কার্ল জাং ও সমষ্টিগত অচেতনতা

সমষ্টিগত অচেতনতাকে বোঝা

Understanding the Collective Unconscious

কালেক্টিভ আনকনশাস বলতে সাইকোলজিতে একটি ব্যাপার আছে। এটাকে মাঝেমাঝে “অবজেক্টিভ সাইকি” বলা হয়। এ ধারণাটির জনক কার্ল জাং। তার এ ধারণা মতে আমাদের মধ্যে অচেতনে যে বিষয়গুলো কাজ করে সেগুলো আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা গঠিত নয়। তিনি মনে করতেন যে, আমাদের সকল আনকনশাস প্রোপার্টি জেনেটিক্যালি আমাদের মধ্যে ইনহেরিটেড! তার মতে, আমাদের গভীর বিশ্বাস, সহযাত প্রবৃত্তি, স্প্রিচুয়ালিটি, সেক্সুয়াল আচরণ এবং জীবন ও মৃত্যু এগুলো সমগ্র মানব সভ্যতার মধ্যেই Common! অতএব এসব কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফল হতে পারেনা! যাহোক, আমরা ধাপে ধাপে দেখবো যে কার্ল জাং আসলে বিজ্ঞান মহলে কতটুকু গ্রহণযোগ্য!


কার্ল জাং কে?

( Who Is Carl Jung?)

এ ব্যক্তি ১৮৭৫ সালে সুইজারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার একটি স্কুল আছে যেটি এনালিক্টিক্যাল সাইকোলজির উপর। কালেক্টিভ আনকনসাস নামক ধারণাটির প্রস্তাব করার জন্য তিনি অভিযুক্ত। তিনি কালেক্টিভ আনকনশাস ও আর্কিওটাইপ নামক ধারণাটি প্রস্তাব করেন। ইন্ট্রোভার্ট ও এক্সট্রভার্ট ব্যক্তিত্বসহ। জাং বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমান্ড ফ্রয়েডের সাথেও কাজ করেছেন। জাং এর কর্ম ফ্রয়েডের অনেক ধারণা নিশ্চিত করে। সময়ের সাথেসাথে তারা তাদের মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত মতবাদে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জাং ফ্রয়েডের সাইকো-এনালিক্টিক প্রিন্সিপালের সাথে কনটেস্ট করে!

“তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিরাট পার্থক্যটি ছিলো ফ্রয়েড মনে করতেন   অচেতন মন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সমগ্র” । অন্যদিকে জাং এর মতে, এগুলো ইনহেরিট হয়েছে মানব সভ্যতার অতীতের সামগ্রিক এক্সপেরিয়েন্স থেকে। ”




জাং এর কালেক্টিভ আনকনশাস থিওরি ( Jung’s Theory of the Collection Unconscious)


জাং বিশ্বাস করতেন, কালেক্টিভ আনকনশাস তৈরি হয়, সে সকল জ্ঞান ও কল্পনা দ্বারা সেগুলো মানুষ জন্মের সময় তাদের সাথে নিয়ে আসে। সকল মানুষ একে অপরের সাথে তাদের এনসেস্ট্রাল অভিজ্ঞতা শেয়ার করে। যদিও মানুষ জানেনা যে তাদের কালেক্টিভ আনকনশাসে কোন ধরণের ছবি ও চিন্তা কাজ করে, তবে তার মতে সংকটের সময় একজন মানুষ সামগ্রিক অচেতনতায় চাপ দিতে পারে! ব্যাপারটা হলো যদিও  আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে,  আপনার অচেতন মন এম্পটি, সেটা দুর্বোধ্য, অজ্ঞান কিন্তু যখন আপনি কোন বিপদে পড়েন তখন আপনার অজান্তেই আপনার অচেতন মন জেগে উঠে ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে ঠিক যেনো সে পূর্ব থেকেই এ বিপদের কথা জান তো!


