Last updated:

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কার থেকে আমরা জানতে পারি, আমাদের আচার আচরণ ও মন মানসিকতার অনেককিছুই বিবর্তিত হয়েছে শিকারী সংগ্রাহক জীবনে। ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়াগুলো প্রতি দশ থেকে বিশ মিনিটের ভেতর মিউটেট হলেও আমাদের মতো বড় মাপের প্রাণীদের বিবর্তন ঘটতে সময় প্রয়োজন হয় মিলিয়ন মিলিয়ন বছর। পরিবর্তনগুলো একেবারেই মাইক্রোস্কোপিক, এত সুক্ষ্ম ও ক্ষুদ্রতর পর্যায়ে মিউটেশনগুলো ঘটে যে সে মিউটেশনগুলো আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছর পর্যন্ত বুঝে উঠতেই পারেনা। কারণ বড় মাপের কোনো মিউটেশন প্রজাতির উপর নেগেটিভ প্রভাব সৃষ্টি করে। আর এজন্যেই আমরা ম্যাক্রো-লেভেলে কোন বিবর্তন দেখতে পাইনা। বিবর্তন ঘটেনা তা নয়, তবে বিবর্তন এতটাই ক্ষুদ্রতর মাত্রায় ঘটে যে সেটি গণনার মধ্যে আসেনা। কারণ ক্ষুদ্রতর পর্যায়ের মিউটেশন পরিবেশের সাথে সঠিকভাবে সমন্বিত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় মাপের মিউটেশনগুলো থেকে বেশি অনুকূল। যদি জিনের মধ্যে খুব অল্প সময়ে বড় মাপের মিউটেশন ঘটে, তবে একটি চিতার নখ হয়তো আকস্মিক বড় হয়ে উঠবে আর সেই নখ দিয়ে শিকার ধরতে গিয়ে, হয়তো শিকারকে নিয়ন্ত্রণে আনার পূর্বেই বড় নখগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যদি একটি আকস্মিক বড় মাপের মিউটেশনের কারণে সিংহের সামনের পা দুটো অনেক বড় হয়ে যায় তবে হয়তো সিংহটি প্রচন্ড গতিতে দোড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, কারণ দ্রুত গতিতে দৌড়াতে গেলে তার পা ভেঙে দু-ভাগ হয়ে যাবে। যদি তাই হয় খুব শীঘ্রই বনের রাজা সিংহ হরিণ থেকেও দূর্বল ও অসহায় প্রাণীতে পরিণত হবে, হয়তোবা পরিণত হবে বন্য কুকুরের খাদ্যে! (১)

আর ঠিক এ জন্যই মিউটেশন ঘটে খুব ধীরে, ক্ষুদ্রতর পর্যায়ে এবং এক একটি মিউটেশনে সময় প্রয়োজন মিলিয়ন মিলিয়ন বছর যেনো সেটি একটি প্রজাতির উপর নেগেটিভ কোনো প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে ধবংস না করে ফেলে! এ কারণেই একটা শিম্পাঞ্জিকে ল্যাবরেটরিতে বন্দী করে রেখে এক প্রজাতি থেকে অন্য কোনো প্রজাতিতে রুপান্তর করা যায়না কিন্তু অতি-ক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের মধ্যে প্রতিনিয়ত মিউটেশন ঘটে। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও একই ব্যাপারটি আমরা আমাদের একাকীত্বের ব্যাখ্যায়ও ব্যবহার করতে পারি।  মূলত,মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে আমাদের পূর্বসূরিরা বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে। আজ থেকে তিন মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের আদিম প্রাইমেটরা বৃক্ষ থেকে তৃণভূমিতে নেমে এসেছিলো, আর ঠিক তখনই তাদের মধ্যে রোম্যান্টিক ভালোবাসার জন্ম হয়। এক লাখ বছর পূর্বে সর্বপ্রথম আধুনিক মানব প্রজাতি উৎপত্তি লাভ করে! এবং তারাও ছিলো শিকারী সংগ্রাহক। (২)   আমরা আধুনিক সময়ে প্রবেশ করেছি মাত্র ২০০ বছর হবে। আর তার আগে প্রায় দশ হাজার বছর আমাদের পূর্বসূরিরা কৃষিকাজ ও খেত খামারে কাজ করে কাটিয়েছে। মিলিয়ন মিলিয়ন বছর সময়ের তুলনায় এক লাখ বছর খুবই ক্ষুদ্র, আর দশ হাজার বছর সময় তো তার থেকেও আরো বহুগুণ বেশি ক্ষুদ্র, আর অন্যদিকে আমাদের আধুনিক মানব সভ্যতার বয়স সেখানে মাত্র ২০০ বছর, মিলিয়ন মিলিয়ন বছর সময়ের প্রেক্ষাপটে থেকে এই ২০০ বছর সময়কে আমরা কী একটা অতি পারমানবিক কণিকাও বলতে পারি?     

