মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন
মূলপাতা বিজ্ঞান মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন

মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
293 বার পঠিত হয়েছে

পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীর মাঝে কবি,সাহিত্যিক বা দার্শনিক দেখা যায়না একমাত্র সেপিয়েন্সদের মধ্যেই মহাবিশ্বের মডেল সিমুলেট করার বিষ্মকর ক্ষমতা দেখা যায়!

আড়াই লক্ষ বছর পূর্বে সেমি মানুষদের মস্তিষ্কের ওজন ছিলো ৬০০ ঘন সেঃমি। বর্তমান আধুনিক মানুষদের মস্তিষ্ক ১৪০০ ঘন সেঃমি। আর অন্যদিকে মানুষের আরো একটি প্রজাতি নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক ছিলো আরো অনেক বড়। আমরা জানি যে যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্য একটি প্রাণীকে টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয় তখন সে বৈশিষ্ট্যটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে!

অতএব প্রাকৃতিক নির্বাচনের সুত্র অনুসারে বড় মস্তিষ্কের প্রাণীরাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকার কথা ছিলো কারণ যার যত বড় মস্তিষ্ক সে ততোবেশি চিন্তা করতে পারে।কিন্তু সেটি সত্যি নয়!নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক সেপিয়েন্স থেকে আকারে আরো বড় ছিলো এবং শারীরিক ভাবেও ছিলো তারা সেপিয়েন্স থেকে শ্রেষ্ঠ কিন্তু হয়তোবা তর্ক বিতর্কে তারা সেপিয়েন্সদের সাথে টিকে উঠতে পারতোনা!আর বড় মস্তিষ্কই যদি বুদ্ধিমত্তার মানদন্ড হয় তবে শিম্পাঞ্জি,এপস, বেড়াল, বাঘ ও সিংহদের মধ্যেও আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানী তৈরি হতো, হাইপেশিয়ার মতো দার্শনিক তৈরি হতো, তৈরি হতো হোমার অথবা এলিয়েটের মতো বিখ্যাত কবি!কিন্তু মানুষ ছাড়া মহাবিশ্বের আর কোনো প্রাণী মহাবিশ্বের মডেল সিমুলেট করতে পারেনা, তাদের Sense of Tomorrow নেই, তাদের মস্তিষ্ক চির বর্তমানের কারাগারে অবরুদ্ধ!

প্রশ্ন জাগে মানব মস্তিষ্ক কেনো মহাবিশ্বের সিমুলেশন তৈরি করতে সক্ষম, অন্যরা নয় কেনো?এ বিষ্ময়কর ক্ষমতা তাদের মধ্যে কিভাবে এলো?আমরা জানি, আধুনিক মানুষের মস্তিষ্ক তার শরীরের মোট ওজনের ২-৩ শতাংশ।মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তাদের মোট শক্তির ২৫ শতাংশ মস্তিষ্কের জন্যে খরচ হয়।আর অন্যদিকে অন্যান্য নর বানরদের মস্তিষ্কে শক্তি খরচ হতো তাদের মোট শক্তির ৮ শতাংশ!এ বড় মস্তিষ্কের জন্যে প্রাচীন শিকারী সংগ্রাহকদের দুইভাবে মূল্য দিতে হয়।বড় মস্তিষ্ক পরিচালনা করার জন্যে অনেক বেশি ক্যালরি প্রয়োজন ছিলো যার ফলশ্রুতিতে তাদের পেশিতে শক্তির সরবরাহ কমে গেলো!এ জন্যে শিকারী সংগ্রাহকদের পেশি ক্ষয় হয়েছে, তারা দূর্বল হয়েছে কিন্তু একদিকে কম্পেনসেশন দিলেও প্রাকৃতিক নির্বাচন তাদের মস্তিষ্ককে বুদ্ধিভিত্তিক ভাবে উন্নততর করে তুলল!

