নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেই কী এবস্ট্রাক্ট থট বিবর্তিত হয়েছিল?

নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেই কী এবস্ট্রাক্ট থট বিবর্তিত হয়েছিল?

Last updated:

মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীতে আসলে কী হয়েছিল তা আমরা পুরোপুরি জানিনা। কিন্তু আমাদের কাছে একটা ব্যাপার সম্পূর্ণ পরিস্কার। মানব সভ্যতা বিমূর্ত চিন্তা ও রুপক সংস্কৃতিতে খুবই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু আমরা সিম্বোলিক থট বলতে কী বুঝবো? নৃবিজ্ঞানীদের মতে, সিম্বোলিক থিংকিং হলো কংক্রিট ওয়ার্ল্ডের উপর যাদৃচ্ছিক এবস্ট্রাক্ট কনসেপ্ট প্রয়োগ করা। এক্ষেত্রে আমরা পবিত্র পানি অথবা হলিবুকের উদাহরণ দিতে পারি।

একটি শিম্পাঞ্জির কাছে ক্যাথেড্রালের মার্বেল বেসিনে বসে থাকা পানি, শুধুই পানি। কালো রঙ অথবা সাদা শাড়ী শিম্পাঞ্জির কাছে শোক অথবা শালীনতার কোন অর্থ তৈরি করেনা৷

যে কুকুর নিউটনের প্রিন্সিপিয়া পুড়িয়ে দিয়েছিল সে বুঝতোনা যে বিজ্ঞান বা গণিত আসলে কি। এর কারণ সে আসলে মহাবিশ্বের যাদৃচ্ছিক বা এবস্ট্রাক্ট কনসেপ্ট তৈরি করতে পারেনা। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন এবস্ট্রাক্ট কনসেপ্টের মধ্যে কী এমন বিশেষত্ব আছে যার ফলে শিম্পাঞ্জি অথবা অন্যসকল প্রাইমেট অথবা হোমো এরেক্টাস থেকে সেপিয়েন্স পৃথক হয়েছিল? আসলে, এই সিম্বোলিক থট বিকশিত হওয়ার পর থেকেই মানুষ নৈতিকতা ও বিবেককে অনুধাবন করতে শুরু করলো। তারা তাদের সাংস্কৃতিক বিশ্বাসকে একে একে কোডেট করতে শুরু করলো, আর এতে করে উন্নত হয় রিচ্যুয়াল , ট্যাবু এবং যৌনতার সাথে সম্পৃক্ত সকল আইনকানুন, রোম্যান্স ও এট্যাচমেন্ট।

আর এভাবেই আধুনিক মানব মনস্তত্ব প্রকাশিত হয়েছিল। এটি একটি দীর্ঘ বিতর্কিত বিষয় যে, আমাদের নিকটবর্তী আত্মীয় নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে গুহা শিল্পির অস্তিত্ব ছিল কিনা। যারা সিম্বোলিক থিংকিং করতো নাকি সিম্বোলিক থিংকিং আধুনিক গুহা মানবদের মস্তিষ্কের ভেতরে দেখা দিয়েছিল। অন্যরা তাদের আমাদের প্রজাতির একটি বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচনা করতো। কিন্তু সবাই একমত যে ১০০, ০০০ বছর পূর্বে, নিয়ান্ডারথাল নারী ও পুরুষ, সেন্ট্রাল এশিয়ার পূর্ব দিকের কাছাকাছি কোথাও বাস করতো। নিয়ান্ডারথালদের কৌতুহল উদ্দীপক কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাদের চোখের উপরের ভ্রু ছিলো খুব মোটা, তাদের ছিল রুক্ষ দাঁত ও চোয়াল, ছিল পেশিবহুল পুরু হাড়, মজবুত, এবং নলাকার শরীরের বুক। রাস্তায় যদি এ মুহূর্তে এ ধরণের কোন নিয়ান্ডারথাল আপনার চোখে পড়ে নির্ঘাত আপনি তাকে পাশবিক মনে করবেন। কিন্তু প্রলম্বিত ললাটের এ মানুষগুলো ছিল আমাদের থেকে অনেক বড় __ যার ছিল বড় মস্তিষ্ক।

