ক্রোম্যাগন ইনসেস্ট ও মরালিটি

Last updated:

জ থেকে ৫০, ০০০ অথবা ৩০০০০ হাজার বছর পূর্বে নিয়ান্ডারথাল ও সেপিয়েন্সসের মধ্যে রোম্যান্টিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল। নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স হয়তোবা সেপি নারীর বডি সিমেট্রিতে আকৃষ্ট হয়ে শাট ডাউন করেছিল। থেমে গিয়েছিলো সময়ের বোধ অথবা নৈতিক উপলব্ধি! হ্যাঁ! ডিএনএ রেকর্ড আমাদের তাই বলছে। ইউরোপ, এশিয়ান, নিউগিনির প্রায় ১-৪ শতাংশ ডিএনএ আজও নিয়ান্ডারথালদের  নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! আজকের সেপিয়েন্সদের রক্তে রক্তে আজও ৫০, ০০০ বছর পূর্বের নিয়ান্ডারথালদের রোম্যান্টিক ভালোবাসার অবিনাশী কামড়ের দাগ ! এনথ্রোপোলোজিস্টদের ধারণা মতে আজ থেকে ১০০,০০০ হাজার বছর পূর্বে আধুনিক নারী ও পুরুষ ঈসরায়েলের একটি গুহায় বাস করতো। আর নিয়ান্ডারথালরা প্রচন্ড ঠান্ডায় অধ্যুষিত হয়ে ইজরায়েলের সেই গুহায় বসবাস করতে শুরু করেছিল আজ থেকে ৮০,০০০ বছর পূর্বে। এই গুহা নিয়ান্ডারথাল ও সেপিয়েন্সদের কাছে ডেকে এনেছিল অতীতের গভীর সময়ের তলার জমে থাকা কোন এক মুহর্তে , তারা খুব সহজে এ গুহায় একে অন্যের সাথে দেখা করতে পারতো , বাণিজ্য করতো এবং সন্ধ্যার রাগে ডুবে যেতো অন্ধকার যৌনতায়! নিয়ান্ডারথাল সেপিয়েন্স পুরুষের সাথে সমকামীতা করেছে কি না এ ব্যাপারে  আমাদের জানা নেই, তেমন কোন ফসিল রেকর্ড আমাদের হাতে নেই, মহাকাল সে সব ঘটনাকে  লুট করেছে ! কিন্ত আধুনিক মানুষের মাঝে তাদের ডিএনএর উপস্থিতি দেখে বোঝা যায়, নিয়ান্ডারথাল আসলে তখনও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি , তারা আমাদের সাথেই একসাথে পথ চলেছিল অসীমের করিডোরে, পালিয়েছিল সোফিয়া নিয়ান্ডারথাল নিয়ে!

ক্রোম্যাগন ইনচেস্ট ও মোরালিটি
লুকিয়ে থাকা নিয়ান্ডারথাল

এত হাজার বছর পর আমরা যাই বলিনা কেনো, আমরা নিয়ান্ডারথাল সম্পর্কে বেশিকিছু জানিনা। আমরা শুধু জানি যে, তারা ক্ষুদ্র যাযাবর দলে বাস করতো, তারা জটিল যন্ত্র তৈরি করতে পারতো, তাদের সূদীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্য ছিলো, তারা বিশাল প্রাণী শিকার করতো, তাদের ছিল মাংসের প্রাচুর্যতা! কয়েক হাজার ম্যামথ, গণ্ডার, রেইনডিয়ার আর বাইসন যা তারা শিকার করেছিল সেগুলোকে গবেষণা করে আমরা জানতে পেরেছি, নিয়ান্ডারথালদের এ শিকার পদ্ধতি ছিল সাজানো, সিস্টেমেটিক এবং পরিকল্পিত! পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত ব্রেন সার্কিট তাদের ছিল, তার প্রমাণ দেয় আমাদের বাইসনের হাঁড় ! ( Mellars 1989)  সম্ভবত, ৩০, ০০০ বছর পূর্বে নিয়ান্ডারথাল বিলুপ্ত হয়ে যায় আর তাদের পরিবর্তে আমাদের আধুনিক মানুষ ওয়েস্টার্ন ইউরোপ দখল করে নেয় যাদেরকে বলা হয় ক্রো-ম্যাগন! এ মানুষরা দেখতে পুরোপুরিভাবে আমাদের মতোই ছিল।

মানুষের মতো দেখতে এ প্রাণীদের আবির্ভাবের সাথে সাথে শিল্প ও সংস্কৃতিতে সহসা Big Bang ঘটে! যদিও গুহায় ছবি অংকন করাটাই ছিল তাদের একমাত্র আবিষ্কার। ক্রো-ম্যাগনরা নতুন নতুন যন্ত্র ও অস্ত্র তৈরি করতে শুরু করে। যদিও নিয়ান্ডারথালদের শক্তিশালী জটিল পাথরের প্রযুক্তি ছিল, ক্রো-ম্যাগনরা সর্বপ্রথম হাঁতির দাঁত ও প্রাণীদের হাঁড় দিয়ে বাসন তৈরি করতে শুরু করে। সম্ভবত, এ প্রথম মানব সভ্যতা তীর ও ধনুক ব্যবহার করতে শিখেছিল। লাসাকক্স গুহায় একপ্রকার বিনুনি করা সুঁতা পাওয়া যায় যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা দড়াদড়ি তৈরি করতে পারতো__ সম্ভবত রশি, সুতা, জাল এবং মাছ ধরার লাইন।