বড় মস্তিষ্কের জন্যে আমাদের শরীর যে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলো আমরা তার সুফল আজো ভোগ করছি!ইউভাল নোয়া হারারি তার Sapiens গ্রন্থে লিখেছেন, সরকার যদি শিক্ষাখাতে বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে সামরিক খাতে বাজেটের  পরিমাণ কমিয়ে দেয় তবে সামরিক খাতের তুলনায় শিক্ষাখাতই উন্নত হবে।

(মানুষের মস্তিষ্কের দশ বিলিয়ন মিলিয়ন নিউরাল কানেকশন, শিম্পাঞ্জি থেকে আলাদা ২৩ হাজার জিন মানুষের মস্তিষ্কে এতো বিপুল নিউরাল কানেকশন তৈরি করেছে, যেটি গাণিতিকভাবে অসম্ভব।একটা দৃষ্টিকোণ থেকে হিউম্যান কনসাসনেস একটি Mathematical Impossibility।প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে এ গাণিতিক অসাম্ভততাকে ব্যাখ্যা করতে পারেনা।আমাদের জিন যখন কোনো একটি মডিউলকে আদর্শকে আদর্শ মনে করে তখন সেটিকে বারবার রিপিট করে, মানব মস্তিষ্কের জটিলতার ব্যাখ্যায় এটাকে বিবেচনায় আনা উচিত)। আরো জানুন “এখানে”  অথবা Nytime।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যদি পরমাণবিক বোমা তৈরির জন্যে বাজেটের পরিমাণ কমিয়ে টাইম মেশিনের তৈরির জন্যে বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে তবে হয়তো Time Machine’ ই তৈরি হবে!ঠিক তেমনি বড় মস্তিষ্কের কারণে আমাদের দশ বিলিয়ন নিউরন সেলের জন্যে শক্তির বাজেট বেড়ে গেলো যার জন্যে আমরা শক্তিশালী ব্রেন পেয়েছি, পেয়েছি Prefrontal Cortex যেটি অনেকটা টাইম মেশিনের মতোই আমাদের মস্তিষ্ককে Future simulation এর ক্ষমতা দেয়, আমরা এ কর্টেক্সের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বাস্তবতা থেকে আমাদের টিকে থাকার জন্যে উপযোগী কোনো একটি বিকল্পকে ডিটারমাইন করতে পারি, তৈরি করতে পারি মহাবিশ্বের মডেল!(oxford Martin)

আমরা আমাদের এ বড় মস্তিষ্ক দিয়ে রকেট তৈরি করতে পারি, কম্পিউটার তৈরি করতে পারি, বন্ধুক তৈরি করতে পারি, গাড়ি তৈরি করতে পারি আর এ বড় মস্তিষ্কের কারণে আমরা শিম্পাঞ্জিদের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে সরাসরি গুলি করে দূর থেকে হত্যা করতে পারি।কিন্তু এ সবতো সেদিনের কথা।২০ লাখ বছর ধরে মানুষের মস্তিষ্কের আকৃতি ক্রমাগত বেড়েছে এবং তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও বেড়েছে।কিন্তু তখন আমরা আমাদের বড় মস্তিষ্ক দিয়ে চাকু বা বর্শা ছাড়া আর তেমন কিছুই তৈরি করতে পারিনি বরং এ বড় মস্তিষ্ক আমাদের শারীরিক ভাবে দূর্বল করেছে!সংশ্লিষ্ট আরো একটি আর্টিকেল (কিভাবে ফসিলের বয়স নির্ণয় করা হয়)

আমরা জানি যদি কোনো একটি বৈশিষ্ট্য প্রজাতিকে বাড়তি কোনো উপযোগীতা না দেয় তবে সে বৈশিষ্ট্য টিকে থাকেনা, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে আমাদের বড় মস্তিষ্ক শতাব্দীর পর শতব্দী টিকে আছে!কিন্তু কেনো?

ইউবাল নোয়া হারারি তার সেপিয়েন্স গ্রন্থে বলেছেন, বড় মস্তিষ্ক বিকাশের পর মানুষের মধ্যে নতুন একটি পরিবর্তন দেখা দিলো, তারা গ্রেভেটিকে উপেক্ষা করে দুই পায়ে ভর করে সোজা হয়ে হাঁটতে শিখলো, এছাড়া তাদের হাত দুটি হাঁটার ঝামেলা মুক্ত হয়ে বস্তুকে ছুড়ে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করলো, শিখলো ঈশারা করতে!যার হাত যত দক্ষ তার টিকে থাকার সম্ভাবনাও ততো বেশি!আমার মতে, মানুষ যতই সোজা হয়ে হাঁটতে শিখলো, ততোই তারা গ্রেভেটির প্রতিকূলে যেতে শুরু লাগলো, তাই গ্রেভেটির আকর্ষণে তাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুসংযোগ আরো বেশি সুক্ষ্ম হয়ে উঠলো, তৈরি হলো অধিকতর স্নায়ুসংযোগ,সুক্ষ্ম কাজের জন্যে হাতের তালু এবং আঙুল সমৃদ্ধ মানুষের উদ্ভব হতে লাগলো!বিশেষ করে তারা অনেক সুক্ষ্ম অস্র তৈরি এবং ব্যাবহারের সুযোগ পেলো!পুরাতত্ববিদরা সবচেয়ে পুরাতন যে হাতিয়ারের অস্তিত্ব পেয়েছিলেন তা ২৫ লাখ বছর পূর্বের যা থেকে প্রমাণিত হয় ঠিক সে সময় থেকেই হাতিয়ারের ব্যাবহার প্রচলিন ছিলো!

আজ আমরা জটিল ম্যাথমেটিক্যাল ফর্মুলা সমাধান করছি, হাইপারস্পেসের মডেল তৈরি করছি, আমরা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করছি কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং স্পেস-টাইম থিওরি অব কনসাসনেস!এসব কিছুর পেছনে আমাদের ঘুমন্ত মস্তিষ্কের জন্যে ১৭ শতাংশ বেশি শক্তি বাজেট করার একটি সম্পর্ক ছিলো, আমাদের বড় মস্তিষ্ক যদি নর বানর থেকে ১৭ শতাংশ বেশি শক্তি ব্যাবহার না করতে পারতো তবে পৃথিবীতে কোনো কবি তৈরি হতোনা, তৈরি হতোনা দার্শনিক, তৈরি হতো না কোনো বিজ্ঞানী অথবা ম্যাথমেটিশিয়ান!

তথ্যসুত্রঃ

আরও পড়ুন

5 মন্তব্যসমূহ

Anik Pal December 19, 2020 - 4:46 pm

আমি ব্যক্তিগতভাবে চাইবো যে এই ওয়েবসাইটটি আরো পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ভাবে উন্নত হোক, লেখার মান আরেকটু বাড়াতে হবে তাতে, যে কোন সাধারণ মানুষ পড়া মাত্রই বুঝতে পারে এবং উপলব্ধি করতে পারে। আশা করি আসিফ মহিউদ্দিনের ওয়েবসাইটের মতো এই ওয়েবসাইটের লেখাগুলো ভালো হবে।

ক্ষমা করবেন যদি ভুল কিছু বলে থাকি।

প্রতিউত্তর
অ্যান্ড্রোস লিহন December 28, 2020 - 3:01 pm

ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্যে।সাইটটি নতুন।আমরা মাত্র লিখালিখি শুরু করেছি আর আপাতত আমরা সাইটটিকে প্রাইম করছি।এ পর্যন্ত যতগুলি আর্টিকেল পোস্ট করা হয়েছে সবগুলি তথ্যবহুল এবং গুরুত্বপূর্ণ।আমরা ৩০ টা আর্টিকেল লিখেছি মাত্র!সাইট ডেভেলপ হতে সময়ের প্রয়োজন।আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য, উপাত্ত ও আর্টকেল আছে তবে এটা আমাদের সূচনার দিক।সহযবোধ্য ও প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা থাকবে এবং এ সাইটটি হবে অনন্য…!

আসিফ মহিউদ্দিনের ওয়েবসাইটের মতো এখানকার লিখাগুলি ভালো হবে এ কথাটার সাথে আমি একমত নই;

লিখার ভালো মন্দ ডিপেন্ড করে তথ্যের শুদ্ধতার উপর!আমাদের কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো আমরা যে তথ্যগুলি প্রেজেন্ট করছি সেগুলির কনফিডেন্সিয়ালিটি যথাযথ কি না!

প্রতিউত্তর

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!
%d bloggers like this: