মূলপাতা বিজ্ঞানবিবর্তন পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তন

পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তন

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
319 বার পঠিত হয়েছে

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তন ব্যাখ্যায় সেলফিশ জিন তত্ব!!

 

ল্যাটিন আমেরিকার বর্তমান জনসংখ্যা তিনশত মিলিয়ন।বর্তমানে জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যদি প্রতি মিনিটে ঠিক একই হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে তবে মাত্র ৫০০ বছরে সমস্ত মহাদেশ মানব কার্পেটে পরিণত হবে।পৃথিবীতে শুধু মানুষ থাকবে কিন্তু তাদের আন্তঃমানবিক দূরত্ব থাকবেনা!তারা এদিক ওদিক চলাচল করতে পারবেনা, স্ট্যাচুর মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।যদি এভাবে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে তবে প্রকৃতিতে খাদ্যের অভাব দেখা দেবে, মানুষকে অপেক্ষাকৃত কম খাবার খেয়ে সার্ভাইভ করতে হবে।ফলে যে সকল মানুষ অপেক্ষাকৃত ভারী এবং যাদের অনেক বেশি খাদ্যের প্রয়োজন হয় তারা প্রয়োজনীয় খাবার পাবেনা এবং খাদ্যের অভাবে দূর্বল ও শীর্ণকায় হয়ে যাবে।ডকিন্সের মতে তারপরেও জনসংখ্যার এ বৃদ্ধিকে ঠেকানো সম্ভব হবে না, যার প্রভাব হবে ভয়াভহ!

আজ থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর পূর্বে আমাদের গ্রহে সেপিয়েন্সদের অন্তত ছয়টি প্রজাতির বিচরণ করেছিলো।যাদের মধ্যে একটি ছিলো হোমো ফ্লোরেনসিয়েসিস।এদের উচ্চতা ছিলো এক মিটার।ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপ তার মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক হওয়ার পূর্বে হোমোফ্লোরেসিয়েন্সিস নামক এ প্রজাতিটি ছিলো আকারে অনেক বড়।মূল ভুখন্ড থেকে পৃথক হয়ে এটি যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো তখন সেই ক্ষুদ্র দ্বিপটিতে প্রচুর খাদ্যের সংকট দেখা দিলো।দ্বীপের সকল প্রাণীর টিকে থাকার পর্যাপ্ত উপকরণ সেখানে ছিলোনা যার ফলে অপেক্ষাকৃত উচ্চতাসম্পন্ন আর স্বাস্থ্যবান প্রাণীরা খাদ্যের অপ্রতুলতার কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেলো কিন্তু যে সব প্রাণী অপেক্ষাকৃত আকারে ছোট, যাদের জন্যে খুব কম খাদ্যই যথেষ্ট ছিলো, তাদের জিন জিনপুলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো যারা অল্প খেয়ে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিলো ।হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস’দের মধ্যেও যারা ছিলো অপেক্ষাকৃত খাটো এবং চিকন তারাই সে প্রতিকূল পরিবেশে প্রজননের সুবিধা প্রাপ্ত হলো।আর এভাবে হাজার বছরের এ বিবর্তনীয় চাপ ফ্লোরেসিয়েনসিস’দের অতি-ক্ষুদ্র বামন মানবে পরিণত করে দেয়।

আমরা যদি হাইপোথেটিক্যালি চিন্তা করি তবে এ গ্রহে (পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তন) আবার হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস’দের ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে।কারণ আজ থেকে মাত্র ৫০০ বছর পর, ল্যাটিন আমেরিকাতে যে হারে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে সে হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে এ বাড়তি জনসংখ্যার চাপ ল্যাটিন আমেরিকা সামলাতে পারবেনা, হয়তোবা সম্পূর্ণ মহাদেশেই ফ্লোরেস দ্বীপের সেই সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হবে!আর এ বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সহ্য করতে না পেরে, মানুষ হয়তো খাদ্যের অভাবে পরিণত হবে ৭০ হাজার বছর পূর্বের সেই একমিটার লম্বা হোমো ফ্লোরেনসিয়েসিস!কারণ প্রাকৃতিক নির্বাচন শুধুমাত্র সে সকল মানুষদের আনুকূল্যতা প্রদর্শন করবে যারা অপেক্ষাকৃত ছোট এবং কম খেয়ে টিকে থাকতে পারে!

 

 

