ভিন্ন ভিন্ন স্লিপ সাইকেলের বিবর্তন কেন হলো?

Last updated:

আপনার শরীর কিভাবে জানে কখন আপনার ঘুমানো প্রয়োজন?আপনি যখন নতুন কোনো সময়ের বলয়ে( Time Zone) প্রবেশ করেন তখন কেনো আপনি জেট ল্যাগ সমস্যায় আক্রান্ত হন? কিভাবে এ সমস্যা এড়ানো যায়? কেনো এ অভিযোজন দেশে ফিরে আসার পরও আপনার মধ্যে জেট ল্যাগের সমস্যা তৈরি করে? কেনো কিছু মানুষ এ সমস্যাটির সাথে কমব্যাট করার জন্য মেলাটোনিন ব্যবহার করে? কেনো এক কাপ কফি আপনাকে জাগিয়ে রাখে? সম্ভবত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, কিভাবে আপনি জানেন যে আপনার পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে? দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর রয়েছে যা নির্ধারণ করে কখন আপনি ঘুমাতে চান এবং কখন আপনি জাগ্রত হওয়ার তাড়নাবোধ করেন? আপনি যখন আমার এ লেখাটি পড়ছেন তখন এ দুটি ফ্যাক্টরই আপনার উপর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছে। প্রথম ফ্যাক্টরটি আপনার মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত একটি ইন্টারনাল-টুয়েন্টি-ফোর-আওয়্যার ক্লক দ্বারা নির্দিষ্ট হয়। এ ঘড়ি আপনার মধ্যে সাইকেলিং তৈরি করে, দিন ও রাতের মধ্যে একটি রিদম, যা আপনার মধ্যে ক্লান্তি তৈরি করে এবং আপনাকে দৈনন্দিন দিন ও রাত্রি সম্পর্কে সতর্ক করে! আর দ্বিতীয় ফ্যাক্টরটি হলো কেমিক্যাল সাবস্ট্যান্স যা আপনার মস্তিষ্কের ভেতর তৈরি হয় এবং একটি ” স্লিপ প্রেসার” তৈরি করে। আপনি যত দীর্ঘক্ষণ জাগ্রত থাকবেন এই কেমিক্যাল প্রেসার পুঞ্জিভূত হতে শুরু করবে এবং সমসাময়িক আপনি ততবেশি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে উঠবেন। আর আমার এ প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো আপনাদের নিকট এটা দেখানো যে, সত্যিকার অর্থেই আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর কোনো ঘড়ির অস্তিত্ব আছে কীনা, কেনো এ ঘড়িটি বিবর্তিত হলো? কেনো এক একজন ব্যক্তির মধ্যে এক একরকম স্লিপ সাইকেল কাজ করে? এর বিবর্তনীয় উপযোগিতা কী? ( আরো পড়ুন – ঘুমের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা )

রিদমিক হও!

আমাদের শরীরের মধ্যে চব্বিশ ঘন্টার একটি রিদম কাজ করে, যেটাকে সার্কাডিয়ান রিদম বলে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই এ সার্কাডিয়ান রিদম রয়েছে। (এখানে “Circa” শব্দের মিনিং “চারপাশে” এবং “Dian” এসেছে Diam থেকে যার অর্থ হচ্ছে “দিন”)। এ গ্রহের প্রায় সকল জীবিত প্রাণী যাদের লাইফ স্প্যান কয়েকদিন থেকে বেশি তারাও এ ন্যাচারাল সাইকেল উৎপাদন করে। আপনার মস্তিষ্কের ভেতর চব্বিশ ঘন্টার যে ইন্টারনাল সার্কাডিয়ান রিদম আছে এটি তার প্রাত্যহিক সার্কাডিয়ান সিগনালের মাধ্যমে মস্তিষ্কের অন্য প্রতিটি অংশ ও শরীরের প্রত্যেকটি অর্গানের সাথে যোগাযোগ করে। চব্বিশঘন্টার এই টেম্পো আপনাকে বলে দেয় আপনি কখন জাগ্রত হবেন এবং কখন আপনি ঘুমাবেন। কিন্তু এটি আপনার অন্যান্য রিদমিক প্যাটার্নকেও নিয়ন্ত্রণ করে। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আপনার খাবার ও পানের টাইম প্রিফারেন্স, আপনার মুড ও ইমোশন এবং আপনার মধ্যে কী পরিমাণ ইউরিন প্রস্তুত হবে, আপনার শরীরের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা, আপনার মেটাবলিক রেট এবং আপনার ভেতরকার অজস্র হর্মোন।

এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে কেনো অলিম্পিকের অধিকাংশ রেকর্ড বিকেল বেলায় ভাঙে, এর কারণ এ সময় মানুষের সার্কাডিয়ান রিদম সর্বোচ্চ হয়। এমনকি জন্ম- মৃত্যুর সময়ও সার্কাডিয়ান রিদমকে প্রদর্শন করে জীবনের মূল মেটাবলিক সুইং-এর চিহ্ন, কার্ডিওভাস্কুলার, তাপমাত্রা ও হর্মোনাল প্রসেস যা এই পেসমেকার নিয়ন্ত্রণ করে। এই বায়োলজিক্যাল পেসমেকার বা হৃদস্পন্দন ঠিক রাখার যন্ত্র একটি দুর্দান্ত ও ভয়ানক গবেষণার পর ১৭২৯ সালে বেরিয়ে আসেঃ তারা সময়কে থামিয়ে দেয়, অন্তত আমাদের গ্রহের জন্য। ফ্রান্সের জিওফিসিজিস্ট জীয়ান জ্যাকিউস ডি মারিয়ান সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন যে, বৃক্ষরা তাদের নিজস্ব ইন্টারনাল টাইম উৎপাদন করতে পারে। ডি মারিয়ান কিছু প্রজাতির পাতাদের স্পন্দন নিয়ে গবেষণা করেন যা হেলিওট্রোপিজম বা সূর্যাবৃত্তি প্রদর্শন করেছিল ; বৃক্ষের পাতারা সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে যখন সূর্য মহাকাশে দিনের বেলায় মুভ করতে থাকে। ডি মারিয়ান যে বিষয়টি দ্বারা বিস্মিত হয়েছিলেন সেটি ছিল যখন তিনি দেখেন, একটি অদ্ভুদ বৃক্ষ যার নাম Mimosa Pudica.

ভিন্ন ভিন্ন স্লিপ সাইকেলের বিবর্তন কেন হলো?
 Mimosa Tree 

এ বৃক্ষের পাতারা শুধুমাত্র সারাদিন মহাকাশের মুখে সূর্যের গতিপথ ট্র‍্যাকই করেনা রাতের অন্ধকারে এ পাতাগুলো শাটডাউন করে। মনে হয় যেন তারা তাদের সতেজভাব হারিয়ে ফেলেছে। আবার পূনরায় পরদিন দিনের শুরুতে এ পাতাগুলো ছাতার মত খুলে যায়, মনে হয় যেনো চির সতেজ। আর এ আচরণটি প্রতিদিন প্রতি সকালেই পুনরাবৃত্তি হয়, আর এখান থেকে বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী ডারউইন এর নাম প্রদান করেন The Sleeping Trees! মারিয়ানের এ এক্সপেরিমেন্টের পূর্বে অনেকেই মনে করতেন যে, পাতার এ সংকোচন ও সম্প্রসারণ সূর্যের উদয় ও অস্তের সাথে সম্পৃক্ত৷ যদি তাই হয় তবে আমরা অত্যন্ত যুক্তিসংগতভাবে চিন্তা করতে পারি যখন সূর্য উদিত হবে, এমনকি যদিও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন তবুও এ পাতাগুলো নিজেদের বিস্ফোরিত করবে, দিনের আলো তাদেরকে ট্রিগার করবে আর বিপরীতভাবে যখনই অন্ধকার উপস্থিত হবে অন্ধকার গাছের পাতা গুলোকে তাদের দোকান বন্ধ করে দিতে বলবে, তারা তাদের বিজনেস ক্লোজ করবে এবং পুঞ্জিভূত হবে। ডি মারিয়ান তাই করলেন, তিনি দিনের আলোতে গাছের পাতাগুলোর উপর থেকে আলো তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। একটি তালাবদ্ধ ঘরে তিনি বৃক্ষটকে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত এভাবে রাখলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, আলোর অনপুস্থিতিতে গাছের পাতাগুলো শাটডাউন করে কীনা!

