মূলপাতা দর্শন আউটগ্রোয়িং গড

আউটগ্রোয়িং গড

লিখেছেন অ্যান্ড্রোস লিহন
783 বার পঠিত হয়েছে

আউটগ্রোয়িং গড;  ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিশ্বাসের কী ডারউইনীয় ব্যাখ্যা আছে?

একুশ শতকের পূর্বে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ঈশ্বরের ধারণায় বিশ্বাস করতেন।  ইউরোপে ঈশ্বর এখন মৃত, সেখানে কেবল সংখ্যালঘিষ্ঠ একটি সংখ্যা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে অসুস্থ্য আছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীজুড়ে অধিকাংশ মানুষ এখনো ঈশ্বর বা কোনো দেব-দেবীর অস্তিত্বের  ভার বহন করছেন। ডারউইনের  প্রাকৃতিক  নির্বাচন ডায়নোসরের উপস্থিতিতে যেমন  মামেলদের অন্ধকারের শিকারীতে পরিণত করে ,দিনের পাখিদের রাজত্ব দিয়ে বাদুড়ের অন্ধত্বকে  ব্যাখ্যা করতে পারে , ঠিক সেভাবে কী এ তত্বটির পক্ষে সম্ভব মানুষের মস্তিষ্কের ঈশ্বর বিশ্বাসকে (অন্ধত্বকে) ব্যাখ্যা করা? দেব-দেবী অথবা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস কী আমাদের পূর্বসূরিদের জিনটিকে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে কোনো সহযোগিতা করেছে? আমরা জানি যে, লাখ লাখ বছর ধরে আমাদের পূর্বসুরিরা বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে শিকারি সংগ্রাহক হিসেবে।   আজকের পৃথিবীর  মানুষে মানুষে  গতির দৃষ্টিতে কোনো দূরত্ব নেই, ইন্টারনেট সমস্ত পৃথিবীকে ইলেকট্রন থেকেও ছোট করে ফেলেছে, পৃথিবীর মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব এখন প্রযুক্তি ও বুদ্ধিতে। পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আপনি ফেসবুকের  মার্ক জাকারবার্গ অথবা গুগলের Sundar Pichai এর মস্তিষ্কের চিন্তা বুঝতে পারবেন না! মিসাইল নিক্ষেপ করে আপনি মাইক্রোসফটের CEO  সত্য নাদেলার 2030  সালের পরিকল্পনা ধরতে পারবেন না, ক্ষেপনাস্ত্র  অথবা সামরিক শক্তিতে কোনো রাষ্ট্রের সীমানা সুসজ্জিত থাকলেই তো আর সে দেশের মানুষ  E=MC2 বুঝবে এমন নয়! আমাদের পূর্বসুরিরা সবসময় যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, কারণ জঙ্গলের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য তাদেরকে সবসময় তাদের চারপাশের পরিবেশের প্রতি আগ্রাসী থাকতে হতো, যারা যতবেশি হিংস্র ও যুদ্ধবাজ ছিল   তারাই শিকারি প্রাণীর ছোবল থেকে নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করতে সক্ষম ছিল ,আর এভাবেই তাদের জিন নিজেদেরকে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে পারতো ।  আমাদের পূর্বপুরুষরা লাখ লাখ বছর ধরে বস্তুভিত্তিক অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বসবাস করেছিল , তাদের চিন্তাভাবনা ছিল ম্যাটারিয়ালিস্টিক। বুদ্ধিভিত্তিক অর্থনীতির কথা তারা চিন্তাই করতে পারতোনা! প্রযুক্তির বিকাশের সাথে আজ আমরা বুদ্ধিভিত্তিক পৃথিবী গড়ে তুললেও আমাদের মন মানসিকতা এখনো লাখ লাখ বছর পূর্বের শিকারী সংগ্রাহক মনস্তত্ব থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে আসতে পারেনি।   