প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়ার বিবর্তন

প্লাস্টিকের দূষণ মুক্তিতে হয়তো এক মাইলপলক

Last updated:

প্রতি বছর ৩৮০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সারা বিশ্বে উৎপাদিত হয়। এ সকল প্লাস্টিকের বিশাল একটি অংশ ভূমিকে পরিপূর্ণ করে রাখে, যা আমাদের সমুদ্র ও শহর দূষিত করে। প্রকৃতপক্ষে, ৮.৭ শতাংশ প্লাস্টিক বর্তমানে রিসাইকল করা যায়, সম্ভাবনা আছে যে ৯০ শতাংশ প্লাস্টিক যা আমরা উৎপাদন করি তা অপচয় হয়। বিশ্বে এরই মধ্যে প্লাস্টিক মারাত্মক কিছু ইস্যু তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি হবে(১)।

এমনকি আমাদের খাবারের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক জায়গা করে নেবে। এবং আমরা নিশ্বাসের সাথে শুধু অক্সিজেন নয় প্রতি সপ্তাহে ৫ গ্রাম মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করবো। যদি পরিবেশে প্লাস্টিকের পরিমাণ এভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে তবে আমাদের খাবার ও নিঃশ্বাস এক সময় মাইক্রোপ্লাস্টিক দখল করে নেবে(২)। এই গ্লোবাল ইস্যুর একমাত্র সমাধান হলো Plastic Eating Bacteria । যা জাপানিজ সায়েন্টিস্টরা সর্বপ্রথম ২০১৬ সালে আবিষ্কার করেন। প্লাস্টিক আবর্জনার বিপক্ষে এ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাক্টেরিয়া অত্যন্ত উত্তেজনাকর একটি ব্যাপার যা প্লাস্টিক রিসাইকলিং- প্রক্রিয়ায় নতুন একটি এভিনিউ উন্মোচন করবে।

কীভাবে এ ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কার হয়?

প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কৃত হয় দুর্ঘটনাবশত। জাপানের ওসাকায় একটি ফ্যাক্টরিতে কর্মরত কয়েকজন বিজ্ঞানী পরিত্যাক্ত কিছু বোতল সংগ্রহ করে দেখেন সেগুলো এমনকিছু ব্যাক্টেরিয়া ধারণ করে যা বিবর্তিত হয়েছে প্লাস্টিক খাওয়ার জন্য। এ ব্যাক্টেরিয়ার নামকরণ করা হয় Ideonella sakaiensis, যে ব্যাক্টেরিয়া PET নামক এক শ্রেণীর প্লাস্টিক ডিকম্পোজ করতে পারে, এটি হলো এমন এক ধরণের প্লাস্টিক যা অধিকাংশ পানীয় বোতলে ব্যবহার করা হয়।যাইহোক এ ব্যাক্টেরিয়া অত্যন্ত ধীর গতিতে কাজ করে। একটি বোতল ভাঙার জন্য তার প্রায় ৬ সপ্তাহের কাছাকাছি সময় লাগে। এ থেকে বোঝা যায় এ ব্যাক্টেরিয়া বাজারজাত করার মত নয়, কারণ যখন PET – এর ধারক নতুন পন্য ও অন্যান্য প্লাস্টিকের উৎপাদন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটবে এবং সস্তায় তখন এ ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে কোনো কাজ হবেনা। আর এজন্য বিজ্ঞানীরা এমন এক ব্যাক্টেরিয়ার বিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেন যে অত্যন্ত দ্রুত কাজ করতে পারে।

Plasticdegrading Bacteria Ideonella Sakaiensis Stock Photo - Download Image  Now - iStock

দ্রুতগতিতে প্লাস্টিক খেতে পারে এমন ব্যাক্টেরিয়া উৎপাদনঃ

জাপানি প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়ার উপর গবেষণাপত্র প্রকাশের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা নতুন ধরণের ব্যাক্টেরিয়া ও এনজাইম নিয়ে কাজ করতে শুরু করে যা প্লাস্টিক খায়। তারা চেষ্টা করে কীভাবে এটাকে আরো কার্যকরী করে তোলা যায়। ২০১৮ সালে ব্রিটিশ সায়েন্টিস্ট এ ব্যাক্টেরিয়াকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করার জন্য গবেষণা পরিচালনা করে, যা মূল ধীরগতির আবিষ্কারের পরিবর্তে বিকল্প বাস্তবসম্মত একটি পদ্ধতি প্রস্তাব করে। এ মিউটেন্ট ভার্সন প্রাকৃতিক ব্যাক্টেরিয়ার তুলনায় ২০% দ্রুততার সাথে প্লাস্টিক ভেঙে ফেলতে পারে এবং এটি শক্ত প্লাস্টিকের উপরও কার্যকরী ছিল, যা পটেনশিয়াল কিছু এপ্লিকেশন বৃদ্ধি করে দেয় (৩)।

এবার বিজ্ঞানীরা উন্নত গবেষণাকে অনুসরণ করে দুটি ব্যাক্টেরিয়াকে সংযুক্ত করে এমন একটি স্ট্রেইন তৈরি করে যা আগের চেয়ে আরো দ্রুতগতিতে কাজ করতে পারে। আর এভাবে ব্যাক্টেরিয়াকে কম্বাইন করে ভিন্ন ভিন্ন উপাদান ভাঙার সম্ভাবনাও উন্মোক্ত হয়। অপরিহার্যভাবে এমন একটি ব্যাক্টেরিয়া প্যাকেজ তৈরি করার মাধ্যমে যা মাল্টিপল টাইপের প্লাস্টিক ও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালস নিয়ে কাজ করতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এ প্যাকেজ বিজ্ঞানীদের সক্ষম করে তুলবে একটি সুপার এনজাইম তৈরি করার জন্য যা প্লাস্টিক, পলিয়েস্টার, কটন এবং অন্যান্য মিক্স ম্যাটারিয়ালস পচনের জন্য কাজ করতে পারবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ যখন কিছু ম্যাটারিয়ালস মৌলিকভাবে অন্য কোনোকিছুর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে যেমন- পোশাক তখন এটি আর রিসাইকল করা যায়না, কিন্তু যদি এমন ব্যাক্টেরিয়া উন্নত করা যায় যা উপাদানগুলোকে আলাদা করবে তবে এটি এ ম্যাটারিয়ালসগুলোকে পূনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে সাহায্য করবে।

২০২০ সালে, ফ্র‍্যান্স কোম্পানী কার্বোয়েস একটি মোডিফায়েড এনজাইম রিলিজ করেছিল যা মাত্র ১০ ঘন্টায় ৯০ শতাংশ PET বোতল ডিগ্রেড করতে পারে। কিন্তু এই এনজাইমের একটি খারাপ দিক হলো এ জন্য তার ৭০°C তাপমাত্রা প্রয়োজন হয় কার্যকর হতে(৪)। এ জ্ঞান ব্যবহার করে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা এমন একটি এনজাইম উন্নত করেছিলেন যেটি খুব দ্রুত ও কার্যকরী উপায়ে রুম টেম্পারেচারের ভেতরই কাজ করতে পারে ( ৫)। এ ধরণের প্লাস্টিক খেকো ব্যাক্টেরিয়া সম্ভবত প্লাস্টিক রিসাইকলিং প্রসেসের একটি বিকল্প( ৬)।

প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়ার সমস্যাঃ

যারা প্লাস্টিকের জ্যামিতিক বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন তাদের জন্য এ ব্যাক্টেরিয়ার ধারণা খুবই আবেদনময়। এর মানে হলো আমরা সমুদ্র ও প্লাস্টিকের পাহাড়ে এ ব্যাক্টেরিয়া স্প্রে করে প্লাস্টিক নির্মুল করতে পারবো। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় সমস্যা আছে, অনেকগুলো গবেষণাপত্রে পটেনশিয়াল ইস্যুগুলো বিজ্ঞানীরা সনাক্ত করে দেখিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, আমরা বলতে পারি এ ব্যাক্টেরিয়াগুলো কিছু টক্সিন রিলিজ করে (৭)। আর যেহেতু এ ব্যাক্টেরিয়া সম্পূর্ণ ল্যাব ক্রিয়েটেড অতএব তাদের সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক থাকতে পারে। এবং অনেক গবেষণাপত্র বলছে, প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়া নিজেই প্লাস্টিক থেকেও আরো ভয়ানক সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। আর তাছাড়া মিশ্র উপাদানের ক্ষেত্রে, একটি থেকে অন্যটি আলাদা করা অনেক সময় ও ব্যায়সাপেক্ষ একটি ব্যাপার যা এটিকে এখনো বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী করে তুলতে পারেনি।

প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে কারা কাজ করছে?

প্লাস্টিক অথবা মাইক্রোপ্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়া তৈরি করার চেয়ে নতুন প্লাস্টিকের বোতল তৈরি করা অনেক কম ব্যায়বহুল। কিন্তু ভালো সংবাদ হলো, L’Oréal, Nestlé Waters, PepsiCo, Suntory Beverage, and Food Europe এর মত কোম্পানীগুলো প্লাস্টিক ইটিং ব্যাক্টেরিয়ার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ কোম্পানিগুলো এমনকিছু প্লাস্টিক ইটিং এনজাইম তৈরি করবে যারা প্লাস্টিক রিসাইকলিং এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

আরো পড়ুনঃ হোমো ডিউস; জেনেটিক্যাল রি-ইঞ্জিনিয়ার ও স্বর্গ

তথ্যসূত্রঃ

  1. Is There More Plastic Than Fish In The Sea?
  2. What are microplastics?
  3. The Race To Develop Plastic-Eating Bacteria, Forbes
  4. Plastic Eating Bacteria: A Viable Solution to the Plastic Problem? Earth org
  5. Characterization and engineering of a two-enzyme system for plastics depolymerization
  6. plastic recycling processes.
  7. Toxicity of plastics

hsbd bg