নোয়াহ হারারির সেরা লেখা !

নোয়াহ হারারির সেরা লেখা!

আমাদের বিশৃঙ্খলা বোধ ও আসন্ন ধবংস প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গতিবেগের অসঙ্গতির সাথে ত্বরাণ্বিত হচ্ছে। শিল্পযুগে উদার রাজনৈতিক ব্যবস্থা রূপরেখা লাভ করে স্টিম ইঞ্জিন, তেল শোধনাগার এবং টেলিভিশন সেটের বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে। এটি আবিষ্কার করেছে সাম্প্রতিক ক্রমবর্ধমান ইনফরমেশন ও বায়োটেকনোলজির বিপ্লবকে মোকাবিলা করা কত কঠিন। রাজনীতিবিদ এবং ভোটার কেউই আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা রাখেনা, তাদের বিস্ফোরণকে নিয়ন্ত্রণ করা তো অনেক দূরের কথা। ১৯৯০ সালের পর থেকে ইন্টারনেট বিশ্বকে অন্য যেকোন ফ্যাক্টর থেকে সম্ভবত অনেক বেশি পরিবর্তন করে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এখনো বোঝার চেষ্টা করছে আসলে কী তাকে আঘাত করতে পারে এবং ডেমোক্রেসি এখনো যথেষ্ট সুসজ্জিত নয় তার পরবর্তী আঘাতগুলো মোকাবিলা করার জন্য, বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ও ব্লকচেইন বিপ্লবের কথা আমরা এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত প্রদান করতে পারি।

আজ কম্পিউটার আমাদের অর্থনৈতিক সিস্টেমকে এতটাই জটিল করে তুলেছে যে, খুব অল্প সংখ্যক মানুষই একে বুঝতে পারে। আর যখন এআই উন্নত হবে, আমরা এমন একটি বিন্দুতে অবতীর্ণ হবো কোনো মানুষই আর ফিন্যান্স সম্পর্কে কোনো সেন্স তৈরি করতে পারবে না। রাজনীতির সাথে তখন আসলে কী ঘটবে? আপনি কি একবারের জন্য কল্পনা করতে পারেন যে সরকার বিনীতভাবে অপেক্ষা করছে কখন এলগোরিদম তাদের বাজেট গ্রহণ করবে অথবা নতুন ট্যাক্স সংস্করণ? ইতোমধ্যে বিটিকনের মতো P2P (peer to peer) ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্থনৈতিক সিস্টেমকে এমনভাবে পূনর্গঠন করছে মৌলিক ট্যাক্স সংস্করণ হয়ে গেছে অপরিহার্য।

”এমনকি অধিক গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি, ইনফোটেক ও বায়োটেকের যে টুইন রেভলুশন তা শুধুমাত্র আমাদের অর্থনীতি অথবা সমাজকেই পূনর্গঠন করবে না এটি একইসাথে বদলে দেবে আমাদের দেহ ও মনকে। অতীতে আমরা মানুষরা এক্সটারনাল বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি কিন্তু আমাদের ভেতরের বিশ্বের উপর আমাদের অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণ নিয়ন্ত্রণই বিদ্যমান ছিল। আমরা জেনেছি কীভাবে একটি গতিশীল নদীতে বাঁধ নির্মাণ করতে হয় এবং থামিয়ে দেয়া যায় নদীর প্রবাহ কিন্তু আমরা এটা জানতাম না যে কীভাবে আমরা আমাদের শরীরে বার্ধ্যকের প্রবাহ প্রতিরোধ করতে পারি। আমরা জানতাম কীভাবে একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেম ডিজাইন করতে হয় কিন্তু আমাদের কাছে কোনো ধারণা ছিলো না কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ককে ডিজাইন করতে পারি। যদি একটি মশা আমাদের কানের ভেতর প্রবেশ করে গুঞ্জন করে এবং আমাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়, আমরা জানতাম কীভাবে মশাটিকে হত্যা করতে হয় কিন্তু যখন আমাদের মনে কোনো একটি চিন্তা গুঞ্জন করে এবং সারারাত আমাদের জাগিয়ে রাখে তখন আমরা বুঝতে পারি না যে কীভাবে আমরা এ চিন্তাটিকে হত্যা করব। ”

কারণ এটি হয়তো অসম্ভব হয়ে উঠবে অথবা অপ্রাসঙ্গিক ডলার ট্যাক্স দেয়া কারণ অধিকাংশ ট্র‍্যান্সসেকশন একটা সময় কোনো জাতির ক্লিয়ার-কাট এক্সচেঞ্জের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে না অথবা কোনো কারেন্সির সাথেই সম্পৃক্ত থাকবে না। আর তাই হয়তো সরকারকে সামগ্রিকভাবে নতুন ট্যাক্স উদ্ভাবন করতে হবে___ সম্ভবত সেটি হবে ” Tax on Information Economy”। পলিটিক্যাল সিস্টেম কি পারবে এ ক্রায়সিস মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণভাবে অর্থ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বে?

বায়োটেক ও ইনফোটেকের বিপ্লব আমাদের নিজেদের ভেতরের জগতের উপর আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ প্রদান করবে এবং আমাদের অনুমোদন দেবে আমাদের জীবন উৎপাদন ও এর ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য। আমরা শিখব কীভাবে আমাদের ব্রেনকে ডিজাইন করতে হয়, জীবনকে সম্প্রসারিত করতে হয় এবং আমাদের নিজস্ব বিবেচনায় চিন্তাগুলোকে মাথার ভেতর থেকে হত্যা করতে হয়। কেউই জানেনা এর প্রভাব কী হতে যাচ্ছে! মানুষ সবসময় যন্ত্র তৈরিতে খুবই পারদর্শী কিন্তু সমস্যা হলো তারা যন্ত্রকে বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করতে জানে না। নদীতে বাঁধ নির্মান করে তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কিন্তু এর ফলে বিশাল ইকোলজিক্যাল সিস্টেমে যে জটিল প্রভাব সৃষ্টি হবে তা প্রেডিক্ট করার ক্ষেত্রে মানুষ খুবই নাজুক। ঠিক একইভাবে বায়োটেক ও ইনফোটেক উন্নতির ফলে আমরা হয়তো আমাদের মনের প্রবাহের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারব কিন্তু এটি আমাদের পারসোনাল সাইকোলজি এবং সামাজিক সিস্টেমে কেমন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে সে ব্যাপারে আমরা খুব বেশি কিছু জানিনা। অতীতে আমরা আমাদের চারপাশের বিশ্ব পরিচালনার জন্য ক্ষমতা অর্জন করেছিলাম এবং এই গ্রহটিকে পূনর্গঠন করার জন্য, এজন্য আমরা উদাসীনভাবে সমগ্র ইকোলজিক্যাল সিস্টেমকে বিপর্যস্ত করেছি আর এখন আমরা পরিবেশগত পতনের মুখোমুখি ( Ecological Collapse)। আগামী শতাব্দীর মধ্যে বায়োটেক ও ইনফোটেক আমাদের ভেতরের সত্তাকে পূনর্গঠন করবে কিন্তু আমরা যেহেতু আমাদের মনের জটিলতা সম্পর্কে বুঝিনা, এ পরিবর্তন হয়তো আমাদের মেন্টাল সিস্টেমকে আপসেট করবে আর এর বিস্তৃতি এত বেশি হবে যে সম্ভবত আমরা মেন্টাল ব্রেকডাউনের শিকার হবো। বায়োটেক ও ইনফোটেকে যে বিপ্লব ইঞ্জিনিয়ার, এন্টারপ্রিনিউয়্যার ও বিজ্ঞানীদের দ্বারা সম্পাদিত হচ্ছে তারা এগুলোর পলিটিক্যাল তাৎপর্য সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান রাখেই না এবং যারা নিশ্চিতভাবে কাউকেই রিপ্রেজেন্ট করছেনা। পার্লাম্যান্ট অথবা পার্টি এ বিষয়টি কী তাদের হাতে নিতে পারবে? বর্তমানে আমাদের কাছে তা মনে হচ্ছেনা। প্রযুক্তিগত বিশৃঙ্খলা এমনকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের নেতৃত্বস্থানীয় কোনো বিষয়ও নয়।২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট প্রতিযোগিতায় বিঘ্নকারী প্রযুক্তির প্রধান রেফারেন্স হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল বিপর্যয়ে উদ্বিগ্ন করলেও এবং চাকরি হারানোর ব্যাপারে অনেক কথা হওয়ার পরও, কোনো প্রতিযোগী এ পর্যন্ত অটোম্যাশনে সম্ভাব্য প্রভাবকে গণনায় নেয়নি। ডোনাল ট্রাম্প তার ভোটারদের সতর্ক করেছিল চায়নিজ ও মেক্সিকানরা তাদের চাকরি খেয়ে ফেলবে আর এ জন্য অবশ্যই মেক্সিকান বর্ডারে দেয়াল তোলা উচিত কিন্তু সে একবারের জন্যও তার ভোটারদের সতর্ক করেনি যে এলগোরিদম তাদের চাকরি খাবে, তাদেরকে একবারও উপদেশ দেয়নি যে ক্যালিফোর্নিয়ার বর্ডারে অগ্নি প্রাচীর নির্মান করা উচিত।