What do we know about the lives of Neanderthal women? | Aeon Essays
একজন নিয়ান্ডারথাল নারীর কাল্পনিক গঠন

সবচেয়ে বড় কথা হলো তাদের মস্তিষ্ক আমার আর আপনার মতোই সুসজ্জিত ছিল। আমরা এটা আমাদের প্রাচীন খুলির রূপরেখা অধ্যায়ন করেই জানতে পারি। যা এন্ডোকাস্টের মাধ্যমে খুব সহযেই করা যায়। এটি ছিলো দুর্দান্ত একটি আবিষ্কার। আপনি কিছু ক্ষির নিন, তারপর সেটা নিয়ান্ডারথালের খুলির উপর ঢালুন। ডেলাডালা ছিটেগুলো অপসারণ করুন, এন্ডোকাস্টের পৃষ্ঠ হলো খুলির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইম্প্রেসন যেখানে ব্রেন বক্র হয়ে থাকে যখন এটি হাড়ের হেলমেট দ্বারা সংকোচিত হয়ে যায়। আর এ ডিজাইন দেখে বোঝা যায়, খাঁজ, রাবার পৃষ্ঠের ফাটল যা দেখায় কিভাবে ব্রেন লোব অর্গানাইজড হয়ে আছে। এন্ডোকাস্ট আমাদের কাছে বর্ণনা করছে যে কিভাবে নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক আমাদের মতো করে বিবর্তিত হয়েছিল। (Hooway 1985)

PDF] The Neanderthal endocast from Gánovce (Poprad, Slovak Republic). |  Semantic Scholar
নিয়ান্ডারথাল ব্রেন এন্ডোকাস্ট

নিয়ান্ডারথালরা চিন্তা করতে পারতো। তারা কথাও বলতে পারতো। গুরুত্বপূর্ণ সব প্রমাণ আমাদের কাছে উপস্থাপন করছে যে, নিয়ান্ডারথাল এবং সেপিয়েন্স আজ থেকে ৫০০,০০০ বছর পূর্বেও মানবীয় ভাষায় কথা বলেছিল (Dediu and Levinson 2013)। নৃতাত্বিকরা একমত যে, নিয়ান্ডারথাল নারী ও পুরুষরা একে অন্যকে শিকারের গল্প বলতো, তারা একে অন্যকে প্রেমের গল্প শুনিয়েছিল আজ থেকে ১০০,০০০ বছর পূর্বে। কিন্তু প্রশ্ন আসে কেনো? এর উত্তর হল, কারণ আমরা নিয়ান্ডারথালদের হাইওয়েড হাড়ের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি( Arebsbrug et al 1989)

Hyoid Bone Kebara Cave Middle Paleolithic Period Tel Aviv University ©  Copyright, The Israel Museum, Jerusalem 19… | Brief history of humankind,  Punic wars, History

Hyoid Bone Kebara Cave Middle Paleolithic Period Tel Aviv University

ক্ষুদ্র U-Shaped হাড় যা শুয়ে আছে তা স্থগিত হয় গলার কাছে এসে আর এ জন্য আমরা বলতে পারি ঠিক একইভাবে দুটি হাইওয়েড হাড় পাওয়া যায় আমাদের প্রাচীন আত্মীয় নিয়ান্ডারথালদের গলায়ও (Martinez et al.2008), এটা নির্দেশনা প্রদান করে যে, নিয়ান্ডারথালদের ভোকাল ট্র‍্যাক্ট ছিল যা আমরা আজ যেভাবে কথা বলি তার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তাদের আভ্যন্তরীণ কানের গঠন দেখে বুঝতে পারা যায় তাদের মধ্যেও কিছু মাত্রায় ল্যাঙ্গুয়েজ সিস্টেম বিবর্তিত হয়েছিল(IBID)। এছাড়া নিয়ান্ডারথালদের ছিল আধুনিক হিউম্যান FOXP2 জিন, যে জিনটি ল্যাঙ্গুয়েজ এবিলিটির সাথে বিজড়িত। বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে তারা আসলে কোন ধরণের ভাষায় একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতো, কখন ও কিভাবে এটি বিবর্তিত হয়েছিল এবং তাদের ডেটা বিভিন্ন মতামতকে সমর্থন করেছিল। (See Dediu and Levinson 2013)। আর তাছাড়া, নিয়ান্ডারথালদেরও আধুনিক মানুষের মতো Fox2 জিন ছিল। কিন্ত সবাই বিশ্বাস করে যে, সে সময় নিয়ান্ডারথাল ম্যামথ ভাজা করতো, গুহায় বসে একে অন্যের সাথে আড্ডা দিতো এবং তারা মানবীয় ভাষার নির্দিষ্ট কিছু রুপে একে অন্যের সাথে কথা বলতো। ( Dediu and Levinson 2013; Johansson 2013) সম্ভবত তারা মারাত্মক জটিল ভাষা উন্নত করতে সক্ষম হয়েছিল __ এসব লোকজন ক্ষুদ্র, একাকী গ্রহে বাস করতো আর যারা একে অন্যের সাথে জটিল ভাষায় কথা বলতো। (Lupyan and Dale 2010; Dediu and Levinson 2013)

নিয়ান্ডারথালরা কী ঈশ্বরে বিশ্বাস করতো অথবা পরকালে?

তারা কী সিম্বোলিক বিশ্বে বাস করতো? ইউরোপজুড়ে প্রত্মতাত্বিকরা নিয়ান্ডারথালদের গুহায় কিছু প্রাচীন কবরের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন যা আমাদের বলে যে তারা মৃতদেহ দাপন করতে পরতো ঠিক যেমনি একজন মানুষ ঘুমায়। (Klein 2009) আত্মীয়রা সম্ভবত তাদের সন্তানদের দাফন করতো।

Africa's Oldest Human Grave Unearthed: 3-Year-Old, Buried 78,000 Years Ago

কিছুকিছু স্কেলিটন পাথরের অস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। অথবা সেখানে যত্ম সহকারে রাখা হয়েছিল পাথর, হাড় এবং প্রাণীদের শিং। উত্তর ইরাকের একটি বিরাট পাহাড়ে ৬০, ০০০০ বছর পূর্বের প্রয়াত নিয়ান্ডারথাল প্রতিবেশীর সমাধিস্থলে একটি ফুলের তোড়া পাওয়া যায় যেটি হয়তো তার বন্ধু ও প্রতিবেশীরা সেখানে স্থাপন করেছিল। তাদের ছড়ানো ছিটানো হাড়ের চারপাশে একপ্রকার ইউরেশিয়ান ফুল পাওয়া যায় যার নাম হলিহোক, অলঙ্কার তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহারিত আরো একটি ফুল গ্রেপ হায়াচিন্থ, ব্যাচেলর বুতন, গ্রাউন্ডসেল এবং সে এলাকার অন্যন্য বন্য ফুল( Leroi-Gourhan 1975; Solecki 1971, 1989) ।

Neanderthals did NOT bury flowers with their dead, study finds | Daily Mail  Online

Daily Mail
Neanderthals did NOT bury flowers with their dead, study finds | Daily Mail Online

নিয়ান্ডারথালদের কিছু সাইটে রেড অচার নামক কিছু ফুল পাওয়া গেছে, তাদের যন্ত্রপাতি ও অস্ত্র। সে বিশ্বের সবাই রেড অচার ফুল ব্যবহার করতো তাদের মুখ, হাত, আঙুল, শরীর ও রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানের পূর্বে। কেউ কিছু অগভীর খাঁজের মাধ্যমে ভাল্লুকের দাঁতকে চিহ্নিত করেছিলো। আর একজন ছেদ করেছিলো শেয়ালের দাঁত। আরো একটি ছিদ্রযুক্ত রেইনডিয়ার হাড় । জিব্রাল্টার পাথরের দেয়ালে আড়াআড়ি কিছু খোদাই নির্দেশনা দান করে যে নিয়ান্ডারথালদের কিছু রিচুয়াল ছিল। যদি তারা পরকালে বিশ্বাস করে, যদি তারা তাদের চারপাশ ও তাদের নিজেদের অলঙ্কৃত করে ; তারা অবশ্যই সিম্বোলিক থট করতে পারতো। তারা ছবি অংকন করতো আর হয়তো তারা শিল্পের প্রশংসাও করতো।