বিস্ময়করভাবে তিনি লক্ষ্য করলেন যখন গাছের পাতার সংস্পর্শ থেকে আলোর উপস্থিতিকে অপসারণ করা হয় তখনও পাতা গুলো এক্সপান্ডেড অবস্থায় স্থির থাকে, তারা এমনভাবে আচরণ করে মনে হয় যেনো তারা এখনো সূর্যের আলোতেই স্নান করছে! তারা ব্লাকনেসকে ফিল করতে পারছেনা! এবং যখন সূর্য ডুবে যায় তখন যদিও তারা অন্ধকারে, তারা সন্ধ্যার দিকে নিজে নিজেই শাট ডাউন হয়ে যায়, মনে হয় যেনো সূর্যের আলোর সিগনাল ছাড়াই তারা অচেতনভাবে বুঝতে পারে কখন তাদের সম্প্রসারিত হওয়া উচিত আর কখন সংকুচিত!

এটি ছিল একটি দারুণ আবিষ্কার। ডি মারিয়ান এ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত আসেন প্রতিটি জীবিত অর্গানিজম তার নিজস্ব সময় সংরক্ষণ করছে, তারা আসলে সূর্যের আলোর রিদমিক কমান্ডের উপর নির্ভর করেনা, বৃক্ষের ভেতরেই ২৪ ঘন্টার একটি রিদমিক জেনারেটর আছে যেটি সময়কে এক্সটারনাল বিশ্বের কোনো সিগনাল ছাড়াই ট্র‍্যাক করতে পারে। একটি বৃক্ষের মধ্যে শুধু সার্কাডিয়ান রিদমই কাজ করছেনা, এর রয়েছে “এন্ডোজেনাস” বা Self Generated Rhythm.! এটি অনেকটা আপনার হার্ট ড্রামিং-এর মতো, এর রয়েছে নিজের তৈরি বিট। পার্থক্য হলো আপনার হার্ট দ্রুত বিট করে। সাধারণত প্রতি সেকেন্ডে একবার, সার্কাডিয়ান ক্লকের মতো ২৪ ঘন্টায় একবারের পরিবর্তে। বিস্ময়করভাবে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছে এটা প্রমাণ করতে যে মানুষেরও আভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট সার্কাডিয়ান রিদম রয়েছে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের আভ্যন্তরীণ টাইম কিপিং-এর মধ্যে অপ্রত্যাশিত একটি ব্যাপার আছে।

১৯৩৮ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাথানায়িল ক্লেইটিম্যান তার গবেষণা সহকারী ব্রুস রিচার্ডসনকে নিয়ে একটি দুরন্ত এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন। আর এ পরীক্ষার জন্য তাদের ত্যাগও ছিল অনেক। ক্লেইটাম্যান ও রিচার্ডসন ছিলো নিজেরাই নিজেদের ল্যাবরেটরির গিনিপিগ। তারা খাবার, পানীয় এবং উচ্চ মাপের হসপিটাল বেড নিয়ে ছয় সপ্তাহের জন্য ক্যান্টিউস্কির ম্যামথ গুহায় চলে যান, যেটি আমাদের প্লানেটের সবচেয়ে গভীর গুহা, এটা এতটাই গভীর যে সনাক্তযোগ্য কোনো আলোই সেখানে পৌঁছাতে পারে না। আর এ পরীক্ষার মাধ্যমে তারা বুঝতে পারেন বায়োলজিক্যাল রিদম মোটের উপর চব্বিশঘন্টা কিন্ত একেবারে যথাযথভাবে চব্বিশঘন্টা নয়! এ দুর্দান্ত গবেষণা থেকে তারা যুগান্তকারী দুটি বিষয় আবিষ্কার করেন, তারা দেখেন ডি মারিয়ান হেলিওট্রোপি বৃক্ষের মতো, তারা যেমন তাদের আভ্যন্তরীণ এন্ডোজেনাস সার্কেডিয়ান রিদম তৈরি করে এক্সটারনাল আলোর এবসেন্সে, মানুষের মধ্যেও একই সার্কেডিয়ান রিদম পাওয়া যায়। ৩২ দিন পর তারা শুধু বিশ্রি দাড়ি ও গোফ নিয়ে ফেরেনি তারা দেখেছে, ঘুম ও জাগরণের এ ছন্দ আসলে র‍্যান্ডম ছিলনা, এটা ছিলো সম্পূর্ণ প্রেডিক্টেবল, এটি প্রায় ১৫ ঘন্টা দীর্ঘায়িত জাগরণ ও ৯ ঘন্টা দৈর্ঘের ঘুমকে পুনরাবৃত্তি করেছিল। আর অপ্রত্যাশিত দিকটি ছিলো এই যে, ঘুম ও জাগরণের এ সাইকেল অ্যাক্সেক্টলি চব্বিশঘণ্টা দৈর্ঘের ছিলোনা বরং অনস্বীকার্যভাবে এটি ছিল ২৪ ঘন্টা থেকে বেশি।

