ফিফথ ফোর্স-নতুন করে লিখতে হবে ফিজিক্সের সূত্র

ফিফথ ফোর্স-নতুন করে লিখতে হবে ফিজিক্সের সূত্র

হাবিশ্বের ফান্ডামেন্টাল চারটি ফোর্সকে একীভূত করার জন্য আইনস্টাইন তার শেষ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অপচয় করেছিলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে ডেস্কে তার অসমাপ্ত পেপার রেখেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন ! এ অসমাপ্ত পেপার পৃথিবীর বহু চিন্তাশীল, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীকে আতঙ্কিত, ভীত সন্ত্রস্ত ও সম্মোহিত করে রেখেছিল। এ ফান্ডামেন্টাল ফোর্সগুলোকে সমন্বিত করতে গিয়েই তৈরি হয় হাইপারস্পেসের ধারণা কারণ হায়ার ডায়মেনশনে প্রকৃতির চারটি ফান্ডামেন্টাল ফোর্স সরল হয়ে যায়। খুব সিম্পল একটি গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা যায় এ মহাবিশ্বের ফিজিক্সের সকল সুত্র! যেটিকে বলা হয় মহান ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব!

Albert Einstein’s office Ñ just as the Nobel Prize-winning physicist left it Ñ taken mere hours after Einstein died, Princeton, New Jersey, April 1955.

মিচিও কাকু প্রায়শ বলেন, যদি মেমব্রেন তত্ত্ব সত্য হয়, মহাবিশ্বকে দেড় ইঞ্চি লম্বা একটি সমীকরণের মাধ্যমেই প্রকাশ করা সম্ভব।এ দুই ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি, কোয়াড্রিলিয়ন পরমাণু আর আমরা আর কিছুই নয়, দুই ইঞ্চি লম্বা একটা ইকুয়েশন ছাড়া, এ ইকুয়েশনের মধ্যেই মহাবিশ্বের প্রতিটি সেকেন্ড লিখা থাকবে এবং আমরা এক কোটি বছর পর এ মহাবিশ্বে কী করবো তাও!

যাইহোক, প্রকৃতির এ ফান্ডামেন্টাল চারটি ফোর্সের নাম হলো স্ট্রং ফোর্স, উইক ফোর্স, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স এবং গ্রেভিটেশনাল ফোর্স। বিগব্যাং- এর পূর্বে মহাবিশ্বের এ চারটি ফোর্স একে অপরের সাথে মহাজাগতিক স্যুপের মতোই মিলেমিশে একাকার হয়েছিল! বিগব্যাং – এর পর যখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হতে শুরু করে তখন এ মৌলিক বলগুলো একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং তাদের আজকের নিজস্ব রুপে ফিরে আসে। এ ঘটনাটিকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন সিমেট্রি ব্রেক আপ।

কিন্তু কোয়ান্টাম এন্ট্যাংগেলমেন্টে আমরা এক অদ্ভুত ব্যাপার পর্যবেক্ষণ করি। দুটি এন্ট্যাংগেল পার্টিকেলকে গ্যালাক্সির ব্যাসার্ধ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পরও তারা একই সময় ও একইসাথে একে অন্যের সাথে ইন্টারেক্ট করে। আপনি যদি গ্যালাক্সির এপার থেকে একটি পার্টিকেলের স্পিন কোয়ান্টাইজ করেন ক্লকওয়াইজ তবে অন্য পার্টিকেলটি এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে অবস্থান করলেও কাউন্টার ক্লকওয়াইজ স্পিন পরিমাপ হয়ে যাবে! এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে , তাদের মাঝখানে আসলে প্রচলিত স্পেস-টাইম এর কনসেপ্ট কাজ করছেনা, তাদের ভেতর সিঙ্গুলারিটি কাজ করে! মহাবিশ্ব মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে আলোর গতিতে সস্প্রসারিত হওয়ার সত্ত্বেও, ডার্ক এনার্জির প্রবল ধাক্কায় গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের থেকে বিপুল গতিতে এক্সিলারেট হওয়া সত্ত্বেও দুটি এন্ট্যাংগেল পার্টিকেলের মধ্যে স্পেস-টাইমগত দূরত্ব কাজ করছেনা, যেনো তারা মহাবিস্ফোরণের পূর্বের সিঙ্গুলারিটি পয়েন্টেই অবস্থান করছে , যেখানে মৌলিক বলগুলো ছিল একীভূত যেটাকে বলে কিনা সুপার সিমেট্রি!