এত অল্প সময়ে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিটে বড় মাপের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, কারণ আমাদের জিনের মধ্যেই এত অল্প সময়ে কোনো ম্যাক্রোস্কোপিক মিউটেশন ঘটতে পারেনা। আর যদি ঘটেও তা হবে মানব সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত ভয়ানক কারণ আমরা একটু আগেই দেখেছি, সিংহের পা যদি আকস্মিক বড় হয়ে উঠে, কোনো একটি বড় মাপের মিউটেশন এর কারণে তবে সে বনের রাজা হওয়ার পরিবর্তে বনের সবচেয়ে দূর্বল এক প্রাণীতে পরিণত হতো, তাকে হয়তো তখন একটি এন্টিলোপও বিন্দুমাত্র ভয় করতোনা! ঠিক তেমনি মিলিয়ন মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের গড়ে উঠা ব্রেন সার্কিট তেমন পরিবর্তিত হয়নি, এক লাখ বছর পর্যন্ত মানব সভ্যতা শুধু শিকারী সংগ্রাহক মনস্তত্ব নিয়েই পৃথিবীতে সার্ভাইভ করেছিলো। ১০২০০ বছরে আমাদের মস্তিষ্কে আর কী বা এমন পরিবর্তন ঘটবে?মোটকথা, আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স অনেক কিছুই পেয়েছি কিন্তু আমাদের সেই মিলিয়ন বছর পূর্বের Ancient Brain Circuit এখনো পরিবর্তন হয়নি, কারণ এখনো আমাদের জিনে যথেষ্ট লক্ষ্যনীয় কোন মিউটেশন ঘটেনি। এ মুহূর্তে আমার মন ডুবে আছে আমার দেহের প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন সেলের ভেতর অবস্থিত আদিম অনুলিপি কারক অনু বা জিনদের প্রি-মর্ডিয়াল স্যুপে, আমার মন বাস করে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর অতীত সময়ে।(৩)  

