ব্রেন কি কমিউনাল চিন্তার জন্য অভিযোজিত?

ব্রেন কি কমিউনাল চিন্তার জন্য অভিযোজিত?

Last updated:

আমরা দেখেছি যে , চিন্তা বিবর্তিত হয়েছে কমপ্লেক্স একশনকে সাপোর্ট করার জন্য। মন ইনফরমেশন প্রসেস করে আর এ জন্য একজন ব্যক্তি কাজ করতে পারে। আর আমরা এটাও দেখেছি যে,  আমাদের মন তার প্রসেসিং- এর জন্য পরিবেশকে ব্যবহার করে। এ মহাবিশ্ব আমাদের মস্তিষ্কের ইনফরমেশন প্রক্রিয়াজাত করার জন্য মেমরি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু একজন স্বতন্ত্র থিংকার বেশ ভালোই করতে পারে। প্রকৃতিতে আমরা দেখি অসংখ্য ব্যক্তির কো-অর্ডিনেশনে কমপ্লেক্স আচরণ নির্গত হয়। যখন Multiple Cognitive System একসাথে কাজ করে, গ্রুপ ইন্টিলিজেন্স বের হয়ে আসে যা একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি যতটা করতে পারে তা ছাড়িয়ে যায়।

মৌমাছি একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত। একটি মৌচাক চমৎকার ভাবে অত্যন্ত জটিল। এটি এর নির্দিষ্ট অংশগুলোর চাইতে অনেক বেশি জটিল। একটি মৌচাক যে সুবিধা গ্রহণ করে এটি একটি কর্পোরেশনের সমরূপঃ একটি কলোনিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে। এখানে আছে কর্মী; নারী যিনি মৌচাক প্রতিরক্ষা করে, নেক্টার ও পোলেন সংগ্রহ করে, শীতের জন্য খাদ্য সরবরাহ করার জন্য মধু তৈরি করে। মোম তৈরি করে যেখানে খাদ্য মজুত থাকে এবং লার্ভাকে খাবার প্রদান করে। এখানে রয়েছে রানী, যিনি নতুন কলোনি তৈরি করে, তারপর মেট করে এবং ডিম প্রদান করে। এবং আছে ড্রোনস, যারা কলোনি ত্যাগ করে আর অন্য কলোনির কোন নারীর সাথে মেটিং করে। মৌচাকটিকে স্বয়ং যত্মের সাথে অর্গানাইজড করা হয়। মধু ও পরাগ মৌচাকের উপরিভাগে সংরক্ষণ করা হয়। নিন্মভাগের দিকে লার্ভার জীবন উন্নত করা হয়, যেখানে যে কেউ কর্মী, ড্রোন ও রানীকে উন্নত করার জন্য আলাদা আলাদা স্থান পায়। মৌচাক অজস্র সমস্যা সমাধান করে পারস্পরিক সহযোগীতার মাধ্যমে। কর্মীরা খাবার সংগ্রহ ও জমা করে মৌচাককে সমর্থন দেয়ার জন্য শীতকালে যখন পরাগ ও মধু দুর্লভ হয়ে যায়। কর্মীরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকেও মৌচাক রক্ষা করে, তারা নিরাপত্তা প্রদান করে খাদ্য ও তরূণদের। যখন রানী অন্য কোনো কলোনির ড্রোনদের সাথে মেটিং করে তখন জেনেটিক ডায়ভার্সিটি তৈরি হয়। কোনো ব্যক্তি নিজেকে রক্ষা করেনা। কর্মীরা মেট করেনা। ড্রোনরা নিজেদের খাবার পরিবেশন করেনা। রানী তাদের সন্তানদের রক্ষা করেনা। প্রতিটি ব্যক্তির রয়েছে করার জন্য নিজস্ব কর্ম যে যে বিষয়ে এক্সপার্ট। কর্মীরা এটাও জানেনা যে তারা কর্মী। ড্রোনরা জানেনা যে তারা ড্রোন। আমাদের মস্তিষ্কের প্রায় একশত বিলিয়ন সেল যেমন পৃথকভাবে কেউই মহাবিশ্ব ও তাদের নিজেদের অস্তিত্ব জানেনা ঠিক তেমনি মৌমাছিরাও পৃথকভাবে কোনো সেল্ফ অব সেন্স তৈরি করতে পারেনা। তারা তাদের জব করে কারণ বিবর্তন তাদের এভাবেই প্রোগ্রাম করেছে এসব কাজ করার জন্য, সম্পূর্ণ ব্যাপারটি আমাদের মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কের মতো কাজ করছে কারণ প্রতিটি ব্যক্তি স্বতন্ত্রভাবে সম্পর্কযুক্ত সরল অংশগুলো নিয়ে কাজ করছে একটি নিদারুণ জটিল কর্ম ব্যবস্থাপনায়। একজন ব্যক্তি মানুষ একটি ব্যক্তি মৌমাছি থেকে বেশ স্মার্ট। আবার অন্য একটি ডায়মেনশনে মৌমাছি ও মানুষের মধ্যে খুব কমন একটি ব্যাপার আছেঃ আমরা উভয়েই মাল্টিপল সত্তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করি একটি Massive Intelligence Generate করার জন্য। মানুষ এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে কমপ্লেক্স ও শক্তিশালী প্রজাতি আর এর কারণ কোনো ব্যক্তি মস্তিষ্ক নয়, এর প্রকৃত কারণ হলো যে কমিউনিটি ব্রেন একসাথে কাজ করছে!

মাঝেমাঝে অনেকে প্রশ্ন করে, কেনো, মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশের কাজ আলাদা আলাদা? কেনো লেফট ও রাইট ব্রেন একে অন্যের সাথে কন্ট্রাডিক্ট করে? কেনো এক এক ধরণের স্মৃতি হিপ্পোক্যাম্পাসের এক এক জায়গায় সংরক্ষিত হয়? এর উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে মৌচাক সম্পর্কে বুঝতে হবে। একটি মৌচাকের পেছনে কর্মী, ড্রোন ও রানী আলাদা আলাদা দায়িত্ব পালন করে, কারণ এদের প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য বিবর্তিত, আমাদের মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশ ড্রোন ও কুইনের মতো আলাদা আলাদা কাজ সম্পাদনের জন্য বিবর্তিত হয়েছে লাখ লাখ থেকে মিলিয়ন বছর আগে। ড্রোনরা সেক্স করার সময় গণহারে মারা যায় কিন্তু এতে মৌচাকের উপর কোনো প্রভাবই পড়েনা, কর্মীরা সেক্স করেনা, তারপরও মৌচাকের উপর কোনো প্রভাব পড়েনা কারণ মৌচাক কোনো নির্দিষ্ট অংশের নির্দিষ্ট কোনো কাজের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়।

আমাদের মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশ যদি আলাদা আলাদা কাজ না করতো তবে কোনো দুর্ঘটনায় একটি অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হলে আমাদের পূর্বসূরীদের মস্তিষ্ক পরিবেশের সাথে নিজেকে অভিযোজিত করতে পারতোনা,  এ জন্য লেফট হেমিস্ফিয়ার ডেমেজ হলেও আমরা রাইট হেমিস্ফিয়ার দিয়ে ঠিকই কাজ চালিয়ে যেতে পারছি, আমাদের ব্রেন যদি মৌমাচির সিস্টেম অনুসরণ না করত তবে আমরা বহুপূর্বেই বিলুপ্ত হয়ে যেতাম। মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশ সম্পর্কযুক্তভাবে টিকে থাকার উদ্দেশ্যেই বিবর্তিত হয়েছে। আর এজন্য মস্তিষ্কের দুটি অংশকে আপাত দৃষ্টিতে কন্ট্রাডিক্টরি মনে হলেও তারা মূলত টিকে থাকার উদ্দেশ্যেই কাজ করছে। এ জন্য Split Brain আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর না জানলেও Excuse প্রদর্শন করে, আমাদের ব্রেন মূলত একটি সার্ভাইভাল মেশিন। আর ব্রেন সায়েন্স নিয়ে কাজ করার সময় আমাদের অবশ্যই এ গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি মনে রাখতে হবে।

যৌথ শিকার (The Community Hunt)