আমাদের মধ্যে এখনো সে আগ্রাসী মনোভাব রয়ে গেছে, সন্ত্রাসবাদ বা টেরোরিজমকে (Terrorism) আমরা লাখ লাখ বছর পূর্বে গড়ে ওঠা সে যুদ্ধবাজ জঙ্গী মানসিকতার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারি।ইসরায়েল পারমাণবিক বোমা তৈরি করলে , ইরানেও পরমাণবিক বোমা তৈরি হয়, আমাদের যুদ্ধবাজ মস্তিষ্ক নিজেদের শক্তিশালী করার জন্য এবং অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে, কিন্তু  বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো এখন প্রায় অনেক  দেশে পারমাণবিক বোমা আছে,  কিন্তু কোনো যুদ্ধ নেই। মস্কো প্রতি বছর তাদের মিসাইল প্রদর্শন করে কিন্তু নিক্ষেপ করে না!যখন প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের কাছেই পরমাণবিক বোমা থাকে, তখন সবার ক্ষমতার মাত্রাই হয় সমান, আর তাই প্রাকৃতিকভাবেই যুদ্ধ থেমে গিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, অসভ্য ও জংলি স্বভাবের এ প্রিমেটিভ মেন্টালিটির মানুষগুলো অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে বুদ্ধির তীর্থ যাত্রা শুরু করে।  বর্তমানে  আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশ্ব গড়ে তুলেছি, আমাদের পৃথিবী ম্যাটারিয়াল নির্ভর নয়, এটি গুগল অথবা মাইক্রোসফটের CEO এর মস্তিষ্কের জ্ঞান ও এলগোরিদমের উচ্চতর যুক্তি নির্ভর। আমাদের লাখ লাখ বছর ধরে গড়ে উঠা ম্যাটারিয়ালিস্টিক মাইন্ড এখনো এ বুদ্ধিভিত্তিক সমাজের সাথে নিজেকে পুরোপুরিভাবে সমবন্বয় করে নিতে পারেনি, উদাহরণস্বরুপ; আমরা মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলতে পারি, তারা ম্যাটারিয়ালিস্টিক, তারা এখনো শরীর হিসেবে বাস করে, বুদ্ধির জগতে তারা এখনো প্রবেশ করতে পারেনি। আমাদের আদিম নর বানররা যে জংলী জীবনের মনস্তত্বে বাস করতো, এখনো তারা সে সময়ের কাছাকাছি, বাংলাদেশও তাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়! শক্তি, ক্ষমতা ও বস্তগত সম্পদ যে একদিন জ্ঞানের কাছে অসহায় হয়ে উঠবে,  সেটা হয়তো আদিম নর বানররা কোনোভাবে কল্পনাও করতে পারেনি!আমরা এখনো তেলাপোকা দেখলে ভয় পাই , যদিও আমরা এটা খুব ভালোভাবেই জানি তেলোপোকা কোনদিন কোনো মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিলনা।   বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, প্রতি বছর ১.৩৫ মিলিয়ন মানুষ গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায় কিন্তু তেলোপোকার জন্য কোনো মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে কোনো সংবাদ মাধ্যম কখনো জানায়নি! প্রশ্ন হলো, কেনো আমরা পোকামাকড় দেখলে ভয় পাই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের ডিএনএর গভীরে। মূলত লাখ লাখ বছর ধরে আমাদের পূর্বসুরিরা বিভিন্ন ভয়ানক ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া ও কীট-পতঙ্গের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাই আমাদের ডিএনএ তে এখনো সে স্মৃতি সংকেত হিসেবে রয়ে গেছে। বাস, ট্রাক, হেলিকপ্টার এবং কৃত্রিম উপগ্রহ দেখলে আমরা ভয় পাইনা, কারণ এসব  আমাদের মৃত্যু ঝুঁকি সৃষ্টি করলেও  আমাদের জিন এখনো এসব তথ্যকে তার জেনেটিক্যাল ভাষায় ট্রান্সলেশন করতে পারেনি, আমাদের ডিএনএ এখনো তার লাখ লাখ বছর পূর্বে গড়ে উঠা বিবর্তনীয় মনেই পড়ে আছে, তার কাছে আমাদের আধুনিক রোবটিক সভ্যতার কোনো সংবাদ নেই!সেলফ রেফ্লিকেটর কম্পিউটার পোগ্রাম তৈরি করে, এসব ভাইরাসের মাধ্যমে শত শত কম্পিউটার সংক্রমিত করার পেছনে জিনগত কোনো উপযোগিতা নেই। আমার কম্পিউটার নষ্ট হয়ে গেলে প্রোগ্রামারের ডিএনএর কি আসে যায়? অথচ সাইবার জগতে হ্যাকিং অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা, কোনোপ্রকার যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আমরা বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক আইডি হ্যাক করি, অন্যের ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক আইডি নষ্ট করে দিতে আমাদের ভালোলাগে! আমরা আনন্দের সাথেই সাম্প্রতিক এসব কাজ অহরহ করছি। মূলত, আমরা অন্যের আইডি, ওয়েভসাইট হ্যাক করলে আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরেটোনিন তৈরি হয়, যা আমাদের আনন্দ দেয়! কিন্তু কোনোপ্রকার জিনগত উপযোগ না থাকা সত্ত্বেও কেনো আমরা সাইবারস্পেসে এসব ধবংসাত্মক কর্মকান্ড চালাই, জিনগত ভিত্তি ছাড়াই আমরা অনর্থক সেরেটোনিন তৈরি করে মস্তিষ্কের সাথে খেলতে পছন্দ করি? কারো ফেসবুক গ্রুপের বিপক্ষে বিরুপ মানসিকতা গড়ে তোলার পেছনে আমাদের বিবর্তনীয় উপযোগ কী? উপযোগ নেই।   কিন্তু আমাদের সে আদিম জংলি যুদ্ধবাজ মানসিকতার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে এখনো,  (তেলোপাকোর উপস্থিতিতে ভয় পাওয়ার মতোই ) ওয়েবসাইট হ্যাকিং এ আনন্দ পাওয়ার ওয়াইল্ড মেন্টালিটিটিও (Wild Mentality) টিকে আছে!কৃষি বিপ্লবের ১০০০০ বছর পর আমরা আধুনিক যুগে প্রবেশ করি, এ সময়কাল মাত্র ২০০ বছর, এতো অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের জিন এখনো সাম্প্রতিক পৃথিবীর সাথে নিজেকে অভিযোজন করতে পারেনি, আজ থেকে ৭০ হাজার বছর পূর্বেও আমরা তৃণভূমিতে চরে বেড়িয়েছি, আমাদের ডিএনএ’তে এখনো জেনেটিক স্তরে সে স্মৃতিগুলো সক্রিয় হয়ে আছে , আমাদের ডিএনএ এখনো বর্তমান পৃথিবী সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেনা! আর এ জন্য আমরা কম্পিউটার গেম, ব্লগিং, ফেসবুকিং, ইউটিউব অথবা বিজ্ঞানচর্চা কোনোকিছুর মধ্যেই শান্তি পাচ্ছিনা, আমাদের একা লাগে, প্রচন্ড ডিপ্রেসন কাজ করে।  কারণ আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র লাখ লাখ বছর পূর্বে গড়ে ওঠা, আমরা প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হলেও ভেতরের দিক থেকে এখনো প্রিমেটিভ রয়ে গেছি। ৭০ হাজার বছর পূর্বের তৃণভূমিতে চরে বেড়ানো একজন অতি সাধারণ  শিকারী সংগ্রাহকের সাথে আমাদের মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক কোনো পার্থক্য নেই, এতো অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের HAR1 অথবা FOX2 জিনের ভেতর কোনো মিউটেশনই ঘটেনি, আমাদের পূর্বসূরিদের সাথে আমাদের মনোগত কোনো পার্থক্য নেই, আমরা তথ্যপ্রযুক্তিতে জাদুকরী উন্নতি সাধন করলেও, মস্তিষ্কের দিক থেকে এখনো পর্যন্ত আমাদের মাঝে কোনো পরিবর্তনই তৈরি করতে পারিনি, তৈরি করতে পারিনি সিঙ্গুলারিটি !আমাদের মস্তিষ্কে ঈশ্বরের ধারণাটি গড়ে উঠার পেছনেও জিনের ভূমিকা আছে বলে রিচার্ড ডকিন্স মনে করেন। তার সাম্প্রতিক প্রকাশিত গ্রন্থ Outgrowing God এ তিনি ঈশ্বর ও দেব-দেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাসের পেছনের জিনগতভিত্তি নিয়ে খুব চমৎকারভাবে আলোচনা করেছেন।   ভয়ের বিবর্তন ঘটেছে শিকারি প্রাণীদের উপস্থিতিকে টের পেয়ে তাদের দৃষ্টিসীমা থেকে অতিদ্রুত পালানোর জন্য। জিরাফ এবং এন্টিলোপের মতো প্রাণীরা মাংসাশী নয়, তাই এদের সারাদিনই ঘাস খেতে হয় , নয়তো শরীর পর্যাপ্ত শক্তি পায়না।  আর এদিকে তাদেরকে এ কাজটি করতে গিয়ে সবসময় সিংহ ও বাঘের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে হয়। কিন্তু জিনেটিক্যাল কারণেই ( যেহেতু তারা মাংসাশী নয় )  তাদের পক্ষে তৃণভূমি ছেড়ে আসা সম্ভব নয়, তারা যদি তৃণভূমি ছেড়ে আসে তবে তারা শক্তিহীনতায় মৃত্যুবরণ করবে, আর অন্যদিকে  তৃণভূমিতে বিচরণ করলে , যে কোনো সময় তারা শিকারী প্রাণীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারাবে। উভয়  ক্ষেত্রেই মৃত্যু ছাড়া তাদের জন্য স্বর্গের কোনো দরজা খোলা নেই। এদিকে জিনের উদ্দেশ্য তার সংখ্যাবৃদ্ধি করা, আর তাই জিন চাইবে এ দুটি অবস্থার মধ্যে একটি সমযোতা হোক।  এ জন্য জিন জিরাফের মস্তিষ্কে ভয় নামক একটি জৈব রাসায়নিক সিগনাল তৈরি করবে। যেনো প্রাণীটি সিংহকে ভয় পায় এবং তার সম্পর্কে সচেতন থাকে , আবার জিন এ ভয়টাকে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় সীমিত রাখবে,  যেনো জিরাফরা সিংহদের ভয় পেয়ে পুরোপুরিভাবে তৃণভূমি ছেড়ে চলে না আসে। জেব্রা ও গ্যাজেলরাও এভাবে তাদের ভয়কে ভারসাম্যময় অবস্থায় রাখে।  জিরাফরা যখন ঘাস খায়, তখন তারা এটা খুব ভালোভাবেই জানে, তাদের পাশে তাদের মৃত্যু বসে আছে, যেকোনো সময় মৃত্যু এসে তাদের ঘাড়ে কামড় দেবে! কিন্তু কোটি কোটি বছরের বিবর্তন তাদের মধ্যে ভয়টাকে একটি ভারসাম্যময় পরিস্থিতিতে রাখে। যেটাকে বলা হয় মোনার্ড স্মিথের ইভ্যলুশনারি স্ট্যাটেটিক স্ট্যাট্রেজি!