ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্ট

Last updated:

উপরের ছবিটি লক্ষ্য করুন।ডান পাশের কোন রেখাটি টার্গেট লাইনের সমান?

উত্তর C? 

কিন্তু আমি যদি বলি সঠিক উত্তর B, আপনি কি আমার কথা মেনে নেবেন?

 আপনার উত্তর যদি ‘না’ হয়; এবার ভাবুন যদি আমার সাথে এই গ্রুপের সবাই একমত হয়ে সঠিক উত্তর B  বাছাই করে, আপনি কি আগের সিদ্ধান্তে স্থির থাকবেন? এবার হয়তো আপনি কিছুটা বিভ্রান্ত হবেন।কারণ সংখ্যা মানবমনে সবসময়ই বড় একটি প্রভাব ফেলে।

ব্যাপারটি হয়তো আপনার কাছে এখনও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না কিন্তু মনোবিজ্ঞানীদের করা বিভিন্ন চমকপ্রদ সোশাল এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখা গেছে একসাথে যখন অনেক মানুষ থাকে তখন তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাদের ব্যক্তিগত আচরণ পাল্টে  কালেক্টিভ বিহ্যাভিওর প্রদর্শন করতে থাকে।

 এরকমই একটি এক্সপেরিমেন্ট হল  সলোমন এশের করা বিখ্যাত কনফরমিটি এক্সপেরিমেন্ট। খুবই সাদামাটা একটি পরীক্ষা।উপরের ছবিটির মতই একটি ছবি দেখিয়ে ভলান্টিয়ারদের  জিজ্ঞেস করা হয় কোন দুটি রেখা সমান।স্বাভাবিক অবস্থায় যে কেউই মুহূর্তের মধ্যে সঠিক উত্তর বলে দিতে পারবে।কিন্তু এশ এই পরীক্ষাটি করেছিলেন একটি বদ্ধ কক্ষে ৮ জন মানুষকে পাশাপাশি রেখে।এই ৮ জনের মধ্যে ৭ জন ছিল কনফেডারেট মানে ফেইক পার্টিসিপেন্ট যারা ইচ্ছে করে ভুল উত্তর দিবে।আর বাকি একজন ছিল সাবজেক্ট (naive participant) যে কিনা ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করেনি যে বাকি ৭ জন ষড়যন্ত্র করে মিথ্যে বলতে পারে।মোট ১৮ টি ট্রায়াল ছিল এক্সপেরিমেন্টটিতে। এর মধ্যে ১২ টি ট্রায়ালে কনফেডারেটরা ভুল উত্তর দেয়।৭ জনকে একসাথে ভুল উত্তর দিতে দেখে সাবজেক্ট কনফিউজড হয়ে যায় এবং আশ্চর্যজনকভাবে নিজেও কিছু সময় পর অন্যদের সাথে সাথে ভুল উত্তর দিতে থাকে।পরীক্ষাটি মোট ৫০ জনের সাথে করা হয়েছিল।প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ভুল উত্তরের সাথে একমত হয় এবং ৭৫% পার্টিসিপেন্ট একবারের জন্য হলেও অন্যদের দেখাদেখি ভুল উত্তর দিয়েছিল।

চিন্তা করুন, এই রকম সহজ একটি প্রশ্নেও এক তৃতীয়াংশ মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠকে অনুসরণ করেছে তাহলে বাস্তব জীবনে আমরা আমাদের চারপাশের মানুষ দ্বারা কতটা প্রভাবিত! যেখানে প্র্যাকটিক্যাল লাইফের সমস্যা এরকম সাদামাটা কনক্লুসিভ ধরণের হয় না।অনেক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সঠিক উত্তরই থাকে না!অধিকাংশ মানুষই ব্যবহারিক জীবনে হার্ডে থাকা ভেড়ার  মত আচরণ করে। অন্যদের দেখাদেখি আচরণ করার এ প্রক্রিয়াকে  “ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্ট” বলা হয়।।

এরকম আরো একটি এক্সপেরিমেন্ট হল এলিভেটর এক্সপেরিমেন্ট।যেটি ১৯৬২ সালে একটি টিভি শো তে দেখানো হয়েছিল। এক্সপেরিমেন্টটিতে একজন ব্যক্তি লিফটে উঠে সবাইকে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।যেটি খুবই অস্বাভাবিক। কিস্তু সবাইকে উল্টো হতে দেখে সেই ব্যক্তি নিজেও কিছুক্ষণ পর অন্যদের সাথে কনফর্মিটি প্রকাশ করে উল্টো হয়েই দাঁড়ায়।(এই এক্সপেরিমেন্টটি চাইলে আপনারা নিজেরাও করে দেখতে পারেন!)

প্র্যাকটিক্যাল লাইফে ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্টের প্রচুর উদাহরণ আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই।সোশাল মিডিয়ায় যেসব পোস্টে বেশি কমেন্টস বা আপভোট দেখা যায়, ইউজারদের মধ্যে সেসব পোস্টে আপভোট দেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্টের প্রভাবে ভোটররা অনেক সময় কোনো একটা পলিটিক্যাল পার্টিকে সাপোর্ট করে কারণ হয়তো সাম্প্রতিক সময়ে কোনো পোলে সে পার্টি বেশি ভোট পেয়েছে। যেসব দেশে মানুষ রাস্তাঘাটে ময়লা ফেলে অভ্যস্ত তারা পরিচ্ছন্ন কোনো শহরে গিয়ে ময়লা ফেলতে ইতঃস্তত করবে।এটাও ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্টের প্রভাব।কনজিউমাররা কোনো একটা ড্রেস কিনে এ জন্য নয় যে ড্রেসটি তাদের চোখে সুন্দর লাগছে বরং ড্রেসটি লেটেস্ট ফ্যাশন ট্রেন্ডের সাথে যায় বলেই তারা সেটি কিনে।ক্লাসে যদি শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে সবাই ভুল উত্তর দিতে থাকে তাহলে অন্যদের দেখাদেখি যে প্রকৃতপক্ষে উত্তরটি জানে তার উত্তর দেয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্টের প্রভাবে মানুষ স্টক মার্কেটে অন্যদের যখন শেয়ার কিনতে দেখে তখন বেশি বেশি ইনভেস্ট করতে থাকে যা আল্টিমেটলি স্পেকিউলেটিভ বাবল এবং মার্কেট ক্রাশের কারণ হয়। জার্নালঃ Physica A: Statistical Mechanics and its Applications

ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্টের পেছনে অনেক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক কারণ জড়িত আছে।এর মধ্যে একটা প্রধান কারণ হতে পারে যে মানুষ নিজেকে কোনো একটা গ্রুপে স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য দেখাতে চায়। অস্বাভাবিক আচরণ করে গ্রুপ থেকে এক্সক্লুডেড হতে চায় না।(Normative Influence) আরেকটা কারণ হতে পারে, মানুষ নিজের ব্রেইনে থাকা ইনফরমেশনের চেয়ে  কমিউনিটির নলেজের উপর বেশি বিশ্বাস করে।(Informational influence) 

এর সাথে হয়তো আমাদের বিবর্তনীয় ইতিহাস জড়িয়ে আছে।ম্যামালিয়ান বায়োলোজির অন্যতম একটি সীমাবদ্ধতা হল সোশাল কর্পোরেশন ছাড়া সে একা এই কঠিন পৃথিবীতে সার্ভাইভ করতে পারে না।বিবর্তনীয় ক্রনোলোজিতে একটি বাইসন শিকার করতে কিংবা হিংস্র পশু থেকে বাঁচতে মানুষ দলবদ্ধ থেকেছে।এমতাবস্থায় যদি কোনো ব্যক্তি দলের সাথে কনফরমিটি না দেখিয়ে স্কেপটিক হতে চায় তবে সে সরাসরি চলে যাবে বাঘের পেটে। এর ফলে ওই ব্যক্তির জিন ন্যাচারাল সিলেকশন কর্তৃক নেগেটিভ সিলেকশনের শিকার হবে।জিনপুলে স্কেপটিসিজমের জিন তাই আর টিকে থাকতে পারেনি।এখনও আমরা জিনের এই নির্দেশ ‘ দলকে অনুসরণ কর’ অধিকাংশ সময়ই অচেতনভাবে কাটিয়ে উঠতে পারি না। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত দ্বারা আমরা শুধু প্রভাবিতই না, সংখ্যার প্রভাবে আমরা কোনো কিছু যাচাই বাছাই না করে চোখ বন্ধ করে কোনো কিছু মেনে নিতে প্রস্তুত।এটাকে বলা যায় ইভোলিউশনারিলি প্রিজার্ভড। Related Article: ব্রেন কি কমিউনাল চিন্তার জন্য অভিযোজিত?

ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্ট থেকে বাঁচার উপায়ঃ

কিছু ডিবায়াসিং টেকনিক গ্রহণ করে ব্যান্ডওয়্যাগন ইফেক্ট থেকে বেঁচে থাকা যায়। যেমন সঠিক ব্যান্ডওয়্যাগনকে খুঁজে বের করে এর থেকে সতর্ক থাকতে হবে হবে। ইনফ্লুয়েন্সার বা মার্কেটাররা একেকজন সম্ভাব্য ব্যান্ডওয়্যাগন যারা কিনা তাদের প্রোডাক্ট বিক্রি করতে আপনাকে প্রভাবিত করবে।সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় পিয়ার প্রেশার দিতে পারে এমন বন্ধু বা কাছের মানুষ থেকে সাইকোলোজিক্যাল ডিসট্যান্সিং ব্যান্ডওয়্যাগন প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। রিজনিং বা ডিসিশন মেকিং এর সময় অল্টারনেটিভ অপশনের কথাও ভাবতে হবে। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস তৈরির মাধ্যমে ব্যাণ্ডওয়্যাগন ইফেক্ট থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব কিছু না।

এশের কনফরমিটি এক্সপেরিমেন্টের যেসব  ট্রায়ালে কনফেডারেটদের মধ্যে একজনও সঠিক উত্তর দিয়েছিল সেসব ট্রায়ালে সাবজেক্টরা গ্রুপকে উপেক্ষা করে সঠিক উত্তর দিয়েছিল।এই ফলাফল নির্দেশ  করে যে কমিউনিটিতে একজনও যখন কোনো একটা প্রিজুডিসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তখন অন্য আরো অনেকেই প্রতিবাদ করার সাহস পায়। আমরা জেনেটিক্যালিই  দলের বিরুদ্ধে যেতে ভয় পাই কিন্তু একজনও যদি সেই সাহস সঞ্চিত  করতে পারে তখন সেটা অন্য আরো অনেকের প্রতিবাদের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

Reference

hsbd bg