একটি প্রজাতির টিকে থাকা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। খাদ্য উৎপাদন তার মধ্যে একটি। ঊনিশ শতকের  এনথ্রোপোলজিক্যাল রেকর্ড এমনকিছু আবিষ্কার দ্বারা পরিপূর্ণ যা আমাদের বলছে, আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষরা ছিল মহান শিকারি। বিশ্বের চারপাশে মহান মহান হাড়ের টুকরা পাওয়া গেছে, আফ্রিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকা__ আর এসব হাড়ের টুকরো আমাদের বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করছে, আমাদের পূর্বসূরিরা ছিলেন এক একজন কষাই।

প্রাচীন মানুষরা সবকিছু হত্যা করেছে এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বিরাট বিরাট প্রাণীদেরও। ম্যামথ, এলিফ্যান্ট, অরোক অথবা বাইসন কেউই মুক্তি পায়নি সেপিয়েন্সের থাবা থেকে। মানুষ এত দক্ষ ও সফল শিকারী যে আজ পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাণী বিলুপ্তির পেছনে এদেরই হাত।

Early Humans | HISTORY Channel

আমাদের এ ভয়ানক পূর্বসূরিরা শিকারে এতটাই দক্ষ ছিল যে তারা তাদের থেকেও অনেক গুণ বিরাট প্রাণী শেষ করে দিয়েছে। মানুষের উদয়ের পূর্বে শিকারের সাফল্য নির্ধারিত হতো উচ্চতর শারীরিক ক্ষমতা দিয়েঃ শক্তি, আকার ও গতি। আর তারপর আকস্মিক মানুষের মস্তিষ্কের ইলেক্ট্রিক্যাল ফিল্ডে চিন্তা জেগে উঠে আর খুব আকস্মিকই একটি বড় বাসের মতো এটি স্বল্প সুরক্ষা প্রদান করতে থাকে। প্রত্নতত্ববিদ ও নৃতাত্বিকরা কিছু পদ্ধতি পূনর্গঠন করেছিলেন যা প্রাচীন মানুষরা তাদের এ সুবিশাল অর্জনে ব্যবহার করেছিল। যে বিষয়টি পরিস্কার ছিল সেটি হলো শিকার হলো একটি ‘’কমিউনাল এন্টারপ্রাইজ’’__ যেখানে পারস্পরিক শ্রমের ভেতর সমন্বয় ও বিভক্তি প্রয়োজন ছিল। কমিউনাল শিকার ছিলো উচ্চমাত্রিকভাবে জটিল ও সুসন্বিত, যেখানে এক ডজন অংশগ্রহণকারী জড়িত ছিল। কিন্তু এখানে পে-অফ ছিল প্রচুর। শিকারীরা মাঝেমাঝে বিপুল সংখ্যক বড় প্রাণী শিকার করতো একটি নির্দিষ্ট অভিযানে যার মাধ্যমে তারা কয়েক মাসের জীবিকা নির্বাহ করতো। নৃবিজ্ঞানী জন স্পেথ আলোচনা করেন, ওয়েস্টার্ন নর্থ আমেরিকায় শেষ বরফ যুগের অন্তিম দিকে কমিউনাল বাইসন শিকার হতো যেটাকে বলা হয় The late Pleistocene (পাইলোসিন) ! মানব শিকারীরা বাইসনের পালকে মাঝেমাঝে কয়েক মাইল তাড়া করতো এবং সেখানে নিয়ে যেতো যেখানে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারিত। মাঝেমাঝে তাদেরকে খাড়া বাঁধের কাছে সুপরিকল্পিতভাবে নিয়ে যাওয়া হতো যা প্রাণীদের মৃত্যুর দিকে পতিত হতে বাধ্য করে। শিকারের জন্য প্রয়োজন ছিল দক্ষ, সতর্ক, পরিকল্পিত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। শিকারের নেতৃত্ব প্রদান করতো কোনো শামান যিনি বাইসনের আচরণের উপর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছিল। পালের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শামানদের বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন হতো যা সৃষ্টি হতো বহু বছরের নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলনের ভেতর দিয়ে। বাইসনকে বোকা বানানোর জন্য সে বাইসনের চামড়া পরিধান করতো যা প্রাণীদের প্রতারিত করতো তাকে নিজেদের একজন হিসেবে ভাবতে, একটি নেতৃত্বশীল প্রাণী। অন্যান্য কমিউনিটির সদস্যরা তার দেখানো রুটে পথ চলতো যেন প্রাণীদেরকে সঠিক ডিরেকশনে রাখা যায়। শিকারীরা যেখানে ফাঁদ রচিত হয়েছে সেখানে অপেক্ষা করতো যেন সুযোগ বুঝেই প্রাণীটিকে হত্যা করা যায়। পুরো ব্যাপারটি অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে সাজানো হতো, শিকারের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ ধবংস হয়ে যেতো যদি তারা মানুষের দেহের ঘ্রাণ কোনোভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং তারা সন্দেহপ্রবন হয়ে উঠতো। শিকারের একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল প্রাণীটিকে হত্যা করা। একবার যখন পশুটিকে জবাই করা হতো, কষাইরা তার মাংস সংগ্রহ করে রাখতো। এটা ছিল তাদের প্রধান পদক্ষেপ। একবার কষাইদের সেই পরিশ্রমের কথা চিন্তা করুন। কয়েক ডজন বাইসন আর যাদের প্রত্যেকের ওজন ৩,৫০০ পাউন্ড। এ জন্য সম্পূর্ণ কমিউনিটির সুসম্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হতো। সুস্পষ্টভাবে শিকার করার জন্য ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজনীয়। একটি কার্যকরী যন্ত্র তৈরি করার জন্য, হুমকির মুখে প্রাণিদের আচরণ প্রেডিক্ট করার জন্য, জবাই ও সংরক্ষণ করার জন্য। কিন্তু এসবের কোনোটাই অসংখ্য বাইসনকে একসাথে শিকার করার জন্য যথেষ্ট ছিলোনা। কোনো ব্যক্তির পক্ষে এটা একা সম্ভব ছিলনা। যা একমাত্র এটাকে সম্ভব করে তুলতে পারে তা হলো জ্ঞানগত শ্রমকে ভাগ করে দেয়া। কমিউনিটির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিটি ব্যক্তি দক্ষ ছিল। শামানরা সময় ও শক্তি অপচয় করতো বাইসনের পালের চরিত্রকে বোঝার জন্য। কিন্তু এটা একমাত্র সম্ভব ছিল কারণ কমিউনিটির অন্যান্য সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করতো। বর্শা চালানো, জবাই করা ও আগুন জ্বালানো। যখনই জ্ঞানগত শ্রমকে ভাগ করে দেয়া হতো তখনই একমাত্র তারা অভাবনীয় কিছু অর্জন করতো।

Comparing the Paleolithic and Neolithic Eras

জ্ঞানগত বিভাজনের এই অভাবনীয় অর্জনের দিকটি আমরা কোনো একটি বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের সময়ও দেখতে পাই। একটি আধুনিক বাড়ি নির্মান করার জন্য ইনডোর প্লাম্বিং, ইনসুলেটর, টেম্পারেচার কন্ট্রোল, ফুল সার্ভিস কিচেন এবং হোম এনটারটেইনমেন্ট সিস্টেম প্রয়োজন, আর এ জন্য প্রয়োজন গ্রুপের সামষ্টিক প্রচেষ্টা। আপনি কল্পনা করুন একটি বাড়ি নির্মানের জন্য সার্ভেয়র, ফার্মার, ব্রিকলেয়ার, রোফার, প্লাম্বার, ড্রাইওয়াল এবং উইন্ডো ইনস্টলার প্রয়োজন এছাড়া প্রয়োজন কার্পেন্টার, পেইন্টার, প্লাস্টারার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, কেবিনমেকার, ল্যান্ডস্ক্যাপার এবং কার্পেট ইনস্টলার। হয়তো কিছুকিছু ব্যক্তি একের অধিক কর্ম জানে কিন্তু কেউই সব কাজ একা করতে পারেনা। আমরা প্রাচীন মিশরের পিরামিডের কথা বলি অথবা আধুনিক স্কাইস্ক্রেপার__ কোনটাই আসলে কগনিটিভ ডিভিশন ছাড়া সম্ভব নয়। আমরা যদি মধ্যযুগীয় ক্যাথেড্রালগুলোর কথা বলি তাহলেও দেখা যায় ক্যায়ারমেন, প্লাস্টারার, মর্টার মেকার ও ম্যাসন প্রয়োজন। এছাড়া প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষক, স্থপতি এবং নকশা প্রস্তুতকারী। আর এ ক্যাথেড্রালগুলো তৈরি করতে মাঝেমাঝে কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দীর প্রয়োজন হতো। অধিকাংশ কর্মীই তাদের জীবদ্দশায় কর্মের শেষ পরিণতি দেখে যেতে পারতেননা। এই যে সমষ্টিগত প্রচেষ্টা (Communal Effort) ও মালিকানা আমাদের নিকট ব্যাখ্যা করে কেনো এই ক্যাথেড্রালগুলি সমস্ত বিশ্বব্যাপী এত জাঁকজমকপূর্ণ, সৌন্দর্যমণ্ডিত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। স্পেস-এক্স কোনো ব্যক্তির একার প্রচেষ্টার ফসল নয়, নাসা কোন স্বতন্ত্র ব্যক্তির প্রচেষ্টার ফলাফল নয়।