ভিন্ন ভিন্ন স্লিপ সাইকেলের বিবর্তন কেন হলো?
নাথানায়িল ক্লেইটিম্যান তার গবেষণা সহকারী ব্রুস রিচার্ডসন

রিচার্ড সন তার বিশ বছর বয়স থেকেই, ২৬ থেকে ২৮ ঘন্টার স্লিপ ও ওয়েক সাইকেল ডেভেলপ করেছিল। ক্লেইটম্যান, তার চৌদ্দবছর বয়স থেকে এটি ডেভেলপ করেছিল, কাছাকাছি কিন্তু তারপরও ২৪ ঘন্টা থেকে বেশি। আর এ জন্য, যখন এক্সটারনাল আলোক উৎস অপসারণ করা হয়, দুজন ব্যক্তির ইন্টারনালি উৎপন্ন স্লিপ ও অয়েকিং সাইকেল যথাযথভাবে ২৪ ঘন্টা ছিল না বরং তার থেকে কিছুটা বেশি ছিল। অযথাযথ হাত ঘড়ির মত, যার সময় অনেক দীর্ঘ, যার প্রতিটি আউট সাইড ওয়ার্ল্ডের একদিন থেকে বড়, ক্লেইটম্যান ও রিচার্ডসন পরে সিদ্ধান্তে আসেন, সময় আসলে তাদের দীর্ঘতর আভ্যন্তরীণ ভাবে উৎপন্ন ক্রোনোমেট্রির উপর নির্ভর করে। যেহেতু আমাদের বায়োলজিক্যাল রিদম পুরোপুরিভাবে ২৪ ঘন্টা নয় কিন্তু তার কাছাকাছি একটি নতুন নোমেনক্ল্যাচার প্রয়োজন হয় ; সার্কেডিয়ান রিদম __তা হলো মোটের উপর এক, অথবা একদিনের দৈর্ঘের সমান। আর এ জন্য এটা বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে আমাদের ব্রেন সূর্যের আলোর মাধ্যমে সময়ের এই গড়মিল সংশোধন করে। কারণ আমাদের প্লানেটের জন্মের শুরু থেকে, প্রতিটি দিন একদিন অন্যদিনের পরবর্তী ছিল , সূর্য সবসময় সকালেই উদিত হয়েছিল আর অস্ত গেছিলো সন্ধ্যায়। আর এ জন্যই সম্ভবত অধিকাংশ প্রজাতি তাদের নিজেদের মধ্যে সার্কাডিয়ান রিদম উন্নত করেছিল, তাদের নিজেদের ও নিজেদের একটিভিটি সিনক্রোনাইজ করার জন্য, আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ও বহিরাগত ফিডিং, তারা প্রাত্যহিক পৃথিবীর আপন অক্ষের ঘূর্ণনের ম্যাকানিক্সের সাথে নিজেকে সমন্বয় করেছে, যা সূর্যের দৈনান্দিত প্রকাশ( আলো) ও গোপনীয়তার (অন্ধকার) ফলাফল থেকে প্রকাশ হয়। দিনের আলোই একমাত্র বিষয় নয় যে সিগনাল ইউজ করে আমাদের ব্রেন তার বায়োলজিক্যাল ঘড়ি রিসেটিং করে। এত দীর্ঘসময় তারা নিজেদের রিপিট করছে যে হয়তো তারা অন্য কোনো সূত্রও ব্যবহার করতে পারে, যেমন- খাবার, তাপমাত্রার ফ্ল্যাকচুয়েশন এবং দৈনান্দিন সময়ের সোশ্যাল ইন্টারেকশন। এ সব ইভেন্ট আপনার বায়োলজিক্যাল ক্লক রিসেট করতে সাহায্য করে, একেবারে যথাযথ ২৪ ঘন্টা। আর এ জন্যই হয়তো যে সকল ব্যক্তিরা অন্ধ তারা তাদের সার্কাডিয়ান রিদম সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেনা। যদিও তারা আলো গ্রহণ করছেনা হয়তো তারা অন্য কোনো বস্তুর মাধ্যমে তাদের টাইম রিসেট করছে। যে কোনো সিগনাল যা মস্তিষ্ক টাইম রিসেট করার জন্য ব্যবহার করে তাকে জেইটগিবার( Zeitgeber) নামক টার্মটি তারা সনাক্ত করা হয়, যেটি জার্মান টাইম গিভার বা সিনক্রোনাইজার থেকে এসেছে। যেহেতু আলো অধিক বিশ্বাসযোগ্য এজন্য একে প্রাইমারি জেইটগিবার বলে, আলোর অনপুস্থিতিতে আরো অনেক ফ্যাক্টরকে এ জন্য ব্যবহার করা যায়। ২৪ ঘন্টার এ বায়োলজিক্যাল ক্লক যা আপনার মস্তিষ্কে বসে আছে এটাকে বলে “Suprachiasmatic Nucleus” ( উচ্চারণটি হবে Soo-pra-kai-as-MAT-ik)। সুপরা মানে “উপরে”, Chiasm এর মানে হলো ক্রসিং পয়েন্ট। এখানে ক্রসিং পয়েন্ট হলো, আপনার আইবল থেকে অপটিক নার্ভ আসে।