আর যদি তা না হয় তবে, যদি জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তেই থাকে, তবে ডকিন্স বলেন, ২০০০ বছর নাগাদ, মানুষের পর্বত, আলোর গতিতে বাইরের দিকে ছুটে চলার মাধ্যমে পৌঁছে যাবে আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বের সীমানা পেরিয়ে।যাহোক, নিশ্চয়, বুঝতে পারছেন, এগুলি হাইপোথেটিক্যাল গণনা মাত্র, বাস্তবে কিছু বিশেষ কারণে এসবের কোনটিই ঘটবেনা, আর তার কারণ দূর্ভিক্ষ, মহামারী, যুদ্ধ অথবা যদি ভাগ্য ভালো হয় তবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ! আমাদের দেহ হলো জিনের সার্ভাইভাল মেশিন।জিনের উদ্দেশ্য জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি।আর তাই প্রতিটি সার্ভাইভাল মেশিনই চাইবে প্রজননের মধ্য দিয়ে অধিকহারে বংশবিস্তার করতে!আমরা টিভি দেখি, কম্পিউটার গেম খেলি অথবা মহাকাশে ভ্রমণ করি! জিনের কাছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, জিন শুধু তার অনুলিপি তৈরি করছে এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম রেডিয়েট করছে।অতএব এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হতে পারে অতিরিক্ত জনসংখ্যা বিস্ফোরণ সম্পর্কে জিনের ভেতর কোনো সচেতনতা নেই!আর হ্যা, জিন শুধু অনুলিপি তৈরি করে, তার কোন চেতনা নেই, অতএব হয়তোবা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে আমরা সেলফিশ জিন তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারিনা!কিন্তু প্রাণীদের গবেষণা করে জানা গেছে জনসংখ্যার বৃদ্ধির এ সুত্রটি তাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন!প্রকৃতিতে প্রাণীরা বংশবিস্তার করছে ঠিকই  কোনো প্রাণী একটি কাজ করছেনা আর তা হলো তারা অনির্দিষ্ট হারে জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে অব্যাহত রাখছেনা।প্রকৃতিতে প্রায় প্রত্যেকটি প্রাণী তাদের সন্তানের জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে।একদিকে জিন তার সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্যেই অন্ধভাবে পোগ্রামড  আর অন্যদিকে প্রত্যেকটি প্রাণীই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মেনে চলছে!যেটি আপাত দৃষ্টিতে জিনের  স্বার্থপর উদ্দেশ্যের স্ববিরোধী!

ওয়েইন এওয়ার্ড তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্যে সম্পূর্ণ ভিন্নরকম একটি তত্ব ব্যাবহার করেছেন।ওয়েইন এডওয়ার্ড মনে করেন প্রাণীজগতে জন্মনিয়ন্ত্রণের ধারণাটি বিকশিত হয়েছে গ্রুপের সকলের ওয়েলফেয়ারের স্বার্থে।কোনো একক সদস্য ব্যাক্তিগত পর্যায়ে এ জন্যেই জন্মহারকে নিয়ন্ত্রণ করে যেনো অতিরিক্ত জনসংখ্যার বিস্পোরণে তাদের গ্রুপ অন্য গ্রুপের তুলনায় কোনোপ্রকার সংকটজনক পরিস্থিতিতে না পড়ে!এ ধারণাটি বহু ক্ষেত্রে প্রমাণিত হলেও গ্রুপ সিলেকশন তত্বটির মাঝে কিছু মৌলিক ত্রুটি রয়ে যায়।

কিছুকিছু প্রাণী আছে যারা তাদের ক্লাচ সাইজ বা ডিমের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে, স্বার্থপর জিন তত্ব অনুসারে, জিনের উদ্দেশ্য জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা,  অতএব একটি পাখির উচিত ছিলো একটির পরিবর্তে দুটি ডিম পাড়া, কারণ দুটি ডিমের মধ্যে জিনের অনুলিপি বেশি থাকে, এভাবে যদি চিন্তা করা হয় ১০০ টি ডিমের মধ্যে সেলফিশ জিনের আরো বেশি অনুলিপি থাকবে, অতএব তাদের উচিত আরো বেশি ডিম পাড়া, কিন্তু দাড়ান! অনন্ত মিলিয়ন ডিমের মধ্যে তো জিনের আরো বেশি অনুলিপি থাকে?এজন্যে, পাখিটির জন্যে নীতিগত ভাবে অনন্ত কোটি ডিম পাড়া উচিত !তাই নয় কী?তাত্বিকভাবে, এটাই ঘটতো যদি না অনন্ত সংখ্যক ডিম তৈরি ও ফোটানোর জন্যে পাখিদের অসীম পরিমাণ সম্পদ থাকতো!দূর্ভাগ্যজনকভাবে সম্পদের পরিমাণ সীমিত, আর তাছাড়া অতিরিক্ত সন্তান জন্ম দেয়ার ফলে একটা সময় পাখিদের উর্বরতা কমে যেতে পারে, আর তখন তারা চাইলেও অধিক ডিম পাড়তে পারবেনা! আবার অনেকক্ষেত্রে সীমিত সম্পদ অধিক সংখ্যক সন্তানের মধ্যে  বিভক্ত করতে গেলে একক শিশুদেহ অপেক্ষাকৃত কম খাবার পেতো, আর এতে করে তারা অনেক বেশি দূর্বল হয়ে উঠতো,  শিশুরা মারা যেতো; স্বার্থপর জিন অধিক সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে পরিমিত সেবার অভাবে প্রায় সকল সন্তানকেই মেরে ফেলতো!এমতাবস্থায় স্বার্থপর জিনের নিজের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে অবশ্যই এমন সংখ্যক সন্তান জন্ম দেয়া ঠিক হবেনা, যারা সীমিত সম্পদের অসম বন্টনে, পরিপূর্ণ পুষ্টির অভাবে নিজেরাই মারা যাবে।এর মানে এই নয় যে জিন খাদ্যসংকটের কারণে প্রজাতির মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি করবে বরং জিন এ জন্যেই জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রবণতা তৈরি করবে যেনো পরবর্তী প্রজন্মে কিছু সংখ্যক জিন হলেও টিকে থাকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে।আর ঠিক এভাবেই সেলফিশ জিন তার