এ সকল উদাহরণ আমাদের মনের একটি মূল বিষয় ব্যাখ্যা করে; একাকী সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে আমাদের মন বিবর্তিত নয়। এটি বিবর্তিত হয়েছে সামগ্রিক সহযোগীতার ( Group Collaboration) প্রতি লক্ষ্য রেখে, আমাদের চিন্তা বিবর্তিত হয়েছে ইন্টারডিপেন্ডেডলি, আমরা যেনো অন্যের চিন্তার সাথে আমাদের চিন্তাকে সংযুক্ত করে অপারেট করতে পারি। এটা অনেকটা মৌচাকের মতো, প্রতিটি ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট ডোমেইনের মাস্টার, গ্রুপ ইন্টিলিজেন্স এর অংশ গুলোর সমষ্টি থেকে অনেক বেশিকিছু।

ব্রেনিনেস

Braininess

মানব সভ্যতার আদিম পূর্বসূরিদের থেকে মানুষের বিবর্তন ছিল বিবর্তনীয় টাইম স্কেলে চুড়ান্তভাবে দ্রুত। আফ্রিকাতে হোমো জিনাস প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে ২-৩ মিলিয়ন বছর পূর্বে, যেখানে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে ২০০, ০০০ বছর পূর্বে। হিউম্যানিটির সবচেয়ে বড় ঝাপটি ছিল জ্ঞানীয় বিবর্তনের সময়ে। আধুনিক মানুষরা তাদের অতীত পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক দ্রুতগামী; তাদের উপযোগিতা ছিল মস্তিষ্কের আকারে। আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের ম্যাস তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনগুণ বড়। নৃতাত্বিকরা মস্তিষ্কের এ দ্রুততর বৃদ্ধিকে বলেছেন, এনসেফালাইজেশন ( Encephalic শব্দটি ব্রেনের সাথে সম্পর্কযুক্ত) । এ ধরণের দ্রুততর বৃদ্ধি বিবর্তন তত্ত্বে একপ্রকার বিভ্রম তৈরি করেছে। বড় ব্রেন খুবই ব্যায়বহুল যা প্রচুর পরিমাণ এনার্জি খরচ করে। কারণ এখানে শুধু সসীম পরিমাণ এনার্জি রয়েছে, আমাদের শরীর  ভৌতভাবে অনেক দূর্বল হয়ে গেছে মস্তিষ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে যেয়ে। আর এছাড়া বড় মস্তিষ্ক মানে বড় মাথার খুলি যেটা সমসাময়িকভাবে খুবই পেইনফুল, বিশেষ করে সন্তান জন্ম দেবার সময়। এত ক্ষতি থাকার পরও আমরা কিভাবে এত দ্রুততর ও স্মার্ট হয়ে উঠেছি? মানব মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণের এ ব্যাপারটিকে আমরা কয়েকটি পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করতে পারি। ইকোলোজিক্যাল থিয়োরি দাবি করছে যে, মূলত পরিবেশের সাথে ব্যক্তি নিজেকে অভিযোজিত করার জন্যই তার মধ্যে বড় মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে। যেমন- শক্ত কোন খোলস বা চামড়া থেকে ফল বের করে আনা হয়তো স্মার্টার মানুষ হতে কোন উপযোগিতা দিয়েছিল। তারা হয়তো অন্যদের থেকে বেশি ক্যালোরি সংগ্রহ করতে পেরেছিল। আবার হয়তোবা বড় কোনো এরিয়ায় মেন্টাল ম্যাপ তৈরি করার ক্ষমতা সেখানে রোমিং করার ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো উপযোগীতা দিয়েছিল যার ফলে আমরা অধিক খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছি আর এটা আমাদের পূর্বসূরিদের ফিটনেস বৃদ্ধি করে দিয়েছিল। যেখানে ইকোলজিক্যাল হাইপোথেসিস ব্যক্তির ক্যাপাসিটির প্রতি ফোকাস করছে সেখানে একটি প্রতিযোগী থিয়োরি ফোকাস করছে, মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তনের ড্রাইভিং ফোর্স হলো মাল্টিপল কগনিটিভ সিস্টেমের সাথে কো-অর্ডিনেশন যার মাধ্যমে তারা জটিল ও পারস্পরিকভাবে ভাগ করা লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে। এটাকে বলা হয় সোশ্যাল ব্রেন হাইপোথিসিস। এ হাইপোথেসিস অনুসারে মস্তিষ্কের বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির সাথে গ্রুপের আকার ও জটিলতা বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক আছে। সোশ্যাল ব্রেন হাইপোথেসিস দাবি করছে যে, জ্ঞানীয় চাহিদা ও টিকে থাকার উপযোগিতা একটি গ্রুপের সাথে এসোসিয়েটেড যেখানে আমরা বাস করি যা স্নোবল ইফেক্ট তৈরি করেঃ গ্রুপ যত বড় হবে এবং জটিল থেকে জটিলতর জয়েন্ট বিহেভিয়ার উন্নত হবে, ব্যক্তির মধ্যে ততই নতুন নতুন ক্যাপাবিলিটি তৈরি হবে সে আচরণকে সমর্থন করার জন্য। আর এ নতুন দক্ষতার কারণে গ্রুপ আরও বেশি বড় হয়ে যেতো আর এতে করে গ্রুপের আচরণ আরও জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠতো।

শিকার ছিল একটি কো-অর্ডিনেটেড একটিভিটি যা সময়ের সাথে ক্রমবর্ধমানভাবে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছিল। আমাদের প্রাচীন পূর্বসুরিরা যথেষ্ট স্মার্ট ছিল একটি ব্যক্তি শিকারকে অবরোধ ও তার পালানোর পথ বন্ধ করে দেবার জন্য। সহস্রাব্দ সময় লেগেছিল কমিউনিটি যথেষ্ট জটিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যখন তাদের কো-অর্ডিনেটেড একভিটি প্রয়োজন ছিল, শিকার ধরা, জবাই করা, কয়েক ডজন বাইসন নৃশংসভাবে হত্যা করার জন্য। শিকার সম্ভবত, মানব সভ্যতার বিবর্তনের একটি ইনস্ট্রুমেন্টাল ছিল।

এনথ্রোপোলজিস্ট রবিন দানবার এ প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্ব__ ইকোলজিক্যাল হাইপোথেসিস ও সোশ্যাল ব্রেন হাইপোথেসিসের উপর টেস্ট করেন, আর এজন্য বিভিন্ন প্রজাতির প্রাইমেটদের ইনফরমেশন সংগ্রহ করেন। তিনি বিভিন্ন প্রাইমেটদের ব্রেন সাইজ, সংশ্লিষ্ট পরিবেশ এবং সেখানে তাদের ভুখন্ডের বিস্তৃতি এবং ডায়েট্রি হেভিট এবং তাদের সমাজের এভারেজ গ্রুপ সাইজ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। আর এখান থেকে বেরিয়ে আসে যে গ্রুপ সাইজ ও ব্রেন সাইজ আসলে একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে সকল প্রাইমেট বড় গ্রুপে বাস করে তাদের ব্রেন বড়।

