মূলপাতা বিজ্ঞানজেনেটিক্স জিন কী ব্রেনকে জানে?

জিন কী ব্রেনকে জানে?

লিখেছেন Kajol Akhter Bristi
187 বার পঠিত হয়েছে

জিন কী ব্রেনকে জানে?

 

আমরা অর্থাৎ সকল প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস- সবাই মূলত একই ধরনের অণুলিপনকারীদের নিজেদের মধ্যে ধারণ করে চলেছি। এই অনুলিপনকারীরা অসচেতনভাবেই নিজেদের বেঁচে থাকা বা বসবাস করবার লক্ষ্যে সারভাইভাল মেশিন বা বেঁচে থাকার যন্ত্র তৈরি করে নিয়েছিল এবং বহু মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের পরিক্রমা অতিক্রম করে বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছে। আজ এরা ‘জিন’ নামে পরিচিত এবং আমরা এদের বেঁচে থাকার যন্ত্র বা সারভাইভাল মেশিন।
এই সারভাইভাল মেশিনগুলো তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা হিসেবে বহু প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়েছে এবং এদের বৈশিষ্ট্যগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। উদ্ভিদরা যেমন তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে পারে জায়গা পরিবর্তন না করে। তেমনি প্রাণীকূলকে বেঁচে থাকতে হলে জায়গা পরিবর্তন করতে হচ্ছে, এই জায়গা পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে তৈরি হয়েছে মাংসপেশী, হাড়, হাড়ের সন্ধি বা জোড়া। তবে এই জটিল প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করবার লক্ষ্যে আরও কিছু জটিল নিউরন-এর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে মস্তিষ্ক। রিচার্ড ডকিন্স মস্তিষ্কের কাজের প্রক্রিয়াটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একে কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। উভয়কেই যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ উভয়ই বিভিন্ন ইনপুট তথ্য বিশ্লেষণ ক’রে তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ক’রে কোনো জটিল আউটপুট প্রকাশ করে।
জিনদের সংঘবদ্ধভাবে সংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় সারভাইভাল মেশিনগুলো তৈরি হলেও, জিনদের কাজ অনেক সূক্ষ্ম এবং খুব ধীরগতি সম্পন্ন, একটা সারভাইভাল মেশিনকে টিকে থাকার জন্যে যেভাবে বাহিরের পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে তার তুলনায় তো বটেই।

তাই জিনরা সরাসরি যন্ত্রগুলোর আচরণ নির্ধারণ করতে পারে না সময়ের ব্যবধান বা টাইম ল্যাগ সমস্যার কারণে। তারা সবকিছু আগে থেকেই তৈরি করে রাখে এবং পরবর্তী সময়ে সারভাইভাল মেশিনকেই মস্তিষ্কের সাহায্যে তার চলাফেরা কিংবা অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

 

এই প্রক্রিয়া অনেকটা ফ্রেড হয়েল ও জন এলিয়টের লেখা ‘A for Andromeda’ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীটির অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের দূরবর্তী জগৎগুলোতে তাদের সাংকেতিক তথ্য পাঠানোর মতো। অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের থেকে ২০০ আলোকবর্ষ দূরে, তার মানে তারা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের লক্ষ্যে কোনো সংকেত পাঠায় তা পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে সময় লাগবে ২০০ বছর। এই দূরত্বে কখনই বাক্য বিনিময়ের কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে দীর্ঘ মনোলোগ বা অনেকটা চিঠির মতো কোনো মাধ্যম। অ্যান্ড্রোমিডাবাসীরাও এমনভাবেই সাংকেতিক ভাষায় দীর্ঘ এক বার্তা সম্প্রচার করেছিল যাতে ছিল এক কম্পিউটার তৈরির সাংকেতিক নির্দেশাবলী। এই সময়ের প্রতিবন্ধকতায় তাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না তাদের সাংকেতিক বার্তার বর্তমান অবস্থান, তাই তাদের সব নির্দেশগুলো আগে থেকেই প্রোগ্রাম করে দিতে হয়েছে কম্পিউটারে। যেন তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াও কম্পিউটারটি কাজ করতে পারে।অ্যান্ড্রোমিডাবাসীরা যেভাবে একটি কম্পিউটার তৈরি করেছিল, পৃথিবীতে তাদের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্যে। জিনরাও সেভাবে তৈরি করেছে মস্তিষ্ক। তবে জিনদের পক্ষে জানা কখনই সম্ভব নয় তার সারভাইভাল মেশিনকে টিকে থাকতে হলে ঠিক কতধরনের পরিস্থিতির এবং ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হবে। তাই ‘তোমার নিজের জন্যে যা ভালো, তাই কর!”-এর মতো কিছু সাধারণ নীতি, নিয়ম এবং উপদেশ প্রোগ্রাম করে দিয়েছে মস্তিষ্ককে, যা তাদের আসন্ন সকল পরিস্থিতি মোকেবেলা করতে সাহায্য করে। আর এই নীতি জিনের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তার করে চলেছে। টাইম ল্যাগের কারণে একটা সারভাইভাল মেশিনের আচারণগত বৈশিষ্ট্যে একটা জিন যেমন সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারছে না, তেমনি নিজেদের টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে মস্তিষ্কের তৈরি করা সামাজিক আচার-আচরণ, নিয়ম কানুন জিনদের পক্ষেও জানা সম্ভব নয় কখনই।

 

আমাদের টিকে থাকার জন্যে সামষ্টিক নিয়মগুলো সহযোগিতা করে কিন্তু তারপরও কেনআমাদের ভিতর নিয়ম ভাঙার প্রবণতা তৈরি হয়?

 

মানুষের সামষ্টিক কল্পনার ভিত্তিতেই যুগে যুগে বিবর্তিত হয়ে আসা ছোট ছোট গোষ্ঠী থেকে বড় বড় গোত্র, রাষ্ট্র কিংবা ব্যবসায়কেন্দ্রের মতো বড় বড় সংগঠন গড়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। আবার এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর গোত্রগুলো পরিচালনার সুবিদার্থে সময়ে সময়ে নিজেদেরকেই তৈরি করতে হয়েছে বিভিন্ন নিয়ম কানুন।(এই প্রক্রিয়া অনেকটা ফ্রেড হয়েল ও জন এলিয়টের লেখা ‘A for Andromeda’ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীটির অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের দূরবর্তী জগৎগুলোতে তাদের সাংকেতিক তথ্য পাঠানোর মতো।(জিন কী ব্রেনকে জানে?)

পৃথিবীর মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীরা যারা দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তাদের দলগুলো স্থায়ী ও নমনীয় হয়। কারণ তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য এবং দলবদ্ধ হয়ে টিকে থাকবার জন্যে প্রয়োজনীয় সকল নিয়মকানুন সরাসরি জিনে লিপিবদ্ধ করা থাকে। আচরণগত দিক থেকে- কোনো হিংস্র প্রাণীর অচেনা কিছু দেখলেই আক্রমণ করবার প্রবণতা এমনকি কুকুরের কিংবা বিড়ালের ছানা সব দেশের সব জায়াগাতেই একই কায়দায় নিজেদের মধ্যে খুনসুটি, মারামারি করা- এসবই তাদের জিনগত সংকেতে লিপিবদ্ধ করা থাকে। কিন্তু মানবশিশুকে জন্মের পর থেকেই তার চলন-বলন, থাকা-খাওয়া, সামাজিক নিয়ম কানুন শেখার প্রক্রিয়ায় চলমান থাকতে হয়। তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে হলে তাকে খেলার বিভিন্ন নিয়ম কানুনও শিখতে হয়, যা তার জিনে লিপিবদ্ধ করা থাকে না। যেই নিয়ম-কানুন মানুষের কল্পনা থেকেই তৈরি, কিন্তু সেই নিয়ম জানা এবং মানার ফলেই যেমন সকলে মিলে একসঙ্গে খেলাধুলা করতে পারছে, ঠিক তেমনি কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের ফলে সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা ব্যাবসায়ের মতো বড় মানবসংগঠন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

একটা মৌমাছির লার্ভা পরিণত হয়ে রাণী মৌমাছি হবে নাকি কর্মী মৌমাছি হবে, তা নির্ভর করছে সে কিরকম খাবার খেতে পারছে তার উপর। এমনকি সে রাণী হোক কিংবা কর্মী, বড় হয়ে তার সামাজিক আচার-আচরণ কেমন হবে তাও তার জিনে লিপিবদ্ধ করা থাকে। মৌমাছিদের মধ্যে নানা ধরনের- খাদ্য সংগ্রাহক কর্মী, সেবিকা কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মতো কর্মী রয়েছে। এ ধরনের কর্মীদের মধ্যে কোনো ধরনের গোলযোগের সৃষ্টি হয় না। মৌমাছিদের সামাজিক কাঠামোতে তাদের নিয়মনীতি অমান্য করবার মতো কোনো প্রবণতা দেখা যায় না কারণ তাদের জিন তাদেরকে বাধ্য করে সেভাবে কাজ করতে, আর সেজন্যে তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো আইনজীবী মৌমাছির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কিন্তু আমরা যদি মানুষের সামাজিক কাঠামো দেখি তাহলে এরকম অনিয়ম সবসময়ই চোখে পড়বে। কারণ মানুষের এই কল্পনা থেকে তৈরি সামষ্টিক নিয়ম কানুনগুলোর ধারণা, তারা চাইলেই জিনে লিপিবদ্ধ করে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে পারে না। একটা সামাজিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে এসব নিয়ম কানুন দিয়ে মানুষদের সামাজিক সংবিধান তৈরি করতে হয়েছে, এবং তা পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে হয়েছে, তারা আবার শিখিয়েছে তাদের সন্তানদের। এই সব নিয়ম কানুন যেহেতু মানুষকে শিখে নিতে হয়েছে সময়ের পরিক্রমায়, তাই তাদের মধ্যে এগুলো অমান্য করবার প্রবণতাও তৈরি হয়েছে কখনও কখনও। কারণ মানুষ জেনেটিকেলভাবে এগুলো মানতে বাধ্য নয়, তারা চাইলেই তাদের নিয়মনীতির অমান্য করতে পারে। আমাদের টিকে থাকার জন্যে যদিও এই সামষ্টিক নিয়মগুলো বিপুল সহযোগিতা করে কিন্তু আমরা চাইলেই এই নিয়ম আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জেনেটিকেলভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পালন করতে বাধ্য করতে পারি না, আর এতেই তৈরি হয় বিভিন্ন বিশৃঙ্খলতা এবং নিয়ম অমান্য করবার প্রবণতা।

 

আমাদের প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলগুলি পড়ুন;

 

 

জিন কী ব্রেনকে জানে;  তথ্যসুত্রঃ 

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!