মিচিও কাকু তার প্যারালাল ওয়ার্ল্ড গ্রন্থে বলেন, এন্ট্যাংগেল পার্টিকেলের মধ্যখানে স্পেস-টাইমের অনপুস্থিতি প্রমাণ করছে যে ফান্ডামেন্টাল ফোর্সগুলো একসময় একীভূত ছিল আর বিগব্যাং -এর পর তাদের সেই একতা ভেঙে গেছে কিন্তু তারপরও অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তাদের মধ্যে এখনো সেই সিঙ্গুলারিটি দশা রয়ে গেছে, একটি অদৃশ্য সুঁতা তাদেরকে একসাথে বেঁধে রেখেছে যার জন্য এখনো তাদের মধ্যে এন্ট্যাংগেলম্যান্ট সংঘটিত হয়! আমরা যদি ভেবে নেই যে মহাবিশ্ব পঞ্চম মাত্রায় বক্র হয়ে আছে তবে আমরা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স ও গ্রেভেটিকে সমন্বিত করতে পারি। আর এভাবে ফান্ডামেন্টাল ফোর্সকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমরা হাইপারস্পেসের দিকে ভ্রমণ করতে শুরু করি আর ঠিক একইভাবে এন্ট্যাংগেলমেন্টকে ব্যাখ্যা করার জন্যও আমাদের দ্বারস্থ হতে হয় হায়ার ডায়মেনশনাল কোন তত্ত্বের!

গ্রেভিটি সূর্য ও সোলার সিষ্টেমের প্রতিটি গ্রহকে মহাকাশে গেঁথে রাখে। গ্র‍্যাভেটি যদি স্তব্দ হয়ে যায় নক্ষত্রগুলো গ্যালাক্সির কক্ষপথ থেকে বিচ্চ্যুত হয়ে যাবে, আমাদের সোলার সিস্টেম ডিপ স্পেসে নিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে, ধবংস হয়ে যাব আমরা!

দ্বিতীয় মহান বল, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম, যে ফোর্স আমাদের নগরীকে আলোকিত করে, বিশ্বকে টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, লেজার বিম ও ইন্টারনেটে পরিপূর্ণ করে। আমরা যদি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সকে মাইক্রোস্কোপিক্যালি দেখি, তবে আমরা দেখবো, এটি মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার তৈরি বা কোয়ান্টা, যেটাকে আমরা ফোটন বলে জানি।

তৃতীয় বলটি দূর্বল নিউক্লিয় বল, যেটি আসলে, রেডিও একটিভ ক্ষয়ের জন্য দায়ী। কারণ দূর্বল বল এতটা সবল নয় এটমের নিউক্লিয়াসকে একসাথে ধরে রাখার জন্য। এটি নিউক্লিউয়াসকে ভেঙে পড়তে বা ক্ষয় হতে অনুমোদন দেয়। উইকফোর্স মূলত, ইলেক্ট্রন ও নিউট্রিনোর উপর ভর করে কাজ করে, নিউট্রিনোস হল এমন একটি পার্টিকেল যেটির কোন ভর নেই, এটি কোন কিছুর সাথে ধাক্কা না খেয়েই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মাইল দূরত্ব পাড়ি দেয়। ইলেক্ট্রন ও নিউট্রিনো W- ও Z- Boson পার্টিকেল এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে একে অন্যের সাথে ইন্টারেক্ট করে।

চতুর্থ বল, স্ট্রং ফোর্স এটমের নিউক্লিকে ধরে রাখে, স্ট্রং ফোর্স ছাড়া সকল নিউক্লি ভেঙে যাবে, এটম উবে যাবে, যদি এটমই না থাকে তবে কোনো বস্তুই গঠিত হবে না, যদি কিছুই গঠিত না হয়, তবে মহাকাশের এত ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি, এত গ্রহ, উপগ্রহ আর আমরা হয়ে যাবো মহাশূন্য! এই স্ট্রং ও উইকফোর্স একসাথে আইনস্টাইনের E=MC2 অনুসারে, নক্ষত্র থেকে আলো নিস্বঃরণ করে।