আর অন্যদিকে এনভায়রনমেন্ট ও ডায়েট ব্রেন সাইজের সাথে সম্পর্কহীন। এ আবিষ্কার সমর্থন করছে যে, বড় মস্তিষ্ক আসলে একটা বিশেষভাবে উপযুক্ত কমিউনিটিতে বসবাস করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তির দক্ষতাকে সমর্থন প্রদান করার জন্য। ভাষা জটিল মেন্টাল প্রসেসের সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ যা বিবর্তিত হয়েছে অন্যান্য মানুষের সাথে কো-অর্ডিনেট হওয়ার জন্য। অনেক প্রজাতি সরল কমিউনিকেশন করতে পারে। মৌমাছিরা ফুলের লোকেশন অন্যদের সাথে শেয়ার করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নেক্টার সরবরাহ করার মাধ্যমে যে প্রক্রিয়ার সাথে নৃত্য ও ফেরোমন নিঃস্বরন অন্তর্ভুক্ত। মৌচাকের সফলতা নির্ভর করে যোগাযোগের উপর। বিপুল সংখ্যক সদস্য আশাব্যঞ্জক স্থান অনুসন্ধান করে এবং অন্যদের জানায় যদি তারা নতুন কোনো ট্রেজার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। তারা যা পেয়েছে তা জানানোর পর, তারা দলবদ্ধ হয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে সবচেয়ে প্রাচুর্যময় এলাকা। যোগাযোগই মৌচাককে এটি করতে সক্ষম করে তোলে। কিন্তু নৃত্য ও ফেরোমোনসের মাধ্যমে খুব অল্প পরিমাণ তথ্যই প্রেরণ করা যেতে পারে; সুস্পষ্টভাবে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষ গোল্ড মেডেল জিতেছে। যা মানুষের মাঝে দূরত্ব নির্ণয় করেছে তা হলো ভাষার মাধ্যমে তাদের নিরবিচ্ছিন্ন ধারণার কমিউনিকেশন যাদৃচ্ছিক জটিলতায়। সকল প্রাণী যারা এক গুচ্ছ শিকার করতে পারে তারা হয়তো একে অন্যের সাথে যথেষ্ট যোগাযোগ করতে পারে তাদের আচরণ সমন্বয় করার মাধ্যমে। কিন্তু যে সকল শিকার আমাদের প্রাচীন পূর্বসুরিরা করেছে তার জন্য আরও অধিক কমপ্লেক্স আইডিয়ার মসৃণ কমিউনিকেশন দরকার; স্থানিক ধারণা নির্দেশ করছে শিকারের লোকেশন, যেখানে তারা পশুর পালকে অনুসরণ করছে আর এজন্য প্রয়োজন জটিল যুক্তিবিচার কিভাবে পালকে পরিচালনা করবে, জবাই ও হত্যা করবে, বলা বাহুল্য যে ভাষা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যে প্রাইজ তারা অর্জন করছে তা কিভাবে ভাগ করবে তা আলোচনার জন্য।

আমরা যদি একসাথে শিকার করি তবে আমরা একে অন্যকে জানতে পারবো। আমি আপনার ইনটেনশন সম্পর্কে শুধু ভাষার মাধ্যমেই নয়, আমি আপনার কর্মের যুক্তিবিচারের ভেতর দিয়েও আপনার সম্পর্কে জানতে পারবো। আমি যদি দেখি আপনি আপনার ধনুক উঁচু করেছেন এবং বাইসনের দিকে তীর নিবদ্ধ করেছেন তবে এটা আমার জন্য খুবই প্রাকৃতিক আপনার প্লান অনুমান করা যে আপনি এখন একটি বাইসনকে স্যুট করতে যাচ্ছেন। এ ধরণের অনুমান তৈরি করার জন্য আপনার বিস্ময়কর মাত্রার মেন্টাল মেশিনারী প্রয়োজন। আমি আপনার ইনটেনশন( বাইসনের দিকে তীর নিক্ষেপ) বোঝার জন্য ব্যাকওয়ার্ড রিজনিং ( ধনুক উত্তোলন ও তীর নিবদ্ধ) করতে পারবো। আর এর মাধ্যমে আমি আপনার আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাস( যেমন আপনি মনে করছেন যে আপনি বাইসনটি শিকার করতে পারবেন) সম্পর্কে জানতে পারবো। আর এটাও প্রয়োজনীয় আপনার ক্যারেক্টার সম্পর্কে জানা ( যে আপনি নৈতিক ভাবে বাইসনটিকে হত্যা করার সময় সংশয়বোধ করছেন কি না)। আমি যদি আপনাকে বাইসনটিকে তীর নিক্ষেপ করার সুযোগ দেই তার মানে এই যে আমি আপনাকে একজন সহযোগী হিসেবে বিশ্বাস করি , আপনি অবশ্যই বাইসনের মাংস নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবেননা। মানুষ একে অপরের সম্পর্কে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এ সকল যুক্তিবিচার করতেই থাকে সবসময় কোনোপ্রকার প্রচেষ্টা ছাড়াই।। মানুষ নিশ্চিতভাবে আলাদা করতে পারে কতটা ভালোভাবে  তারা অন্যের ইনটেনশন উদঘাটন করতে পারে এবং মেন্টাল স্টেটস কিন্তু প্রত্যেকেই কিছু না কিছু হারে এটি করতে পারে। কুকুরও এক্ষেত্রে বেশ ভালো যদিও তেমন ভালো না। কোনো কুকুরই আপনার ধনুক ও তীরের পয়েন্টিং দেখে অনুমান করতে পারবেনা যে আপনি একটি বাইসনকেই হত্যা করতে যাচ্ছেন। অন্যান্য মানুষের মেন্টাল স্টেট সম্পর্কে যুক্তি তৈরি করার ক্ষমতা গ্রুপে একসাথে কাজ করার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইনটেশনালিটি

অন্যরা কি করছে তা পড়ার চেয়ে মানুষ আরও ভালো কিছু করতে পারে। মানুষের সে সক্ষমতাও রয়েছে যা অন্য কোনো মেশিন বা কগনিটিভ সিস্টেমের পক্ষে করা সম্ভব নয়। মানুষ অন্যদের সাথে নিজের ইনটেনশান শেয়ার করতে পারে। মানুষ যখন একে অন্যের সাথে ইন্টারেক্ট করে তারা শুধু নিছক একই ইভেন্টের অভিজ্ঞতা অর্জন করেনা, তারা এটাও জানে যে তারা একই ইভেন্ট শেয়ার করছে। এবং তারা যে একে অন্যের সাথে তাদের ইনটেনশন শেয়ার করছে এ জ্ঞান তাদের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত পরিবর্তন হয়; তারা কী করবে এটি সেটাও পরিবর্তন করে দেয় এবং অন্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তারা কি অর্জন করবে। গ্রুপ কগনিটিভ শ্রম বিভাজনের এই সহযোগীতাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এটেনশন শেয়ারিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। একবার যখন আমরা আমাদের এটেনশান শেয়ার করি, আমরা আরও অনুপ্রেরণাদায়ক কোনোকিছু একটা করতে সমর্থ হই, আমরা একটি সাধারণ প্রেক্ষাপট শেয়ার করি। আমরা এমনকিছু জানতে পারি যা আমরা জানি অন্যরা জানে এবং আমরা জানি যে তারা জানে আমরা যা জানি।

জ্ঞান শুধুমাত্র ডিস্ট্রিবিউটেড, এটি বিভক্ত। যখন জ্ঞান এ পদ্ধতিতে বিভাজিত হয় তখন আমরা ইনটেনশনালিটি শেয়ার করি; আমরা যৌথভাবে একটি সাধারণ লক্ষ্য অর্জন করি। একটি বেসিক হিউম্যান ট্যালেন্ট হলো অন্যদের সাথে ইনটেনশন শেয়ার করা যে জন্য আমরা কোনো একটি বস্তু সহযোগীতামূলকভাবে অর্জন করতে পারি। তারা অন্যদের সাথে সম্পৃক্ত হয় সামগ্রিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে। এ ধারণাটির অনেকটাই এসেছে রাশিয়ার মনোবিজ্ঞানী লেভ ভাইগটস্কি থেকে। যিনি বিশ শতকের প্রথমদিকে এ ধারণার উন্নয়ন করেন যে মন একটি সামাজিক এন্টিটি। ভাইগটস্কি দাবি করেন যে, কোনো ব্যক্তির ব্রেন পাওয়ার মানব সভ্যতাকে অন্যদের চেয়ে পৃথক করেনি। এর কারণ হলো মানুষ অন্য মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিখতে পারে এবং তারা সহযোগিতা করেঃ তারা অন্যান্য কালেক্টিভ এক্টিভিটিজের সাথে সম্পৃক্ত হয়। ভাইগটস্কির এ ধারণাই কমিউনিটি অব নলেজের মূল চাবিকাঠি।

জার্মানি মাইপজিগের, ম্যাক্সপ্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের মাইকেল টমাসেলো এবং তার সহকর্মীরা যারা ইভোলুশনারি এনথ্রোপোলজি নিয়ে কাজ করছেন তারা কিভাবে শিম্পাঞ্জি ও শিশুরা ইনটেনশনালিটি শেয়ার করে এ ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করে আসছেন। কেনো শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠে যারা শিল্প ও সাহিত্যে অংশগ্রহণ করে, উচ্চশিক্ষা ও জটিল মেশিনারি এমনকি বৈধ গাঁজা সেবন, বোরবন, দেশীয় সংগীত এবং ওয়েস্টার্ন মিউজিক আর অথচ শিম্পাঞ্জিরা এখনো ঠিক একইরকম জীবনযাপন করে তারা যা প্রথমেই করে এসেছিল?

