ শতকের ছেলেপেলে বলে কথা, গুগল বা ফেসবুকের মতো এতটা ধর্ম বা নৈতিক অনুভূতি নিয়ে চলার সময় কোথায়? তার মতে আজকাল নাকি গুগল ও ফেসবুকও ধর্মীয় অনুভূতি মেনে চলে! যাকগে! যা বলছিলাম!! প্ল্যানচেট নিয়ে আমার আগ্রহ দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেলো!
রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেট নিয়ে জানতে গিয়ে একসময় প্রবীর ঘোষের অলৌকিক নয় লৌকিক গ্রন্থের একটি খন্ড পড়তে শুরু করি! প্রবীর সাহেব ছন্দে ছন্দে কথা বলতে ভালোবাসেন! এমন একটা ভাব যেনো জগতের সব প্যারানরমালের গোষ্ঠী তিনি একাই উদ্ধার করে ছাড়বেন! অবশেষে, প্ল্যানচেট সম্পর্কে পড়তে গিয়ে জানতে পারি, রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় বন্ধু সন্তোষচন্দ্রের দেহহীন আত্মার সাথেও একদা কথা বলেছিলেন । মিডিয়াম ছিলেন উমাদেবী! উমাদেবীর মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতর ভাইরাসের মতো সন্তোষচন্দ্র প্রয়াত আত্মা ঢুকে পড়ে! আর তারপর তার পেন্সিলে ভর করে শুরু হয় মহান কবি তথা আমাদের বিশ্বকবির সাথে সংক্ষিপ্ত এক আলোচনা । কিছুদিন পূর্বে নোমচমস্কির সাথে রিপনের যেমন আলোচনা হয়েছিল আর কি! অনেকটা সেরকম কিছু !
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তুমি ওখানে কি কাজে প্রবৃত্ত হইয়াছো?
সন্তোষচন্দ্র- আমি একটা বাগান তদারকি করি! কিন্তু সে পৃথিবীর ফুল বাগান নয়!
যাক, আমি এতটুকু শুনেই একেবারে থমকে গেলাম! সে একটা বাগান দেখাশুনা করে কিন্তু সেটা পৃথিবীর ফুলের বাগান নয়! তবে, ভাই সেটা কী? কীসের বাগান? ফুলের বাগান কিন্তু আবার ফুলের বাগান নয়, এটা কোন কথা হলো! নাকি আত্মা বিশ্বকবির সাথে ঠাট্টা করছে!
রবীন্দ্রনাথ শীতল গলায় সুরেলা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে যেমন গাছপালা থাকে, সেকি সেইরকম?
সন্তোষচন্দ্র- একটি গাছের আত্মার একটি বিশেষ ফুল ক্রমেই শুকিয়ে উঠছে! পেন্সিল এভাবে দিয়ে যাচ্ছে উমাদেবির হাতের স্নায়ুতন্ত্র বেয়ে একের পর এক উত্তর!
আমি তো এবার একেবারে হতাশ! গাছের নাকি আত্মা আছে? আত্মার নাকি একটা ফুল শুকিয়ে গেছে, এটা কোন সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষের কথা ! এরকম একজন বিশ্বমাপের ব্যক্তিকে ১৯২৯ সালের সেইদিন এ ধরনের আরও বহু আজগুবি প্যারানর্মাল কথাবার্তা গিলতে হয়েছিল! শুধু কী তাই! আমাদের এ মহান কবি নভেম্বরের ৬, ২৮,২৯ এবং ১৬ ডিসেম্বর একের পর এক ভূতের সাথে আড্ডার আসর বসাতে থাকেন! চলে তুমুল আড্ডা! তাই বলে আবার ভাববেন না, কবির মাথায় হালকা সাইকোপ্যাথ ছিল।
কবিগুরুর জীবনী গ্রন্থে লেখা আছে, জীবদ্দশায় "স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্ল্যানচেট লইয়া বহুবার পরীক্ষা করিয়াছেন! কখনও কৌতুহলছলে, তো কখনো কৌতুহলবশে!