স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে প্রজাতির ক্লাচ সাইজ নিয়ন্ত্রণ করে!জন্মনিয়ন্ত্রণে আরো একটি প্রভাবক হচ্ছে টেরিটরি। বহু প্রজাতির প্রাণী আছে যারা বিপুল সময় ও শক্তি অপচয় করে তাদের টেরিটোরি রক্ষা করার জন্যে,  টেরিটোরি হতে পারে নির্দিষ্ট একটি এলাকা, হতে পারে এটি একটি জঙ্গল।শুধুমাত্র স্থন্যপায়ী, পাখি বা মাছই নয় এমনটি  কীটপতঙ্গ এবং সী- অ্যানিমোনরাও টেরিটোরির জন্যে একে অপরের সাথে লড়াই করে!হেরিং গার্লদের জন্যে এটি হতে পারে ক্ষুদ্র একটি এলাকা, যে এলাকাতে কোনো খাদ্য নেই, এলাকাটির মাঝখানে তাদের নীড়…!
অতএব একটি শূন্যস্থানের জন্যে তাদের যুদ্ধ করার কোনো কারণ ছিলো না!কবির ভাষায় বললে, এত মিলিয়ন আলোকবর্ষ আয়তন জুড়ে বিস্তারিত এ মহাবিশ্বের অতি-ক্ষুদ্র একটি স্থান নিয়ে যুদ্ধ করার মাঝে কী এমন উপকারীতা আছে!টেরিটোরিয়াল যুদ্ধে বিজিতরা পুরস্কার হিসেবে কোনো খাবার পায় না, তারা যা পায় তা হলো নারীর মন, প্রজননের সার্টিফিকেট।কারণ অনেকক্ষেত্রেই নারীরা সে সকল পুরুষের সাথে প্রজনন করতে অস্বীকৃতি জানায় যার নিজস্ব কোনো টেরিটরি নেই।রিচার্ড ডকিন্স বলেছেন, নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষের চেয়েও মানসিকভাবে তার টেরিটোরির সাথেই জড়িত থাকে, একজন পুরুষ মারা গেলে বা তাকে পরজিত করে অন্য কোনো পুরুষ টেরিটরি দখল করলে নারী সদস্যরা খুব দ্রুত আগন্তুকের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করে!টেরিটোরিয়াল যুদ্ধে পরাজিতরা তাদের পরাজয়কে খুব সহযে মেনে নেয়, যেনো তারা খেলার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে তাদের পরাজয়কে মেনে নিয়েছে, গ্রুপ সিলেকশনিস্টরা  এটাকে পরার্থবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে।যাহোক, আমরা দেখতে পাচ্ছি যারা টেরিটোরি দখল করছে তারাই প্রজননের লাটারি জেতে আর যারা টেরিটোরি দখল করতে পারে না তারা প্রজনন চেষ্টা থেকে দূরে সরে আসে।আর ঠিক এভাবে প্রাকৃতিকভাবেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রিত হয়!
ওয়েইন এডওয়ার্ড বিষয়টিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান।তিনি এর একটি সাহসী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন!কেনো পরাজিত ‘রা প্রজননের চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ডেস্টিনির কাছে আত্মসমর্পণ করে!একটা কথা মনে রাখুন, জিনের উদ্দেশ্য প্রজনন ও বংশবিস্তার।অতএব পরাজিতরা যদি প্রজননের সুযোগ বঞ্চিত হওয়ার পর প্রচেষ্টা ছেড়ে দেয় তবে জিনের সেই স্বার্থপর উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়!আবার আমরা দেখি এদিকে হেরিং গার্লরা পরাজয়ের পর মুহূর্তেই তাদের প্রজননের চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে।আপাত দৃষ্টিতে এটিকেও স্বার্থপর জিনের  স্ববিরোধী মনে হয়!এডওয়ার্ড যদিও সেলফিশ জিন তত্বের বিপরীতে কিন্তু তিনি বিষয়টি চমৎকার ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।তার মতে, মূলত,  টেরিটোরির দখলের ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে সামাজিক স্তরবিন্যাস তৈরি হয়, যারা ক্ষমতাবান তারাই টেরিটোরি দখল করে, আর এরা গ্রুপের দূর্বল সদস্যদের নারীদের সংস্পর্শে আসতে বাধা দেয়, আর ঠিক এভাবে তারা দূর্বল হেরিং গার্লদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে, অনেকটা আর্টিফিশিয়াল সিলেকশনের মতো, শুধু আত্মমর্যাদা সম্পর্ণ প্রাণীরাই বংশবিস্তার করতে পারে, যারা ক্ষমতার দিক থেকে  সমাজের প্রথম স্তরে!এখানে পরিস্কার যে, মর্জাদার স্তর বিন্যাসের উপর ভিত্তি করেই তারা প্রজননের সার্টিফিকেট পায়, আর এভাবে শুধুমাত্র যারা প্রজনন করার জন্যে সার্টিফিকেট পাচ্ছে, একমাত্র তারাই বংশবিস্তার করতে পারে।এ প্রকৃয়ায় দলের অপেক্ষাকৃত দূর্বল প্রাণীরা প্রজনন করতে পারেনা, তাদের বিশাল সংখ্যক বিবর্তনের ছাকুনিতে ঝরে পড়ে যায় আর এভাবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে অচেতনভাবেই শুধু উচ্চশ্রেণীর সংখ্যালগিষ্ঠ এলিট হেরিং গার্লরাই বংশবিস্তার করে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রন করে!এদিকে যারা পরাজিত তারাও সুযোগের অপেক্ষা করে, পর্যবেক্ষণ করে, তারা এ সময় গবেষণা করে তারা কাকে পরাজিত করার ক্ষমতা রাখে, আর কার সাথে যুদ্ধ করতে গেলে গোহারা হারার সম্ভাবনা আছে এভাবে বিভিন্ন স্তরের মর্জাদাসম্পন্ন প্রাণীরা একে অপরের সাথে বিক্ষিপ্ত ও খন্ড যুদ্ধ চালিয়ে যায়।এরপর ওয়েইন এডওয়ার্ড সিদ্ধান্তে আসেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের আত্মমর্যাদার যুদ্ধগুলিকে মূলত যৌনতার যুদ্ধ বলা যায়।মূলত হেরিংরা যখন নিজেদের মাঝে মর্জাদা নিয়ে যুদ্ধ করে তখন তাদের যুদ্ধের বিষয়বস্তু থাকে নারীর যৌনাঙ্গ, আত্মমর্জাদা শুধু সে যুদ্ধের পটভূমি !