ভিন্ন ভিন্ন স্লিপ সাইকেলের বিবর্তন কেন হলো?

এ নার্ভগুলো আপনার মিডল ব্রেনে যোগাযোগ করে, তারপর কার্যকারী ভাবে সেই পাশ চালু করে দেয়। সুপরাকাইয়েসম্যাটিক নিউক্লিয়াস একটি বিশেষ কারণে এই ইন্টারসেকশনের উপরে অবস্থান করে। এটি আলোর সিগনালের নমুনা দু-চোখের ভেতর অপটিক নার্ভ ধরে মস্তিষ্কের পেছনে ভিজুয়াল প্রসেসিং করার জন্য পাঠিয়ে দেয়। এই সুপরাকাইয়েসম্যাটিক নিউক্লিয়াস বিশ্বাসযোগ্য আলোর ইনফরমেশন ইউজ করে আপনার ভেতরকার সহযাত সময়ের অসম্পূর্ণতাকে, সকলপ্রকার বিচ্যুতি অবদমন করার স্বার্থে পূনরায় সেট করে দেয়।যখন আমি আপনাকে বলবো এ সুপরাকাইয়েসম্যাটিক নিউক্লিয়াস ২০, ০০০ নিউরন দিয়ে গঠিত আপনার মনে হতে পারে এটি তো বিরাট যা ক্রেনিয়াল স্পেসের বড় একটি অংশ দখল করে রেখেছে। কিন্তু আসলে এটি ক্ষুদ্র। আমাদের ব্রেন মোটের উপর ১০০ বিলিয়ন নিউরন দিয়ে গঠিত, তুলনামূলক সেরিব্রাল ম্যাটারের তুলনায় এটি অনুমাত্র। আমাদের শরীরের আকারের তুলনায় আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে এ নিউক্লিয়াসের প্রভাব খুবই ক্ষুদ্র। কিন্তু এ ক্ষুদ্র ঘড়িটি আমাদের জীবনের বায়োলজিক্যাল রিদমিক সিম্ফোনির কেন্দ্রীয় কন্ডাক্টর, আপনার ও প্রতিটি জীবিত প্রাণীর। এই সুপরাকাইয়েসম্যাটিক নিউক্লিয়াস আপনার আচরণের অনেকগুলো দিক নিয়ন্ত্রণ করে, এমনকি আপনি যে এ মুহূর্তে এ আর্টিকেলে ফোকাস করছেন সে ব্যাপারটিও। মানুষের মতো দিবাচর প্রাণী যারা দিনে সক্রিয় থাকে সার্কাডিয়ান রিদম মস্তিষ্ক ও শরীরের অনেক ম্যাকানিজম সক্রিয় করে তোলে এবং দিনের বেলায় শরীরকে যেটি ডিজাইন করা হয়েছে জাগ্রত ও সতর্ক থাকার জন্য। রাতের বেলায় এই এলার্টিং ইনফ্লুয়েন্স বন্ধ হয়ে যায়। এ বায়োলজিক্যাল রিদম শোয়ার সময় আপনার দেহের তাপমাত্রা নামিয়ে দেয়।। আসলে এ তাপমাত্রা আপনার ঘুমের উপর প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করেনা। আপনি চাইলে সারারাত জাগ্রতও থাকতে পারেন কিন্তু আপনার বডি টেম্পারেচার সেইম প্যাটার্ন প্রদর্শন করবে। যদিও তাপমাত্রার পতন আপনার ঘুমকে ত্বরাণ্বিত করে কিন্তু চব্বিশঘন্টার মধ্যে তাপমাত্রা নিজেই উঠানামা করে আপনি জাগ্রত থাকুন বা ঘুমন্ত। এটি হলো পূর্ব থেকে প্রোগ্রাম করা সার্কেডিয়ান রিদম, যেটি বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে, কোনোপ্রকার পতন ছাড়াই, মেট্রোনোমের মত। তাপমাত্রা হলো চব্বিশঘন্টার এ রিদমের অজস্র উপাদানের একটি যা সুপরাকাইয়েসম্যাটিক নিউক্লিয়াস পরিচালনা করে। জাগরণ আর ঘুম আলাদা কিছু। এ জন্য ঘুম ও জাগরণ সার্কেডিয়ান রিদমের নিয়ন্ত্রণেই, অন্যথা নয়।