আমরা যখন উপরের দিকে লাফ দেই গ্রেভেটির প্রভাবে নিচে পড়ে যাই, বিরাট বিরাট উড়ো জাহাজ ও রকেট গ্রেভেটির টানকে অতিক্রম করার জন্য প্রচন্ড পরিমাণ শক্তি প্রয়োগ করে আর এভাবেই তারা মুক্তিবেগ প্রাপ্ত হয় অথচ আপনার চুলের সাথে একটি চিরুনি ঘর্ষণ করে যদি আপনি কাগজের পাশাপাশি ধরেন তবে কাগজের টুকরাটি ৬ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোগ্রাম ওজনের এ বিশাল ভরসম্পন্ন সম্পূর্ণ পৃথিবীর গ্র‍্যাভেটিক উপেক্ষা করে উপরের দিকে লাফ দেবে। চিরুণীকে ইলেক্ট্রিফাই করে যে ম্যাগনেটিক ইফেক্ট তৈরি হয়েছে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের সে এনার্জির তুলনায় সম্পূর্ণ পৃথিবীর গ্রেভেটি ১০৩৬ গুন দূর্বল! গ্রেভেটি সবসময় আকর্ষণীয় কিন্তু ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স চার্যের উপর ভর করে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দুটোই করতে জানে!এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স গ্রেভেটি থেকে আসলে ঠিক কতটা পৃথক আর ঠিক এ ভাবেই প্রতিটি ফোর্সই পরস্পর পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা!

কিন্তু ২৬ শে জানুয়ারী ২০১৬ সালে বিশ্বের নেতৃত্বস্থানীয় সায়েন্স জার্নাল Physical Review Letter -এ ফিফথ ফোর্সের অস্তিত্বের দাবি করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। (Protophobic Fifth-Force Interpretation of the Observed Anomaly in 8Be Nuclear Transitions)

এবং সাম্প্রতিক বিজ্ঞানীরা এ ফোর্সটির ব্যাপারে খুবই আশাবাদী! আমরা জানি যে, বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, শেলডন গ্লুশো ও স্টিভেন ওয়েইনবার্গ উইকফোর্স ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন কিন্তু তারা স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স ও গ্রেভিটেশনাল ফোর্সের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়নি। নতুন যে বলের কথা দাবি করা হচ্ছে, যদি সেটি সত্য হয়ে থাকে তবে আমরা প্রকৃতির এ ৫ টি ফান্ডামেন্টাল ফোর্সকে কিভাবে সমন্বয় করবো? এ জন্য কী স্পেসের ডায়মেনশন আরো বৃদ্ধি করতে হবে? আমাদের প্রচলিত ফিজিক্সের সকল ধারণাই কী তবে বদলে যাবে?