ওয়েইন এডওয়ার্ড এর সবচেয়ে বিষ্ময়কর একটি ধারণা ছিলো এপিডাইকটিক আচরণের ধারণাটি।এ নামটি তার নিজেরই আবিষ্কার!বহু প্রাণীরা সময়ের বিশাল একটি অংশ কাটায় দলবদ্ধ হয়ে।কমনসেন্স থেকে দেখলে মনে হবে, হয়তো এ ধরণের দলবদ্ধ হয়ে বাস করাটা তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো উপযোগিতা দেয়।এডওয়ার্ড এর ধারণা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন।যখন স্টারলিন পাখিদের বিশাল একটি দল প্রতি সন্ধ্যায় একত্রিত হয় এবং এক গুচ্ছ মিজ কোনো  গেটপোস্টের উপর নাচানাচি করে তখন তারা আসলে জনসংখ্যা শুমারির মতো কিছু একটা করে বা তারা মূলত তাদের জনসংখ্যার ঘণত্ব পরিমাপ করতে চায়।একটি থার্মোমিটারের কাজ করা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে ঠিক যেমন একটি থার্মোস্ট্যাটের দরকার হয়। ওয়েইন-এডওয়ার্ডস এর জন্য এই ‘এপিডাইকটিক’ আচরণ হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে কোনো জমায়েত হবার একটি উপায় যা জনসংখ্যার পরিমাণ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। তিনি অবশ্যই কোনো সচেতন প্রক্রিয়ায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন না এখানে, কিন্তু একটি স্বয়ংক্রিয় স্নায়বিক ও হরমোন নির্ভর কোনো প্রক্রিয়া, যা কোনো একক সদস্যর তাদের জনসংখ্যার ঘনত্বের প্রতি সংবেদী অনুভূতির সাথে তাদের প্রজনন তন্ত্রকে সংযুক্ত করেছে।