আপনারা ভাবতে পারেন, তারা কত বোকাই না ছিল! কবরে ফুল দেয়া অথবা নিজেদের অলংকৃত করা এসব নিরর্থক কর্মকান্ডের মানেটা কী! কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, আর তা হলো একটি শিম্পাঞ্জির নিকট যেটি ফুল নিয়ান্ডারথালদের নিকট তা অন্যকিছু, একটি শিম্পাঞ্জির জন্য সেটা জল সেটা আমাদের জন্য ক্যাথেড্রালের পবিত্র পানি! একটি তেলাপোকার কাছে বাইবেল সাধারণ একটি কাগজ মাত্র আর শিম্পাঞ্জির কাছে আইনস্টাইনের সমীকরণের কোন মানে হয়না! আমাদের আদিম নিয়ান্ডারথালরা যে সর্বপ্রথম বস্তুর বিকল্প বিমূর্ত অর্থ বের করা শিখেছিল, তারা যে মহাবিশ্বের এবস্ট্রাক্ট কনসেপ্ট তৈরি করার এক বিমূর্ত চিন্তাপদ্ধতির প্রাথমিক রুপ অর্জন করেছিলো তাদের ফুল, জিব্রাল্টার গুহার দেয়ালে তাদের এক সারি আড়াআড়ি দাগ তারই সাক্ষ্য! যেনো তারা আমাদের জানান দিচ্ছে, দেখো, আমরা আমাদের মহাবিশ্বকে এখন যাদৃচ্ছিক অর্থ প্রদান করতে পারছি, আমরা চিন্তা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একটি শিশু সুস্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারে কিনা সেটা মখ্য বিষয় নয়, যখন তার মুখে প্রথম অবোধ্য শব্দ ফোটে উঠে, সে শব্দই মায়ের চোখে খুশির বন্যা বইয়ে দেয়! আমরা আজ শিল্প, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাকে যতটা তুচ্ছ মনে করি হয়তোবা তার রয়েছে এক গভীর বিবর্তনীয় গুরুত্ব।

Neanderthal 'artwork' found in Gibraltar cave - BBC News
জিব্রাল্টার পাথরের দেয়ালে আড়াআড়ি কিছু খোদাই নির্দেশনা দান করে যে নিয়ান্ডারথালদের কিছু রিচুয়াল ছিল। যদি তারা পরকালে বিশ্বাস করে, যদি তারা তাদের চারপাশ ও তাদের নিজেদের অলঙ্কৃত করে ; তারা অবশ্যই সিম্বোলিক থট করতে পারতো। তারা ছবি অংকন করতো আর হয়তো তারা শিল্পের প্রশংসাও করতো।

বিশ্বের বুকে অস্ট্রোলোপিথ, হোমো হ্যাবিলস অথবা হোমো এরেক্টাস কেউই পরকালে বিশ্বাস করেনি, আর এখান থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি যে, তাদের হয়তো Sense of Tomorrow পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি। তারা ফোর্থ ডায়মেনশনকে অনুধাবন করতে পারতোনা! তাদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স ছিল প্রাইমেটিভ। কিন্তু নিয়ান্ডারথালরা জানতো মৃত্যুর পরও কিছু একটা আছে, যা আমরা মৃত প্রাণীদের প্রতি তাদের শোক প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা দেখে অনুধাবন করতে পারি! পরকাল বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা; সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্কে Sense of Tomorrow তৈরি হয়েছিলো, তারা আগামীকালকেও এ মহাবিশ্বে জীবিত থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল কারণ তারা কল্পনা করতে শিখেছিল, তারা এ বিশ্বপ্রকৃতিকে কল্পনা করতে শিখেছিল।