একটি পর্যবেক্ষণের কথা বিবেচনা করুন, একজন বৃদ্ধ ও শিশু একটি কক্ষে অবস্থান করছিল যেখানে ছিল ক্ষুদ্র একটি অস্বচ্ছ বালতি। শিশুটি দেখলো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিটি তাকে বালতির দিকে কিছু একটা নির্দেশ করছে, যদি প্রাপ্ত বয়স্করা নীল কিছুর দিকে নির্দেশ করে শিশুরা বিভ্রান্ত হয়। ঐ লোকটি আসলে কী বোঝাতে চায়? সে কী বালতির আকার, রঙ, উপাদান অথবা অন্য কোনোকিছুর প্রতি ইঙ্গিত করছে? এবার ভাবুন দুজন একটি গেম খেলছে। বয়স্ক লোকটি কোনোকিছু একটা শিশুটির কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলল যেনো সে খুঁজে বের করতে পারে। বয়স্ক লোকটি যখন বালতির দিকে ইঙ্গিত করে তখন শিশুটি তার ইনটেনশন বুঝতে পারে, সে বোঝে কোথায় থেকে অবজেক্টটি খুঁজে বের করা যাবে। গবেষকরা দেখেন যে, এমনকি চৌদ্দ মাসের শিশুও এ কাজটি ভালো করতে পারে, তারা এ পরিস্থিতিতিতে বৃদ্ধ লোকটির ইনটেনশান বুঝতে পারে। শিম্পাঞ্জি ও অন্যান্য এপসরা এ কাজটি কোনো বয়সেই করতে পারেনা।

এপসরা খুবই জটিল কিন্তু তারা মানবীয় ইনটেনশন শেয়ার করেনা। এপসরা মানুষের দৃষ্টিকে অনুসরণ করতে পারে তারা কি দেখছে কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারেনা যে মানুষ আসলে কি নির্দেশ করছে যখন তারা একসাথে খেলে। তারা সে অবজেক্টের কাছে পৌছাতে পারেনা আর বুঝতে পারেনা যে মানুষ একই অবজেক্টের কাছেই পৌঁছে গেছে। এপস চিন্তা করতে পারেনা। এপ এটা চিন্তা করতে পারেনা যে, হুম, মানুষ আমাকে এমনকিছু চিন্তা করছে ইঙ্গিত দিচ্ছে যা সে নিজেও চিন্তা করছে, সে অবজেক্ট সম্পর্কে যা নিয়ে আমরা অলরেডি খেলেছি। এপস এটা বুঝতে পারে যে মানুষ কিছু একটা অর্জন করতে চাইছে কিন্তু তারা তাদের ইনটেনশন ভাগ করার মাধ্যমে কোলাবোরেট করতে পারেনা যা তাদেরকে যৌথ ভাবে কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

আপনি এক্ষেত্রে ঈশারার কথা ভাবতে পারেন। ঈশারা মানব যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আমরা ঈশারার মাধ্যমে ইনফরমেশন প্রেরণ করি( কোন একটি মুভমেন্ট মিমিক্রি করার মাধ্যমে), আমরা সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারি (আমাদের বাহু উন্মোক্ত ও বন্ধ করার মাধ্যমে), আমরা অনুরোধ করতে পারি (হাত জোড় করার মাধ্যমে), নয়মাসের শিশুও কোন একটি অবজেক্টের কাছে জয়েন্টলি যাওয়ার জন্য বড়দের ঈশারা করতে পারে। আর অন্যদিকে শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে ঈশারা হলো শুধুমাত্র অন্যদের কিছু একটা বলা ও অনুরোধের প্রতিক্রিয়া জানানো। মানব ঈশারার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি একই ওয়েভল্যাংথ পেতে পারে; আর এপসের অঙ্গভঙ্গি হলো কোন একটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য অঙ্গভঙ্গি।

আর একটি গবেষণায় টমাসিলো আর তার সহকর্মীদের একজন বৃদ্ধ পরীক্ষক ছিলেন যিনি শিশুদের সাথে কোনো একটি কাজ করার জন্য প্রথমে একত্রিত হন আর পরে তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু শিশুটি বারবার পরীক্ষককে পরীক্ষাটি পূনরায় করার জন্য অনুপ্রাণিত করতে থাকে। কিন্তু একই কাজ যখন শিম্পাঞ্জির সাথে করা হয়, তারা পরীক্ষককে পরীক্ষাটির সাথে পূনরায় জড়িত হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেনি। শিশুরা এটি করে কিন্তু শিম্পাঞ্জি নয়। শিম্পঞ্জিরা শুধু একত্রিত হবার স্বার্থেই একত্রিত হয়। যেমন- একটি শিশুকে যদি আপনি ঘর বানানোর জন্য কিছু সরল উপকরণ প্রদান করেন, তবে সে বারবার এ কাজটিতে জড়িত হবে, তারা ঘরটি ভেঙে উপকরণগুলো দিয়ে আবার নতুন করে একটি স্ট্রাকচার নির্মান করবে কিন্তু শিম্পাঞ্জি কনসেপ্ট অব এনগেজমেন্ট বুঝতে ব্যার্থ হয়।

আবারও মানুষকে সক্ষমতার দিক থেকে আলাদা করেছে সে বিষয়টি যে জন্য তারা একে অন্যের সাথে কোনকিছু করার জন্য জয়েন্টলি এটেন্ড করতে পারে। মানুষকে তৈরি করা হয়েছে কোলাবরেটর করার জন্য। ইনটেনশনালিটি সাপোর্ট ভাগ করার ক্ষমতা মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষমতা; এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান সংরক্ষণ ও স্থানান্তর করার ক্ষমতা। এটা হলো তা যেটাকে নৃ-বিজ্ঞানীরা Cumulative Culture বলেছেন। এটি মানুষের সফলতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের সক্ষমতা ক্রমবর্ধমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটা এ জন্য নয় যে ব্যক্তি অনেক বেশি স্মার্ট হয়ে উঠছে। মৌচাকের সাথে বৈশাদৃশ্যমূলকভাবে, যা অনেকটা সেরকমভাবেই অপারেট করছে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে, আমাদের ভাগ করা প্রচেষ্টাগুলো আরও বেশি জটিল হচ্ছে, আমাদের ভাগ করা বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠছে অধিক ক্ষমতাবান।

আমরা মাঝেমাঝে মনে করি যে, সামাজিক দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা নেগেটিভলি সম্পর্কযুক্ত। প্রায় আশির দশকের সিনেমাগুলো চালু করুন, সেখানে আপনি একটি স্টেরিওটাইপিক্যাল পাবেন, একজন নির্বোধ চরিত্রের মানুষ যিনি গণিত ও ফিজিক্সে অত্যন্ত দুর্দান্ত কিন্তু সে বিপরীত লিঙ্গের সদস্যের সাথে একটি সিম্পল কথোকপথনও চালিয়ে যেতে পারেনা। এ ধরণের চিত্রগুলো ব্যক্তি ও গ্রুপ ইন্টিলিজেন্সের এক গভীর সংযোগের বিশ্বাস জন্ম দেয়। খুব শীঘ্রই আমরা জানতে পারবো, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে স্মার্ট সে ব্যক্তি যারা অন্যদেরকে বোঝার ক্ষেত্রে অনেক বেশি পারদর্শী।

আমাদের বিভাজিন কগনিটিভ ইভোলিউশনের চিত্র সর্বত্র। আপনি দেখুন, তরুণ শিশুরা কিভাবে ইন্টারেক্ট করে। তাদের অধিকাংশই সক্রিয়ভাবে গ্রুপ থিংকিং-এ অংশ নেয় বৃদ্ধ ও অন্যান্য শিশুদের সাথে। তারা গেম তৈরি করে, একটা নির্দিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করে, সমস্যা সমাধান করে এবং আপত্তি উপস্থাপন করে। বৃদ্ধরাও আসলে ভিন্ন নয়। আপনারা যদি একটি টেবিলের চারপাশে বসেন এবং জোক্স করেন, তবে সবাই সবাইকে রেসপন্স করতে থাকে। মাঝেমাঝে গ্রপে প্রভাবশালী একজন স্টোরি টেলার থাকে, যে গল্প বলে আর অন্যরা তাকে শোনে। কিন্তু অধিকাংশ গল্পের মধ্যে গ্রুপ ওয়ার্কিং কাজ করে। একটি জোক্স তখনই নির্গত হয় যখন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি তাদের ধারণা নিয়োগ করে এবং অন্যান্যদের মন্তব্যে স্বাধীনভাবে সম্পৃক্ত হয়। এটি শুধু বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার ক্ষেত্রেই নয়। গবেষকরা টেবিলের চারপাশে বসে, সাধারণত স্লাইড অথবা হোয়াইটবোর্ড নিয়ে, সবাই অল্প অল্প ধারণা ও জ্ঞান শেয়ার করে।। মাঝেমাঝে প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়, হাইপোথিসিস মিশ্রিত হয়, মতানৈক্য লিপিবদ্ধ হয়, কনসেনশাস সম্ভবত নির্মিত হয়, সবকিছুই মোটের উপর বিশৃঙ্খল পরম্পরা ও প্রতিক্রিয়া।

বিভিন্ন পরিবেশে সফলতার সাথে কোনোকিছু অর্জন করার জন্য এটি একটি সেরা উপায়। বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে সাধারণত একটি দল নিয়োগ করা হয় পেশেন্টের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। মেডিকেল প্রফেশনে বিভিন্ন ধরণের বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, সেবিকা, শিক্ষার্থী, প্রকৌশলি, ফার্মাসিস্ট ও কেয়ার ম্যানেজারের অস্তিত্ব রয়েছে যারা কোলাবরেটলি কাজ করে। এখানে কোনো সুস্পষ্ট লিডার নেই কিন্তু এখানে রয়েছে এক দল বিশেষজ্ঞ, সবচেয়ে ভালো ক্ষেত্রে এটি আমাদেরকে গ্রুপ ইন্টিলিজেন্স প্রদান করে যা অংশের চেয়ে অনেক বেশি। একটি বিমান পাইলট, কো-পাইলট, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং জটিল অটম্যাটেট ফ্লাইটের সাহায্যে চলাচল করে যেটি আধুনিক এয়ারক্রাফট ম্যানেজ করার জন্য বিরাট এক একটি অংশ। অজস্র গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আজ কমিউনিটি দ্বারা গৃহিত হচ্ছে। পলিটিক্যাল পলিসি ও বিচারকের রায় থেকে শুরু করে মিলিটারি ও স্পোর্ট পর্যন্ত __ আর এ জন্য এটা বলা যুক্তিসঙ্গত যে এগুলো নিয়ম। বিজ্ঞানের চুড়ান্ত পর্যায়ে জ্ঞান এতটাই পরিশীলিত যে বিশাল বিশাল দল প্রয়োজন এখানে অগ্রগতির জন্য। আপনি যদি ফান্ডামেন্টাল ফিজিসিস্ট হয়ে থাকেন তবে আপনি জানেন ২০১২ সালে হিগস বোসনের আবিষ্কার ছিল একটি বিশাল পদক্ষেপ, এমনকি প্রকম্পনকারী। এ আবিষ্কার বিজ্ঞানীদেরকে সবচেয়ে মৌলিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম করে তুলেছিল কিভাবে ফিজিক্যাল বিশ্ব কাজ করে। কিন্ত এ আবিষ্কার কে করেছিল? এ জন্য যদিও পিটার হিগস এবং ফ্রাসোয়া এঙ্গলার্টকে উপাধি দেয়া হয় যারা ২০১৩ সালে এ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য নোবেল পেয়েছিলেন। কিন্ত সত্য হলো এই যে হিগস বোসন হাজার হাজার বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা থেকে আবিষ্কার হয়েছে। প্রায় ৩০০০ মানুষ মূল ফিজিক্স পেপারের লেখক ছিল যারা এ আবিষ্কারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সে সকল ব্যক্তির নামও নেয়া হয়নি যারা ৬.৪ ইউএস ডলারের CERN সুপার কন্ট্রাডক্টর তৈরি করেছিল যেখানে হিগস বোসনের পর্যবেক্ষণ তৈরি হয়। কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তির পক্ষে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের একটি স্পেশিয়ালাইজড টাস্ক সম্পাদন করাও স্পম্ভব নয়। তারা জানে কিভাবে এটি হাজার হাজার মানুষের মাঝে ভাগ করে দিতে হয়।

সাইকোলজিক্যাল রিসার্চ প্রদর্শন করেছে যে, মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই তাদের শ্রমকে ভাগ করে দেয় এমনকি কোনোপ্রকার চিন্তা ছাড়াই। কল্পনা করুন যে আপনি আপনার বন্ধুর জন্য একটি স্পেশার ডিনার তৈরি করছেন। আপনি একজন ভালো রাধুনি কিন্তু আপনার বন্ধু ওয়াইন এক্সপার্ট। আপনার কোন একজন প্রতিবেশী কখন নতুন একটি ওয়াইনের কথা বলেছিল সেটির নাম ও প্রাপ্তি স্থান কোনোটাই আপনার মনে নেই। অজস্র নতুন নতুন ওয়াইন আছে তার মধ্যে আপনি কোনটি মনে রাখবেন। এটা আপনার জন্য কতটা কঠিন একবার ভেবে দেখুন, কিন্তু আপনি কেনো অযথা শক্তি অপচয় করবেন যদি আপনার সামনে একজন ওয়াইন এক্সপার্ট বসে থাকে, এমনকি যার ওয়াইনের নাম মনে রাখার জন্য কোনো চেষ্টাও করতে হয়না? এ প্রভাবটি টনি জিউলিয়ানো এবং ড্যানিয়েল ওয়েগনার তাদের পরীক্ষাগারে প্রদর্শন করেন, তারা একদল দম্পত্তিকে একটি কম্পিউটার ব্র‍্যান্ডের সাথে সম্পৃক্ত পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত আইটেমের নাম অন্তত তিন মাস মনে রাখতে বলেন। তারা ঐ দম্পত্তিকে আরও বলেন তারা যে আইটেমে দক্ষ সেগুলো রেটিং করতে ( যেমন- একজন যদি কম্পিউটার প্রোগ্রামার হয় এবং অন্যজন চীফ তবে প্রথমজন অন্যজনের তুলনায় ভালো মনে রাখতে পারবে)। কিন্তু তারা যা আবিষ্কার করলো তা ছিল, দুজন দম্পত্তি তাদের চাহিদার সাথে সম্পৃক্ত মেমরি ভাগ করে নিল, যে অংশীদার যে ক্ষেত্রে বেশি দক্ষ তারা সেক্ষেত্রটি নিজের সাথে ভাগ করে নেন। যে আইটেমগুলোতে কোনো একজন মেম্বার বেশি পারদর্শী ছিল তিনি সে ক্ষেত্রের আইটেমগুলোর নামই বেশি মনে রাখতে পারে এবং নন-এক্সপার্টরা ভুলে যায়। একজন ব্যক্তি কোনো একটি বিষয় স্মরণ করার জন্য খুব একটা চেষ্টা করেনা যদিনা তার একজন সঙ্গী সংশ্লিষ্ট ফিল্ডে এক্সপার্টাইজ হয়। মানুষ একটি কমিউনিটিতে যার সাথে সম্পৃক্ত সুবধাজনক তথ্যগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে রাখে আর সে ক্ষেত্রে থেকেই সর্বোচ্চ কন্ট্রিবিউট করে তাদের জ্ঞানগত শ্রম বিভক্তিকরণের মাধ্যমে। আমরা সকল ক্ষেত্রেই কোনোকিছু মনে রাখার জন্য এক্সপার্টের উপর নির্ভর করি। ভাষা, মেমরি ও এটেনশান___ মূলত সকল মেন্টাল ফাংশন __ সবকিছুকে চিন্তা করা যেতে পারে কমিউনিটির জ্ঞানগত শ্রম বিভাজন আর এ প্রক্রিয়ায় সবকিছু কাজ করে।