এপিডাইকটিক আচরণের ব্যাপারটি আমি আর একটু পরিস্কার করার প্রয়োজনবোধ করছি, এটি এতটাই নিদারুণ সুন্দর একটি ব্যাপার যে যা আমি আলোচনা না করে এড়িয়ে যেতে পারছিনা।আমরা জানি শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়, ভেড়ার প্রজননের জন্যে তাই এ সময়টা মোটেও উপযোগী নয়।আর তাই তাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র তাদের প্রজনন তন্ত্রকে শীতকালে সন্তান জন্মদান থেকে বিরত রাখবে!এর কারণ শীতকাল ভেড়ার জন্যে বিবর্তনীয়ভাবে অসুবিধাজনক।ঠিক একইভাবে যে সব প্রাণীরা এপিডাইটিক প্রদর্শনী করছে, তারা মূলত এটি করে তাদের জনসংখ্যার ঘণত্বের মানসিক জরিপ তৈরি করার জন্যে যেটাকে সাইকোলজিক্যাল ম্যাপিং বলা যেতে পারে!জনসংখ্যার ঘণত্ব যদি বেশি হয় স্টারলিন পাখিদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র যৌনতার জন্য উদ্দীপিত হবেনা এনং প্রজননতন্ত্রকে এটি ইন্টারকোর্সের জন্যে ফোর্স করা থেকে বিরত থাকবে।কিন্তু জনসংখ্যার ঘণত্ব যদি কম হয় তবে তাদের স্নায়ুতন্ত্র যৌনতার জন্যে উদ্দীপিত হবে এবং প্রজননতন্ত্রকে রাসায়নিক সিগনাল সেন্ড করবে যেনো প্রজননতন্ত্র প্রজননের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করে।বৃষ্টির উপস্থিতি যেমনিভাবে ব্যাঙদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রজননের জন্যে সিগনাল পাঠায় ঠিক তেমনি এপিডাইডিক আচরণ জনসংখ্যার ঘণত্ব পরিমাপ করে স্টারলিন পাখিদের প্রজননের জন্যে সিগনাল পাঠায় আর এভাবে এই প্রদর্শনী যৌনযন্ত্র ও ব্রেনকে নিয়ন্ত্রণ করে!আমরা যেমন নারীদের শরীরের সেক্সুয়াল ইন্ডিকেটরগুলির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যৌনতায় লিপ্ত হই, স্টার্লিং পাখিদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তেমন নয়, তারা শুধুমাত্র সেক্সুয়াল ইন্ডিকেটর দেখেই যৌন উত্তেজনাবোধ করেনা, তারা যৌন উত্তেজনতাবোধ করে জনসংখ্যার ঘণত্ব দেখে!অতএব যৌনতা পুরোপুরিভাবে শারীরিক এ কথাটি সত্য নয় হয়তো, যৌনতার উদ্দীপনা শরীর ছাড়াও পরিবেশ, পরিস্থিতি, জনসংখ্যা ও সময়ের বিশেষ উপযোগীতার উপরও নির্ভর করে, এ জন্যে দেখা যায় বছরের এক একটি ঋতুতে এক একটি প্রাণী এক এক সময় সন্তান জন্মদান করে!আমরা এপিডাইটিক আচরণকে সেলফিশ জিন তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও এটির  গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটেনা কারণ জিন তার স্বার্থরক্ষার জন্যে নিশ্চয় জনসংখ্যার ঘণত্ব বোঝার উপযোগী করে তাদের ব্রেনকে বিবর্তিত করতে পারে!

যাহোক আমার এ প্রবন্ধটির মূল বিষয়বস্ত ছিলো জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা।পরিবার পরিকল্পনার স্বার্থপর জিন তত্বটি প্রস্তাব করেছেন জন ল্যাক।তার মতে, বন্য পাখিরা তাদের ডিমের সংখ্যা (ক্লাচ সাইজ) নিয়ন্ত্রণ করে, প্রজাতির অন্য সদস্যের কল্যাণের জন্যে নয়, বা কোনো গ্রুপের মঙ্গলের জন্যে নয়,  তারা এটি করে তাদের জিনের স্বার্থে যা আমরা প্রবন্ধের শুরুতে আলোচনা করেছিলাম।যেমন, গ্যানেট আর গিলমেটরা একটি করে ডিমে তা দেয় একটি সময়ে, সুইফটা তিনটি, গ্রেট-টিটরা আধা ডজন বা তার কিছুটা বেশী। বেশ কিছু পার্থক্য আছে বা বৈচিত্র্যও আছে: যেমন, কিছু সুইফট মাত্র দুটি করে ডিম পাড়ে একবারে, গ্রেট টিটস কখনো বারোটি ডিমও পাড়তে পারে।একটা বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যে কোন পাখি ঠিক কতগুলি ডিম পাড়বে সেটি আংশিক নিয়ন্ত্রিত হবে জিনগতভাবে। হয়তো কোনো একটি পাখি যেমন গ্রেট টিটের জিন পুলে একটি এলিল আছে আটটি ডিমের , কোনটিতে ১৫  অথবা কোনো একটি এলিল আছে যার ডিমের সংখ্যা বিশ।

যেহেতু জিনের উদ্দেশ্য জিনের সংখ্যাবৃদ্ধি সেহেতু সবচেয়ে উচ্চতম সংখ্যার এলিলটি জিনপুলে রেডিয়েট হওয়া উচিত ছিলো।কিন্তু বাস্তবিকই দেখা যায় এ বিকল্প এলিলগুলির মধ্যে সে সংখ্যাটিই জিনপুলে আধিপত্য বিস্তার করে যে সংখ্যাটি পাখিদের জন্যে সুবিধাজনক।ডিম পাড়া, তা দেয়া, ডিমের রক্ষণাবেক্ষণ, ডিম ফোটানো এটা অনেক বেশি শ্রমসাধ্য কাজ।গ্রেট টিটরা সূর্যের আলো থাকা অবস্থায়  প্রতি ত্রিশ সেকেন্ডে একটি করে খাবার তাদের সন্তানের জন্যে নিয়ে আসে।প্রাণীদের বিপুল সময় এবং শক্তি বিনিয়োগ করতে হয় শুধুমাত্র প্রজনন ও বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে।অতএব নিশ্চয় বেশি সংখ্যক ডিমের এলিলটি ঠিক এ কারণেই জিনগতভাবে রিসেসিভ হবে এবং সে এলিলটির পরিবর্তে এমন একটি এলিল জিনপুলে ডোমিনেন্ট হবে, যে সংখ্যাটি বড় নয় আবার গ্রেট টিটদের সে সংখ্যক শিশুদের লালন পালনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য থাকে।

