মূলপাতা বিজ্ঞান ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার

ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
165 বার পঠিত হয়েছে

ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার

 

রাত একসময় দিন হয়, দিন শেষে আবার রাত আসে, এটি ঘটে যখন পৃথিবীর যে অংশে আমরা বাস করি সেটি ঘুরে সূর্যের মুখোমুখি হয় আর তারপর আবার ঘুরে এর ছায়ার দিকে চলে যায়। কিন্তু অন্ততপক্ষে যারা বিষুবরেখা থেকে দূরে বাস করেন, সেখানে গ্রীষ্মের উষ্ণ দিনে সংক্ষিপ্ত রাত আর দীর্ঘ দিন থেকে শীতকালের দীর্ঘ রাত আর শীতল সংক্ষিপ্ত দিনের ঋতুকালীন পরিবর্তন বেশ নাটকীয় মনে হয়। রাত আর দিনের পার্থক্যটি খুবই নাটকীয়-এতই নাটকীয় যে বেশীর ভাগ প্রজাতির প্রাণী হয় দিনে নয়তো রাতে সফলভাবে তাদের জীবন কাটাতে পারে, কিন্তু দুটোতেই নয়। (১-ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার)

 

ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার

 

কারণ এক একটি প্রাণী এক একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হয়, তাদের কিছু আছে যারা রাতের অন্ধকারের অনিশ্চিত পরিবেশের সাথে সুন্দরভাবে অভিযোজিত হয়েছে আবার এমন কিছু বিশিষ্ট্য আছে তাদের যা দ্বারা দিনের সাথে তারা যেনো সহ-বিবর্তিত , সূর্যের আলোয় প্লাবিত জগতের সাথে তারা এমন ভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে দিনের আলোয়ই তাদের সুবিধাজনক পরিস্থিতি উপহার দিয়ে শত শত বছর টিকিয়ে রাখে!যদি কোথাও দিন আর রাতের দৈর্ঘ ব্যাপকভাবে পরিবর্তনশীল হয় তবে এক একটি প্রাণী দিন রাতের পরিবর্তনশীল সময়ের ডায়মেনশনের এক একটি স্তরে এক একপ্রকার স্ট্রেটেজিতে টিকে থাকতে বাধ্য হয় আর তাই সেখানে সময়ের এক একটি স্তরে এক একভাবে বিবর্তিত বৈচিত্রময় প্রাণী পাওয়া যাবে!

আমরা জানি বিবর্তনের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির মধ্যে একটি হলো গ্রেজুয়ালিজম।গ্রেজুয়ালিজম মানে ধাপে ধাপে, যদি প্রজাতির জিনপুলের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরির প্রকৃয়া মন্থর ও ধাপে ধাপে হয় তবে তবে আমরা প্রেডিকশন করতে পারি যে ক্রমস ধাপে ধাপে পরিবর্তনশীল জিনপুলের বিবর্তিত বৈশিষ্ট্যগুলি সংশ্লিষ্ট প্রজাতির ফসিলের ভেতর পাওয়া যাবে, আর ফসিলগুলিও ভুত্বকের এক একটি স্তরে প্রাকৃতিক মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।ভুত্বকের সবচেয়ে নিচের স্তরে যে প্রাণীদের ফসিল পাওয়া যায় সেগুলি বহু প্রাচীীন আর অপেক্ষাকৃত অগভীর স্তরে সংরক্ষিত থাকে অপেক্ষাকৃত আধুনিক শতাব্দীর ফসিল!গ্রেজুয়ালি বিবর্তন সংঘঠিত হওয়ার কারণে প্রজাতির ফসিলগুলি সময়ের ডায়মেনশনে ভুত্বকের এক একটি স্তরে এমনভাবে সাজানো গুছানো আছে যে, অসচেতনভাবে দেখলে মনে হয় কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েন পৃথিবী নামক এ প্রাকৃতিক জাদুঘরের প্রতি স্তরে স্তরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবেই এগুলিকে তাদের সময়ক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে রেখেছেন তাদের দক্ষতা প্রমাণের জন্যে!মাটির এক একটি স্তরে পাওয়া ফসিলগুলি ভুতত্তবিদগণও একইভাবে সংরক্ষণ করেন যেমনটি তারা পেয়েছিলো প্রকৃতিতে!যদিও ফসিল গুলি পরিকল্পিতভাবে সাজানো না, ব্লাইন্ডওয়াচমেকার বিবর্তনের গ্রাজুয়াল পোগ্রেসই এটাকে এমন বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে সচেতনমনে উপস্থাপন করে সম্পূর্ণ অচেতনভাবে!

বিষুবীয় অঞ্চলের দিন রাত্রির বৈচিত্রতা বা দিন রাত্রির সময়ের ডিউরেশনগত ভেরিয়েশনগুলি প্রাণীদের জিনপুলে ভেরিয়েশন তৈরি করে!যে জন্যে বিষুবীয় অঞ্চলে প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতির প্রকরণের মাঝে বৈশিষ্ট্যগত বৈচিত্রতা অনেক বেশি এবং খাদ্যের উৎসও বিচিত্র!এভাবে শীত আর গ্রীষ্মের পার্থক্যগুলির সাথে নিজেদের সুন্দর ভাবে সমন্বয় করে নেয়ার জন্যেও প্রাণীদের রয়েছে বিভিন্ন রকম কৌশল ও উপযোগী বৈশিষ্ট্য!যেমন- এক একটি প্রাণী এক এক উপায়ে শীতকে প্রতিরোধ করে!স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পুরু আস্তরণ যুক্ত লোমশ চামড়া থাকে শীতের প্রাকৃতিক জ্যাকেট হিসেবে যেগুলি তারা গ্রীষ্মকালে আবার খুলে ফেলে দেয় তাদের লোম ঝরিয়ে..!মাইগ্রেটরা শীতকালকে অতিক্রম করার জন্যে শীত কালে তারা পৃথিবীর অন্যকোথাও চলে যায়, যেমন বিষুবীয় এলাকায়, বিষুবীয় এলাকায় যেতে যেতে তাদের বিরাট সময় অপচয় হয় আর তারা যখন সেখানে পৌছে তখন সেখানকার শীতকাল ফুরিয়ে যায় এবং দেখা দেয় গ্রীষ্ম।এরা অন্তঃবর্তিকালীন কোন এলাকায় থামেনা!যার জন্যে তারা একইসাথে দুটি গ্রীষ্মকাল পায়, তাদের জগতে কোনো শীতকালের চিহ্ন নেই!আর বলতে পারা যায় যে বিশাল সময়ের দূরত্বে তাদের এ দীর্ঘ ভ্রমণটাই তাদের শীতের জ্যাকেট।

অন্য আর একটি উপায়ে প্রাণীরা শীতের প্রকোপকে এড়িয়ে চলে যেটিকে বলে হাইবারনেশন।এটি
ল্যাটিন শব্দ hibernus থেকে উদ্ভুত এই শব্দটির অর্থ ‘শীত’।হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্যালাক্সিতে ভ্রমণ শুরুর পূর্বে স্টার্কটার্ক বিজ্ঞানীরা নভৌচারীদেরকে হাজার হাজার বছরের জন্যে স্পেস ক্যাপসুলে ঘুম পাড়িয়ে রাখে !ঠিক তেমনি এ সকল প্রাণীরা শীতের বিশাল সময়টি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যে নভৌচারীদের মতোই ক্যাপসুলের ভেতর দীর্ঘ ঘুমে ধ্যানমগ্ন থাকে!মানুষ ক্যাপসুলে ঘুমিয়ে থাকেনা কিন্তু তারা তাদের শরীরের কৃত্রিম আস্তরণ তৈরি করে!

 

ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার

 

 

কিছু প্রাণী পুরো শীতেই একটানা ঘুমায়, কেউ অধিকাংশ সময় ঘুমায় তবে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে সামান্য একটি অলস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, তারপর তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সাধারণত তাদের শরীরের তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়, তাদের শরীরের সব কর্মকাণ্ড ধীর হয়ে প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হয়: তাদের ভিতরের ইঞ্জিন কোনো কাজ করেনা বললেই চলে। আলাস্কায় এমনকি একটি ব্যাঙ আছে যারা জমে কঠিন বরফ হয়ে যায়, কিন্তু বসন্তের সময় আবার গলে জীবন্ত হয়ে ওঠে।(২)

 

এমনকি সেই সব প্রাণীগুলো, আমাদের মত, শীত এড়াতে যারা হাইবারনেট বা মাইগ্রেট করেনা তাদেরও খাপ খাইয়ে নিতে হয় ঋতু পরিবর্তনের সাথে। পাতা বেরিয়ে আসে বসন্তে, হেমন্তে পড়ে যায় ( আর এ কারণে আমেরিকায় এই সময়টাকে ‘ফল’ বলা হয়ে থাকে), সুতরাং গ্রীষ্মে গাছ থাকে সমৃদ্ধ সবুজ এবং পাতাশূন্য হয়ে যায় যা শীতে। ভেড়ার বাচ্চার জন্ম হয় বসন্তে, যেন তারা উষ্ণ তাপমাত্রার সুফল পেতে পারে এবং নতুন ঘাস পায় যখন তারা বড় হতে থাকে। আমাদের গায়ে লোমশ কোনো চামড়া নেই, কিন্তু আমরা প্রায়ই সেগুলো পরি। ঋতু পরিবর্তনে পৃথিবীতে নতুন নতুন মহাজাগতিক মেগা মুহূর্ত উপস্থিত হয় প্রতিটি মেগা মুহূর্তের আবহাওয়া ও জলবায়ু আলাদা।

ঋতু নামক মেগা মুহূর্তগুলির আলাদা আলাদা বিশেষত্বের কারণে, ভিন্ন ভিন্ন জিনপুলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্ণ প্রাণীরা এক একটি ঋতুতে তাদের নিজেদের জিনগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য গুলিকে এক একভাবে সমন্বয় করে নেয়।কিছু প্রাণীর জন্যে একটি নির্দিষ্ট কাল হয়তো উপযোগী ছিলো যেজন্য হয়তো একটি বিশেষ সময়ের স্থবিরতা যেমন- শীতকাল ; বাচ্ছাপ্রসব করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো সুবিধা দেয়!কারণ শীত কাল কোনো একভাবে সে প্রজাতিটিকে টিকে থাকার জন্যে বিশেষ কোনো উপযোগীতা দিয়েছিলো বলেই তাদের জিনপুলে শীতকালে বাচ্ছাপ্রসবের এ নিয়মটির এলিল ডোমিনেন্ট হয়েছিলো বিবর্তনীয় সময় রেখার কোনো এক আদি সীমায় যেমন- কুকুর!

আবার, শীতে গাছের পাতা ঝরে যায় অতএব কোনো ভেড়ার বাচ্ছার জন্যে অবশ্যই এটা সুবিধাজনক হবে না যদি তারা শীতকালের বৃক্ষহীন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে!অতীতে এমন কোনো ভুলের কারণে ভেড়ার পূর্বসুরীদের কোনো কোনো প্রজন্ম হয়তো তীব্রভাবে বিলুপ্ত হয়েছে আর এ দীর্ঘ বিবর্তনীয় পথ পরিক্রমায় তাদের জিনপুল তীব্র সিলেকশন প্রেসারে পতিত হয়েছে, যা হয়তোবা তাদের জিনপুলে এমন কোন জিনের উদ্ভব ঘটিয়েছে যেনো তারা ঋতুর পরিবর্তনের আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যগুলি আরো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং এভাবে তারা অবচেতনভাবেই প্রাকৃতিক ঘড়ির ছন্দের সাথে মিশে যায় যা তাদের সেক্স ও সন্তান প্রসবের ঝুকি থেকে নিরাপদ দুরত্বে রাখে!ভেড়ার বাচ্ছার জন্ম হয় বসন্তে যেনো তারা উষ্ণ পরিবেশ ও সবুজ পাতার মতো উপঢৌকন প্রাপ্ত হয় যা তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্যবান ও টিকে থাকার জন্যে উপযোগী করে তোলে রাণীর অনুকূল বুকে!

সুতরাং ঋতু পরিবর্তন আমরা উপেক্ষা করতে পারিনা, কিন্তু আমরা কি সেটি বুঝতে পারি? বহু মানুষই বোঝেন না।এমন কি কিছু মানুষ বোঝেন না যে সূর্যের চারপাথে একবার ঘুরে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে এক বছর, এবং আসলেই সেটাই হচ্ছে ‘বছর’। জরিপ অনুযায়ী ১৯ শতাংশ ব্রিটিশ জানেন যে এর জন্য মাত্র ১ মাস সময় লাগে, ইউরোপের অন্যান্য দেশেগুলোতে একই শতাংশ মানুষও তাদের অজ্ঞতার প্রমাণ দিয়েছেন।

 

আমাদের প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলগুলিঃ

 

ঘড়ি ধরে কাজ-আর ক্যালেন্ডার; তথ্যসুত্র

 

 

 

 

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!