তবে ভাগ্যের ব্যাপার হলো বেচারা কবি রবি ঠাকুর উমাদেবীর কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেননি। তার উদ্দেশ্য মূলত, প্ল্যানচেট করে আত্মার সাথে যোগাযোগ করা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, খুব শক্ত সবল জোরাল মানুষ বোধ হয় ভালো মিডিয়াম হতে পারে না! এতো গেলো মিডিয়ামের মাধ্যমে প্ল্যানচ্যাট করার এক ঐতিহাসিক ইতিহাস! কিন্ত প্লানচেট জিনিসটা আসলে কী? এটি কত প্রকার? আসলেই কী মৃত আত্মার সাথে আপনি এ পদ্ধতিতে যোগাযোগ করতে পারবেন? এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করার প্রয়োজনীতা বোধ করছি!
হার্ভার্ডের তথ্যমতে, প্ল্যানচেট ফ্র্যান্স শব্দ “Little Planck” থেকে এসেছে। এ জন্য ১৮৫০ সালে যে পদ্ধতি ব্যাবহার করা হতো তা হলো তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল, একটি টেবিল, টেবিলের উপর হৃদপিন্ড আকৃতির বা লাভ রিয়েক্টের মতো এক টুকরো কাঠ, কাঠের দু-পাশে থাকবে বিয়ারিং এর চাকা, মাঝখানে একটি ছিদ্র আর সে ছিদ্রের ভেতর ঢোকানো হবে একটা কলম। কাঠের হৃদপিন্ডের উপর দুজন মানুষ হাত রাখবে। আর বিয়ারিং এর চাকাগুলো ঘুরে ঘুরে খাতার মধ্যে কিছু একটা লিখবে। যেটাকে বলে অটোম্যাটিক রাইটিং!
আর উমাদেবীও অটোম্যাটিক রাইটিং পদ্ধতিতেই কবিকে আত্মার সাথে যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ১৮৫০-১৮৬০ সাল পর্যন্ত ফ্র্যান্স ও ইংল্যান্ডের সর্বত্র এ প্ল্যানচেট পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। বর্তমানে আমরা এটিকে Oija Board বলে জানি। আমার বন্ধু নিনিষের ক্ষেত্রে দেখেছি। প্রায় ৫ জন একত্রিত হয়ে একটি ট্রায়াঙ্গুলার পয়েন্টারে হাত রেখেছিলো, যেটা কাঠের তৈরি হৃদপিন্ডের মতো। তবে এখানে কোন চাকা নেই এবং কলমও আটকানো থাকেনা। আমরা যেমন আয়রন মেশিন দিয়ে কাপড়ে আয়রন করি, অনেকটা তেমন। তবে আয়রন মেশিনের বদৌলে ঐ ট্রায়াঙ্গুলার পয়েন্টার থাকে, যেটির উপর 5 জন ব্যক্তির হাত রাখা হয়। আর এই ট্রায়াঙ্গুলার পয়েন্টারটিকেই মূলত বলা হচ্ছে প্ল্যানচেট! Oiji Board এর উপর ঐ প্লানচেট নামক যন্ত্রটি রাখা থাকে। বোর্ডের টপ কর্ণারে Yes এবং No লিখা থাকে, বোর্ডের সেন্টারে ইংরেজি এলফাভেটগুলো লেখা থাকে, এবং নিচের প্রান্তে লিখা থাকে, Good Bye!