কিন্তু শিল্পের কী এমন উপযোগীতা ছিল? ইথোলোজিস্ট এলেন দিসনায়েকে শিল্পের বিবর্তনের পেছনে দারুণ একটি বিষয় প্রস্তাব করেছিলেন। তার বই What is art For বইটিতে তিনি লিখেন, সকল শিল্প যা অতীতে তারা রচনা করেছিল, সকল আকৃতি, শোভা, সৌন্দর্য শুধু একটি বিষয়কে বিশেষায়িত করে তোলার জন্য। যে সকল মানুষ একটি যন্ত্রকে সজ্জার মাধ্যমে বিশেষ করে তুলতে পারতো, বা আনুষ্ঠানিক রুপ দিতে সক্ষম হতো এর ফলে তারা অনুষ্ঠানটি স্মরণ রাখার ক্ষমতা অর্জন করতো আর এ সকল আচারগুলো মনে রাখাটা টিকে থাকার জন্য ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । আর এ জন্য যারা ছবি অংকন করেছেন এবং শিল্পের প্রশংসা করেছেন তারা তাদের সৌন্দর্য ও শিল্পবোধের জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনে জয় লাভ করেছিলেন। আর এ জন্যই আমাদের মধ্যে শিল্পের জয়গানের একপ্রকার জৈবিক প্রবণতা দেখা যায়।

গবেষকরা বলছে যে, আর্ট আমাদের মস্তিষ্কের নিউরাল কানেকশনগুলোকে Rewire করে, আমাদের জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ করে, এটি মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করে এবং আমাদের ব্রেন মেমরিকে প্রোটেক্ট করে। আমরা যখন শৈল্পিক কোন কিছু তৈরি করি তখন আমাদের মোটর স্কিল উন্নত হয়, আর উদ্দেশ্যমূলক এ মুভমেন্টগুলো আমাদের ব্রেনকে মিনিং দেয়, আমরা নিজেদের ব্রেনকে বোঝাতে পারি যে , তুমি কোন একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কাজ করছো, কারণ আমাদের ব্রেন টিকে থাকার জন্য সবসময় কারণ ও উদ্দেশ্য খোঁজ করে, আর এভাবে ক্ষুদ্র কিছু মুভমেন্টের মাধ্যমেই আমাদের পেইন ও কাঠিন্য দূর করে। আর আমরা যখন অদ্ভুত কিছু চিন্তা করি তখন সেটা আমাদের মস্তিষ্কের মেমরিতে স্থায়ী ভাবে গেঁথে যায়, যেমন আমি যদি আপনাকে, ওয়ার্মহোল, মহাবিশ্ব, প্যারালাল মহাবিশ্ব, পিঁপড়া , কুকুর, বট বৃক্ষ, স্পেসশিপ এ শব্দগুলো এক পলক দেখে মুখস্ত বলতে বলি আপনি হয়তো কিছুক্ষণ পরই তা ভুলে যাবেন, কিন্ত আপনি যদি সেটাকে অস্বাভাবিক একটা গল্পে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজাতে পারেন তবে এটা আপনার বহুদিন মনে থাকবে। যেমন- একটি কুকুর স্পেসশিপে ছড়ে একটি ওয়ার্মহোলের কাছে গেলো, মহাবিশ্বের ভেতর ফুটো করে সে স্পেসশিপ সহ প্যারালাল বিশ্বে ঢুকে পড়লো আর এভাবে একসময় কুকুরটি বটবৃক্ষের নিচে বিরাট এক পিঁপড়ার দেখা পেলো। দেখুন, এবার শব্দগুলো আপনার ব্রেনে গেঁথে গেছে। যখনই আমি সাইকোলজিক্যালি প্রতিটি শব্দকে ড্রয়িং করেছি সেটা আমার মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে গেলো।

নিয়ান্ডারথাল নারীরা হয়তো সে সকল পুরুষকেই পছন্দ করতো যারা শৈল্পিক। কারণ এ শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষদের ব্রেনে ফিউচার সিমুলেশন করার ক্ষমতা ছিল, তারা ফোর্থ ডায়মেনশনের ভেতর দিয়ে তাদের Sense of Tomorrow কে ব্যবহার করে বিভিন্ন রকম ইনফরমেশন মিশিয়ে এক একটি একটি কাল্পনিক প্রতিরুপ তৈরি করতো, তাদের ব্রেন ইন্টারনালি জগিং করতো । এটা তাদের মস্তিষ্কের বুদ্ধিমত্তা, সুক্ষ্মতা, নিপুনতা ও ব্যক্তিত্বের সংবাদও হয়তো প্রেরণ করতো। একটা জিনিস ভেবে দেখুন, যার কল্পনাশক্তি দূর্বল সে কখনোই ভালো ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেনা আর যে ভাল ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেনা সে কখনো দলবদ্ধ হয়ে একটি শিকারকে ট্র‍্যাক করার উপায় তৈরি করতে পারবেনা, সে তার দলের পরিণতি সম্পর্কেও কোন ধারণা করতে পারবেনা! আর তাই একজন শিল্পি যিনি ভালো আর্ট করতে পারে, ভালো অভিনয় করতে পারে সে অবশ্যই একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করারও ক্ষমতা রাখে। আর সম্ভবত এ জন্যই আমাদের ভেতর সৌন্দর্যবোধ বা সেন্স অব বিউটি বিবর্তিত হয়, যেনো আমরা শিল্প বুঝি ও শিল্পের প্রশংসা করতে জানি! একজন প্রেমিক যে বাঁশির মধ্যে ফুঁ দিয়ে সেই সুরে প্রেমিকার মস্তিষ্ক এলোমেলো করে দিতে পারে, সে অবশ্যই ক্ষমতাবান, দক্ষ, নিপুন ও বুদ্ধ। মূলত, হেলেন ফিশার বলেন, আজ থেকে ২,৫০,০০০ বছর পূর্বে নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেই শিল্পের বিবর্তন ঘটেছিল। ইংল্যান্ডের দুজন ব্যক্তি সে সময়কার পাথরের কিছু টুলসও পেয়েছিল যা শিল্পের নির্দেশক।

LARGE MUSEUM-CLASS NEANDERTHAL MOUSTERIAN FLINT HAND AXE OF INGENIOUS DESIGN  FROM FAMOUS REGION IN FRANCE *M381 | Neanderthal, Paleolithic, Stone tools

Pinterest
LARGE MUSEUM-CLASS NEANDERTHAL MOUSTERIAN FLINT HAND AXE 

মূলত, তারা যা পেয়েছিল তা ছিল কুঠার যেটি হয়তো বিশেষ কোন উৎসবের উদ্দেশ্যে নির্মিত। একই সময় তারা ফ্রান্সে সামূদ্রিক গুহায় লাল, হলুদ, বাদামী গ্লোব এবং বেগুনী অচার রেখে গিয়েছিল। সম্ভবত এরা তাদের নিজেদের ও চারপাশের মানুষদের বিশেষ করে তুলতে চেয়েছিল। শিল্প কেনো? এর উত্তরে জেফরি মিলার বলেন, শিল্পিরা অধিক প্রেমিক আকৃষ্ট করতে পারে আর তাদের রয়েছে অধিক সন্তান।আর এ জন্যই শিল্প তৈরি ও তার প্রশংসার জন্য আমাদের জেনেটিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নিয়ান্ডারথালরা হয়তো উদ্ভাবনী থ্রিডি আর্ট রেখে যায়নি। তারা শুরু করেছিল। নিয়ান্ডারথালরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মৃতদের কবর দিতো, তাদের কবরস্থানগুলো সজ্জিত করতো। অচার ব্যাবহার করতো সজ্জা ও রুপক উদ্দেশ্যে। তারা অলংকার হিসেবে ভাল্লুক ও শেয়ালের দাঁত পরিধান করতো। কিন্তু তারাই কী শিল্পের প্রাচীন শিক্ষক? এর উত্তর -না! কিন্তু এ আর্টিস্টিক প্রবণতা এক সময় মানব প্রকৃতির অংশ হয়ে যায় আর ডিএনএ তে সংরক্ষিত হয়। আর এ জন্যই আজ মানুষ এবস্ট্রাক্ট ও সিম্বোলিক থটে অংশগ্রহণ করে। আজকাল ফেচবুকে অজস্র প্লাটফর্ম দেখা যায় যা আর্ট ও সিম্বোলিজমে পরিপূর্ণ। একুশ শতাব্দীর তরুণ তরুণীদের এবস্ট্রাক্ট থট এমন এক গভীরতায় চলে গেছে তারা কী নিয়ে হাসে আর কীসে কান্না করে সেটা অনুধাবন করাটাই খুবই কষ্টসাধ্য। মাঝেমাঝে আমি নিজেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাই, কী এক গোলকধাঁধা! একটা পাওয়ারুটি ভাইরাল হয়ে যায় এবস্ট্রাক্ট থটের কল্যাণে। ঠিক যেমন পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে যায় জলসানো রুটি!

নিয়ান্ডারথালরা দেখতে বিরাট ছিল, মনে হয় যেনো খুবই রুঢ়, নিষ্ঠুর কিন্তু তারাও প্রেম করতো। দুর্দান্ত কিছু জেনেটিক ডেটা সংগ্রহ করেছিলেন জীবাশ্মবিদ সান্তে পাওবো। তিনি ও তার সহকর্মীরা দেখিয়েছিলেন, ওরাও প্রেমে পড়তো, এমনকি ভালোবেসেছিলো পুরোপুরি মডার্ন ইউরোপীয়দের। তাদের বিধবংসী প্রেম শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলোনা। নিয়ান্ডারথাল সেপি নারীর প্রেমে পড়েছিলো। স্যাপিও প্রেমে পড়েছিলো কোন এক অচেনা, অজানা প্রবল পুরুষ নিয়ান্ডারথালের। ২০১০ সালে গিবন ও গ্রীনের ( Gibbon 2010, Green 2012) একটি গবেষণায় দেখা যায় ৫০০০০ বছর পূর্বে নিয়ান্ডারথালরা স্যাপিদের সাথে রোম্যান্টিম প্রেমে মগ্ন হয়েছিলো, তাদের সাথে সেক্স করেছিলো, তারা তাদের প্র‍্যাগন্যান্ট করেছিলো, আর আমাদের পূর্বসূরি নারীরা হয়েছিল নিয়ান্ডারথালের মা এবং আজও ইউরোপ ও এশিয়ার অজস্র মানুষ নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ নিয়ে নিজের অজান্তেই ঘুরে বেড়ায়। (Green et al 2010) প্রথমে পাওবো তিনজন নারীর হাড় থেকে DNA পৃথক করেছিলেন যারা ক্রোয়েশিয়ার ভিন্দিজা গুহায় ৩৮,০০০ বছর পূর্বে বাস করতো। তারপর তারা নিয়ান্ডারথালের DNA এর সাথে ৫ জন আধুনিক মানুষের DNA তুলনা করেন। একজন দক্ষিণ আফ্রিকার সান জনগণের সদস্য , একজন ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার ইওরুবা উপজাতির সদস্য, একজন পাপুয়া নিউগিনির, একজন হান চাইনিজ ও আর একজ ফরাসী। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ইউরোপ, নিউগিনি, এশিয়ার ১-৪% ডিএনএ নিয়ান্ডারথালদের সাথে শেয়ার করেছিল। শুধু আফ্রিকাতে কেউ নিয়ান্ডারথালের সাথে সেক্স করেনি। (Gibbon 2010) এ থেকে বোঝা যায় আমাদের পূর্বসূরিরা আফ্রিকা ছাড়ার পরই নিয়ান্ডারথালদের সাথে ইন্টারব্রিড করেছিল, আমাদের গোষ্ঠী ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউগিনিতে ছড়িয়ে যাওয়ার পূর্বে। (হোমো এরেক্টাসের ভালোবাসা)

hsbd bg