আমরা জানি যে, সবচেয়ে কম দূরত্বের মধ্যে স্ট্রং ফোর্স কাজ করে। এটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রোটন ও নিউট্রনকে একসাথে ধরে রাখে। প্রোটন ও নিউট্রন আবার কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। প্রোটনের রয়েছে দুটি আপ-কোয়ার্ক ও একটি ডাউন-কোয়ার্ক এবং নিউট্রনের আছে একটি আপ-কোয়ার্ক এবং দুটি ডাউন-কোয়ার্ক। আপ-কোয়ার্কের চার্য হলো +২/৩ এবং ডাউন-কোয়ার্কের চার্য -১/৩। সূতরাং প্রোটনের চার্য দেখা যাচ্ছে, +২/৩+২/৩-১/৩ =+১ আর নিউট্রনের চার্য দাঁড়াচ্ছে, +২/৩ -১/৩ -১/৩=০ ।নিউক্লিয়াসের ভেতর যেহেতু সকল প্রোটন একইরকমের ধনাত্মক চার্য বহন করে, অতএব কুলম্বের সূত্র অনুসারে একটি প্রোটন আর একটি প্রোটনকে বিকর্ষণ করার কথা। কিন্তু নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রোটন ও নিউট্রনগুলো অত্যন্ত কাছাকাছি থাকে যার ফলে দেখা যাচ্ছে যে কুলম্বের সূত্র তাদের উপর কোনোভাবেই খাটছেনা, একই চার্যসম্পন্ন হওয়ার পরও এত নিকটে থাকা ফিজিক্সের সূত্র অনুযায়ী অসম্ভব আর যখনই বিজ্ঞানীরা দেখলেন এ অসম্ভব ঘটনাটিই নিউক্লিয়াসের ভেতর ঘটছে তখন তারা বুঝতে পারেন, যে এদের মধ্যে হয়তো অত্যন্ত শক্ত কোন একটা ফোর্স কাজ করছে যে ফোর্সটি কুলম্বের সূত্রকে অতিক্রম করে প্রোটন ও নিউট্রনকে এতটা কাছাকাছি ধরে রেখেছে, আর যে ফোর্সটি তাদের মধ্যকার বিকর্ষণকে অতিক্রম করে পারস্পরিক আকর্ষণ শক্তি ধরে রেখেছে সে ফোর্সটিকে বলা হচ্ছে স্ট্রং ফোর্স! এ স্ট্রং ফোর্স কিন্তু বিরাট আকারের কোন দূরত্বে কাজ করেনা, এটি কাজ করে শুধু এটমের ভেতরের ১ ফেমটোমিটারের মধ্যে বা ১০-১৫ মিটার। এ সীমানার বাহিরে আর স্ট্রং ফোর্স যেতে পারেনা, সে এতটুকুর মধ্যেই আটকে থাকে, সে এত ক্ষুদ্র একটি সীমার মধ্যেও প্রবল। তার প্রাবল্যের ১ ফেমটোমিটার সীমার বাহিরে অন্য তিনটি ফোর্সের কাজ করে, এখানে অন্যান্য মৌলিক বলের সুত্র জাগ্রত হয়। এ তিনটি মৌলিক বল কখনোই ১ ফেমটোমিটারের ভেতর ঢুকতে পারেনা! আর এজন্য স্ট্রং ফোর্সকে সবচেয়ে প্রবল মনে করা হয়! স্ট্রং ফোর্সকে ১৩৭ ভাগ করলে এক ভাগ পাবে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স। চার্জযুক্ত কণাদের মধ্যেই এ ফোর্সটি কাজ করে। এ বলের নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। একটি চার্যিত কণার সাথে অন্য আর একটি চার্যিত কণার মধ্যবর্তী দূরত্ব যত বাড়ে এ বলটি দূরত্বের বর্গের বিপরীত অনুপাতে কমতে থাকে। সমধর্মী চার্য একে অন্যকে বিকর্ষণ করে আর বিপরীতধর্মী চার্য পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করে। ইলেক্ট্রন ও প্রোটনের মধ্যে যে আকর্ষণ বল কাজ করে- সেটা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স বা তড়িৎ চুম্বকীয় বল। এবার আসি উইক নিউক্লিউয়ার ফোর্সে। উইক নিউক্লিয়ার ফোর্সের একটা প্রাবল্য বা ইনটেনসিটি আছে। তবে সেটা স্ট্রং ফোর্সের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ প্রক্রিয়ায় পরমাণুর নিউক্লিয়াস এর যে পরিবর্তন ঘটে তার জন্য এ দূর্বল বলই দায়ী। কিছুকিছু তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের একটি নিউট্রন __ একটি প্রোটন, একটি ইলেক্ট্রন ও এন্টি ইলেক্ট্রনে পরিণত হয় এই উইকফোর্সের কারণেই।