এবার প্ল্যানচেট নামক ঐ পয়েন্টারের উপর হাত রাখুন। যে আত্মার সাথে কথা বলবেন তাকে স্মরণ করুন। আপনাদের সবার হাত একসাথে ওইজি বোর্ডে প্লানচেটকে মুভ করতে থাকবে এবং নিজের অনিচ্ছায়। বোর্ডের বিভিন্ন দিকে এটি ভ্রমণ করবে। একটা সময় মনে হবে, আপনাদের হাতকে টেনে কেউ পয়েন্টারকে এক একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির দিচ্ছে, পয়েন্টার যে অক্ষরগুলোতে ইঙ্গিত করবে সে অক্ষরগুলো সাজাতে থাকুন। আর এভাবে সাজালে আপনি পাবেন এক একটা সেন্টেন্স। আপনি আত্মার ভাষা পড়তে পারবেন। বলতে পারেন, এতো দেখি সাংঘাতিক টাইম মেশিন’ রে বাবা! বুঝতে পারছি না, কেনো মানুষ এ সহজ সিস্টেমটা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে টাইম ট্রাভেল করছে না? যদি ঈশ্বর সত্য হয় এবং তিনি মহাবিশ্বের সর্বত্র উপস্থিত থেকে থাকেন, তবে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সবকিছুই তো তার মধ্যে এ মুহূর্তে উপস্থিত রয়েছে, একেবারে “Singularity point” এর মতো! যা হয়েছে, যা হচ্ছে ও হবে, সবই তার মনের মধ্যে “At Now Present”! যদি এ মুহূর্তে সবকিছুই তার মধ্যে প্রেজেন্ট হয়, তবে সে এ মুহূর্ত থেকে কোনোকিছু এদিক সেদিক মুভ করতে পারবে না! এভাবে চিন্তা করলে, আপনি যদি প্ল্যানচেট করে ভবিষ্যতের কোন সত্তাকে ডেকে এনে হাইপারড্রাইভ প্রযুক্তি প্রার্থনা করেন, তবে ঈশ্বর তো আপনাকে নিষেধ করতে পারবে না!
ঈশ্বর ও আত্মা যদি সত্য হয় তবে, নিশ্চয়ই, আপনি প্ল্যানচেটে আইনস্টাইন, নিউটন, প্লাঙ্ক, হকিং অথবা এমনকি ভিন্ন গ্রহের কোন আত্মাকেও ডেকে নিয়ে আসতে পারবেন! তাই নয় কী? তাহলে আমারা বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে এত পিছিয়ে আছি কেন? প্ল্যানচেট করে আত্মাদের কাছ থেকেই তো আমরা মহান মহান প্রযুক্তিগুলো নিয়ে নিতে পারি! নিকোলা টেসলার আত্মাকে ঢেকে নিয়ে এসে যুগান্তকারী সব প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলতে পারি, তাই নয় কি? ভাবা যায়?
কিন্তু প্ল্যানচেটের সায়েন্টিফিক এক্সপ্লেইনেশন কী? প্ল্যানচেটের অত্যন্ত সাধারণ একটি সায়েন্টিফিক এক্সপ্লেইনেশন রয়েছে। যে রহস্যজনক শক্তি ওউজা বোর্ডকে “Power Gift” করে সেটি ছিল “আইডিওমোটর ইফেক্ট”। এটি মূলত, এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে আপনার শরীর আপনাকে Talk Back করে!
আপনি এ পদ্ধতিতে মূলত আপনার শরীরের সাথে কথা বলতে পারেন। আইডোওমোটর ইফেক্ট হলো এমন একটি মানসিক পরিস্থিতি যেখানে আপনি কোনোকিছু মুভ করতে না চাইলেও সম্পূর্ণ নিজের অনিচ্ছায় আনকনসাসলি সেটি মুভ করতে থাকবেন। মাঝেমাঝে ঘুমের মধ্যে মনে হয়, আমি যেনো ঝাঁকুনি দিয়ে অনেক নিচে পড়ে যাচ্ছি, কোন বিরাট গর্তে, যেটাকে হাইপোনিক জার্ক বলে। যেটি আইডিওমোটর ইফেক্টের সবচেয়ে চরম ভার্সন।
আপনার ব্রেন আপনার শরীরকে সিগন্যাল দেবে কোনপ্রকার সচেতন জাগরণ ছাড়াই মুভ করতে। জাগ্রত অবস্থায়ও এটি ঘটে, যে রিফ্লেক্সিভ মুভমেন্ট আপনি সে সময় তৈরি করেন সেটি হবে খুবই ক্ষুদ্র! ইনফ্যাক্ট, আপনি যখন ওইজা বোর্ডকে প্রশ্ন করেন, তখন আপনার ব্রেন আনকনশাসলি ইমেজ ও মেমরি তৈরি করে। আপনার শরীর আপনার মস্তিষ্কের সিগনালকে রেসপন্স করতে থাকে সচেতনভাবে আপনাকে কোনোকিছু না বলেই। যা আপনার হাত ও বাহুকে পয়েন্টারটি চালনা করতে ফোর্স করে, আর আপনি নিজের অজান্তেই একটি নির্দিষ্ট উত্তর পেয়ে যান, যে উত্তরটি অবচেতনভাবে আপনি আসলেই পেতে চেয়েছেন।

আইডিওমোটর ইফেক্টের এমন অজস্র উদাহরণ রয়েছে তার মধ্যে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বিখ্যাত যে একশনটি আবিষ্কার করেছেন তার নাম হলো “Oft- Repeated”! এটি ছিলো ওইজা বোর্ডের একটি ভ্যারিয়েন্ট। একে টেবিল টার্নিং বলা হয়। এখানে একদল ব্যাক্তি একটি টেবিলের চারপাশে বসে থাকে এবং তাদের হাত থাকে টেবিলের উপরে। আকস্মিক টেবিলটি মুভ করতে শুরু করে। এটাকে স্প্রিচুয়ালিস্টরা আত্মার উপস্থিতির একটি সিগনাল মনে করেন! কেউকেউ মনে করেন, এখানে আসলে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের মতো কিছু একটা কাজ করছে। কিন্তু ১৮৫৩ সালে ফ্যারাডে এ একটি ইনভেস্টিগেশন পরিচালনা করেন এবং দি টাইমসে এ নিয়ে একটি পাবলিক স্পিকিং প্রকাশ করেন! সেখানে তিনি এ ধারণাটিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন টেবিলের মুভমেন্ট তৈরি হয় আইডোওমোটর ইফেক্ট থেকে। আইডিওমোটর ইফেক্টের কারণেই সুঁতার অগ্রভাগে একটি ক্রিস্টাল বেঁধে রাখলে আপনার হাতের মুভমেন্ট ছাড়াই পেন্ডুলামটি সামনে ও পেছনে আপনার নির্দেশনায় দুলতে থাকে!
গবেষকরা একটা সময় অনুধাবন করেন, আইডিওমোটর ইফেক্ট আমাদের সাব-কনশাস জাগরণের সাথে জড়িত। আপনি যতই গভীরভাবে অনুধাবন করবেন যে, আপনার এ মুভমেন্টের উপর আপনার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, ততই আপনার সাব-কনশাস মাইন্ডের নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি বেড়ে যাবে!
আপনার অবচেতন মনই আপনার পেশির মুভমেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, কারণ আপনি ফোকাস না করলেও আপনার সাব-কনশাস মাইন্ড ঠিকই ফোকাস করে, এমনকি যদিও আপনি এটা বিশ্বাস না করেন যে আপনি সেগুলোকে কন্ট্রোল করছেন। আর এ জন্যই প্ল্যানচাটে একজন ব্যক্তির তুলনায় কয়েকজন ব্যক্তির শক্তি বেশি কাজে লাগে। কারণ এটি সাব- কনসাসলি সবার মনকে মুক্ত করে দেয় আর পারস্পরিক শক্তি একত্রিত হয় ওইজা বোর্ডকে Talkback করতে ফোর্স করে!কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ওইজা বোর্ড ব্যবহার করে আপনি আপনার আপনার সাব-কনশাস মাইন্ড ট্যাপ করতে পারবেন।
২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ওইজাবোর্ড একজন ব্যক্তিকে তার সাব-কনশাস মাইন্ডের ভেতর থেকে অধিক ফ্যাকচুয়াল ইনফরমেশন বের করে আনতে সাহায্য করে। যেমন- আপনি আপনার কম্পিউটারের কোন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিকিউরিটি কোড ভুলে গেছেন। আপনি সম্ভাব্য কয়েকটি কোড মনে মনে কল্পনা করতে করতে ওইজা বোর্ডে পয়েন্টারকে নাড়াচ্ছেন, যদি পয়েন্টার আপনাকে Yes বিন্দুতে স্থির করে দেয়, তবে আপনার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যাবে। কিছু কিছু অংশগ্রহণকারী ওইজাবোর্ড ইউজ করে, তাদের মনে নেই এমন তথ্যেরও অনেক নিখুঁত বর্ণনা দিতে পেরেছেন!
কিন্তু এর মারাত্মক খারাপ প্রভাব সৃষ্টি হয় তখন যখন কেউ এ ধরণের ঘটনাগুলোকে প্যারানরমালি এক্সপ্লেইন করতে চায়। যার মধ্যে একটি হলো Demon Possession Hoax! এখানে বিশ্বাস করা হয় যে কোন আত্মা, ঈশ্বর, এলিয়েন তার কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেকটা Invasion of Body Snatcher মুভির মতোই যেখানে এলিয়েন একজন ব্যক্তির শরীর দখল করে তাকে নিজের Host হিসেবে ব্যাবহার করে। যারা এ ধরণের মানসিক অবস্থায় পৌঁছায় তারা সাধারণত দাবি করে যে, তাদের মেমরি হারিয়ে গেছে, সংবেদন বিকৃত হয়ে গেছে, তারা সেন্স অব কন্ট্রোল খুঁজে পাচ্ছে না অথবা এদের মধ্যে হাইপার-সাজেস্টিবিলিটি কাজ করে। এরিকা বুরগিনন বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৮৮ সমাজের উপর গবেষণা করেন, যাদের ৭৪ শতাংশ বিশ্বাস করেন তাদের উপর আত্মা ভর করেছে। পেসিফিক সংস্কৃতিতে এ ধরণের বিশ্বাসের পরিমাণ অনেক উচ্চমাত্রিক এবং এ বিশ্বাসগুলো খুবই নিন্মমাত্রিক নেটিভ আমেরিকা ও সাউথ আমেরিকায়।
আবার এই আইডোম্যাটিক ইফেক্টের কারণেই “Automatic Writing” এর ক্ষমতা তৈরি হয় যা একজন ব্যক্তিকে ঈশ্বরের দূতে পরিণত করে। আর এই আইডিওমোটর ইফেক্টের মাধ্যমেই এক্সোরচিস্ট, সাইকি, মিডিয়াম ও স্বগোষিত আত্মার চ্যানেলের পরিচালকরা মানুষকে প্রতারিত করে আর UMMHA(উমা দেবীও) সে রকমই একজন মহিলা ছিলেন, যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিভিন্ন আত্মার সাথে কথা বলার অনৈচ্ছিক নাটক প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রতারিত করেছিলেন!
আমাদের প্রিয় কবি শ্রদ্ধেয় রবি ঠাকুর ঠিকই তার চালাকি বুঝতে পেরেছিলেন, আর তাইতো তিনি বলেছিলেন, দূর্বল চিত্তের মানুষরাই মিডিয়াম হওয়ার জন্য খুব বেশি উপযোগী। স্বামী অভেদানন্দ(অপবিজ্ঞানী) তার মরণের পারে বইটির ১৪২ পৃষ্ঠায় লিখেন, কোন লোক যদি নিজের উপর পরিপূর্ণ কতৃত্ব রেখে দেয়, তবে তার পক্ষে একজন মিডিয়াম হয়ে উঠা সম্পূর্ণ অসম্ভব! আইডিওমোটর ইফেক্টের আর একটি রুপ হলো Facilitated Communication যেটি ১৯৯০ সালের জনপ্রিয় থেরাপি টেকনিক থেকে নির্গত হয়। এ ধরনের কমিউনিকেশনে বিশ্বাসীরা দাবি করেন তারা অটিস্টিক রোগীদেরকে ফিঙ্গার মুভমেন্টের মাধ্যমে যোগাযোগে সক্ষম করে তুলতে পারবে। বিজ্ঞানীরা বার বার এ ধরণের দাবিকে ডিভাঙ্ক করেছেন এবং বলেছেন, এগুলো আইডিওমোটর ইফেক্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। একজন বিজ্ঞানী এটাকে “Ouija Board Stuff” বলেও আখ্যায়িত করেন। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, অটিজম আক্রান্ত মেয়েরা Facilitated Communication এর কারণে Sex Abus এর শিকার হয় কারণ তাদের কেয়ার গিভাররা বলেন, তারা নাকি এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মেয়েটার সম্মতিক্রমেই তার সেক্স করেছে (রবীন্দ্র-বিদূষণ ও ফ্যালাসি, পর্ব-২) এবং আদালতে মামলা করার পর বলা হয় ঐ মেয়েটি নাকি উলটা তার পিতামাতার বিরুদ্ধেই নির্যাতনের অভিযোগ করেছে!