একজন ব্যক্তির মনকে ডিজাইন করা হয়েছে কমিউনিটির জন্য

লেভ ভাইগটস্কি ও মাইকেল থমসেলোর কাজের ভেতর দিয়ে আমরা কমিউনিটি নলেজের মূল উপাদান সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পেরেছি। তারা প্রত্যেকে হয়তো নিজেদের এটেনশান শেয়ার করতে পারে এবং একটি সাধারণ গ্রাউন্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আরও একটি বিষয় প্রয়োজনীয় আমরা কিভাবে ইনফরমেশন সংরক্ষণ করি। কমিউনাল নলেজ গ্রুপের সবার মধ্যে ভাগ করা থাকে। কোনো ব্যক্তিরই এটি নেই। অতএব একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি যা জানি তা অন্যান্য ব্যক্তির জ্ঞানের সাথে জড়িত। আমার জ্ঞান শুধুমাত্র বিভিন্ন পয়েন্টার ও প্লেসহোল্ডার দ্বারা পরিপূর্ণ। যেমন এক্ষেত্রে আমি ইজিপ্টের স্ফিংক্সের( Sphinx) কথা বলতে পারি কিন্তু আমি আসলে জানিনা স্ফিংক্স কী। আর এ জন্য আমি যা চিন্তা ও যুক্তিবিচার করি ইজিপ্ট সম্পর্কে যা আমাকে বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করে যে ইজিপ্টে এমন কিছু জিনিস আছে যেগুলোকে স্ফিংক্স বলে। কিন্তু আমি কখনো এটি দেখিনি। আর এ জন্য আমার বিশ্বাস নির্ভর করে অন্যান্যরা এটি সম্পর্কে কী বলে তার উপর। আমি এটিকে দেখতে চাই কারণ অন্যানরা বলেছে এটি বেশ কুল। আমি বিশ্বাস করি আমার এটা দেখা উচিত কারণ আমি যাদের কাছে এটির কথা শুনেছি তারা আমার পরিচিত। অথবা অন্তত আমি জানি এখানে এমন কিছু ব্যক্তি আছে, যারা এটি দেখেছে। আমি যখন অন্যান্য ইংরেজি ভাষীদের দি স্ফিংক্সের কথা বলি আমি মনে করি যে আমরা একই সাবজেক্ট নিয়ে কথা বলছি যদিও এ বিষয়ে তারা আমার সম্পর্কে খুব কমই জানে। অতএব স্ফিংক্স সম্পর্কে আমার জ্ঞান অন্যদের পূরণ করার জন্য একটি প্লেসহোল্ডার। একই জিনিস ধারণ করছে ইজিপ্ট সম্পর্কে আমার জ্ঞান। এটি শুধু একটি প্লেসহোল্ডার ধারণ করছে যা আমাকে বলছে এটি হলো সে স্থান যেখানে স্ফিংক্স অবস্থান করছে। মিশর সম্পর্কে আমার জ্ঞান এ ধরণের ভাররক্ষক পয়েন্টার দ্বারা পরিপূর্ণ যা আমাকে বলে বিস্তারিত অন্যত্র। মানুষ সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অন্ততপক্ষে আমরা যখন একমত হই, আমরা তখন জগতের একই ক্ষুদ্র অংশের প্রতি ইঙ্গিত করি যেটি সম্পর্কে আমাদের বিভিন্ন স্ক্র‍্যাপের তথ্য রয়েছে। যেমনঃ আমি আপনার সাথে পরমাণু নিয়ে কথা বলছি, আপনিও আমার সাথে পরমাণু নিয়ে কথা বলছেন। পরমাণু সম্পর্কে আপনার ধারণা শুধু নাম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ আর আমি পরমাণুর ভেতরকার কোয়ার্ক ও এন্টি কোয়ার্ক সম্পর্কেও জানি এবং জানি স্ট্রিং সম্পর্কে এবং আমি এটাও জানি যে পরমাণুগুলো হায়ার স্পেসে কিভাবে আটকে আছে। পরমাণু সম্পর্কে আপনার জ্ঞান শুধুই একটি প্লেসহোল্ডার বা পয়েন্টার, এর বেশকিছু না কিন্তু এ পয়েন্টার নির্দেশ করছে যে যদিও আমরা পরমাণু সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখিনা আর আমাদের পরমাণু সম্পর্কে তথ্যগত জ্ঞানে যদিও তারতম্য আছে কিন্তু আমরা আসলে একই বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করছি। আর এটাই হলো মূলত, কমিউনাল নলেজের সেকেন্ড প্রপার্টি। ভিন্ন ভিন্ন সদস্যের ভিন্ন ভিন্ন বিটের জ্ঞান তুলনাযোগ্য। আমরা অধিকাংশ সময় সামগ্রিকভাবে একমত প্রকাশ করিনা, এবং অজস্র ক্ষেত্রে আমরা এটা করিনা, কিন্তু আমরা অন্তত সম্পর্কযুক্ত বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলি অথবা আমাদের জ্ঞানগত শ্রমের বিভাজন আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিতো। আমরা যদি একটি বাড়ি নির্মান করি, কার্পেন্টর ও প্লাম্বার একই পেজ সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান রাখে, বিশেষ করে বার্থরুমের লোকেশন ও শেপ সম্পর্কে। এমনকি যদিও কার্পেন্টর প্লাম্বিং সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখেনা, বার্থরুম এমনভাবে তৈরি করতে হয় যেনো পানির পাইপ প্রবেশ করতে পারে এবং স্যুয়ারেজের পাইপ বের হতে পারে। একইভাবে বস্তু সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের স্ট্রাকচার এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে করে আমরা আমরা আশা করতে পারি যে অন্যদের পূরণ করার জন্য এখানে পর্যাপ্ত জায়গা আছে।

বেনিফিট এন্ড পেরিল অব দি হাইভ অব মাইন্ড

সেইন্ট জোয়ানের মুখবন্ধে, জোয়ান আর্ক সম্পর্কে তার যে নাটক, যেখানে সাধু ও ঈশ্বরপ্রেরিত দূতের প্রতি একজন তরুণীর কল্পনাশক্তি পনের শতকের সৈন্যদের যুদ্ধে উদ্ধুদ্ধ করেছিল, জজ বার্নাডশ বিস্ময়করভাবে একটি অনিবার্য যুক্তি প্রদর্শন করেছেন যে জোয়ান আর্কের সেই মিস্টিক্যাল কল্পনার অনুসরণ আমাদের আধুনিক যুগের জেনারেলদের অনুসরণ করার সমরূপ কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের উচ্চমাত্রিক প্রকৌশল এবং দূর্বোধ্য যন্ত্র সম্পর্কে কোনো যোদ্ধারই ভালো জ্ঞান নেই। তার যুক্তি ছিল যে, বিশ শতকের যোদ্ধারা পনের শতকের যোদ্ধাদের মতোই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত। ঈশ্বরকে না জেনে মানুষ যদি ঈশ্বরের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় তবে এটি এ জন্যই যে কারণ তারা তাকে বিশ্বাস করে , আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে কোন জ্ঞান ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণপণ লড়াই করা ঈশ্বরের কুসংস্কারে বিশ্বাস করার চেয়ে নিশ্চয় আলাদা কিছু নয়।

মধ্যযুগে মানুষ মনে করতো পৃথিবী সমান্তরাল যার সাপেক্ষে অন্তত তাদের সেন্স প্রমাণ উপস্থাপন করেছিল। আমরা বিশ্বাস করি যে পৃথিবী গোলাকার, এর মানে এই নয় যে, আমরা এ প্রত্যেকে আমাদের বিশ্বাসের সাপেক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারি; এর একমাত্র কারণ হলো আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে কোনোকিছু যা একেবারেই সুস্পষ্ট তা সত্য হবে এমন কোনো কারণ নেই এবং এ জন্য যা কিছু ম্যাজিক্যাল, ইম্প্রোবেবল, এক্সট্রা-অর্ডিনারি, হিউজ, মাইক্রোস্কোপিক , হার্টলেস এবং অনমনীয় তাহাই বিজ্ঞান।

অতিশয়োক্তি নিশ্চয়, কিন্তু এটি উল্লেখযোগ্য যে আমরা কতটা নির্ভরশীল যা আমাদেরকে বলা হয়েছে যা আমরা অধুনিক বিশ্ব থেকে পেয়েছি। আমাদের সাথে যা ঘটে তার অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশই আমরা সরাসরি সেন্সরি এক্সপেরিয়েন্সের মাধ্যমে অর্জন করতে পারি। যে এলার্ম আমাদেরকে জাগিয়ে দেয়, যে টয়লেটে আমরা ভ্রমণ করি, বার্থরুমে প্রবেশের পূর্বে ও পরে সে স্মার্টফোন আমরা ব্যবহার করি, কফি মেশিন যা আমাদের কিচেনে শুভেচ্ছা জানায়, কোনোকিছুই আমাদের কনসেপচুয়াল বোধে নেই। কিন্তু আমরা এ টুলসগুলো ব্যবহার করি, এমনকি আমরা এ সকল টুলসের উপর নির্ভরও করি কারণ সেগুলো কাজ করে। এ জন্য সে সব এক্সপার্টকে ধন্যবাদ জানানো উচিত যারা এগুলো তৈরি করেছে যে জন্য আমরা অন্তত এটা জানি কিভাবে এগুলোর উপর আমাদের ডিপেন্ড করতে হয়। আধুনিক প্রকৌশলের তৈরি জিনিসপত্র কয়েকমাস ব্যবহার করার পর সেগুলোর উপর আমাদের একটা বিশ্বাস তৈরি হয়ে যায় কিন্তু যখনই আপনার ল্যাপটপ কাজ করেনা, যখনই আপনার কেবল সার্ভিস নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, ফেসবুক একাউন্ট ডিজেবল হয়ে যায়, ওয়েবসাইট হ্যাক হয়ে যায় তখন অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আমাদের মনে পড়ে আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে আমরা ঠিক কত কম জানি।

আমাদের মধ্যে জ্ঞানের ইলিউশন তৈরি হওয়ার কারণ হলো আমরা কমিউনিটি অব নলেজে বাস করি এবং আমরা আমাদের খুলির ভেতরের জ্ঞান ও বাহিরের জ্ঞানের মধ্যে তারতম্য করতে ব্যর্থ হই। আমরা মনে করি যে, বস্তু কিভাবে কাজ করে তা আমাদের খুলির ভেতর অবস্থান করে যখন আসলে এটি থেকে আমরা অনেক কিছু ড্র-করছি পরিবেশ এবং অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে। এটি আমাদের জ্ঞানের একটি বৈশিষ্ট্য যেনো এটি একটি বাগ বা জীবাণু। বিশ্ব ও আমাদের কমিউনিটি নলেজ প্রায়ই আমাদের জ্ঞান নির্ভর। অধিকাংশ মানুষই এ ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছে যে জ্ঞান আসলে তাদের খুলির ভেতর নেই। আমাদের আধুনিক বোধ মূলত কোথায় এটি পাওয়া যাবে তার উপর গঠিত। কেবলমাত্র সত্যিকার পন্ডিতদেরই কেবল তার মেমরিতে যে জ্ঞান আছে সে জ্ঞান আছে। জ্ঞানের ইলুশন হলো একটি ফ্লিপ সাইড সেটিকে ইকোনোমিস্টরা জ্ঞানের অভিশাপ বলেন। আমরা যখন কোনোকিছু সম্পর্কে জানি, আমাদের এটা কল্পনা করতে খুবই কষ্ট হয় যে কেউ হয়তো এ ব্যাপারে জানেনা। যদি আমরা কোন একটি সুর বের করি, তখন মাঝেমাঝে আমরা আহত হই যে, অন্যরা এটি সনাক্ত করতে পারেনি। এটি তখন একদম স্পষ্ট হয়ে যায়, অবশেষে আমরা এটি আমার মাথার ভেতর শুনতে পাই।

আমরা যদি সাধারণ জ্ঞানের একটি প্রশ্নের উত্তরও জানি, আমাদের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয় যে অন্যরাও হয়তো এ ব্যাপারটি সম্পর্কে জানে। জ্ঞানের অভিশাপ মাঝেমাঝে কোনো একটি অন্তঃদৃষ্টি ও পক্ষপাত আকারে আসে। যদি আমাদের দল বড় একটি গেমে জয়লাভ করে অথবা আমাদের প্রতিযোগী নির্বাচনে জয়লাভ করে আমাদের মধ্যে এমন একটি বোধ কাজ করে যে আমরা জানি অন্যরাও একই ফলাফল প্রত্যাশা করছে। জ্ঞানের অভিশাপ হলো যে আমাদের মধ্যে এমন একটি চিন্তা করার প্রবণতা আছে যে আমার মাথার খুলিটাই অন্যদের মাথার খুলি। এ দুটো ক্ষেত্রেই, আমরা এটা আলাদা করতে ব্যর্থ হই, কে কি জানে!

কারণ আমরা আসলে হাইভ মনে( Hive mind) বাস করি, আমরা খুব মারাত্মকভাবে অন্যদের উপর নির্ভর করি এবং পরিবেশের উপর আমাদের জ্ঞানকে সংরক্ষণ করার জন্য। আমাদের মনের মধ্যে যা কিছু আছে তার অধিকাংশই সুপারফিশিয়াল। আমরা বেশিরভাগ সময় সুপারফিশিয়ালিটি( বহির্গত) থেকে দূরে থাকতে পারি কারণ অন্যান্য ব্যক্তিরা আমাদের কাছ থেকে তেমন কিছু শুনতে চায়না। আমরা পাশ কাটিয়ে যাই কারণ জ্ঞানগত শ্রম বিভাজনের অস্তিত্ব আছে যেখানে জ্ঞানের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের সাথে সম্পৃক্ত আমাদের দায়িত্ব সমস্ত কমিউনিটির মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। জ্ঞানগত শ্রম বিভাজন আমাদের জ্ঞানের বিবর্তনের সবচেয়ে মৌলিক দিক এবং আজ আমরা ঠিক এ পদ্ধতিতেই কাজ করছি। কমিউনিটির সাথে আমাদের জ্ঞান ভাগ করার ক্ষমতার কারণেই আমরা চন্দ্রপৃষ্ঠে পা রাখার অনুমোদন পেয়েছি, আমরা তৈরি করতে শুরু করেছি রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার ও স্পেসশিপ। আমাদের জ্ঞানগত শ্রম বিভাজনের একাকী জংলী জীবন ও আরামদায়ক ও নিরাপদ সমাজ ব্যবস্থার সাথে তারতম্য তৈরি করেছে। কিন্তু আমরা যখন অন্যদের ধারণ করা জ্ঞানের উপর নির্ভর করি এক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক দিকের জন্ম হয়। আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড পড়েছেন, কিন্তু আজ খুব কম সংখ্যক মানুষই লুইস ক্যারলের বই পড়ে যা তাকে বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। অনেকেই এলিস সম্পর্কে পরোক্ষভাবে জানে, মুভি, কার্টুন এবং টিভি-শো, তারা এ মাইন্ড-বেন্ডিং ও অনন্য গ্রন্থটি পড়ে ক্যারলের এই দুর্দান্ত কাজটির অভিজ্ঞতা অর্জন করেনা। আপনি যদি ক্যালকুলাস না জানেন তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন না সময়কে সংকোচিত করে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কল্পনার সৌন্দর্য। নিউটন ঠিক কী দেখেছিল যা তাকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলল যে জন্য কতৃপক্ষ তাকে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে দাপন করেছিল? এটি হলো কমিউনিটি নলেজের একটি মূল্য, আমরা সে সকল জিনিসকে মিস করে যাই যেগুলো আমরা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে জানি এবং অন্যদের অভিজ্ঞতার উপর।

আর এর রয়েছে আরো ভয়াভহ একটি প্রভাব। কারণ আমরা আমাদের খুলির ভেতরের জ্ঞান দ্বারা বিভ্রান্ত হই সেই জ্ঞান দ্বারা যে জ্ঞানের উপর আমাদের অ্যাক্সেস আছে, আমরা বিশালভাবে অচেতন যে আমরা ঠিক কতটা কম বুঝি। আমরা এমন একটি বিশ্বাস নিয়ে কাজ করি যে আমরা যা বুঝি তার থেকেও অনেক বেশিকিছু বুঝি। এবং আমরা একটা পর্যায়ে এটাও দেখবো যে কিভাবে অজস্র সমাজ এ জ্ঞানগত ইলিউশন থেকে ভয়াভহ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল।

তথ্যসূত্রঃ

  1. The knowledge Illusion
hsbd bg