যদি বেশি সংখ্যক সন্তান জন্ম দেয়ার পরে সব সন্তানই খাদ্যের অভাবে মারা যায় তবে ভবিষ্যত প্রজন্মে যে জিনটি  বেশি সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম সে জিনটি নিজেকে রেডিয়েট করতে পারবেনা, এজন্যে সেলফিশ জিনটি সীমিত আকারে হলেও  তার ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করার জন্যে অনিশ্চয়তাপূর্ণ ক্লাচ সাইজটিকে উপেক্ষা করবে!প্রকৃতিতে ঠিক এভাবেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত হয়।মানুষ ছাড়া প্রাণী জগতের বিভিন্ন প্রজাতির পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিটি আংশিকভাবে সেলফিশ জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিন্তু রাষ্ট্রের মতো জনকল্যাণমূখী একটি প্রতিষ্ঠানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জিনের তেমন একটা ভূমিকা নেই বললেই চলে!কারণ মানুষ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো প্রজাতির মধ্যে কল্যাণমূখী রাষ্ট্র নেই।একটি গ্রেট টিটের সন্তান যদি খাদ্যের অভাবে মারা যায় তবে অন্য কোনো গ্রেট টিট তার জন্যে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখবেনা, ক্ষুদার্থ শিশুদের নিয়ে ইউটিউব চ্যানেলে কোনো মানবিক আবেদন প্রচার করবেনা, সরকার সে শিশুটির দায়িত্ব নেবেনা কারণ তাদের সমাজে রাষ্ট্র নামক কোনো যন্ত্র নেই, তারা রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনা, তাদের মস্তিষ্ক রাষ্ট্র গঠনের উপযোগী করে বিকশিত হয়নি!

একজন মানব শিশুর ক্ষুদা নিবারণের জন্যে সম্পূর্ণ একটি রাষ্ট্র কাজ করে, রাষ্ট্রীয় প্রকৃয়ায় রাষ্ট্রকেই অর্থনৈতিক একক মনে করা হয়, পরিবারকে নয়। কিন্তু একটি বেবুনের জন্যে নিশ্চয় এ কথাটি  সত্য ঠিক নয়।তার ক্ষুদা নিবারণের জন্যে রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনা!

রিচার্ড ডকিন্সের মতে, রাষ্ট্রীয় এ সুবিধা জনসংখ্যার বিস্ফোরণকে খুব দ্রুতগতিতে ত্বরাণ্বিত করে!কিন্তু প্রশ্ন হলো মানুষ কিভাবে রাষ্ট্রকে গঠন করলো যা তাদের জিনগত প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত করে দিয়ে বরং জিনকে অধিক সংখ্যক সন্তান জন্মের সার্টিফিকেট প্রদান করলো?হারারি তার গ্রন্থে বলেছিলেন, আজ থেকে ত্রিশ হাজার বছর পূর্বে সেপিয়েন্সদের জিনে এক্সিডেন্সিয়াল একটি মিউটেশন ঘটেছিলো যা তাদের নিউরাল কানেকশন বদলে দেয় আর ঠিক তখন থেকে তারা উদ্ভাবন করে ভাষা যে ভাষার মাধ্যমে তারা গল্প তৈরি করতে শেখে, তারা এমন সব গল্প তৈরি করে, যে গল্পের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ কাল্পনিক, বাস্তব জগতে যা কিছুর কোনো অস্তিত্ব নেই তারা সে সব বিষয় নিয়েই তখন কথা বলে আর এ সব গল্প দ্রুত জনগোষ্ঠীর মিমপুলে ভাইরাল হয়ে যায় যার ভেতর দিয়ে তারা বিরাট জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যক সদস্যকে  একটি নির্দিষ্ট চিন্তার সুত্রে বন্ধী করে ফেলে, কবিতার এক একটি  ছন্দের মতো বিভিন্ন জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ ভাবে একটি সাধারণ ও সার্বজনীন গল্পের অংশ হয়ে যায় যা তাদের মধ্যে একপ্রকার বিশ্বজনীন মনোভাব তৈরি করে।দুজন সেপিয়েন্স হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করা সত্ত্বেও  তাদের মধ্যে ভাইরাল হওয়া গল্পগুলি সাধারণ( Common)  হয়  তারা মানসিকভাবে একই কাল্পনিক গল্পের মধ্যে বাস করে আর এসব তৃতীয় গল্পে বিশ্বাস বিরাট সংখ্যক সেপিয়েন্সকে দলবদ্ধ করতে সাহায্য করে, ভুত,প্রেত,ঈশ্বর, টাকা ইত্যাদি সার্বজনীন গল্পগুলিতে বিশ্বাসই তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে, আর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিও হলো এদেশের সতের কোটি মানুষের মনের সামষ্টিক বিশ্বাস যেটি ঈশ্বর, স্বর্গ, কোম্পানি,ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এবং টাকা  অথবা ভূতের মতোই একটি সার্বজনীন কল্পনা, যে কল্পনার প্রতি  সামষ্টিক বিশ্বাস তাদের  ঐক্য ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজ গড়তে সাহায্য করে!মানবতাবাদ, পরার্থবাদের মতো মিথগুলি ভাইরাল হওয়ার ভেতর দিয়ে তারা রাষ্ট্রের মধ্যে এমন একটি সার্বজনীন মনোভাব তৈরি করেছে যার ফলে একজন মানুষ বিপদে পড়লে অন্য আর একজন কোনোপ্রকার জিনগত সম্পর্ক ছাড়াই একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে! তারা মানবতাবাদ নামক একটি নির্দিষ্ট গল্পে বিশ্বাস করে ঠিক যেমনি ইসলাম নামক একটি সার্বজনীন গল্পে বিশ্বাসের ফলে মোহাম্মদের ব্যাঙ্গচিত্র অংকন করলে গ্রহের একে অপরের অচেনা অজানা অপরিচিত মানুষ গুলি হাজার মাইল ব্যাস দ্বারা বিচ্ছিন্ন হলেও এন্ট্যাংগেল পার্টিকেলের মতোই  একযোগে রিয়েক্ট করে!আন্তঃব্যাক্তিক বিশ্বাসের উপর ভর করে  একসাথে ফ্রান্সের পন্য বয়কট করে, আন্দোলন করে বিশ্বজুড়ে।ভাষা ও উদ্ভট বিশ্বাসযোগ্য গল্প বলার ক্ষমতা দিয়েই  মানুষ রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল গঠন করেছে আর সেখানে রাজত্ব করে সে সব গল্পের সংস্কৃতিক একক বা মিমগুলি  অথবা মানব রচিত মিথগুলি; টাইম ল্যাগের কারণে সেলফিশ জিনের এখানে সরাসরি কোনো প্রভাব নেই, অতএব অন্য কোনো প্রাণীর সন্তান ক্ষুদার্ত অবস্থায় মারা গেলেও মানবতাবাদী গল্পে বিশ্বাসী রাষ্ট্রে তাদের মৃত্যুর  ঝুকি অনেকটাই কমে যাবে!আর তাই জিনগতভাবে মানুষ তাদের সন্তান জন্মের হারকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাবেনা কারণ অতিরিক্ত সন্তান জন্মের ফলে একটি নির্দিষ্ট সময় অবধি তারা এর খারাপ প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে সক্ষম হবেনা যেটি এক্সিডেন্সিয়ালি হয়তোবা পৃথিবীতে  মানব ভাইরাস ছড়িয়ে দেবে!