ক্রো-ম্যাগনরাই পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম বাঁশি তৈরি করেছিল। তারাই ঢোল ও তবলার জন্ম দিয়েছিল। তারা ভাল্লুক ও সিংহের দাঁতের নেকলেস পরিধান করেছিল। তারা হাঁড়ের ব্রেসলেট পরিধান করতো এবং কানের দুল, শত শত হাঁতির দাঁত, খোলস এবং পাথরের জপমালাও তাদের ছিল নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক জিনিসের ভেতর। কিন্তু তাদের পূর্বসূরীরা এক ভয়ানাক খেলায় লিপ্ত ছিল আর তা ছিল ইনসেস্ট বা অজাচার। এ ক্রোম্যাগনদের জগতেই প্রথম ইনসেস্টের প্রতি এভারসন দেখা যায়! যা আজ আমাদের একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়, মা, বাবা ও অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে সেক্স এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে আমাদের মধ্যে কী আসলেই কোন জেনেটিক টেন্ডেন্সি কাজ করে? এটা আসলে নতুন কোন ধারণা নয়। ১৯৯১ সালে এডওয়ার্ড ওয়েস্টারমার্ক প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন, একসাথে যাদের সঙ্গে আমরা বেড়ে উঠি তাদের প্রতি ফিজিক্যাল রিপুলশানের কথা (Wertermarck 1934)। তারপর থেকে ইসরায়েলে এ এভারসন বা ঘৃণার উপর গবেষণা করে তার দাবির প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়। ইসরায়েলের কিবুটজে মেলফোর্ড স্পাইরো সে সব শিশুদেরকে পর্যবেক্ষণ করেন যারা তাদের তারুণ্যে উপনীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত একসাথে বাস করে, একসাথে ঘুমায়, স্নান করে। এখানে ছেলে ও মেয়েরা যৌনতার খেলায় মগ্ন হয়, একে অপরের সাথে বিছানার নিচে শুয়ে, পরীক্ষা করে, যে খেলাটিকে বলে “ক্লিনিক” যার মধ্যে থাকে, চুম্বন, জড়িয়ে ধরা এবং একে অন্যের জননাঙ্গ স্পর্শ করা। কিন্ত বারো বছর বয়সে এ সকল ছেলেমেয়েদের মধ্যে লজ্জার জন্ম হয় এবং একে অন্যের সঙ্গ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠে। আর পনের বছরের মধ্যেই তাদের মধ্যে খুব দৃঢ় ভাই-বোনের সম্পর্ক জন্ম হয়। যদিও এ সম্পর্কহীন তরুণরা একে অন্যকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন কিন্ত স্পাইরো দেখেছিলেন তারা কখনো কিবুটজ গ্রুপের কারো সাথে ইন্টারকোর্সে জড়ায়না।

১৯৭০ সালের একটি রেকর্ডে দেখা যায় কিবুটজের ২,৭৬৯ টি বিয়ের মধ্যে শুধুমাত্র ৩০ টি সংঘটিত হয়েছে একই গ্রুপের সাথে। এবং কোন শিশুই তার জন্মের ছয় বছর পর এর পূর্বের সাধারণ জীবনযাপন পদ্ধতিতে প্রবেশ করেনি। শেপলার বুঝতে পারেন, তিন থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল একটা সময় রয়েছে যখন মানুষের মাঝে ন্যাচারাল সেকচুয়াল এভারসন তৈরি হয় সে সকল ব্যক্তিদের প্রতি যাদের তারা সবসময় দেখে। নিউক্লিয়ার ফ্যামলির সেক্সের প্রতি এই ফিজিক্যাল এভারসন বিবর্তিত হয়েছিল সে সময় যখন আমাদের পূর্বসূরীরা এখনো তীর, ধনুক অথবা বাঁশি বাজানো শেখেনি অথবা তারা শেখেনি ফ্রান্স ও স্পেইনের গুহার দেয়াল সুসজ্জিত করতে।

স্তন্যপায়ী, পাখি এবং এমনকি পতঙ্গদের মধ্যেও আগন্তুকের সাথে সম্পর্ক করার প্রবণতা দেখা যায়। আসলে অন্যান্য প্রজাতিদের মধ্যেও Incest Avoid করার জন্য অজস্র অজস্র উপায় অনুসরণ করার প্রবণতা দেখা যায় , যে জন্য জীববিজ্ঞানীরা চিন্তা করেন যে, মানুষের ইনসেস্ট ট্যাবু জন্ম হয়েছে তাদের প্রাণী পূর্বসূরীদের থেকে। উচ্চমাত্রিক প্রাইমেটরা তাদের আত্মীয়দের শনাক্ত করতে পারে এবং তরুণরা খুবই দুর্লভ যে তাদের সাথে মেট করে, বিশেষ করে নিকটবর্তী আত্মীয়, যেমন মা।

সান্টিয়াগো দ্বীপের, পুয়ের্তো রিকোর পূর্বদিকে রিসাস বানরদের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে তারুণ্যে তারা কখনো মায়ের প্রতি সেকচুয়াল পদক্ষেপ নেয়না বরং তারা মাকে অথোরিটি ফিগার মনে করে, তার পিঠে চড়ে, তার সাথে কোনোপ্রকার কোর্ট করার পরিবর্তে, তারা মায়ের সাথে শিশুসুলভ আচরণ করে, কেউ কেউ আবার স্তন্যপান করে। নারী ও পুরুষ প্রায়শ প্রত্যাগমণ করে এবং তাদের পিতামাতার উপস্থিতিতে একদম শিশুসুলভ হয়ে যায়। ( Sade 1968, Bischop 1975b)

ভাই-বোন, পিতা-কন্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে প্রকৃতিতে একে অপরের সাথে মেটিং করেনা মূলত। বিভিন্ন প্রজাতিতে সদ্যযৌবনপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষ তাদের দল ছেড়ে চলে যায়৷। শিম্পাঞ্জিদের ভাইবোনরা মাঝে মাঝে তাদের নিজস্ব কমিউনিটিতে থেকে যায়। তানজানিয়ার গোম্ব স্ট্রিম রিজার্ভে জেন গোডেল এমন কিছু শিম্পঞ্জি দেখেছিলেন যারা অজাচারে আক্রান্ত হয়। সেখানে দেখা যায়, যে বোনটির সাথে তার ভাই সেক্স করছিল সে অত্যন্ত উদাসীন হয়ে যায়, ভাই ও বোনের জন্য এটা ছিল একটা জঘন্য লড়াই। ফিফি উদাহরণস্বরূপ, গাছের ডাল থেকে চিৎকার করে উঠেছিল যখন তার ভাই তার সাথে সহবাস করার জন্য ফোর্স করেছিল।

সম্ভবত আজ থেকে চার মিলিয়ন বছর পূর্বে, আর্দি,লুসি আর তারপর টউগি এবং আমাদের অন্যান্য প্রাচীন সব পূর্বসূরী সে সকল ব্যক্তিদের সেকচুয়ালি আনএট্রাক্টিভ মনে করতো যাদের সাথে তারা একসাথে বড় হয়। তারা চেয়েছিল তাদের মা ও “বিশেষ বন্ধুর” জন্য সাহায্য এবং নারী ও পুরুষ উভয়েই বয়সন্ধীতে তাদের দল ছেড়ে চলে যেতো। ইনসেস্ট ছিল খুবই দূর্লভ। তারপর মানব সভ্যতার মধ্যে সম্প্রসারিত মস্তিষ্কের বিবর্তন ঘটে, যে মস্তিষ্কের মাধ্যমে তারা তাদের আত্মীয়তার সুবিস্তৃত তীরকে বুঝতে পারে, আর এ ব্রেনপাওয়ারই তাদের মধ্যে স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে আর তারা সেকচুয়াল রুলস পালন করতে শুরু করে, মানুষের মাঝে ইনসেস্ট থেকে যে ইকোনোমিক ও পলিটিক্যাল ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় তার বোধ জন্ম হয়। আমাদের পূর্বসূরীদের মধ্যে এই যে ন্যাচারাল প্রবণতা এটাই একসময় সাংস্কৃতিক নীতিতে পরিণত হয় ( Bischof 1975, de Waal 1989 and Wilson 1983)। আর এ সংস্কৃতির মাধ্যমেই তারা বুঝতে পারে কাদের সাথে তাদের মেটিং করা উচিত আর কাদের সাথে মেটিং করা উচিত নয়।

পোস্টপার্টাম ট্যাবু বা প্রসবোত্তর নিষেধাজ্ঞাও ঠিক এ সময় বিবর্তিত হয়েছিল বলে জানা যায় যা প্রায় ৯৪ টি সংস্কৃতিতে পালন করা হতো । সাধারণত স্বামী-স্ত্রী সন্তান জন্মের পর প্রায় ছয়মাস সেক্স থেকে বিরত থাকে। এ নিয়মটি সম্ভবত বিবর্তিত হয়েছিল যেনো মা ও বাবা অসহায় শিশুটির কাছে এটেন্ড করতে পারে। ক্রো-ম্যাগনরা সম্ভবত এই নিয়মের ভেতর বসবাস করে। এছাড়া ক্রো-ম্যাগনরা রাতের অন্ধকারে অথবা সবার চোখের আড়ালে সেক্স করতো যা আমরা আজকের সমাজেও পর্যবেক্ষণ করি। তাই যারা বলে সেক্স গোপন করাটা আসলে নিজের স্বভাব সম্পর্কে একটি মিথ্যাচার তারা হয়তো সঠিক নন কারণ সবার আড়ালে সেক্স করার মধ্যেও হয়তো টিকে থাকার উপযোগীতা নিহিত ছিল। পুরুষরা শিকারে যাওয়ার আগে কখনোই নারীর সাথে সেক্স করতোনা। আমেরিকান ফুটবল কোচরা আজও এটা খুব ভালো করে জানে যে, তাদের প্লেয়াররা তখনই ভালো খেলে যদি না তারা খেলার পূর্বে সেক্স থেকে বিরত থাকে। ক্রোম্যাগনরা ম্যানুস্ট্রুয়াল ব্লাডের মধ্যে ক্ষমতা দেখতে পেতো যা আজো অধিকাংশ সংস্কৃতিতে দেখা যায়। আর ইউরোপিয়ান পূর্বসূরীরাই মেনুস্ট্রুয়েশন সম্পর্কে এ কুসংস্কার জন্ম দেয়। ১৯৫০ সালের পূর্বেও আমেরিকান নারীরা ম্যানুষ্ট্রুয়েশনকে “অভিশাপ” মনে করতো, তারা সেক্স থেকে বিরত থাকতো যখন ম্যানিস্ট্রুয়েশন দেখা দিতো।

মানুষ কেনো পোশাক পড়তে শুরু করেছিল?

ফ্লোরিডা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরির ডেভিড DNA সিকোয়েন্সিং এর মাধ্যমে ক্যালকুলেশন করে বের করেছিলেন যে, আজ থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর পূর্বে মানুষ সর্বপ্রথম পোশাক পরিধান করতে শুরু করেছিল আর এর কারণ ছিল ক্লাইমেটের শীতলতা ও উচ্চ অক্ষাংশ। একটা সময় আমাদের পূর্বসূরিরা তাদের দেহের পশম হারায়, হোমো সেপিয়েন্সদের শরীর ছিল তখন একেবারেই নগ্ন, আর তাই শীতের কবল থেকে রক্ষার জন্য তাদের ছিলোনা কোন দৈহিক প্রতিরোধক। ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ল্যান গিলিগ্যান বলেন, সেপিয়েন্সরা পোশাক পরিধান করতে শুরু করেছিল তাদের পশম হারানোর ক্ষতিপূরণ বা কম্পেনসেশন দিতে গিয়ে। শিকারী সংগ্রাহকরাও পোশাক পরিধান করে তবে তারা প্রায় নগ্ন। নিয়ান্ডারথালরাও পোশাক পরিধান করতো কিন্তু সেটা তাদের শরীরকে পরিপূর্ণভাবে কাভার করতোনা।

ক্রোম্যাগন ইনচেস্ট ও মোরালিটি
সভ্য় নিন্ডারথাল

২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় শীতকালে নিয়ান্ডারথালরাও তাদের দেহের ৭০-৮০ ভাগ ঢেকে রাখতো ক্লাইমেটকে মোকাবিলা করার জন্য। আর আধুনিক মানুষরা তাদের দেহের ৯০ ভাগই আবৃত করে রাখে। যদি ক্লাইমেটের কারণেই আমাদের পূর্বসূরী ক্রোম্যাগনরা পোশাক পরিধান করে থাকে তবে তারা পোশাক খুলে ফেললে লজ্জা পায় কেনো?