এ সার্কেডিয়ান রিদম উঠানামা করবেই প্রতি চব্বিশঘন্টায় আপনি ঘুমান অথবা জাগ্রত থাকেন। এ ক্ষেত্রে সার্কেডিয়ান রিদম সবার মধ্যে অবিচল কিন্তু সকল মানুষের এ সার্কেডিয়ান টাইমিং একই নয়! আর আমার এ আর্টিকেলের উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি ব্যক্তির বিভিন্ন রকমের সার্কেডিয়ান রিদমের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা! কেনো ব্যক্তিভেদে সাইকেলিং-এর এ সময় পৃথক? কী এমন উপযোগিতা ছিলো এর মধ্যে? যদিও প্রতিটি ব্যক্তি অলঙঘনীয় ২৪ ঘন্টার একটি প্যাটার্ন প্রদর্শন করে কিন্তু তাদের তরঙ্গশীর্ষ ও তরঙ্গপাদ আলাদা আলাদা। কিছুকিছু মানুষ আছে যাদের জাগরণের তরঙ্গশীর্ষ দিনের বেলায় সর্বোচ্চ হয় এবং রাতের প্রারম্ভিক দিকেই তারা ঘুমিয়ে যায়। আবার এরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে। এ ধরণের সকাল বেলার পাখিরা জনসংখ্যার ৪০% দখল করে রেখেছে। তারা সূর্যের সাথেই ঘুম থেকে জাগ্রত হয় এবং এতে করে তারা খুশিও এবং তারা দিনের এ সময়ে অনুকূলভাবে কাজ করে। আর অন্য এক ধরণের মানুষ আছে যারা সন্ধ্যাবেলার পাখি (Evening Type)! এরা মোট জনসংখ্যার ৩০% দখল করে আছে। তারা প্রাকৃতিকভাবেই রাতের বেলায় অনেক দেরীতে ঘুমাতে যায় এবং পরবর্তীদিন সকাল বেলায় তারা দেরীতেই ঘুম থেকে জেগে উঠে। এমনকি কখনো কখনো তারা বিকেলেও জাগ্রত হয়। আর অবশিষ্ট ৩০% মানুষ কোথাও সকালে অথবা কোথায় সন্ধ্যায় ঘুমায়, তবে তাদের ঝোঁক কিছুটা সন্ধ্যার দিকে। সকাল বেলার পাখিদের মতো রাতের পাখিরা শত চেষ্টা করলেও রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতে পারেনা। তারা যে শুধু রাতে ঘুমাতে পারেনা তাই না তারা শত চেষ্টা করেও সকাল সকাল জেগে উঠতে পারেনা। তারা এ সময় কোনো কাজ ভালোভাবে করতে পারেনা কারণ যদিও কোন ভাবে তাদের এই সময় জাগানো হয় তবে তাদের ব্রেন সকাল বেলায় “স্লিপ লাইক স্টেটে” থাকবে।