এটা সম্ভবত একটা কারণ যা আমাদের ব্যাখ্যা করছে কেনো পশ্চিমের উদারপন্থীদের হৃদপিন্ডে অবস্থানকারী ভোটাররা লিভারেল স্টোরির উপর তাদের বিশ্বাস হারাচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝে। সাধারণ মানুষ সম্ভবত আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ও বায়োটেক সম্পর্কে জ্ঞান রাখেনা কিন্তু তাদের মধ্যে অন্তত এই সেন্স কাজ করছে তারা কোন ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ১৯৩৮ সালে USSR, জার্মানির সাধারণ মানুষদের পরিস্থিতি খুবই দুর্বিষহ ছিল কিন্তু তারা ধারাবাহিকভাবে বলতে থাকলো যে, সে একটা সময় বিশ্বে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। সে প্রাচীরের পোস্টারের দিকে তাকাতো যা সাধারণত কয়লাখনির শ্রমিক, ইস্পাত শ্রমিক এবং গৃহিনীদের বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গি চিত্রিত করে __এবং সে নিজেকেও সেখানে দেখেছিল; আমি পোস্টারে আছি! আমি ভবিষ্যতের নায়ক! ২০১৮ সালে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি অপ্রাসঙ্গিকতা অনুভব করলো। TED এর তর্কবিতর্ক চলাকালীন উত্তেজনাদায়কভাবে অনেক রহস্যজনক শব্দ উচ্চারিত হয়, সরকার ট্যাঙ্ক এবং হাই-টেক কনফারেন্স নিয়ে চিন্তা করে__ সরকারের একমাত্র চিন্তা গ্লোবালাইজেশন, ব্লকচেইন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, মেশিন লার্নিং নিয়ে___ এবং সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলো যে এ সকল শব্দের কোনোটাই তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। উদারনৈতিক রাজনীতির মূল গল্প হলো সাধারণ মানুষ নিয়ে। কীভাবে এ গল্প সাইবর্গ ও নেটওয়ার্কড এলগোরিদমের বিশ্বে প্রাসঙ্গিক হিসেবে অবশিষ্ট থাকতে পারে? একুশ শতকে জনগণের শোষণের বিপক্ষে বিদ্রোহ করেছিল এবং তারা চেয়েছিল অর্থনীতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে। এখন জনতার মাঝে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক আর তারা অবশিষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে উন্মত্ত অনেক বেশি দেরী হয়ে যাওয়ার বহু আগেই। ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের উথান এইভাবে প্রদর্শন করতে পারে প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিপরীত গতিপথ। রাশিয়ান, চাইনিজ এবং কিউবিয়ান বিপ্লব গড়ে উঠেছিল সে সকল মানুষদের দ্বারা যারা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাব ; ২০১৬ সালে ট্রাম্প ও ব্রেক্সিটকে অজস্র মানুষ সমর্থন করেছিল যারা তখনো উপভোগ করেছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা কিন্তু যাদের ভয় ছিল অর্থনৈতিক সম্পদ হারাবার। একুশ শতকের বিপ্লব সম্ভবত তাদের বিরুদ্ধে নয় যারা অর্থনৈতিকভাবে অভিজাত ও মানুষের শোষক কিন্তু এ বিপ্লব সে সকল অর্থনৈতিক অভিজাতদের বিপক্ষে সাধারণ মানুষদের যাদের কোনো প্রয়োজন নেই। (হোমো ডিউস কনশাসনেস)

From:
21 Lessons for the 21st Century – Yuval Noah Harari

hsbd bg