ক্লাইমেটের সাথে লজ্জার কী সম্পর্ক? কেনো তারা তাদের জননাঙ্গ ঢেকে রাখতে চায়?  উন্মোক্ত হয়ে গেলে তারা লজ্জা আর আতঙ্কে শিহরিত হয়? আসলে এর পেছনে Code for Sexual Modesty এর একটা সম্পর্ক আছে। শিকারী সংগ্রাহকরা প্রায় অর্ধনগ্ন থাকলেও আমরা দেখেছি, তারা তাদের পেনিস ও নিতম্ব ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। তার মানে, অন্তত এ কাপড়ের টুকরাটুকুর সাথে বিবর্তনীয় কোন সত্য লুকিয়ে আছে! আমাজনের নারীরা গভীর জঙ্গলেও এ অংশটুকু ঢেকে রাখে যদিও তারা একে অপরকে সনাক্ত করতে পারেনা। ইয়ানোমামো নারীরা তাদের কোমরের চারপাশে পাতলা একটা দড়ি ছাড়া আর কিছু পরতেন না। কিন্তু আপনি যদি তাকে সে সুঁতার বেল্টটা খুলে ফেলতে বলেন তবে তারা ঠিক ততটাই লজ্জা পাবে একজন বাংলাদেশী অথবা আমেরিকান নারী এখন তার জামা খুলে ফেলতে যতটা লজ্জা পায়। একজন ইয়ানোমামো পুরুষ তার পেটে দড়ি পড়তেন এবং খুব সাবধানে সেটার ভেতর তার পেনিসের স্কিনকে টেনে ধরতেন যেনো এটি বাহিরের দিকে প্রকাশ না হয় ঠিক যেমনি একজন টেনিস বল প্লেয়ার লজ্জা পাবে যদি তার শর্টের উপর দিয়ে পেনিস ফ্লপ করে।

আমাদের পূর্বসূরীদের মধ্যে সম্ভবত পরকীয়া ও বিচ্ছেদের ব্যাপারে কিছু নিয়ম তৈরি হয়েছিল। শিকারী সংগ্রাহকরা আসলে পরকীয়া অথবা বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারে এতবেশি সেনসেটিভ ছিলনা। কিন্তু ক্রো-ম্যাগনদের মধ্যে পিল্যান্ডারিং এর শাস্তি বিকেলের উপহাস, হালকা মারপিট অথবা নৃশংস কিছু কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলনা। সম্ভবত, ক্রো-ম্যাগনরা নারী ও পুরুষের মধ্যে শক্ত কিছু নিয়ম তৈরি করে দেয় _নারী ও পুরুষ উভয়েই যে নিয়ম সম্পর্কে জানতো আর এখান থেকেই নগ্নতা হয়ে উঠেছিল তাদের জন্য লজ্জাজনক।

লজ্জা নগ্নতার সাথে জড়িত কোন বাস্তবতা নয়। মূলত , লজ্জা হলো সাহসিকতার বিপরীত। আমাদের ব্রেনে যখন অনেক বেশি ডোপামিন তৈরি হয় আমরা সাহসিকতা অনুভব করি। যখন সোশ্যাল মোটিভেশন হ্রাস পায় তখন আমরা সাহসিকতা হারিয়ে ফেলি যা হয়তো ডোপামিন লেভেলে পরিবর্তন তৈরি করে যে জন্য আমরা লজ্জিত হই। প্রফেসর থমাস ফরমার্ক বলেন, আমরা পজিট্রন এমিশন টপোগ্রাফি ও ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রিজোন্যান্সের মাধ্যমে দেখেছি যে, লজ্জা বা Social Anxiety Disorder আক্রান্ত ব্যক্তি ও একজন সুখী মানুষের মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরেটোনিন লেভেলের মধ্যে তারতম্য পাওয়া যায়। সেরেটোনিনের ওভার প্রোডাকশনের কারণেও কারো মধ্যে লজ্জার সৃষ্টি হতে পারে৷ তারমানে দেখা যাচ্ছে, লজ্জার সাথে মূলত সেরেটোনিন ও ডোপামিনের সম্পর্ক, আর এ সব নিউরোট্রান্সমিটার প্রভাবিত হয় সোশ্যাল মোটিভেশনের প্রভাবে, আমেরিকান মেয়েরা প্যান্টি পড়ে পথ চললে তাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরেটোনিন পরিবর্তিত হয়ে লজ্জা পায়না কিন্তু তার প্যান্টি খুলে নিলে সে নিয়ান্ডারথাল বা আদিবাসিদের মতোই লজ্জায় শীতল হয়ে যায় অথচ ইন্ডিয়ার একজন নারীর সামান্য ওড়না ( যদিও প্যান্টি ও ওড়না দুটোই কাপড়, দুটোই সমান) ধরে কেউ টান দিলেও মারাত্মক লজ্জা পায়(মামলা হয়ে যেতে পারে ) । খেলাটা মূলত ব্রেন নিউরো-ট্রান্সমিটারের, নগ্নতা বা পোশাকের নয় , যাকে সামাজিক মর্জাদা বলে যা বোঝানো হয় তার উপর ভর করেই তারা মোটিভেট হয় ও মোটিভেশন হারায় !

লিহন
ক্রোম্যাগন ইনচেস্ট ও মোরালিটি
ক্রো-ম্যাগন

সোশ্যাল মোটিভেশন হ্রাস পেলে আপনার মস্তিষ্কে এ নিউরোট্রান্সমিটারগুলো লজ্জার জন্ম দেবে। ক্রোম্যাগনরা একসময় পোশাককেই সভ্যতার অংশ মনে করতে শুরু করেছিল, তারা সেক্সকে অনেক বেশি প্রাইভেট মনে করতো, জিনগত জেলাসি থেকেই তারা হয়তো একজন তার প্রেমিককে অন্যের সাথে ভাগ করতে চাইতোনা, যে জন্য তারা এটাকে নিয়ম করে ফেলেছিল। যখনই কেউ এ নিয়ম ভেঙে ফেলতো সে সামাজিক মর্জাদা তথা মোটিভেশান হারাতো যা তার মধ্যে সোশ্যাল এনাক্সাইটি ডিসঅর্ডার বা লজ্জার জন্ম দিতো।

নগ্নতা লজ্জা নয়, লজ্জার জন্ম হয় Low Social Motivation এর আতঙ্ক থেকে আর এটা সর্বপ্রথম শুরু হয়েছিলো ক্রোম্যাগন ও নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে। আমরা জানি যে, নিয়ান্ডারথাল এবস্ট্রাক্ট থট করতে পারতো, এবস্ট্রাক্ট থট নেই বলেই একটা শিম্পাঞ্জির কাছে ক্যাথেড্রালের মার্বেল বেসিনের পবিত্র পানি শুধুই পানি  কিন্তু আপনার কাছে নয়। নিউটনের কুকুর যে কিনা তার প্রিন্সিপিয়া পুড়িয়ে দিয়েছিল সেও জানতোনা গণিত বা ফিজিক্স কী। এবস্ট্রাক্ট থট হল, বস্তুর উপর নিজের মন মতো গুণ বা মিনিং আরোপ করার ক্ষমতা। পোশাক আসলে লজ্জা নিবারণের কোন আবরণ নয়!

মূলত, এবস্ট্রাক্ট থট করার ক্ষমতার কারণেই আমরা নগ্নতার মধ্যে লজ্জা দেখতে শুরু করি আর কাপড়ের মধ্যে দেখতে শুরু করি শালীনতা, ভদ্রতা ও সভ্যতার প্রকাশ। যখন ক্রো-ম্যাগন মানুষের এবস্ট্রাক্ট থট তার জিনগত সেলফিশনেস থেকে নিজেদের সেক্স পার্টনারকে একান্ত নিজের বলে মনে করতে থাকে তখনই তাদের মধ্যে ক্লথ ও লজ্জার মিথের বিবর্তন হয়। আর ঠিক এ কারণেই আমরা আজ নগ্ন হতে লজ্জা পাই! কিন্তু তাই বলে কী আমরা লজ্জা পাবো না? কেনো নয়! নিয়ান্ডারথালও তো লজ্জা পেতো?

কর্তব্যশীলতার জন্মঃ

বিশ্বের সর্বত্র আজ নিয়ম। কিভাবে ক্রো-ম্যাগনদের মধ্যে সেকচুয়াল আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রিত হতো সুকঠিন নিয়ম মেনে? তারা কী মোরালিটি অনুভব করতো? তাদের মধ্যে কি ভালো ও মন্দের অনুভূতি ছিল? তাদের বিবেক ছিল?

সম্ভবত!

মানুষ ও নিন্মশ্রেণীর মানুষের মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হিসেবে ডারউইন লিখেছিলেন, মোরাল সেন্স বা কনসায়েন্স গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এ বিবেকবোধ থেকেই জন্ম নেয় দায়িত্বশীলতার। কিন্তু কিভাবে বিবেক বিবর্তিত হয়েছিল?

নৃ-তাত্বিক রবিন ফক্স বলেন, মানব জীবন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠে, তরুণরা কার সাথে মেটিং করবে আর কার সাথে মেটিং করবেনা এ ব্যাপারে কঠিন নিয়ম মেনে চলতে শুরু করে। তাদের প্রাকৃতিক যৌনতা ও এগ্রেসিভ প্রবণতায় প্রতিবন্ধকতা তাদের মধ্যে তাদের চাহিদাগুলো জোরালো করে তোলে। এই সিকেকশন প্রেসার থেকে একটা বিশেষ পরিস্থিতির জন্ম হয়, কারা তাদের সেকচুয়াল ব্যাপারে সর্বোচ্চ অনুশোচনা বোধ করবে। আর ফক্সের মতে, এখান থেকেই আমাদের মস্তিষ্কে বিবেকের Software তৈরি হয়। তিনি বলেন এটা ছিল এমন এক পরিস্থিতি যা মানুষের মধ্যে জেনেটিক্যালি অনুশোচনা ও পরিতাপবোধ তৈরি করে।( Ibid,247)

আমাদের নাকের ঠিক পেছনের দিকে মস্তিষ্কের যে অংশ সেটিই আমাদের অনুশোচনাবোধ ও নৈতিক ডাইলেমার সাথে জড়িত, এটি হলো সেই এলাকা যেখান থেকে আমরা ডিসিশন মেইক করি। মানুষ ভুল আর ঠিকের মধ্যে তারতম্য তৈরি করতে পারে, তারা যুক্তি তৈরি করতে পারে কিন্তু যাদের এ এলাকা নষ্ট হয়ে যায় তারা অনুশোচনা বোধ করেনা, বা মোরাল কোড মেনে চলে না। ( Damasio et al 1994)

Morality is a set of complex emotional and cognitive processes that is reflected across many brain domains. … The orbital and ventromedial prefrontal cortices are implicated in emotionally-driven moral decisions, whereas the dorsolateral prefrontal cortex seems to mitigate the salience of prepotent emotional responses.The Prefrontal Cortex (PFC) and hippocampus are the most critical parts of the human brain for decision making.

স্ট্রেইজ অব মোরালিটিঃ

বিজ্ঞানীরা আজ বিশ্বাস করেন, সম্ভাব্য নৈতিকবোধ তখনও একজন মানুষের মধ্যে উপস্থিত থাকে যখন সে মাতৃগর্ভে অবস্থান করে। যেমন- একজন শিশু কান্না করে যখন সে অন্য আর একজন শিশুর কান্না শোনে। যেটাকে গ্লোবাল এম্পেথি বলে। এক থেকে দুই বছরের মধ্যে শিশুদের মধ্যে Sense of Self তৈরি হয়। কে সে আর কে সে নয় এবং সে তার চারপাশের মানুষের প্রতি বিশেষ দৃষ্টিপাত করে। অল্পবয়সী শিশুরা লজ্জাবোধ করে এবং পরবর্তীতে অনুভব করে, অনুতাপ। তারা ভুল ও শুদ্ধের নিয়ম অনুধাবন করে। রীতির প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল হয়, গোপনীয়তা ও সামাজিক সম্পদের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল হয়।

বয়স, স্ট্যাটাস ও ব্যক্তির তারতম্যে এক একটি সংস্কৃতিতে মোরালিটির ডেফিনেশন এক এক রকম হয় নিউগিনির নৈতিক গুণাবলি অবশ্যম্ভাবীভাবে ইউনাইটেড স্টেটের মতো নয়। কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, মানুষ নামক এ প্রাণীদেরকে ভুল ও সঠিকের কনসেপ্ট বোঝার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। বড় হওয়ার সাথেসাথে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে শোষণ করি, তারপর বিবেক দ্বারা আমাদের আভ্যন্তরীণ স্বভাবের সাথে লড়াই করি আইন অনুসরণ বা লঙ্গন করার জন্য। কেউই আমাদেরকে অনুশোচনার শিক্ষা দেয়না। আপনার সংস্কৃতি শুধু আপনাকে এটা শেখায় কীসে আপনি অপরাধবোধ করবেন।

শিশুদের মোরাল কোড আছে। গ্লোবাল এম্পেথি যদি না থাকতো শিশুরা নিয়মিত নিজের দিকেই ফোকাস করতো। ডারউইনের মতে, তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠতো। একটি শিশুর প্রাইমারী গোল শিশুকালে টিকে থাকা__ এমন একটা সময় যখন তারা দূর্ঘটনা ও রোগের ভয়ে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, আর একপ্রকারের মোরালিটি রয়েছে যেটিকে বলে টিনেজ মোরালিটি। টিনেজাররা তাদের বন্ধুবান্ধবদের সন্তুষ্ট করার জন্য বাবা মায়ের কাছ থেকে চুরি করে। ডারউইনের মতে, এটাও এডাপ্টিভ ছিল। আমাদের শিকারী সংগ্রাহক জীবনে তরুণদের অবশ্যম্ভাবীভাবে এটা প্রয়োজন ছিল তাদের কমরেডদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, সে সকল ব্যক্তি যাদের সাথে সে ভ্রমণ ও শিকার সংগ্রহ করবে। এ জন্য আমাদের মধ্যে মা-বাবার তুলনায় বন্ধুবান্ধবের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা যায় এবং অনেক সময় বন্ধুর কাছে প্রেস্টিজ নষ্ট হয়ে গেলে আমরা পিতামাতাকে অপমান করতে পিছুপা হইনা কিন্তু ডারউইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটাও এডাপ্টিভ কারণ নয়তোবা আমরা আমাদের কমরেডদের যোগাড় করতে পারতামনা, আমাদের পক্ষে ভালো শিকারী সংগ্রাহক হওয়াটাই ছিল অসম্ভব এবং হয়তোবা একা একজন শিকারী শিকার করা তো দূরের কথা কোন হিংস্র জন্তুর শিকারে পরিণত হয়ে যেত! আর এতে করে প্রকারন্তে পিতা মাতাই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ জন্যই টিনেজারদের মধ্যে তার বন্ধুবান্ধবের প্রতি মোরাল ফিলিংস সার্বাধিক দেখা যায়।  

তৃতীয়ত, মায়েদের মধ্যেও এক প্রকার মোরাল কোড দেখা যায়। মায়েদেরও একটি মোরাল কোড রয়েছে। মায়েরা ছেলের বন্ধুদের থেকে খাবার লুকিয়ে ছেলেকে প্রদান করে, এটিও একটি এডাপ্টিভ আচরণ যা DNA কে ভবিষ্যত প্রজন্মে নিশ্চিত করে।  সর্বশেষ মোরালিটি, বৃদ্ধদের থেকেই আসে। এ সব লোক কমিউনিটির ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করে। এরা অধিকাংশই বিশ্বপ্রেমিক বা মানবহিতৈষী হয়ে যায়, তারা তাদের অধিকাংশ সময়, শক্তি ও সম্পদ আরো উন্নত আত্মীয়তার সম্পর্ক গঠনের জন্য অপচয় করে, আরো দৃঢ় ট্রাইব অথবা ন্যাশন, তারা প্লানেটারি চিন্তা করে এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে জড়িত হয়। পোস্ট প্রোডাক্টিভ পুরুষরা এমন একটি বিশ্ব গঠন করার জন্য মনোনিবেশ করে যেখানে তাদের DNA পরবর্তী দশকে বিস্তার লাভ করবে অথবা বহু শতাব্দী! আর এভাবেই বিশ্বমানব ও বিশ্বজনীন নীতি নৈতিকতার জন্ম হয়।

বিবেকের রহস্য উন্মোচনঃ

কখন আমাদের নৈতিক বিচার ও আচরণের প্রবণতা বিবর্তিত হয় সেটি আর একটি ব্যাপার। ডারউইন প্রদর্শন করেছিলেন যে, অজস্র প্রাণী তাদের সামাজিক প্রবণতা প্রদর্শন করে যেমন- তাদের তরুণদের ডিফেন্ড করা, অন্যদের আরাম দেয়া এবং খাবার ভাগ করা। প্রাইমেটোলোজিস্ট ফ্রান্স ডি ওয়াল বলেছেন, তিমি থেকে হাতি, কুকুর থেকে বানর, বানর থেকে শিম্পাঞ্জি সবার সামাজিক নিয়ম আছে, সুন্দরের বোধ আছে, আছে সহানুভূতি, পারস্পরিক সহযোগিতা, মিউচুয়াল এইড __যা মানুষের বিবেকের বিল্ডিং ব্লক। ( De Waal 1996)

অন্যের জন্য নিজের ক্ষতি শিকার করা এটা একদম সার্বজনীন। ডলপিনরা তাদের আহত সঙ্গীকে সাপোর্ট করে। পাখিরা সতর্কতামূলক ডাক দেয় তাদের সঙ্গীদের রক্ষা করার জন্য আর এতে করে শিকারীর দৃষ্টিতে পড়ে সে নিজেই প্রাণ হারায়। বানররা তাদের অন্ধ তরুণদের রক্ষা করার জন্য তাদের মেটাবলিক এনার্জি অপচয় করে। হাতিরা তাদের মৃতদের দাপন করে, পাতা ও গাছের ডালপালা আবৃত করে। একটি শিম্পাঞ্জি অন্য আর একটিকে জড়িয়ে ধরে যে কিনা কিছুক্ষণ পূর্বে অন্য কারো কামড় খেয়েছে। ভ্যাম্পায়াররা ক্ষুদার্থ ভ্যাম্পায়ারকে রক্ত দেয়। শিম্পাঞ্জিরা উপকারীর উপকার স্মরণ রাখে এবং দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ তারা এর ঋণ শোধ করে। এ সব সৃষ্টি মানুষ নয় কিন্তু তারা মানুষের মতোই। ওয়াল বলেন, অন্যদের কেয়ার করার ক্ষমতা আমাদের মোরাল সিস্টেমের ভিত্তি। অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে মোরাল এবিলিটি আমাদের ল্যাঙ্গুয়েজ এবিলিটির সমরূপ। তার মতে মোরাল কোড আমাদের স্তন্যপায়ী সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

যেহেতু মোরালিটি নন-হিউম্যান ক্রিয়েচারদেরও একটি এনালগ। ডারউইন প্রস্তাব করেন যে, আমাদের পূর্বসূরীদেরও এ ধরণের সামাজিক প্রবণতা ছিল। এই মোরাল ড্রাইভ তাদের  ভুল ও সঠিক পথের মধ্যে তারতম্য বুঝিয়ে দিতো। কিন্তু যেহেতু মানুষ ইন্টেলেকচুয়াল পাওয়ার অর্জন করে…..মোরালিটির স্ট্যান্ডার্ড উচ্চ থেকে উচ্চতর হতে থাকে। (Darwin 1871,493)

এটি কল্পনা করা কঠিন নয় যে, সিরিয়াল মনোগেমি ও ক্ল্যান্ডেস্টাইন এডাল্ট্রি আজ থেকে চার মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের মোরাল নিউরাল-ওয়্যারিং’কে ট্রিগার করেছিল। এ ডুয়েল রি-প্রোডাক্টিভ স্ট্র্যাটেজি থেকে যে দ্বন্দ্ব জন্ম হয়েছিল তা আমাদের পূর্বসূরীদের মস্তিষ্কের ভেতর মোরাল সেন্স জন্ম দিয়েছিল। একদিকে তারা এক এক সময় এক এক পুরুষের সাথে যুগল ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতো আর অন্যদিকে একজনকে রেখে গোপনে গোপনে অন্য কারো সাথে তারা রোম্যান্টিক প্রেমে জড়িয়ে পড়তো। দুজনের কাছেই ছিল সে দায়বদ্ধ।

না এদিকে যেতে পারছে অথবা না ওদিকে। আর দুদিকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে তার প্রয়োজন বিবেক, নীতি ও সততা। সে যদি অনেস্ট না হয়, সে যদি নৈতিক না হয়, সে যদি সাম্যবাদী না হয় তবে তার পক্ষে কারো মন রক্ষা করাই সম্ভব নয়। দুজন পুরুষের পেনিসের জন্য নারীর মস্তিষ্কে “বিবেক ও বিচারবোধ” জন্ম নেয় আর এদিকে পুরুষের মস্তিষ্কও দুজন নারীর প্রতি যৌন লালসা থেকে জন্ম নেয় ” বিবেক ও মহানুভবতা”! যদি দ্বন্দ্ব না থাকতো, যদি ভারসাম্যহীনতা না থাকতো, যদি একজন নারী ও পুরুষ শুধু একজন সঙ্গীনী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতো তবে তার মধ্যে আলাদা আলাদা করে বিচারবোধ জন্ম হতো না, আসলে তার বিবেকের দরজাই চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যেতো! অতএব আমরা বলতে পারি, এডাল্ট্রি বা বহুগামীতাই আমাদের পূর্বসূরীদের মস্তিষ্কে নীতির জন্ম দিয়েছিল। একইসাথে প্যায়ারবন্ড ও পরকিয়া বজায় রাখার জন্য তাদের সুবিস্তৃত রেঞ্জের কনসিকোয়েন্সকে ওজন করতে হতো।

হেলেন ফিশার বলেন, হিউম্যান মোরালিটির প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় আজ থেকে ৪.৪ মিলিয়ন বছর পূর্বে যখন আর্ডি ইথিওপিয়ার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো। মোরালিটির এই পূর্বপ্রবণতা লুসির মধ্যে সম্প্রসারিত হয় আর তারপর টউগির মধ্যে, তারপর নারিকোটম ছেলে যে পৃথিবীতে একসময় পথ চলেছিল। সাইকোলজিস্ট জোনাথন হাদিদ সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব করেছিলেন যে, আমাদের পূর্বসূরীরা পারস্পরিক সহযোগীতামূলক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিল ৭ লক্ষ বছর আগে, তারা রুবিকন অতিক্রম করেছিল, তাদের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছিল, প্রাথমিক মোরাল মেট্রিক্স যা তাদের পরস্পরের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে সক্ষম করে তুলেছিল। (Haidt 2012, 209)

কিন্তু সবাই একমত যে নিয়ান্ডারথালরা আজ থেকে ৫০ হাজার বছর পূর্বে সাউথার্ন ফ্রান্সে তাদের হাত উত্তপ্ত করেছিল। ভালো ও মন্দ সম্পর্কে তাদের কংক্রিট কোড ছিল, তারা ছিল নৈতিক নিয়মের হোস্ট, তাদের মধ্যে ছিল সেন্স অব ডিউটি যা তারা গ্রুপের স্বার্থে মেনে চলতো। মূলত, কিছুকিছু নিয়ান্ডারথাল সাইটে পঙ্গু কিছু মানুষ ছিল  যারা ক্রোনিক ডিজিজে আক্রান্ত। তারা তাদের সেবা করার চেষ্টা করেছিল যদিও তাদের সে ক্ষমতা চছিলোনা।

তারপর ক্রোম্যাগন নারী ও পুরুষ শঙ্কিত হয়েছিল আরো বিরাট ও বিরাট সামাজিক নেটওয়ার্ক দ্বারা আর এ জন্য তারা আরো কঠিন থেকে কঠিনতর নিয়ম তৈরি করতে থাকে যেটা সম্ভবত ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়তে থাকা সামাজিক বিশৃঙ্খলাকে হ্রাস করতে Evolved হয়েছিল আর ঠিক এভাবেই বিবর্তিত হয়েছিল মানুষের লজ্জাবোধ, অনুতাপ, অনুশোচনা, ক্ষোভ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিকতাবোধ, বিশেষ করে ভালোবাসা ও সেক্স সংক্রান্ত বিবেক ( কনসায়েন্স)! সমাজিক নেটওয়ার্ক যত জটিল হতে থাকে সেই জটিল সমাজের সাথে সমন্বিত হতে গিয়ে জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে মানব মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক, তৈরি হয় নতুন নতুন ব্রেন সার্কিট। লজ্জা, অনুতাপ, অনুশোচনা সবকিছুই আসলে সামাজিক নেটওয়ার্কে শৃঙ্খলা আনয়ন করে। আপনি যদি অপরাধ করে লজ্জাবোধ করেন তবে সমাজ মনে করবে আপনি ভবিষ্যতে সংশোধিত হবেন আর সে আপনাকে স্পেস দেয় যা আপনার টিকে থাকার সম্ভবনা বাড়িয়ে তোলে! আপনি যদি বলেন, মহাশয়, আমি খুবই দুঃখিত, তবে সমাজ আপনাকে বড় মাপের কোন শাস্তি দেয়ার পূর্বে একবারের জন্য হলেও বিবেচনা করে এবং তারা আপনাকে ভুল শুধরানোর সুযোগ দেয়। আপনি যদি সমাজিক নিয়ম লঙ্গন করে অনুতাপ করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, লোক সম্মুখে নিজেকে তিরস্কার করেন তবে সমাজ আপনাকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার পূর্বে একবারের জন্য হলেও ভাববে!

কেউ দুঃখিত, অনুতপ্ত, লজ্জিত, ক্ষমাপ্রার্থী ইত্যাদি শব্দগুলো উচ্চারণ করার পর স্বভাবতই আমাদের ব্রেন কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে উঠে, আমরা বড় মাপের দুঃখ নিয়েও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠি, এভাবে ব্রেন টু ব্রেন কমিউনিকেশনের মাধ্যমে আমরা দৈহিক সাংঘর্ষিকতা এড়িয়ে চলি! সমাজ যত জটিল হয় আমাদের ব্রেনও ততই তীব্র থেকে তীব্রতরভাবে জটিল হয়ে উঠে। ক্ষুদা লাগলে আমাদের খেতে হয়, চাল বিক্রেতার টাকা না দিয়ে “স্যরি ” বলে সে ক্ষমা করেনা কিন্তু যে সব ক্ষেত্রে আমাদের জীবন মৃত্যুর পরিস্থিতি জড়িত নয় আমরা সেখানে ঠিকই “স্যরি” বলে ঝামেলা এড়িয়ে যেতে পারি। মূলত, জটিল সমাজ ব্যবস্থাই আমাদের মস্তিষ্কে I am Sorry! Please Forgive Me! I feel ashamed! i feel Guilty ইত্যাদি অনুভূতি বা বোধগুলো তৈরি করে!

ক্রোম্যাগন ইনচেস্ট ও মোরালিটি

মানুষের জৈবিক ভাণ্ডারে কী অসাধারণ এক সংযোজন। আধুনিক নারী পুরুষ একে অপরকে তাদের অপকর্মের জন্য সরাসরি আক্রমণ করেনা বা বহিস্কার করেনা। বিবেকের ফুল ফোটার সাথেসাথে তারা এখন নিজেদের তিরস্কার করে। মনোবিজ্ঞানী এরিখ ফ্রম বলেন, একটি সমাজ তখনই ভালো কাজ করতে পারে যখন তারা যা চায় তা করতে পারে আর বিবেক তাদেরকে সে কাজটি করারই অনুমোদন দেয়। তিনি বিবেককে একটি সামাজিক GLUE বলে জানতেন। মানব মনে এভাবে চলতে থাকে দ্বন্দ্ব নিরন্তর। নারী ও পুরুষ উভয়েই মানব সভ্যতার পরিবর্তনশীল মন মানসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছিল, দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল যখন তার্ক হয়েছিল অন্য কোন নারী বা পুরুষের সঙ্গে সেক্স করার আগ্রহ নিয়ে।

আরো পড়ুন- নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেই কী এবস্ট্রাক্ট থট বিবর্তিত হয়েছিল?

এ লেখাটির বেসিক স্ট্রাকচার নেয়া হয়েছে ” দি এনাটমি অব লাভ বইটি ” থেকে।

hsbd bg