এটি বিশেষভাবে মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ক্ষেত্রে সত্য, যে দিকটি চোখের উপরের দিকে অবস্থিত এবং যেটাকে মস্তিষ্কের হেড অফিস হিসেবে চিন্তা করা হয়। এ প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স উচ্চমাপের চিন্তা ও যৌক্তিক রিজনিং করে এবং আমাদের ইমোশনকে অবদমন করে। যখন রাতের পেঁচাদের খুব ভোরে জাগিয়ে দেয়া হয়, তাদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সাথেসাথে ডিজেবল হয়ে যায়, যেটাকে বলা হয় “অফলাইন স্টেট”! এটা অনেকটা কোল্ড ইঞ্জিনের মত, এটি চালু হতে দীর্ঘ সময় লাগে অপারেটিং টেম্পারেচার তৈরি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এবং তারপর এটি কার্যকরীভাবে কাজ করে। এ দু-ধরণের মস্তিষ্ক, যেগুলোকে তাদের ক্রোনোটাইপ বলা হয় খুব দৃঢ়ভাবে জিন দ্বারা নির্ধারিত। আপনি যদি রাতের পাখি হয়ে থাকেন তবে আপনার পিতা ও মাতা দুজনের যেকোনো একজন অবশ্যই রাতের পাখি।

কিন্তু দুঃখজনক ভাবে রাতের পাখিদের সমাজ খুবই নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। তাদেরকে সবাই অলস ও কর্মবিমুখ জানে শুধু একটা কারণেই যে তারা সকাল সকাল ঘুম থেকে জাগ্রত হতে পারেনা। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে যারা রাতে ঘুমাতে পারেনা, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ কাজটি করছেনা, তারা তাদের ডিএনএ হার্ডওয়্যারের কারণেই ডিলেইড শিডিউলে কাজ করছে। এটা তাদের সচেতন কোনো ফল্ট নয়। এটা হলো তাদের জেনেটিক্যাল নিয়তি। এ জন্য সামাজিক কার্যদিবসের শিডিউল খুব শক্তভাবে পক্ষপাতদুষ্ট যা এ সব রাতের পাখিদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে। যদিও স্ট্যান্ডার্ড কর্ম শিডিউলের কারণে এ অবস্থার উন্নতি ঘটছে। এছাড়া রাতের পাখিদের সকাল বেলার জব পারফর্মেন্সও এতোটা ভালো না। যদি তাদেরকে সকালে কাজ করতে দেয়া হয় তবে সেটা তাদের পটেনশিয়ালিটির উপর একটি বড় মাপের আঘাত, তারা শুধু বিকেলেই অপটিম্যালি কাজ করতে পারে। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ এ মানুষগুলো সকালের পাখিদের সাথে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয় সেদিন বিকেলের পূর্বে তারা আর ঘুমাতে যেতে পারেনা। আর এখান থেকে তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন, এঞ্জাইটি, ডায়বেটিক্স, ক্যান্সার, হার্ট এটাক ও স্ট্রোকের প্রবণতা দেখা দেয়। আর এ জন্য অবশ্যই আমাদের সোশ্যাইটাল চেঞ্জ জরুরি। আমরা জেনেটিক্যালি অসম স্লিপ সাইকেলের এ পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে পারিনা বরং আমাদেরকে এমনভাবে জব শিডিউল তৈরি করতে হবে যেনো প্রত্যেকেই সে শিডিউলের সাথে নিজেকে এডাপ্ট করতে পারে। আমাদের এমন একটি ওয়ার্ক শিডিউল দরকার যেটা সকল ক্রোনোটাইপকেই সমর্থন করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট দিকে আমাদের এক্সট্রিম হওয়া যাবেনা। আপনাকে বুঝতে হবে কেনো প্রকৃতি মাতা আমাদের মধ্যে এ জেনেটিক্যাল ডায়ভার্সিটি তৈরি করেছে।

সামাজিক প্রজাতি হিসেবে প্রকৃতির কি প্রয়োজন ছিলোনা আমাদের স্লিপ সাইকেলের মধ্যে সিনক্রোনাইজেশন তৈরি করা? আমরা একসাথে জেগে উঠবো আর একসাথে ঘুমাতে যাবো? একমাত্র আমরা যদি বিবর্তনীয়ভাবে চিন্তা করি তবেই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, কেনো আমাদের মধ্যে জেনেটিক্যালি আলাদা আলাদা স্লিপ/অয়েকিং প্রিফারেন্স তৈরি হয়েছে! মূলত, আমাদের পূর্বসূরিরা যদি দলবদ্ধভাবে সবাই ঘুমিয়ে পড়তো তবে আফ্রিকার জঙ্গলে তারা ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতো। ঘুমের সময় মানুষ শিকারী প্রাণী সনাক্ত করতে পারতোনা, তারা তাদের চারপাশে হিংস্র বাঘ, সিংহ অথবা ভয়াভহ সাপের উপস্থিতি অনুভব করতে পারতোনা! আর এতে করে সম্পূর্ণ প্রজাতি ঘুমের মধ্যেই দিনের পর দিন বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হতো! স্লিপ সাইকেলের এ ভিন্নতার কারণে যখন দলের অন্যান্য সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়তো তখন হয়তো অন্য সদস্যরা চারপাশের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেতো এবং যদি কোনো ভয়াবহ প্রাণী বা ঘূর্ণিজড়ের উপস্থিতির সিগনাল সংগ্রহ করতে সমর্থ হতো তবে তারা সেটা তাদের গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদেরকে জানানোর সুযোগ পেতো! এতে করে আমাদের পূর্বসূরিদের প্রায় ৫০ শতাংশ হয়তো তাদের ভিন্ন রকম স্লিপ প্যাটার্ন ব্যাবহার করে অন্য ৫০ শতাংশ সদস্যকে ধারাবাহিকভাবে টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা প্রদান করতে সক্ষম হয়েছিল। ৫০ শতাংশ মানুষের স্লিপিং সাইকেলের ভিন্নতা প্রজাতির মধ্যে যে সার্ভাইভাল অ্যাডভেন্টেইজ তৈরি করেছিল সম্ভবত তার কারণেই যারা স্লিপিং সাইকেলের এ অসমতাকে পুনরাবৃত্তি করতে সক্ষম হয়েছিল তারা টিকে থাকার ক্ষেত্রে অধিক সুবিধা প্রাপ্ত হয়েছিল। আর এভাবে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক স্লিপিং সাইকেলের ভেতর যারা পরস্পর ইন্টারেক্ট করতো, তাদের জিনই ভবিষ্যত প্রজন্মে হস্তান্তরিত হতো, আর এভাবে এ স্লিপিং সাইকেলের ভেরিয়েশন আমাদের পূর্বসূরীদের হিংস্র প্রাণীদের কবল থেকে রক্ষা করেছিল। আমরা জানি যে জিন স্বার্থপর। আর তার উদ্দেশ্য নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। গ্রুপের অন্য সদস্যদের সাহায্য করাটা অবশ্যই তার স্বার্থের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক কিন্তু আপনাকে এটাও মনে রাখতে হবে যে, আপনি যদি আপনার চারপাশের মানুষকে ঘুমানোর সময় নিরাপত্তা প্রদান না করেন তবে তারাও আপনাকে ঠিক একই সময় সকল প্রকার সতর্ক বার্তা প্রেরণ থেকে বিরত থাকবে; আর এভাবে আমাদের পূর্বসূরিরা যদি প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রতি জিনগত স্বার্থপর আচরণ করতো তবে তারা গণ বিলুপ্তির সম্মুখিন হতো, কেউ কারো জিনকে ভবিষ্যত প্রজন্মে স্থানান্তর করতে পারতোনা! আমরা যদি সেলফিশ জিন তত্ত্বের আলোকেও চিন্তা করি তবেও গ্রুপের ভিন্ন ভিন্ন সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন স্লিপিং সাইকেল জেনেটিক্যাল সেন্স তৈরি করে! আর আমরা এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারি যে, কেনো ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ঘুমের প্রবণতা বিবর্তিত হয়েছে! অতএব “আমি হবো সকাল বেলার পাখি” এ কবিতাটি বৈজ্ঞানিকভাবে মিসগাইডিং একটি কবিতা। শিশুদের জন্ম থেকে এত মারাত্মক অপবিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে! কেউই আসলে ইচ্ছে করে সকাল বা রাতের পাখিতে পরিণত হয়নি ; এর পেছনে কাজ করছে তার জেনেটিক্যাল হার্ডওয়্যার যার উপর তার নিজের সচেতন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ।

তথ্যসূত্রঃ

hsbd bg