রিচার্ড ডকিন্স মনে করেন একটি পরার্থবাদী রাষ্ট্র কখনোই বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল নয়।উদাহরণ হিসেবে বেবি সিটিং চক্রের কথা বলা যায়।কিন্তু বেবি সিটিং চক্র কী?শুনুন তবে, গীলমেটরা ডিম পাড়ে, সমতল চ্যাপ্টা পাথরের উপর।আর এ জন্যে তাদের ডিমগুলি এদিক ওদিক গড়িয়ে যায়,এক বাসার ডিম অন্য বাসায় , হাজার হাজার বছর ধরে তাদের সাথে এ প্রকৃয়া চলমান, তারা সব সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে কোনটা তার ডিম আর কোনটা তার ডিম নয় যেজন্যে তারা সম্ভাবনার উপর ভর করে যে কারো ডিমে তা দেয়।তাদেরকে অনিবার্যভাবে সম্ভাবনাময় ডিমে তা দিতে হয় যা তাদেরকে নিঃস্বার্থপর করে তোলে, এ নিঃস্বার্থপর গিলমেটদের মাতৃত্বের দূর্বলতাকে স্বার্থপর গিলমেটরা ব্যাবহার করে, তারা শুধু ডিম পেড়ে চলে যায় কিন্তু তাতে তা দেয়না, আর অন্য নিঃস্বার্থপর গিলমেটরা এসে স্বার্থপর গিলমেট এর ডিম ফুটিয়ে দেয়, কারণ  ব্রেন এখনো  কোনটা তার ডিম আর কোনটা তার ডিম নয়, এ পার্থক্যটি বোঝার জন্যে উপযোগী হয়নি।এ সুযোগ ব্যাবহার করে স্বার্থপর গিলমেটরা একের পর এক ডিম পাড়ে এবং অন্যরা সে ডিমে বাচ্ছা ফোটায়।একটা সময় নিঃস্বার্থপর গিলমেটরা নিজেদের কোন জিনই রেখে যেতে পারেনা, সম্পূর্ণ গোষ্ঠী সেলফিশ জিনে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।যখন পুরো জনগোষ্ঠী এক সময় স্বার্থপর গিলমেটে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে তখন কেউ আর কারো ডিমে তা দেয়না এতে করে বেবি সিটিং চক্রটি ভেঙে পড়ে!ঠিক একই ব্যাপারটি আমরা চরম পরার্থবাদী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি।রাষ্ট্র যদি অনিয়ন্ত্রিত সন্তান জন্মদানে বাধা না দিয়ে, অতিরিক্ত সন্তানের ভরণপোষণের ব্যাবস্থা করে তবে স্বার্থপর জিন রাষ্ট্রের এ পরার্থবাদীতার সুযোগটি গ্রহণ করবে এবং তাদের ক্ষমতার বাহিরে গিয়ে সন্তান জন্ম দেবে,  এতে করে এ আচরণটি মিম তত্ব অনুযায়ী সমস্ত জনগোষ্ঠীর মিমে ছড়িয়ে পড়বে, তারাও রাষ্ট্রকে এ পদ্ধতিতে ব্যাবহার করবে, আর সবাই যদি রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দায় উঠিয়ে দেয় তবে সেই রাষ্ট্রের বাড়তি জনসংখ্যার জন্যে কোনোকিছুই করার থাকবেনা, যেখানে সবাই একই সমস্যার মধ্যে নিপতিত হয় সেখানে কারো জন্যে একে অপরের প্রতি পরার্থবাদী হওয়ার সুযোগ  থাকেনা, তার অনিবার্য পরিণতি হবে যুদ্ধ ও ক্রুসেড আর এভাবে বেবি সিটিং চক্রের মতো এ পরার্থবাদী রাষ্ট্রটি পরম স্বার্থপর একটি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে।যখন রাষ্ট্র জনসংখ্যার চাপ সামলাতে না পেরে স্বার্থপর হবে ঠিক তখনই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে।গিলমেটদের স্বার্থপর জিন ঠিক যেমনিভাবে তার ক্লাচ সাইজ নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষের রাষ্ট্র নিজেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক জিনের মতোই একটা সময় রাষ্ট্রের মধ্যে বাড়তি জনসংখ্যার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে…!তারা তখন এটা  করছে মানবতা বা ধর্মের চাপে নয় তারা এ কাজটি করছে সরাসরি জিনের চাপে।