এ ধরণের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়াকে বলা হয় বিটা মাইনাস বিকিরণ। আবার এই বলের কারণে ঘটে বিটা প্লাস বিকিরণ যেখানে নিউক্লিয়াসের একটি প্রোটন রুপান্তরিত হয় একটি নিউট্রন ও পজিট্রনে! আমরা আগেই দেখেছি মৌলিক বলগুলোর মধ্যে প্রাবল্যের দিক থেকে সবচেয়ে দূর্বল হলো গ্রেভিটেশনাল ফোর্স। স্ট্রং ফোর্স থেকে এটি দশ হাজার কোটি কোটি কোটি কোটি ভাগের এক ভাগ(১০^-১৯)। চারটি বলের তিনটির সাথে গ্রেভিটেশনাল ফোর্সের একটি তারতম্য আছে। কারণ এ বলের আদান প্রদানের জন্য যে বোসন কণাকে দায়ী করা হচ্ছে সেই বোসন কণা যার নাম কিনা গ্রেভিটন তার অস্তিত্ব এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত! আমরা গ্রেভেটিকে স্পেস ও টাইমের বক্রতা হিসেবে জানি! স্পেস-টাইমের বক্রতা থেকেই যদি গ্রেভেটির জন্ম হয় তবে সে বলের বাহক হিসেবে একটি কণা কাজ করছে এটা ভাবতে কেন যেনো একটা খটকা লাগে! যেমন- স্ট্রং ফোর্সের বল বহনকারী কণিকাটির নাম “গ্লুওন” এই গ্লুওনই মূলত প্রোটন ও নিউট্রনকে একসাথে ধরে রাখে অনেকটা সুপারগ্লু এর মতো। আবার ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের বল বহণকারী কণিকার নাম হলো বোসন কণা ফোটন এবং দূর্বল নিউক্লিয়ার বল বহণকারী W+, W- এবং Z Boson কণা। আমরা সবগুলো বলকে একত্রিত করতে পারছিনা কারণ মহাকর্ষ বল একটু ব্যতীক্রম, একবার বলছি, গ্রেভেটি স্পেস-টাইমের বক্রতা আবার বলছি বোসন নামক একটি কণারই এই বলকে বহণ করে! ব্যাপারটা অদ্ভুত নয় কী? তাহলে তো কণা আর স্থানকালের বক্রতাকে একই ডায়মেনশন থেকেই ব্যাখ্যা করতে হবে? ( গ্রেভিটেশনাল ওয়েভের অস্তিত্ব অবশ্য প্রমাণিত হয়েছে, আলোর কোয়ান্টার মতো, গ্রেভিটিরও কোয়ান্টা রয়েছে)

যেখানে আমরা ফান্ডামেন্টাল চারটি ফোর্সকে নিয়েই প্রবল ঝামেলায় আছি, সেখানে যুক্ত হলো এসে আর একটি ফোর্স! হাঙ্গেরির এটমিক ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার রিসার্চের গবেষক অটিলা ক্রাজনাহোর্কে ও তাঁর গবেষক দল, অনেক বছর ধরেই কাজ করে চলছেন নিউক্লিয়ার আইসোটোপ নিয়ে। ২০১৬ সালে তারা বেরিলিয়াম-১৬ আইসোটোপের বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে, একটি Unknown Particle এর সন্ধান পান।

Scientists find 'evidence of new force of nature solving universe's deepest  mysteries' - Mirror Online
Fift forces

বেরিলিয়াম-৮ ক্ষয় হয়ে দুটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। এ ক্ষয় হওয়ার সময় ইলেক্ট্রন ও পজিট্রন এমিট হতে দেখা যায়। কিন্তু পার্টিকেল ফিজিক্সের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, ইলেক্ট্রন ও পজিট্রন যে কোণিক দিক থেকে এমিট হওয়ার কথা, বেরিলিয়ান-৮ এর বেলায় তার ব্যতিক্রম ঘটছে। বেরিলিয়ান-৮ এর ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রন ও পজিট্রন পরস্পর ১৩৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে নির্গত হচ্ছে। আর এ ঘটনাটিকে প্রচলিত পদার্থবিদ্যার সুত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে না! ধারণা করা হচ্ছে, এ কণিকাটি নতুন একটি বলের জন্য দায়ী। একটি বোসন কণা X-17 এ নতুন মৌলিক বল বহণ করছে। তারা বিস্ময়কর উপায়ে এই কাল্পনিক পার্টিকেলটির ভরও হিসেব করে বের করেছেন! কী সাংঘাতিক! কল্পনার ভর নির্ণয়! এ কাল্পনিক কণার ভর ১৭ মেগা ইলেক্ট্রনভোল্টের সমান যা ইলেক্ট্রনের ভরের ৩৪ গুণ। মূলত, এর ভরের কারণেই কণিকাটির নাম রাখা হয় X-17! সম্প্রতি তাঁরা নিউক্লিয়াসের বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বেরিলিয়াম -৮ এর বিকিরণের অনুরুপ ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

UCI ফিজিক্স ও এস্ট্রোনোমির প্রফেসর জোনাথন ফেং বলেন, আমরা এটাকে X-Boson বলছি, এখানে X means Unknown। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে তবে এ নতুন Force Carrier Particle নতুন একটি ফোর্সের নির্দেশনা দেয় যেটাকে আমরা বলতে পারি ” Fifth Fundamental Forces! তিনি আরো বলেন, এ ফোর্সটি আমাদেরকে ডার্ক ম্যাটার ও ফোর্সের একীভূতকরণ সংক্রান্ত মহাজাগতিক বোধকেই পরিবর্তন করে দেবে। তার মতে, এ তত্ত্বটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স, উইক ও স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্সের ইফেক্টকে একীভূত করতে সাহায্য করবে। আমরা এতদিন জেনে এসেছি যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স, স্ট্রং ফোর্স ও উইক ফোর্স একসাথে কাজ করে, আমরা যদি এই নতুন ফোর্সটি সম্পর্কে বুঝতে পারি তবে সম্ভবত আমরা পাজলের আর একটি টুকরো খুঁজে পাবো। আমরা যদি ফিফথ ফোর্সের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারি তবে এটি মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের রিয়েল সেন্স তৈরি করবে। এখনো পর্যন্ত ডার্কম্যাটার আমাদের কাছে সমস্যাপূর্ণ।

ডার্কম্যাটারের ধারণা প্রথম প্রস্তাব করা হয় যখন আমরা দেখতে পাই যে, গ্যালাক্সির প্রান্তে নক্ষত্র এবং গ্যাসগুলো দ্রুত খুব দ্রুত মুভ করছে যেটাকে প্রেডিক্টেড গ্রেভেটি ব্যাখ্যা করতে পারেনা। এরমানে, হলো আমাদের থিওরি অব গ্রেভেটি হয়তো ভুল অথবা এমন কোন ম্যাটার আছে যার অদৃশ্য ভর গ্যালাক্সির ভেতর নিস্তব্দভাবে কাজ করছে। যদি তাই হয় তবে সে ভর স্থানকালে বক্রতা তৈরি করতে পারে ও গ্রেভেটির প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে যে ম্যাটারগুলোকে আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। বিগত ৫০ বছরে ডার্ক ম্যাটারের ধারণা অনেক শক্ত হয়েছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি কিভাবে ডার্ক ম্যাটার গ্যালাক্সির ক্লাস্টার তৈরি করে। কিন্তু এই ডার্ক ম্যাটার সাধারণ কোনো ম্যাটারের সাথে অত্যন্ত স্ট্রংলি ইন্টারেক্ট করেনা। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এমন কোন পার্টিকেল নেই যা ডার্ক ম্যাটার তৈরি করতে পারে, এমনও হতে পারে ডার্ক ম্যাটার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্লাকহোলের তৈরি কিন্তু এস্ট্রোনোমিক্যাল ডেটা এ ধারণাটিকে আসলে সাপোর্ট করছেনা, ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত কোনো অনাবিস্কৃত পার্টিকেলের তৈরি যেটাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল ব্যাখ্যা করতে পারেনা।

এছাড়া রয়েছে ডার্ক এনার্জি। বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে যেটাকে বলে কিনা Ever Increasing Rate! এরমানে হলো এ ক্রমবর্ধমান শক্তির যোগান কোন একটা সোর্স থেকে আসছে যেটাকে আমরা এখনো বুঝতে পারিনি। হতে পারে, এই এক্সিলারেশন স্পেস ও টাইমের স্ট্রাকচারের একটি ফলাফল, কোন এক ধরণের মহাজাগতিক ধ্রুবক যা মহাবিশ্বকে এক্সপেন্ড হতে ফোর্স করছে। এর মানে হলো এটি আমাদেরকে অনাবিস্কৃত নতুন একটি ফোর্সের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ডার্ক এনার্জি কি তা আমরা জানিনা কিন্ত এটি আমাদের মহাবিশ্বের ২/৩ দখল করে রেখেছে। এ সকল পয়েন্টে এসে স্ট্যান্ডার্ড মডেল আর কাজ করছেনা, এটি অসম্পূর্ণ। আমরা হয়তোবা ফান্ডামেন্টালি কিছু একটাকে মিস করেছি। স্ট্যান্ডার্ড মডেল এ সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য, সুপার সিমেট্রি থেকে শুরু করে অনাবিস্কৃত কোয়ার্ক পর্যন্ত প্রেডিক্ট করেছে আর অন্য একটি ধারণা ছিল যে প্রকৃতিতে পঞ্চম আর একটি ফোর্স কাজ করছে। এ ফোর্সটির রয়েছে তার নিজস্ব বোসনিক বাহক একটি নতুন পার্টিকেল যা আমাদের জানাশোনার অতীত। এ পার্টিকেলটি সম্ভবত আমাদের জানা পার্টিকেলের সাথেও খুব সুক্ষ্মভাবে ইন্টারেক্ট করে যা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সাথে যায়না।

What is dark energy? - Sky & Telescope - Sky & Telescope

ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জনাথিন ফেং ও তার দল, বেরিলিয়াম-৮ এর ব্যতিক্রমী ফলাফল অনুসন্ধান করেছেন এবং তারা বলেছেন, X-17 Particle টি প্রদার্থ ও প্রতি-পদার্থ বা কৃষ-বস্তুর মধ্যকার সংযোগ। এর মানে হচ্ছে, এক্স-১৭ এর ভর শুধুমাত্র নিউট্রনের উপর কার্যকর, প্রোটনের উপর এর কোন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া নেই। নয়তোবা এটাকে আমরা খুব সহযে সনাক্ত করতে পারতাম। সেজন্য এটাকে প্রোটনের শত্রু বলা হয়। ইতালীর Positron Annihilation into Dark Matter Experiment গ্রুপ এক্স- ১৭ পার্টিকেলটি অলরেডি খুঁজতে শুরু করেছে। Physicist hunting the “Dark photon” Will blast a dimond with antimatter শিরোনামে এ নিয়ে লাইভসায়েন্সে ২০১৮ সালের ৫’ ই সেপ্টেম্বর একটি আর্টিকেলও প্রকাশিত হয়। Muons; ‘Strong” Evidence found for a new force of nature শিরোনামে ২০২১ আলের ৭ এ এপ্রিল একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়, সেখানে বলা হয়, ডার্ক এনার্জি আসলে ফিফথ ফোর্স ছাড়া আর কিছুই নয়!

Muons: Scientists have 'strong evidence' for new force of nature - BBC News

আমরা আগেই বলেছি, আমাদের মহাবিশ্ব কোন এক রহস্যজনক শক্তির কারণে ক্রমবর্ধমান হারে প্রসারিত হচ্ছে, মনে করা হয়, যে এটা অজানা ডার্ক এনার্জি, এই ডার্ক এনার্জি আসলে স্পেসেরই একটি প্রোপার্টি, আর তাই বিগ-ব্যাং থেকে প্রাপ্ত স্পিডের কারণে দুটি গ্যালাক্সির মাঝখানের স্পেস প্রসারিত হলেও এই ডার্ক এনার্জি একইরকম থেকে যায়, এটার ঘণত্ব কমানো যায়না, এটি শূন্যস্থানের সাথে একদম তারতম্যহীনভাবে বসে থাকে, যার ফলে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে দূরে সরে যেতে থাকে। যদি ফিফথ ফোর্স সত্যি হয়, তবে ডার্ক এনার্জি হয়তো এই ফিফথ ফোর্স ছাড়া আর কিছুই নয়, এখন প্রশ্ন হলো তবে কী আমাদেরকে ফিজিক্সের সুত্রগুলো আবার নতুন করে লিখতে হতে পারে? এর উত্তর আমার সঠিক জানা নেই। তবে ডার্ক এনার্জিকে শুধু স্পেস থেকে নয় , টাইম থেকেও আলাদা করা যায়না, এটি স্পেস- টাইমের সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে আছে, যেমন- সময়ের সাথে সবকিছুর মাত্রা পরিবর্তন হয়, কোথাও ঘণত্ব বাড়ে এবং কোথাও ঘণত্ব কমে কিন্তু ডার্ক এনার্জি এক মিলিয়ন বছর অতীতে যেমন ছিলো এখনো ঠিক তেমন, আর এ জন্য গ্রেভেটির মতো মহাবিশ্বের কোন নির্দিষ্ট বস্তুর উপর এর কোনো লোকাল ইফেক্ট কাজ করেনা, ডার্ক এনার্জি স্পেস ও টাইমের ভেতর দিয়ে সর্বত্র সমানভাবে মহাবিশ্বকে সম্প্রসারিত করে চলে ! (আমরা অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মহাবিশ্বকে দেখি? )

এটি যদি ফিফথ ফোর্স হয় তবে কেনো এ ফোর্স স্পেসের প্রতিটি বিন্দুতে একই শক্তিতে কাজ করে? কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে এর মাঝে?

hsbd bg