সহযাত প্রবৃত্তি ও আর্কিওটাইপ (Instincts and Archetypes)

জাং বিশ্বাস করেন, সামগ্রিক অচেতনতা একটি বিশ্বজনীন কনসেপ্ট প্রকাশ করে যেটিকে বলা হয় আর্কিওটাইপ। আর্কিওটাইপ হতে পারে, চিহ্ন, প্রতিক অথবা থট প্যাটার্ন এবং আচরণ যা আমরা পূর্বসূরি থেকে পাই। জাং এর মতে, মাইথোলজিক্যাল ইমেজ অথবা কালচারাল সিম্বল স্থির নয়। তার মতে,  বিভিন্ন রকমের আর্কিওটাইপ সম্ভবত একে অন্যের সাথে ওভারল্যাপ বা সমন্বিত হয়। আর্কিওটাইপের মধ্যে আছে-

১. জন্ম
২. মৃত্যু
৩. ক্ষমতা
৪. পূনর্জন্ম
৫. এনিমা
৬. চিল্ড্রেন
৭. হিরো
৮. শিশু
৯. মা

জাং মনে করেন, মাদার আর্কিওটাইপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আর্কিওটাইপ আক্ষরিক মা হবে তা নয়, যেমন আক্ষরিক অর্থে যাদেরকে আমরা মা বলে জানি, গ্র্যান্ড মাদার,স্টেপ মাদার, মাদার-ইন-ল অথবা নার্স এর মতো শারীরিক মা না হয়ে সেটা হতে পারে-

১. বাগান
২. একটি লাঙ্গল ক্ষেত
৩. একটি ঝর্ণা বা কুয়া
৪. দেশ
৫. গীর্জা
৬. পৃথিবী
৭. ঈশ্বরের মা
৮. সমূদ্র
৯. কাঠ

অদ্ভুত শোনাচ্ছে? তাই না! আমার কাছেও খুবই অদ্ভুত লাগছে। Very Well mind নামক একটি ওয়েবসাইটের Understanding of the collective Unconscious Mind নামক একটি আর্টিকেলে লিসা ফ্রিটশে,  জাং এর ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আর্কিটাইপের এ ধারণাগুলো নিয়ে এসেছেন।


জটিল বিশ্বাস ( Complex Believe )

স্প্রিচুয়ালিটি ও ধর্মের গভীর কিছু বিশ্বাস কালেক্টিভ আনকনশাসের ধারণা দিয়ে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জাং এর মতে, বিশ্বব্যাপী ধর্মগুলোর অভ্যন্তরে আমরা যে একটা সমতা দেখি  সেটা আমাদের অচেতন মনের ভেতরের ইউনিভার্সালিটিকে ইঙ্গিত করে।  যদি আমাদের অচেতন মনের গভীরে মিল না থাকতো তবে প্রতিটি ধর্মের ভেতর আমরা যে আভ্যন্তরীণ সমতা বা ইউনিটি দেখি সেটা দেখা সম্ভব ছিলো না!


পোবিহা ( Phobias)


জাং তার এ তত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন কিভাবে কালেক্টিভ আনকনশাসনেস সামাজিক পোবিহা ও আতঙ্ক এক্সপ্লেইন করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় যে কোনো প্রকার সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া আমরা ভয় পাই। আমরা অন্ধকার, লাউড সাউন্ড, ব্রিজ অথবা রক্ত দেখে ভয় পাই। এগুলো সম্ভবত আমাদের কালেক্টিভ অচেতনতায় বদ্ধমূল থাকে। যেটাকে প্রস্তাব করা হয়েছে জেনেটিক্যাল ট্রেইট হিসেবে যা আমাদের পূর্বসূরি থেকে আমাদের মাঝে ইনহেরিট হয়েছে! যেমন- একটি গবেষণায় দেখা গেছে ব্রিটিশদের ১/৩ অংশ শিশু সাপ দেখলে ভয় পায়। যদিও ব্রিটিশদের সাপের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। শিশুরা কখনো সাপের কারণে ট্রামাটিক সিচুয়েশনের মুখোমুখি না হওয়া সত্ত্বেও তারা সাপ দেখলে খুবই ভয় পায়!