লেমিংরা যে সব এলাকায় জনসংখ্যার ঘণত্ব বেশি সেসব এলাকা থেকে সরে যায়।গ্রুপ সিলেকশনবাদীরা মনে করে এটি গ্রুপের সকল সদস্যের উপর চাপ কমানোর জন্যে কিছু সদস্যের নিস্বার্থপর আচরণ!কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, ডকিন্স বলেন, মূলত তারা জনসংখ্যার ঘণত্ব কমিয়ে জনগোষ্ঠীর উপকারের স্বার্থে তারা  এলাকা ত্যাগ করেনা, তারা এলাকা ত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত হালকা ঘনবসতি সম্পন্ন এলাকা খুজে বের করার জন্যে যা তাদের টিকে থাকা ও বংশবিস্তারের জন্যে আরো বেশি উপযোগী!

সি এনিমোনদের কোনো শক্তিশালী দল যদি কোন একটি হারেম দখল করে তবে পরাজিতরা তাদের কাছ থেকে দূরে সরে আসে তারা আর হারেম দখলের চেষ্টা করেনা।যারা হারেম দখল করেছে তারা প্রজননের সুবিধা পায় আর যারা পরাজিত তারা প্রজনন সুবিধা বঞ্চিত হয় এবং নিসংকোচে মেনে নেয়।এ প্রকৃয়ায় শুধু একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী উপকৃত হয়, যারা বংশবৃদ্ধি করে আর অন্যদের প্রজনন থেকে দূরে রেখে তারা জনসংখ্যার আকার সীমিত রাখে!পরাজিত সী এনিমোনদের এ আচরণকে পরার্থবাদী আচরণ মনে হতে পারে ঠিক যেমনটি ওয়েইন এডওয়ার্ড মনে করে কিন্তু স্বার্থপর জিন তত্ব অনুসারে এটি একটি কৌশল।তারা অপেক্ষা করে, তারা অপেক্ষা করে সে সময়ের জন্যে যে সময় বিজয়ীরা কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রভাবে পড়বে কারণ অপেক্ষাকৃত কম শক্তি নিয়ে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এনিমোনরা  শক্তিশালী সী এনিমোনদের আক্রমণ করতে গেলে তারা পুরোপুরিভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, আর অবশ্যই পুরোপুরিভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার তুলনায় মোক্ষম সুযোগের জন্যে অপেক্ষা করা জিনের জন্যে অধিক কল্যাণকর!তাই তারা জিনগত শিক্ষা অনুযায়ী অপেক্ষা করে, কখনো কখনো অপেক্ষার নিরবতার দেয়াল এতটাই দীর্ঘ হয় যে তাদের গ্রুপের প্রায় সব সদস্যই বিলুপ্ত হয়ে যায়,তারা না আক্রমণ করতে পারে অথবা না বিপুল সময় অপেক্ষা করে কোনো সুযোগ পায়, স্বার্থপর জিন তার আপন স্বার্থের প্যারাডক্সে পড়ে মৃত্যুবরণ করে!আর এভাবেই প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রজাতিদের মধ্যে জনসংখ্যার হার নিয়ন্ত্রিত হয়!জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ রুপে গ্রুপ সিলেকশন তত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এটি আমাদের শেখায়, স্বার্থপরতার মিসফায়ারিং এ প্রজাতির মধ্যে নিস্বার্থপরতার ইলুশন দেখা যায়..!

পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তন ছাড়াও প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলগুলি পড়ুনঃ

পরিবার পরিকল্পনার বিবর্তন ; তথ্যসুত্র:

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!