আমাদের মস্তিষ্ক যদিও আধুনিক রোবটিক্স সভ্যতাকে পর্যবেক্ষণ করছে কিন্তু আমাদের মন এখনো জিনদের সাথে তার Ancient Evolutionary Era ‘ তে বাস করছে, আমাদের জিন এখনো আমাদের মনকে “২০২১” সালের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারেনি, আমরা এখনো মনে মনে সে প্রাচীন তৃণভূমিতেই ভ্রমণ করি, অথবা লাফিয়ে বেড়াই এক বৃক্ষ থেকে অন্য কোনো বৃক্ষে! এই যে প্রাচীন ব্রেন সার্কিটের সাথে সাম্প্রতিক সময়ের Missing link এটাও আমাদের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল একাকীত্ব তৈরি করে! কারণ আমরা আমাদের Ancient Evolutionary Genetic Mind থেকে ফিজিক্যালি সম্পূর্নভাবে Disconnected হয়ে গেছি। আজ আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য রোবট আছে, কম্পিউটার আছে। তারা প্রতিনিয়ত আমাকে বৈচিত্র্যময় তথ্য দিয়ে যাচ্ছে, হয়তো আমি আমার প্রিয় রোবটের সাথে গল্প করছি, প্রিয় কম্পিউটার গেমস ও গেইমারদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছি কিন্তু আমার নিউরন সেল এখনো অবচেতনে তিন মিলিয়ন বছর অতীতের জীবনে ঘুরে বেড়ায়, লাফিয়ে বেড়ায় গাছেগাছে যা আমাদেরকে বর্তমানের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগী হতে দেয়না । আমরা প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হলেও আমরা এখনো আমাদের প্রাচীন এপস এর মনস্তত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি আমাদের চিন্তা এদিক ওদিক লাফালাফি করে আদিম নর বানরদের মতো যার জন্য আমরা আমাদের অবচেতন মনকে “শয়তান” বলি আর এ প্রাচীন এপসকে হত্যা করার জন্য আমরা আবিষ্কার করি নতুন নতুন মেডিটেশন বা ধ্যানের পদ্ধতি। (৪)    একদিক থেকে আমরা সাম্প্রতিক সময়ের সাথে আমাদের ব্রেনকে Connect করতে পারছিনা আর সেজন্য আমাদের মধ্যে একাকীত্ব দেখা দিয়েছে আবার অন্যদিকে আমাদের মস্তিষ্ক দলবদ্ধভাবে থাকার জন্য অভিযোজিত যার ফলে আমাদের মস্তিষ্কের সেই এনসায়েন্ট সার্কিটের সীমাবদ্ধতা থেকে সৃষ্ট কৃত্রিম একাকীত্ব বারবার আমাদের ভেতর একপ্রকার মিথ্যা আতঙ্ক, ভয় ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। আর এ দুইয়ের সংকট দখল করে রেখেছে সম্পূর্ণ একুশ শতাব্দী, করোনার মতো একাকীত্বের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বিলিয়ন বিলিয়ম মানুষের মনে! (৫)  

__  অ্যাড্রোস লিহন, লেখক ও গবেষক ব্লাইন্ডওয়্যাচমেকার

দ্যা ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের একটি পরিসংখ্যান বলছে,”উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ আত্মহত্যা করছে শুধু mental disorder(মানসিক ব্যাধি ) এ  আক্রান্ত হয়ে ।”অন্যদিকে,National Institute of Mental Health বলছে , ” 8 million people die each year due to mental illness.They don’t die for mental disorder but chronic health condition, cardiovascular /pulmonary diseases. “

    জাপান ,আমেরিকা ,চীনে সংঘটিত Psychological autopsy থেকে একটি ভয়ঙ্কর সত্য উঠে এসেছে। Psychological autopsy বলছে চীনে ৪৮.০১%,জাপানে ৬৫.৩% ,আমেরিকায় ৬০% আত্মহত্যার পরিসংখ্যান Mental disorder, depression, anxiety disorder এর সাথে সম্পর্কিত। এখন প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশও কি এই তালিকায় আছে? নিঃসন্দেহে । The financial express আরো বলছে  , “বাংলাদেশে dec16,2020 এর একটি Psychological autopsy থেকে জানা যায়, যে সমস্ত আত্মহত্যার সাথে সম্পর্কিত পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে তার মধ্যে একটি বড় অংশই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে আঙুল তুলছে। এর মধ্যে ৬১% psychiatric disorder,৪৪% depression এর মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে ইঙ্গিত করছে!”বিষয়টি কি অত্যন্ত গভীর এবং ভয়াবহ নয়?  Psychological autopsy test এর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাকে যেই কথাটি খুব বেশি উৎসুক করেছে তা হলো শুধু একটি লাইনের পুনরাবৃত্তি –Lower level of social support ! তাই খুব স্পষ্টতই আমি একটি উপসংহারে আসি আর তা হলো –একাকীত্ব!        

আজকের দিনে একজন হোমো সেপিয়েন্সের কাছে কি নেই!বিলাস-ব্যশনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হাজার হাজার ফ্রেন্ড -ফলোয়ার!মনে হতেই পারে, এই তো সব আছে !কিন্তু তবুও কোথায় যেন একটি হাহাকার ! ধরুন আপনাকে একটি কামরায় অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির সাথে বাস করতে দেয়া হলো,সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হলো ফ্যারাডে কেইজ যাতে কাকপক্ষীতেও টের না পায় আপনার মস্তিষ্ক কি ভাবছে!আপনি একদিন থাকবেন এবং মন্তব্য করবেন ,oh ,it was too good!কিন্তু একমাসের মাথায় আপনার পরিবর্তন আসবেই,আর বছরের পর বছর যদি আপনি সেই কেইজেই বন্ধ হয়ে থাকেন আপনার মৃত্যু ঘটবে শুধু এবং শুধু মাত্র একাকীত্বে!     

   একজন শিকারী সংগ্রাকের কাছে একাকীত্বের বোধ ছিল মৃত্যু সমান!  আদিম শিকারী সংগ্রাহকেরা দলবদ্ধভাবে শিকার করতো এবং দলের সাথে থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ ছিল তাদের জন্য ।কারণ চারিদিকে তখনও হিংস্র জীবজন্তুর অনাকাঙ্খিত ভয় উপস্থিত ছিল। আর কোনো ক্রমে আমার আপনার এক পূর্বসূরী যদি দলছাড়া হতো তাদের শেষ পরিণতি হতো চরম! আগুন আবিষ্কারের পর থেকে আমাদের বিবর্তনীয় পরিবর্তন ছিল চোখে পড়ার মতো । কিন্তু, জীববিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মের বিরুদ্ধের এই বিবর্তনে আমরা শুধু আমাদের দেহটাকেই টেনে নিয়ে এসেছি আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতে । কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে আমরা এখনো মনে প্রাণে পড়ে আছি সেই শিকারী সংগ্রাক জীবনে!  আমাদের DNA ,Gene এই বংশগতীয় বস্তু গুলো হোমো সেপিয়েন্সের দ্রুত গতির বিবর্তনকে ধরতে পারেনি।     

আমাদের দেহ -ট্রেন তার শিকারী সংগ্রাহক জীবনের স্টেশন ছেড়েছে আজ থেকে প্রায় ৭০০০০ বছর আগে,কিন্তু একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী তার ধীরগতির কারণে সেই ট্রেনের নাগাল পায়নি।কিন্তু সেই যাত্রীর কাছেই ছিল ট্রেনের কলকব্জার চাবিকাঠি। তাই আজ আমরা যখন ভাবছি এই তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কত বন্ধু, সারাদিন এক্টিভ থেকে কথা তো হচ্ছেই,কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা হয় না। কারণ আমাদের আদি শিকারী সংগ্রাহক পূর্বসূরীরা Physical attachment এ বিশ্বাসী ছিল । তারা দলবদ্ধভাবে বাস করতো ,দলবদ্ধভাবেই শিকার করতো এবং দলবদ্ধভাবেই সম্পন্ন করতো সেই শিকারকৃত জন্তুর ভোজ। তাদের জীবনটি ছিল একটি সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান । বেঁচে থাকার জন্য যে প্রতিষ্ঠানের ওপর তারা ছিল ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল!  

  Young Woman, Girl, Umbrella, Rain, Out, In The Free     Psychology today তে এই একই কথা তুলে ধরা হয়েছে ।তারা বলছে ,” We are going through times of profound social change,and the Internet and other new social technologies are huge drivers of this epidemic, allowing us to remain in touch with others without actually having to connect with them.” একাকীত্বকেই এখানে Epidemic বলা হচ্ছে! বিষয়টি আসলেই এতোটা গভীর! আমরা এই রোবটিক্স সিভিলাইজেশনে মানসিকভাবে যুক্ত থাকা কে নিশ্চিত করতে পারছি কিন্তু আমাদের জেনেটিক্স সেটা চাইছে না । যার ফলে physical attachment এবং psychological attachment এ রয়ে যাচ্ছে একটি missing link! এই ভারসাম্যহীনতা উদ্রেক ঘটাচ্ছে একাকীত্বের । The University of Chicago এর কগনিটিভ ও সোশ্যাল নিউরোসায়েন্টিস্ট John Cacioppo একাকীত্বের এই বিবর্তনীয় ব্যাখ্যাটিকে চার নাম্বারে স্থান দিয়েছেন। তিনি আরো বলছেন, একাকীত্বের অনুভূতি আমাদের শারীরিক যন্ত্রণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।যখন আমরা ব্যথা পাই তখন যেমন মস্তিষ্ক সিগন্যাল দিয়ে বলে বিশ্রাম নিতে,  তেমনি যখন আমরা একাকী বোধ করি তখনও সে বলে ,যাও বন্ধুত্ব খোঁজ!  

আরো ভালো করে বলতে গেলে বলা যায়,একাকীত্ব একটি সিগন্যাল  যেটি আমাদের মধ্যে আত্মসচেতনতা তৈরি করে,এ সিগন্যালের মাধ্যমে জানানো হয় যে ,তুমি একা,তোমার সঙ্গী প্রয়োজন। তাই এখানে একাকীত্বকে ফিজিক্যাল পেইনের সাথে তুলনা করা হচ্ছে । যখন শীতল বাতাস প্রবাহিত হয় তখন আমাদের শরীরে এক ধরণের শিহরণ বা ব্যথা অনুভূত হয়,আর এই ব্যথা  আমাদেরকে বলে তুমি এখান থেকে পালাও ,নয়তো তোমার শরীরে সমস্যার সৃষ্টি হবে। তখন আমরা জ্যাকেট পরে শরীরকে বাঁচাই। ঠিক তেমনি একাকীত্ব আমাদের মাঝে ব্যথা তৈরি করে যেনো আমরা বন্ধু বা যৌনসঙ্গী অনুসন্ধান করি!

   Sex and Loneliness | noizeology    ডোপামিনার্জিক ও সেরোটোনার্জিক নিউরনের কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে,যা কি না আমাদের আবেগীয় সুস্থতার মূল চাবি! THE conversation  এ  প্রকাশিত The Neuroscience of Loneliness শীর্ষক আর্টিকেলে গবেষক ম্যাথিউস ও তার সহকারীরা এমনটি বলছেন। তারা বলছেন ব্রেইনের Dorsal raphe  nucleus এর Dopeminergic neurons একাকীত্বের বোধে উদ্দীপ্ত হয় এবং নির্দেশনা দেয় আবারো social interaction এ ফিরে যেতে। আর সেই কারণেই বর্তমানে আমরা সিনেমা হল ,অলিম্পিক গেইম,ফুটবল ক্রিকেটের মতো গেইমের সারা বিশ্বব্যাপী একটি বিস্তার দেখতে পাই! আদিম শিকারী সংগ্রাকদের সেই দলবদ্ধ থাকার মনস্তত্ব আজ পরিলক্ষিত হয় স্টেডিয়ামে কিংবা সিনেমা হলে! (৬)
     Structural Brain Correlates of Loneliness among Older Adults | Scientific Reports    Left: Brain regions showing a negative association (red clusters) between loneliness and gray matter volume (p < 0.001; corrected for multiple comparisons; cluster extent threshold k > 97). Upper right panel: Correlation between the individual GM volumes in the first cluster and loneliness score. Lower right panel: Correlation between the individual GM volumes in the second cluster and loneliness score (p < 0.05; all scores are residualized for covariates).   Loneliness is bad for your health নামে MSUTODAY এর এপ্রিল ২০১৮ এর একটি প্রতিবেদন বলছে , আদিম শিকারী সংগ্রাহক মানুষ যখন শিকার করতে গিয়ে তার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো তখন তার মধ্যে uncontrolled stress কাজ করতো ।যার ফলে ব্রেইনে cortisol hormone এর নিঃসরণ বেড়ে যেত। Cortisol শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়ে  infection এর সম্ভাব্যতা বাড়িয়ে তোলে। এমনকি এটি ব্রেইনের নিউরন সেলগুলোকে কম কার্যক্ষম করে তুলতে পারে,আরো স্পষ্ট করে, এই হরমোন Neurons cell এর মৃত্যুর জন্যও দায়ী হতে পারে! সেই সাথে এটি সম্পৃক্ত থাকতে পারে cardiovascular disease, stroke এবং hypertension এর সাথে যা কি না depression এ রূপ নিতে পারে ।উল্লেখ্য একাকীত্ব আর বিষণ্ণতা (depression )একই নয়।বিষন্নতা একাকীত্বের ফলাফল !  (৭) এই আর্টিকেলটি আরো বলছে,“Loneliness and social icolation are also associated with increased blood pressure, higher cholesterol levels,depression and ,if that weren’t bad enough,decreases in cognitive abilities and Alzheimer’s disease.In 2015,the results from several hundred thousand people showed that social isolation resulted in a 50 percent increase in premature death.”      

পুরুষ কি নারীর থেকে বেশি একাকী বোধ করে?

প্লোস ওয়ান জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিলো যেখানে বলা হয় পুরুষরা নারীদের থেকে বেশি একাকীত্ব বোধ করে কিন্ত কেনো? কেনো দলবদ্ধভাবে থাকার জন্য পুরুষ ফুটবল, ক্রিকেট অথবা অলিম্পিকের জন্ম দিলো? কেনো জন্ম হয় পুরুষদের কেন্দ্র করে বিভিন্ন ক্লাব?কম্পিউটার থেকে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে ফেললে যেমন হয়,  বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও পুরুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

 আদিম শিকারী সংগ্রাক জীবনব্যবস্থায় পুরুষরা দল বেঁধে শিকারে যেতো। তাদের সমাজব্যবস্থায় দলবদ্ধতা ছিল সমাজকাঠামোর মূল ভিত্তি ।আর নারীরা সন্তান লালন পালনে ,সর্বোপরি সামাজিক দায়িত্ব পালন করত। যেহেতু আমাদের মস্তিষ্ক এবং জিন এখনো নিজেকে এই সিভিলাইজেশনের অংশ ভাবতে শেখেনি তাই এখনো সামাজিক মাধ্যমে এতো এতো বন্ধু থাকা সত্ত্বেও Dopeminergic neuron triggered হয় আসল বন্ধুত্ব কিংবা physical interaction খুঁজে বের করার জন্য । আর যার কারণে পুরুষরা তাদের বন্ধুত্ব খুঁজতে যায় ক্লাবে ,পাবে(pub) , সিনেমা হলে কিংবা খেলার ময়দানে এক ঝাঁক বন্ধু বান্ধব নিয়ে দলবেঁধে খেলা দেখার মাধ্যমে। 3 surprising truths about gender and loneliness নামক প্রতিবেদনে Psychology Today বলছে,    

যখন ছেলেরা একাকী বোধ করে ,তখন তারা casual friends এর একটি দল খোঁজে যেখানে নারীরা শুধুই one -to -one communication এর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী ।পুরুষরা তাদের দলে অনেক বেশি বন্ধু আশা করে কিংবা “অনেক মানুষের ঘনত্ব বিশিষ্ট একটি দল” তাদের পছন্দ।আর অন্যদিকে দেখা যায় ,নারীরা তাদের একটি relationship এ বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকে। (৮)

 এখন এই বিষয়টিকেও দেখতে হবে বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। নারীরা যদি তাদের একটি Relationship এ বেশি মনোযোগ না দিত তাহলে শিকারী সংগ্রাহ জীবনে তার অনাগত সন্তানের নিরাপত্তা সংকট দেখা দিত। কারণ যে পুরুষের সাথে সে sexual intercourse এ যেত বা যার সন্তান বহন করত তার প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ না দিলে সেই পুরুষটি তার সন্তানকে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করতো। যেহেতু পুরুষরা বায়োলজিক্যালি বহুগামী,তাই সেই নারীটি যদি  তার প্রতি মনোযোগী না হতো তাহলে পুরুষটির অন্য নারীর কাছে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আবার অন্য আরেক দিক থেকে দেখতে গেলে ,নারীরা খুব সাবধানতার সাথে বিশ্বাসে জড়াত,কারণ যদি এমন কোন পুরুষ তাদের সাথে প্রণয়ে আবদ্ধ হয়ে এবং তার সাথে যৌন সম্পর্কে সংযুক্ত হওয়ার পর তার অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার কথা না ভেবে অন্য কোনো নারীর কাছে চলে যেত তাহলে  জন্ম নেয়া সন্তানটি সেই বন্য প্রতিকূল পরিবেশে অসহায় হয়ে পড়তে পারত। কারণ নারীরা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দিত এবং সেই সন্তানের শরীর ছিল খুবই নাজুক! তাই বলা যায়,” For man ,it seems to be more about quantity. For woman it’s more about quality. “(Psychology today)    

আর আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে হয়তো বৈবাহিক সম্পর্ক নিজে থেকেই স্ত্রী -পুরুষের তাদের সন্তানের প্রতি দায়িত্বকে সমাজব্যবস্থায় চিহ্নিত করে দিয়েছে। কিন্তু এখনো নারীর সেই আচরণে পরিবর্তন ঘটেনি।তারা এখন যে কোন পর্যায়ের বন্ধু নির্বাচনে বেশি মনোযোগ দেয়। তাই তাদের বন্ধু-দলটিও অধিক ঘনত্বপূর্ণ থাকে না।

 আর অন্য দিকে পুরুষের সেই শিকারী জীবনের দলবদ্ধতার উপর নির্ভরশীলতা এখনো কমেনি বরং রয়ে গেছে একদম অপরিবর্তিত হিসেবে!  কিন্তু! ….হ্যাঁ ,এতো তথ্য প্রমাণের পরও একটি কিন্তুর সম্ভাবনা দেখিয়েছে Psychology Today! তবে বিষয়টির একটি অন্য রকম তাৎপর্য রয়েছে। তারা বলছে,  নারীরা পুরুষের থেকে বেশি একাকীত্ব বোধ করে । কিন্তু একি সাথে তারা এটাও বলছে যে ,নারীরা তাদের আবেগ অনুভূতি বেশি প্রকাশ করে,  যেখানে পুরুষদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা নেই বললেই চলে। University of Waterloo এর Shelly Borys একটি  স্টাডিতে বলছে ,”Woman may not necessarily be the lonelier gender ,they may simply be more comfortable admitting vulnerability. “তিনি আরো বলেছেন নারীরা তাদের একাকীত্বের কথা খুব সহজেই স্বীকার করতে পারে যেখানে পুরুষরা এটি প্রকাশ করাকে একটি দুর্বল অনুভূতি বা weak feelings হিসেবে চিহ্নিত করে।তারা একে পৌরুষের অন্তরক মনে করে! ( একাকীত্বের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা )           

লিখেছেন- মহাশ্বেতা চৌধুরী, হলি ক্রস কলেজ, একাদশ, বিজ্ঞান,  গবেষক ও শিক্ষার্থী হ্যালিক্স ইউনিভার্সিটি, ব্লাইন্ডওয়াচমেকার।

তথ্যসুত্রঃ

১-৫) লিহন, মেটা এনালায়সিস অব দি লোনলিনেস

৬) The Neuroscience of Loneliness, THE conversation 

৭) Loneliness is bad for your health , MSUTODAY

৮) 3 surprising truths about gender and loneliness, Psychology Today

hsbd bg