স্বপ্ন ( Dream)

 

কালেক্টিভ আনকনশাস থিওরিতে, স্বপ্নকে Key insight হিসেবে দেখা হয়। জাং বিশ্বাস করেন, যেহেতু আর্কিওটাইপ প্রতিনিধিত্ব করে, অতএব স্বপ্নের একটি স্পেসিফিক সিম্বল সবার জন্য ইউনিভার্সাল। অন্যকথায়, একই সিম্বল ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে একই কথা বলে!
যাহোক, সমসাময়িক ফ্রয়েড থেকে তার দৃষ্টিকোণ ভিন্ন ছিলো। জাং বিশ্বাস করতেন, স্বপ্ন অনেক উচ্চমাত্রিক ভাবে ব্যক্তিগত। স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে হলে একজন ব্যাক্তি ড্রিমারের ভেতর গভীরভাবে সাক্ষাৎ করতে হবে। অন্যদিকে ফ্রয়েড সম্পূর্ণ আলাদা, তার পরামর্শ হলো, এক একটি স্পেসিফিক সিম্বল এক একটি অচেতন চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। জাং বিশ্বাস করেন, স্বপ্ন একজন সাইকির মনস্তত্বের একটি অংশের ক্ষতিপূরণ করে যা সে জাগ্রত অবস্থায় করতে পারেনা। এটি অনুমোদন দেয়, স্বপ্নকে রোগ নির্ণয় ও গবেষণার ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে দেখতে।


এ তত্ত্বটি কী বৈজ্ঞানিক (Is It a Scientific Theory?)

 

ঐতিহাসিকভাবে বিতর্ক রয়েছে যে কালেক্টিভ আনকনশাস মনের কোনো প্রতিকী ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে কি না। বিজ্ঞানীদের বৃত্তের ভেতর, কালেক্টিভ আনকনশাসের আক্ষরিক ব্যাখ্যাকে অপবিজ্ঞান মনে করা হয়! কারণ এটা প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে মাইথোলজি ইমেজ ও কালচারাল সিম্বল জন্মের সময় উপস্থিত থাকে। এটা ছাড়া, কালেক্টিভ আনকনশাসনেসের প্রতিকী ব্যাখ্যার কিছু সায়েন্টিফিক গ্রাউন্ড আছে কারণ এ তত্ব বলে যে,  সকল মানুষ নির্দিষ্ট আচরণ শেয়ার করে।


কালেক্টিভ আনকনশাসনেসে ব্যাক্টেরিয়ার ভূমিকা(

The Role of Bacteria in the Collective Unconscious)

কালেক্টিভ আনকনশাসনেসকে বর্তমানে কিছুটা ভিন্ন ভাবে দেখা হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা এখন কালেক্টিভ আনকনশাস তৈরিতে ব্যাক্টেরিয়ার ভূমিকার কথা বিবেচনায় নিয়েছেন। অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়ার জিনগুলো অনেক সময় মানব জিনকে ছাড়িয়ে যায় এবং এই ব্যাক্টেরিয়াগুলো নিউরোঅ্যাকটিভ যোগ তৈরি করতে পারে। এটি এখন চিন্তা করা হচ্ছে যে, নিউরোঅ্যাকটিভ যোগ সম্ভবত কালেক্টিভ আনকনশাস তৈরি করে ও মানবীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। যদি এটি সত্য হয়ে থাকে তবে অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়ার উপর গবেষণাই একদিন সাইকিয়াট্রিক গবেষণার সবচেয়ে বড় অংশ হবে!






Psychobiotics and the Manipulation of Bacteria–Gut–Brain Signals: Trends in Neurosciences



তথ্যসুত্র-
hsbd bg
%d bloggers like this: