সেদিন জনৈক বন্ধুর একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল ” weed khai moga pai”।  টাকলা ভাষার অর্থ ডিকোড করে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম।বন্ধুটি গরুত্ব প্রাপ্ত হল কীভাবে? নাকি বলবে গরু ঘাস খায়, আমি গরু খাই তাই আমি ঘাস খাই। যাইহোক রহস্য উদঘাটন করতে নক দিলাম।কিন্তু বন্ধু যা বলল সেটা প্রায় অবিশ্বাস্য। weed মানে আগাছা বা ঘাস কোনোটাই নয়, weed মানে গঞ্জিকা উদ্ভিদ! Cannabis বা গাঁজা যাকে মারিজুয়ানাও ডাকা হয়। আমি বললাম ঘাস বল আর মারিজুয়ানাই বল এটা তোর স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। কিন্তু সে পাল্টা আর্গুমেন্ট দিয়ে বলল গাঁজা যদি খারাপই হত তাহলে এটা কেন চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।অনেক দেশে মারিজুয়ানা আইনগতভাবে ভ্যালিড। সবচেয়ে বড় কথা উইড খেয়ে সে নাকি আধ্যাত্মিক জগতে চলে যায়।এমন অনেক কিছু অনুভব করতে পারে যা কিনা  আমাদের মত সাধারণ পাবলিক চিন্তাও করতে পারবে না। এসব শুনে কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলাম।সামান্য গাঁজার ধোঁয়া কি সত্যিই এতসব সুপারপাওয়ার দিতে পারে? 

আমরা জানি মানবমস্তিষ্ক প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন ধারণ করে।  এই নিউরনগুলো আলাদা আলাদা কোনো তাৎপর্য বহন করে না।কিন্তু যখন একটি নিউরন অন্য নিউরনের সাথে সংযুক্ত হয়ে তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে নিউরাল নেটওয়ার্ক গঠন করে তখন আমরা চিন্তা করতে পারি, ব্যথা অনুভব করি কিংবা আনন্দিত হই । নিউরনগুলো একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে নিউরোট্রান্সমিটার নামক এক ধরণের কেমিকেলের সাহায্যে। ধরা যাক কোনো একটি নিউরনে নার্ভ সিগনাল বা একশন পটেনশিয়াল তৈরি হয়েছে।এই নিউরনকে বলে প্রিসিন্যাপটিক নিউরন।সিগনালটি যেই নিউরনে স্থানান্তরিত হবে সেটি পোস্ট সিন্যাপটিক নিউরন। এদের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম ফাঁকা স্থানটি হল সিন্যাপ্টিক ক্লেফট (Synaptic Cleft)।একশন পটেনশিয়াল ট্রান্সমিট করতে প্রিসিন্যাপটিক নিউরন থেকে নিউরোট্রান্সমিটার মধ্যবর্তী ফাঁকাস্থানে আসে এবং পোস্ট সিন্যাপটিক নিউরনের গায়ে লেগে থাকা রিসেপ্টর অনুর সাথে বন্ধন গঠন করে।এর ফলে নিউরোট্রান্সমিটারের প্রকৃতি অনুযায়ী পোস্ট সিন্যাপটিক নিউরনে একটি বর্ধিত বা হ্রাসকৃত একশন পটেনশিয়াল সৃষ্টি হয়।এভাবে একশন পটেনশিয়াল বা নিউরাল সিগনাল একটি নিউরন থেকে তার সাইন্যাপসে থাকা অন্য নিউরনের মধ্যে বাহিত হয়।

কিন্তু এখানে একটি বিপরীত প্রক্রিয়াও সংঘটিত হয় যেটি ECS বা Endocannabinoid System নামে পরিচিত ।যখন পোস্ট সিন্যাপটিক নিউরন সিগনাল প্রাপ্ত হয় তখন সেটি Endocannabinoid বা EC  রিলিজ করে যা প্রিসিন্যাপটিক নিউরনে থাকা Cannabinoid Receptor (CB1  or CB2)এর সাথে যুক্ত হয়।ফলে প্রিসিন্যাপটিক সেল থেকে কম পরিমানে নিউরোট্রান্সমিটার নির্গত হয়। প্রকৃতপক্ষে ECS নিউরনকে এক্সেসিভ ফায়ারিং থেকে রক্ষা করে। যেমন স্ট্রেসফুল স্টিমুলিতে সাড়া দেয়া অর্গানিজমের একটি সার্ভাইভাল স্ট্র্যাটেজি  কিন্তু অতিরিক্ত স্ট্রেস  সিগনাল প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।চিন্তা করা ভালো,অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা খারাপ।তাই এখানে ECS কাজ করে স্ট্রেস রিডিউস করতে।

ডোপামিন প্রকৃতিগতভাবে inhibitory neurotransmitter।নার্ভ ট্রান্সমিশন প্রক্রিয়ায় এর সিগনাল হ্রাস পাওয়ার কথা। কিন্তু ECS ডোপামিনের প্রভাব বাড়িয়ে দিয়ে উচ্চমাত্রিক সুখানুভূতি (euphoria) প্রদান করে।তার মানে ECS শুধু দুঃখ কষ্টের অনুভূতি কমায়ই না এক্সট্রা প্লেজারও যোগ করে।

ECS সংঘটিত হয় একটি  স্ট্রিক্ট রেগুলেশনের  মাধ্যমে এবং এখানে একটি সূক্ষ্ম সমন্বয়বাদ (fine tuning)কাজ করে। কিন্তু যখনই কেউ অতিরিক্ত সুখের আশায় মারিজুয়ানা সেবন করে তখন ECS হাইপার একটিভেটেড হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের এই সমন্বয় ব্যহত হয়।

মারিজুয়ানার যে যৌগটি প্রধান কালপ্রিট সেটি হল ডেল্টা-9-টেট্রাহাইড্রো-ক্যানাবিনল (THC)।   THC Endocannabinoid এর বিকল্প হিসেবে ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয় এবং ECS সিস্টেমকে এক্টিভেট করে। কিন্তু Endocannabinoid এর সাথে এর সাথে পার্থক্য হল THC সহজে নষ্ট হয় না।প্রতিবার ধোঁয়া গ্রহণের সাথে বিপুল পরিমাণে THC ব্লাড স্ট্রিমে মিশে যায় যা স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন Endocannabinoid  এর থেকে অনেক বেশি এবং দীর্ঘায়ু।তাই ECS এর ফাংশনগুলোকে THC অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। এজন্যই মারিজুয়ানা সেবনের পর তীব্র সব অনুভূতি হতে থাকে।নিজেকে সুখ দুঃখের ঊর্ধে মনে হয়।বাস্তব জীবনের কোনো উদ্বেগ দুশ্চিন্তা স্পর্শ করেনা।টাইম সেন্স নষ্ট হয়ে যায়।চোখের সামনে জিন পরী ভাসতে থাকে।সোজা কথায় হ্যালুসিনেশন হতে থাকে।

স্বাভাবিক Endocannabinoid যতটুকু ডোপামিন ইনডিউস করে THC করে তার থেকে অনেক বেশি। ফলে গাঁজা সেবনকারীরা অন্য এক অপার্থিব আনন্দময় জগতে চলে যান যেটাকে তারা” High” হওয়া বলে থাকেন।নিজেকে মনে হতে থাকে পৃথিবীর রাজা!ডোপামিনের কথা শুনে আপাতদৃষ্টিতে সুসংবাদ মনে হলেও অতিরিক্ত ডোপামিন ক্ষতিকর।এটি স্বাভাবিক রিওয়ার্ড সিস্টেমকে ব্যাহত করে।মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসকে ড্যামেজ করে দেয়। ফলে নিয়মিত গাঁজা সেবনে শর্ট টার্ম মেমোরি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।অর্থাৎ আপনি এইমাত্র পরিচিত হওয়া ব্যাক্তির নামটি হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারবেন না।কারো সাথে তুমুল ঝগড়ার ক্লাইমেক্স মুহূর্তে গিয়ে হয়তো ঝগড়ার কারণটাই ভুলে যাবেন।

ভাঙা হৃদয় নিয়ে ধুম্র টানতে শুরু করলে  হয়তো কিছুক্ষণ পরেই জাগতিক সুখ দুঃখের বাইরে চলে গিয়ে নিজেকে দি গ্রেট ফিলোসোফার মনে হতে থাকে কিন্তু গাঁজার রিভার্স ইফেক্টও অনুভব করতে পারেন । যেমন নিম্ন মাত্রার THC স্ট্রেস এংজাইটি, প্যানিক এটাককে কাটিয়ে দেয় কিন্তু উচ্চমাত্রার THC স্ট্রেস আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।সৃষ্টি হতে পারে অস্বাভাবিক ভয়।নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি আধ্যাত্মিক শক্তি উপলব্ধি করতে পারেন। চোখের সামনে আলাদীনের বিরাট দৈত্য এসে হাজির হতে পারে অথবা আপনি হয়তো শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রির কথোপকথন চালাতে পারেন। সোজা কথায় প্যারানয়েড ডিলিউশনের শিকার হতে পারেন। 

এনিম্যাল রিসার্চ থেকে দেখা গেছে মারিজুয়ানা ব্রেইনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব রেখে যেতে পারে।যেসব ইঁদুরের মায়ের দেহে THC ইনজেক্ট করা হয়েছিল সেসব ইঁদুরের শিখন এবং স্মৃতি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

২৫ বছরের কমবয়সীদের মধ্যে গাঁজার প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক। এই বয়সে Cannabinoid Receptor বেশি পুঞ্জীভূত থাকে ব্রেইনের হোয়াইট ম্যাটারে।তাই গাঁজা সেবনে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ অংশটিই।আমরা জানি হোয়াইটম্যাটার যোগাযোগ, শিখন, স্মৃতি এবং ইমোশনের সাথে জড়িত।এ কারণে কমবয়সীদের মধ্যে গাঁজা সেবনের ফলে প্রবলেম সলভিং ক্ষমতা হ্রাস পায় উল্লখযোগ্য পরিমাণে।

ডিউক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক রিসার্চ স্টাডি থেকে দেখতে পান যারা তাদের টিনএইজে মারিজুয়ানা সেবনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল তাদের  IQ এভারেজ  ৮ পয়েন্ট কমে গেছে।এডাল্ট এইজে এসে মারিজুয়ানা সেবন বন্ধ করলেও IQ তেমন বৃদ্ধি পায়নি।রিসার্চ অনুযায়ী বয়ষ্কদের মধ্যে মারিজুয়ানার প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল।

অবশ্য আইডেন্টক্যাল টুইনদের মধ্যে পরিচালিত গবেষণায় আইকিউ পরিবর্তনের মান পাওয়া গেছে এভারেজ ৪ পয়েন্ট।অর্থাৎ টুইনদের মধ্যে মারিজুয়ানা সেবনকারী ব্যক্তির IQ সুস্থ ব্যক্তির চেয়ে চার পয়েন্ট কম ছিল।কিন্তু প্রথম পরীক্ষা থেকে টুইনদের মধ্যে IQ পরিবর্তনের মান কম থাকার অর্থ হল, প্রথম পরীক্ষায় আইকিউ শুধুমাত্র মারিজুয়ানার কারণেই কমেনি।বরং প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন জেনেটিক্যাল মেইকআপ,ব্রেইন কেমিস্ট্রি এবং পরিবেশের পার্থক্যের কারণে ঘটেছে। অর্থাৎ মারিজুয়ানা সবাইকে সমানভাবে প্রভাবিত করে না।এডাল্ট টুইনদের মধ্যে মারিজুয়ানার কারণে IQ এর উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না তাই অনেক দেশে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মারিজুয়ানা সেবনের লাইসেন্স দেয়া হয়।

রিসার্চ লিমিটেশনের জন্য মারিজুয়ানার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন।চিকিৎসা ক্ষেত্রে  ক্যান্সার পেশেন্টদের ক্ষুধাবৃদ্ধিতে এবং বমিভাব(nausea) কমাতে গাঁজার ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু কোনো কিছু চিকিৎসার উদ্দেশে ব্যবহার উপকারী বলেই বিনোদনের জন্য উপকারী হয়ে যায় না।যে ভাইরাস আমার আমাদের রোগের কারণ সে ভাইরাস থেকেই রোগের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন তৈরি হয়।

আমার প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব  চার্লি মাঙ্গার একবার বলেছিলেন ” জীবনে ব্যর্থ হওয়ার অব্যর্থ উপায় হল সুখের জন্য রাসায়নিক নেয়া”।

এরপরও যদি কারো মনে হয় একটু এনজয় করার জন্য মারিজুয়ানা গ্রহণ করা যেতেই পারে তাহলে চলুন একটি গেইম খেলি। অত্যন্ত উপভোগ্য আনন্দায়ক একটি গেইম।কিন্তু বড় একটি সম্ভাবনা আছে আপনি হয়তো গেইমটি খেলতে পরবেন না বরং আপনার শরীরের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে আপনাকে নিয়েই খেলা হবে। বিপজ্জনক এ গেইমটি খেলার জন্য আপনাকে পুলিশে ধরতে পারে এবং সামান্য সম্ভাবনা আছে আপনি গেইমটি  উপভোগ করে আবার বেরিয়ে আসতে পারবেন কিংবা এতটাই আকৃষ্ট হবেন যে গেইম ছেড়ে আর বেরিয়ে আসতে পারবেন না।আপনি কি রাজী? হ্যাঁ বলার মত যথেষ্ট নির্বুদ্ধিতা ধারণ করতে পারলে গাঁজার আসরে আপনাকে স্বাগতম!

Reference

[1]  National Institute on Drug Abuse. 2021. Marijuana DrugFacts | National Institute on Drug Abuse. [online] Available at:

[2]  High Times. 2021. What Is THC And What Does It Do?. [online] Available at:

[3]  Youtube.com. 2021. [online] Available at:

[4]  En.wikipedia.org. 2021. Cannabis (drug) – Wikipedia. [online] Available

hsbd bg