প্রজনন ও সেলফিশ জিন

প্রজনন ও সেলফিশ জিন ; গ্রীন ফ্লাইরা কেনো মা মেরির মতোই পিতৃহীন সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম…? 

দ্বিতীয় ভাগ

যৌন প্রজনের জন্যে দুজন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়।নারী ও পুরুষের মধ্যকার ফিজিক্যাল ইন্টারকোর্স ছাড়া আমরা সাধারণত সন্তান জন্মের কথা চিন্তাও করতে পারিনা।কিন্তু প্রকৃতিতে এমন কিছু প্রাণী আছে যারা সেক্স ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে পারে।অনেকটা কুমারী মাতা মেরির মতো, যে কোনো পুরুষের সংস্পর্শ ব্যাতিত যিশুকে জন্ম দিয়েছিলো।আমরা এক্ষেত্রে এলন বৃক্ষ এবং গ্রীনফ্লাইদের উদাহরণ দিতে পারি।গ্রিনফ্লাইরা জীবন্ত ও পিতৃহীন কন্যা সন্তান সন্তান জন্ম দিতে পারে।যেমন- কোনো একটি গ্রীনফ্লাইয়ের গর্ভের ভেতর একটি ভ্রুণ থাকে সেই ভ্রুণের গর্ভে থাকে আরো একটি ভ্রুণ।আর ঠিক এভাবে তৃতীয় ভ্রুণটি কোনো পিতার সহযোগীতা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্মগ্রহণ করে।

যৌন প্রজননে ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে একটি সন্তানের ক্রোমোজমের ৫০ ভাগ জিন আসে তার পিতার কাছ থেকে এবং ৫০ তার ভাগ মায়ের।কিন্তু গ্রীনফ্লাইদের ১০০ ভাগের মধ্যে ১০০ ভাগ জিনই তার পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।তার মানে, নিশ্চয়, গ্রীনফ্লাইদের জিনপুলে এমন কোন ইউনিভার্সাল জিনের অস্তিত্ব আছে যে জিনটি গ্রীনফ্লাইদের  ক্রোমোজোমের কোনো নির্দিষ্ট জিনকে ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে বিভক্ত হতে দেয় না!আমরা জানি ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে ক্রোমোজমের ভেতর জিনগুলি একে অপরের সাথে তাদের স্থানবদল করে, স্থানবদলের কারণে জিনগুলির ক্রোমোজমে অবস্থানগত পরিবর্তন তৈরি হলেও জিনের অখন্ডতা নষ্ট হয়না।গ্রীনফ্লাইদের ক্রোমোজোমের কোনো একক জিনই যেহতু তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছেনা অতএব সম্পূর্ণ ক্রোমোজমটি নিজেই এখানে অখন্ড একক হিসেবে কাজ করবে বা আমরা বলতে পারি যে তাদের সম্পূর্ণ ক্রোমোজোমটাই একটি জিন।যদি গ্রীনদের পুরো ক্রোমোজমই প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হয় তবে আমরা সেটাকে জিনপুল না বলে ক্রোমোজম পুল বলতে পারি।গ্রীন ফ্লাইদের ক্রোমোজমপুলে একটি ইউনিভার্সাল জিনের অস্তিত্ব আছে যে ইউনিভার্সাল জিনটি ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে জিনের এ স্থানান্তরকে প্রতিরোধ করে আর এ প্রকৃয়াকেই অযৌন পদ্ধতিতে বংশবিস্তার বলা হয়।

যৌন প্রজনন ও স্বার্থপর জিন

আদিম অনুলিপিকারী অনুরা পুরুষ বা নারী কোনটাই ছিলোনা, তারা ছিলো এমন একপ্রকারের বিবর্তিত অনু যারা প্রাইমোর্ডিয়াল স্যুপে সাতার কাটতো যারা নিজেদের অনুলিপি তৈরি করতে সক্ষম ছিলো, কিছু অনুলিপি কারী নিজেদের মধ্যে দল গঠন করতো এবং অন্য অনুলিপিকারী অনুদের সাথে টিকে থাকার জন্যে লড়াই করতো।এক সময় এ অনুগুলি রাসায়নিকভাবে অন্য অনুলিপিকারক অনু গুলিকে ভাঙতে শুরু করলো, অন্য অনুগুলিকে এ ধরণের অভিযোজিত অনুরা ভেঙে তাদের উপাদানগুলি নিজেদের অনুলিপি তৈরি করার উপাদান হিসেবে ব্যাবহার করতো।আর এ জন্যে প্রতিযোগি অনুদের মধ্যে একপ্রকার নির্বাচনী চাপ সৃষ্টি হয়, যে নির্বাচনী চাপের ফলে প্রতিযোগীরা তাদের শরীরের চারপাশে একটি আস্তরণ তৈরি করে নেয়, যে প্রোটিনের আস্তরণ কে আমরা এখন সেল বলি!মূলত হিংস্র অনুদের থাবা থেকে  নিজেদের রক্ষা করার জন্যে প্রাকৃতিক নির্বাচন  সেই অনুদের চারপাশে একটি ঢাল তৈরি করে নেয়।এভাবে এ অনুলিপিকারী অনুগুলি মিলিয়ন বছরের বিবর্তনীয় পথে অজস্র ট্রিলিয়ন নির্বাচনী চাপের শিকার হয় যা তাদেরকে জটিল জটিল সার্ভাইভাল মেশিন তৈরি করতে অভিযোজিত করে।আর এভাবে একটা সময় এ প্রকৌশলী অনুগুলি আমাদের এ গ্রহে মিলিয়ন মিলিয়ন রোবট তৈরি করে!যে রোবট গুলির কোনো কোনোটি শিম্পাঞ্জি হয়ে গাছের ঢালে ঝুলতে থাকে, তিমির মতো সমূদ্রের আড়ালে ঘুরে বেড়ায়, পাখি হয়ে এ রোবটগুলি উড়ে বেড়ায় বায়ুমন্ডলে  অথবা সেপিয়েন্সদের মতো রোবটগুলি মহাকাশে পাড়ি জমায়।মূলত নারী ও পুরুষের ভেতরের পার্থক্যটা তৈরি হয় মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের বিবর্তনীয় সময় ভ্রমণের কোনো এক পর্যায়ে। এছাড়া এখনো এলন বৃক্ষ যারা চোষকের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে অথবা গ্রীনফ্লাই ; যারা তাদের গর্ভের ভ্রুণের গর্ভে আরো একটি ভ্রুণ জন্ম দেয় তাদের জন্যে পুরুষের প্রয়োজনীয়তা নেই  অথবা আরো পরিচ্ছন্ন করে বললে যৌন প্রজননের প্রয়োজনীয়তাই  নেই তাদের জগতে!!

কিন্তু প্রশ্ন জাগে তাহলে কেনো যৌন প্রজননের মতো একটি জটিল পদ্ধতি প্রকৃতিতে বিবর্তিত হলো?যদি এলম অথবা গ্রীনফ্লাইদের জিন সরাসরি তার অনুলিপি তৈরি করতে পারে?তাহলে কেনো যৌন প্রজননের মত এমন অদ্ভুত বিকৃতির জন্ম হলো?জিনের মিশ্রণ ঘটানোর জন্যে?যৌন প্রজননের কী এমন বিবর্তনীয় উপযোগীতা ছিলো? যে উপযোগিতার ফলে এটি প্রজাতির মধ্যে বিশেষভাবে সংযোজিত হলো?(প্রজনন ও সেলফিশ জিন)

যৌন প্রজনন ও সেলফিশ জিন

 

বিবর্তনবাদীদের জন্যে এ প্রশ্নটির উত্তর দেয়াটা কঠিন ছিলো।এমনকি এ প্রশ্নটির উত্তরের সাথে গাণিতিক প্রকৃয়াও সংশ্লিষ্ট ছিলো।আমাদের জিনের উদ্দেশ্য হলো জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি, তার কাছে আমি বা আপনি গুরুত্বপূর্ণ নই, আমরা মহাবিশ্বকে প্রতি মুহূর্তে কিভাবে পর্যবেক্ষণ করছি আমাদের জিন সেটাও দেখেনা সে শুধু তার প্রোটিন সংশ্লেষণের মাধ্যমে  নিজের অনুলিপি তৈরি করে, জিনের উদ্দেশ্য জিন নিজেই, তার কাজ তার অনুলিপি তৈরি করা।যদি অনুলিপি তৈরি করাই জিনের প্রবণতা হয়, তবে গ্রীনফ্লাইরা তাদের একশ ভাগ জিন পরবর্তী প্রজন্মে অনুলিপি করতে পারে আর অন্যান্য প্রাণীদের ক্রোমোজের অর্ধেক জিন যদি পিতা থেকে আসে তবে অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে, আর তাই অবশ্যই এক্ষেত্রে কোনো একক সদস্যের ১০০ শতাংশ জিন পরবর্তী প্রজন্মে সুইপ করছেনা যার সাথে সেলফিশ জিন তত্ব পুরোপুরিভাবে সাংঘর্ষিক।

জিনের উদ্দেশ্য যদি নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি হয় তবে গ্রীন ফ্লাইরা সে উদ্দেশ্য অযৌন প্রজনন পদ্ধতিতে ১০০ ভাগ বাস্তবায়ন করতে পারছে, তাহলে এখানে যৌন প্রজননের কী এমন প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে যেখানে একটি একক সদস্যের জিনের মাত্র ৫০ ভাগ ক্রস ওভারিং এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়….?আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি প্যারাডক্স…!

এখান থেকে অনেকে গ্রুপ সিলেকশন তত্বকে মেনে নেয় যাদের মতে যৌন প্রজনন এ জন্যেই প্রকৃতিতে অস্তিত্বশীল হয়েছে কারণ এটি গ্রুপের একাধিক সদস্যকেই ভবিষ্যত প্রজন্ম তৈরিতে সুযোগ করে দেয় আর এতে করে শিশুর লালন পালনের সাথে বিরাট একটি গ্রুপ বিভিন্নভাবে জড়িয়ে যায়।কিন্তু আসলেই কী তাই?গ্রুপ সিলেকশন তত্বের বিপরীতে ডাব এফ বেদমার চমৎকার ভাবে বলেছিলেন, এক একজন ব্যাক্তির শরীরে এক এক ধরণের জেনেটিক্যাল মিউটেশন ঘটে, এ মিউটেশনগুলির মধ্যে কিছু আছে যেগুলি খুবই সুবিধাজনক,  যদি গ্রীন ফ্লাইয়ের মতো সরাসরি প্রাণীরা একশভাগ জিন পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তর করে দিতো তবে একক ব্যাক্তির ভিন্ন ভিন্ন সুবিধাজনক মিউটেশনগুলিকে ব্যাবহার করার কোন সুযোগ থাকতোনা, যৌন প্রজনন এ জন্যেই বিবর্তিত হয়েছে কারণ এটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাক্তির জিনপুলের সুবিধাজনক মিউটেশনগুলিকে ব্যাবহার করে শক্তিশালী জিনপুল তৈরি করতে সাহায্য করে যারা অধিক বৈচিত্রময় এবং টিকে থাকার ক্ষেত্রে দক্ষ।

রিচার্ড ডকিন্স বলেছেন, আমরা আমাদের শরীরকে একটি সার্ভাইভাল মেশিন মনে করতে পারি, যে মেশিনটি ইমোর্টাল জিনরা টিকে থাকার স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট ডিউরেশনের জন্যে তৈরি করেছে!আমাদের ক্রোমোজোমকে তুলনা করা যেতে পারে একটি গ্রন্থের সাথে, আর জিন হলো সে গ্রন্থের এক একটি পেজ, প্রত্যেকটি পেজের জিনের মধ্যে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য লিখা থাকে, যদি একটি জিন বলে চোখের রঙ বাদামী হবে তবে অন্য আর একটি জিন বলছে চোখের রঙ হবে নীল, এভাবে ক্রোমোজোম নামক গ্রন্থটিতে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক সংস্করণ থাকতে পারে।এ প্রতিযোগি সংস্করণ গুলিকে বলে এলিল।যদি নীল চোখের জিনের এলিলটি ডোমিনেন্ট হয় তবে বাদামী চোখের নিয়ন্ত্রণকারী এলিলটি রিসেসিভ হয়ে যাবে, আর এভাবে যেকোনো একটি বৈশিষ্টের এলিল জিনপুলে স্থান করে নেয়।ঠিক একইভাবে আমরা যৌন প্রজনন ও অযৌন প্রজননকে ক্রোমোজমের দুটি ভিন্ন ভার্সনের এলিল বলতে পারি, কোনো একটি জিন হতে পারে যৌন প্রজননের পক্ষে আর একটি জিন যৌন প্রজননের বিপক্ষে।বিবর্তনীয় পথের কোন একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে হয়তো কোনোপ্রকার নির্বাচনী চাপের ফলে বিকল্প এলিলটি ডোমিনেন্ট হয় যার ফলশ্রুতিতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে যৌন প্রজনের মতো  সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়!যৌনতার জন্য কোনো জিন অন্য সেই সব জিনদের তাদের নিজেদের স্বার্থপর উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে প্রভাবিত করবে, একই কাজ করবে মাইওসিস কোষ বিভাজনের সময় ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়াটির জন্যে দায়ী একটি জিন।

এছাড়া মিউটেটর জিন নামক একপ্রকার জিন রয়েছে, যারা অন্যজিনের অনুলিপি গুলি তৈরি করার সময় তারা কী পরিমাণ ভুল করছে (Copying Error Rate) নিরুপন করে!ডেফিনেশন অনুযায়ী যখন মিউটেটর জিন অন্য জিনদের অনুলিপি তৈরি করার সময় ভুলের পরিমাণ নির্ণয় করতে যায় তখন সে সব অনুলিপনকারী জিনগুলি সমস্যার মধ্যে পড়ে।তাতে স্বার্থপর মিউটেটর জিনের কিছুই আসে যায়না কারণ এ ভুল ধরার মাঝে ঐ স্বার্থপর জিনের টিকের থাকার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ উপযোগীতা আছে আর ঠিক এ কথাটি যৌন প্রজননের সাথে সংশ্লিষ্ট স্বার্থপর জিনদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।স্বার্থপর মিউটেটর জিন যদি ভুল ধরে বিশেষভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হয় তবে সেটি জিনপুলে সে বিশেষ স্থান অধিকার করবে কারণ সেলফিশ মিউটেটর ভুল ধরার কারণে অন্য জিন গুলির প্রতিলিপি তৈরির গতি স্লো হয়ে যায়, আর সময়ের এ স্থিরতাকে ব্যাবহার করে স্বার্থপর মিউটেটর জিন নিজেদের জিনপুলে ছড়াতে থাকে, আর এতে করে জিনপুলে স্বার্থপর মিউটেটর জিনের সংখ্যা বেড়ে যায়!!

সেলফিশ জিন ও যৌন প্রজনন ;

  • Evolution of Sexual Reproduction 
  • Evolution of Sexulity Bilology and Behaviour 
  • যৌন প্রজনন কিসের জন্য ভালো সেই প্রশ্নটির সমস্যা আগের মতই এখনও আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে লোভনীয় একটি প্রস্তাবনা, যদিও বেশ কিছু ভাবনা উদ্রেক করার মত বই প্রকাশিত হয়েছে এই বিষয়ে, বিশেষ করে, এম. টি.গিশেলিন, জি. সি. উইলিয়ামস, জে.মেনার্ড স্মিথ এবং জি. বেল প্রমূখ লেখকদের লেখা, এছাড়া একটি খণ্ড, যা সম্পাদনা করেছেন আর. মিশোদ এবং বি. লেভিন। আমার মনে হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধারণাটি এসেছে ডাবলিউ. ডি.হ্যামিলটনের পরজীবী তত্ত্বটি থেকে,যা সাধারণ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে জেরেমি শেরফাস ও জন গ্রিবিন তাদের The Redundant Male বইটিরে।
  • Replicators and Vehicles, Richard Dawkins
  • The Selfish Gene, Richard Dawkins, 160-167, Mahbub Hasan

 

আমাদের প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলগুলি ;

 

hsbd bg