আমরা জানি যে আজ থেকে ৭০ হাজার বছর পূর্বে আমাদের পূর্বসূরিরা শিকারী সংগ্রাহক হিসেবে জীবন যাপন করতো। তখন সেপিয়েন্স ছিল  খাদ্য শৃঙ্খলের মাঝামাঝি পর্যায়ের একটি প্রাণী। সেপিয়েন্সরা মাংসাশী  হলেও তারা বড় মাপের কোনো প্রাণী শিকার করতে পারতো না , কারণ তখনও তারা আগুনকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। মনে করুন, আপনি ৩০০০০ হাজার বছর পূর্বের একজন মানুষ। আপনি দেখছেন, একটি বাঘ জিরাফ শিকার করেছে, তখন আপনাকে অপেক্ষা করতে হতো কখন তারা চলে যাবে এবং আপনার সুযোগ আসবে। কিন্তু না! এরপরই শুরু হতো বন্য শেয়ালদের পালা আর সবশেষে আপনার জন্য যা অবশিষ্ট থাকতো তা ছিল অস্থিমজ্জা, যা দিয়ে কোনোমতে আপনি আপনার শরীরের চর্বি ও স্নেহের চাহিদা মেটাতেন। আমাদের ডি এন এ এখনো সে স্মৃতিটি মনে রেখেছে যার জন্য আমরা এখনো চর্বি জাতিয় খাবার খেতে পছন্দ করি, আইসক্রিম খাওয়া থেকে আমাদের কেউই  বিরত রাখতে পারেনা! আমাদের পূর্বসুরিরা এ জন্য অধিকাংশ সময় ফলমূল আহরণ করে জীবন কাটাতো।   শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়ার জন্য, তাদেরকে ফলমূল ও মাটির নিচের কোনো ইয়ামের উপরই বেশি নির্ভর করতে হতো। তাদের প্রজনন সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য, তখন তারা মাটি খুঁড়ে মিষ্টি আলু বের করতো এবং সেটি তাকে উপহার দিতো! আজ যদি আপনি আপনার গার্লফ্রেন্ডের জন্য আইফোনের পরিবর্তে মিষ্টি আলু নিয়ে যান , নিশ্চয় সেটা আপনার জন্য সুখকর হবে না! ইয়াম খুড়ে বের করার জন্য আমাদের পূর্বসূরিদের নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো এবং যখনই কোনো শব্দ শুনতো, তখন চারপাশে তাকিয়ে দেখতো। মনে করুন, আপনি ঘাসের মধ্যে কোনোকিছু নাড়াচড়ার আওয়াজ পেলেন , আপনার এটাকে সিংহ মনে হতে পারে! আবার এমনও হতে পারে, এটি বাতাসের শব্দ ! আপনি হয়তো আপনার প্রেমিকাকে আকৃষ্ট করার লোভ সামলাতে না পেরে, আপনার পাশে সৃষ্ট কোনো শব্দকে উপেক্ষা করে মাটি খুড়তে থাকলেন আর হয়তো সেটাই কোনো সিংহের শব্দ ছিল , আপনি মিষ্টি আলু উপহার দিয়ে প্রেমিকার মন পাওয়ার পূর্বেই সিংহ তার প্রেমিকাকে দুপুরের খাবার হিসেবে আপনার মাংস উপহার দিবে।আপনি যদি বিশ্বাস করতেন যে, এটি সিংহ এবং বাস্তবিকই এটি সিংহ,  তবে আপনার এ সংশয় আপনাকে রক্ষা করতো! এটি বোঝা খুবই সহয কিন্তু এরপরের অংশটি বোঝা একটু কঠিন।   এমনকি যদি এটি সিংহ নাও হয়ে  থাকে, তবে শব্দ বা চারপাশে কোনোকিছু নাড়াচড়া মানেই বিপদ এমন কোনো সাধারণ নীতিতে বিশ্বাস আপনার জীবন রক্ষা করতে পারে।  আর আপনি যদি এ সাধারণ নীতিটিকে অতিরিক্ত মাত্রায় নিয়ে যান  তখন আপনি সামান্য একটি শব্দ শুনেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেন এবং আপনার দৈনন্দিন জীবন যাপন অনেক কঠিন হয়ে উঠে।  আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন, যারা ঝোপের পাশে পথ চলতে ভয় পান অথবা রাতের অন্ধকারে কোনো ঘন জঙ্গলে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ অপেক্ষায় ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করাটাকেই  তাদের  জন্য সুখকর মনে করেন! আমরা অন্ধকারকে ভয় পাই , ভয় পাই অন্ধকারে ঘরের ছাদে সৃষ্ট কোনো শব্দকে! আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র এ ভয়গুলিকে আমাদের মাঝে  আরো বাড়িয়ে তোলে! আমাদের পূর্বপুরুষরা ঘন বন জঙ্গলে অনেক বেশি প্রাণ সংশয়ের কবলে পড়েছিল বলেই আমাদের মধ্যে এখনো এসবের প্রতি আতঙ্ক রয়ে গেছে! আমাদের মধ্যে অজস্র মানুষ আছেন, যারা পুকুর ও নদীর পানিতে গোসল করতে ভয় পান। কারণ কুমির ও বিষাক্ত সাপের মতো অদৃশ্য শত্রুরাই কোনো জলাশয়ের দ্বার থেকে আমাদের পূর্বসূরিদের কিডন্যাপ করেছিল যা এখনো ডি এন এ ভুলতে পারেনি! সুইমিংপুলে কোনো আতঙ্কজনক পরিস্থিতি না থাকলেও অনেকে আছেন, সেখানে নামতে ভয় পাবেন,  তার স্নায়ুতন্ত্র তাকে লক্ষ বছর পূর্বের স্মৃতি থেকে কোনোকিছুতেই বের হতে দেয়না, বরং এ সময় মস্তিষ্কের বেসোল্যাটারিয়াল এমিগডালাতে প্রচুর পরিমাণে ৫- হাইড্রোক্সিথাইপ্টামিন  রিলিজ হতে থাকে (5HT) । জঙ্গলে বাঘ বা ভয়ানক সাপ না থাকলেও, এখনো যেমন আমাদের মস্তিষ্ক,  জেনেটিক স্মৃতির কারণে ঘনজঙ্গল ও অন্ধকারকে ভয় পায়,  ঠিক তেমনি সত্যিকারে বাঘ না থাকা সত্ত্বেও আমাদের পূর্ব-পুরুষরা অনেক সময় পাতা বা বাতাসের শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে উঠতো।   এমনকি যারা এ সাধারণ নীতিটিতে ভারসাম্য অর্জন করতে পেরেছিল  , যারা ভয়ের মাত্রাকে সীমিত ও স্থিতিশীল অবস্থানে রাখার ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিল  , তাদের মধ্যেও মাঝে মাঝে সিংহের উপস্থিতিকে বিশ্বাস করার প্রবণতা দেখা দিতো,  যখন আসলে সেখানে কোনো সিংহ নেই! এটি ছিল এমন একটি উপায় যেখানে অস্তিত্বহীন কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস করলেও আপনি আপনার জীবন রক্ষা করতে পারতেন! ইন্টারনেটে ভাইরাস ছড়িয়ে জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়না জেনেও যেমন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র তার জঙ্গলের মানসিকতার কবলে পড়ে শত শত কম্পিউটার নষ্ট করে ঠিক তেমনি এ মহাবিশ্বে কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকা স্বত্ত্বেও আমরা অস্তিত্বহীন সিংহের অস্তিত্বে বিশ্বাসের মতোই, আমাদের স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা প্রতারিত হয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্ম দেই।রিচার্ড ডকিন্স আউটগ্রোয়িং গড গ্রন্থে  বলেছেন, মানুষের মাঝে এজেন্সিতে বিশ্বাস করার একটি প্রবণতা আছে।  এজেন্সি হলো এমন কিছু যারা পরিকল্পিতভাবে কোনোকিছু করে।   সূর্য এজেন্ট নয়, গ্রহ গুলিও এজেন্ট নয়, বাতাসের শব্দের মধ্যেও কোনো পরিকল্পনা নেই,  কিন্তু সিংহ একটি এজেন্ট,  কারণ তার উদ্দেশ্য আপনাকে খাওয়া! এটি জটিল পরিকল্পিত উপায়ে তার আচরণ পরিবর্তন করে,  যেনো আপনাকে শিকার করতে পারে এবং উদ্যম ও নমনীয়ভাবে আচরণ করে যেনো আপনার পালিয়ে যাওয়ার সব প্রচেষ্টা সে প্রতিহত করতে পারে! এজেন্সির ব্যাপারে ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া যুক্তিযুক্ত। আবার কখনো কখনো এসব আতঙ্ক আপনার সময় ও শক্তির অপচয়ও হতে পারে কারণ এজেন্ট হিসেবে সন্দেহভাজন কখনও কখনও বাতাসও হতে পারে! গড়পড়তা আপনার জীবন যতবেশি বিপদজ্জনক হবে , ততই এজেন্ট দেখার মত পরিস্থিতির দিকে ভারসাম্যটি ঝুঁকে পড়া উচিত। আধুনিক মানুষ বাঘ ভাল্লুকে ভয় পায়না, তারা অন্ধকারে ভয় পায়, শিশুরা বাগিমেন ও ভূতে ভয় পায়। প্রাপ্ত বয়স্করা টেরোরিস্টে ভয় পায়। আপনি রাতে বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় একটা শব্দ শুনলেন , এটা বাঘ হতে পারে, পুরোনো বাড়ীর কাঠ হতে পারে, অস্ত্র সজ্জিত কোনো অনুপ্রবেশকারীও হতে পারে। হয়তো এটা চোরের মতো তেমন সুনির্দিষ্ট কিছু নাও হতে পারে, আপনি মূলত বাতাস, শব্দ ,চোর, পুলিশ অথবা হিংস্র প্রাণী কোনোটাকেই নির্দিষ্ট করে ভয় পাচ্ছেন না, আপনার মধ্যে শব্দ শোনার পর থেকেই ঠিক কীসের জন্য ভয় হচ্ছে সেটা আপনি জানেন না, এ ভয়টি সম্পূর্ণ অজ্ঞাতনামা, আপনি অজ্ঞাতনামা বা অজানা, অনির্ণেয় কোনো এজেন্টকে ভয় পাচ্ছেন।  যদিও এসব এজেন্ট অযৌক্তিক , কিছুকিছু ক্ষেত্রে একেবারেই বেমানান , তবুও আপনি এজেন্টের ভয় থেকে বের হতে পারছেন না! আর এজেন্টের প্রতি আমাদের এ স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া আমাদের পূর্বসূরি অতীত থেকেই আমাদের মাঝে এসেছে। ড. ডেভিড থমসন তার Why we believe in God গ্রন্থে বলেছিলেন , কোনো ছায়াকে চোর বলে ভুল করার সম্ভাবনা আমাদের মাঝে বেশি , কোনো চোরকে ছায়া ভেবে ভুল করার প্রবণতা আমাদের মাঝে কম। তারমানে জেনেটিক্যালভাবেই এজেন্ট দেখার ব্যাপারে আমাদের মানসিক পক্ষপাত আছে। এমনকি বাস্তবে যেখানে কোনো এজেন্ট নেই সেখানে।  আমাদের পূর্বসুরিরা যদি সর্বত্র এজেন্ট আছে এমন একটি সাধারণ ধারণায় বিশ্বাস না করতো তবে সিংহের খসখস আওয়াজ শোনার পরও সে মাটি খুড়ার কাজে ব্যাস্ত থাকতো আর এতে করে তারা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যেতো। আমরা আগেই বলেছি, এজেন্ট মানে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত কোনোকিছু, এজেন্ট কোনো বস্তু নয়, ফিজিক্সের সুত্র নয়, এজেন্ট হলো আমাদের ক্ষতির উদ্দেশ্যে পরিচালিত যে কোনোকিছু , যা যে কোনো মুহূর্তেই আমাদের পূর্বসুরিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে , আর তাই প্রতি মুহূর্তেই তাদেরকে এজেন্টের প্রতি সজাগ থাকতে হয়।  সবকিছুর মধ্যে পরিকল্পনা খুঁজতে হয়, মহাবিশ্বের সকলকিছুর মধ্যে সচেতনতা আরোপ করে চিন্তা করার মানসিকতা ঠিক এভাবেই আমাদের মস্তিষ্কে প্রোগ্রাম হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরিরা ছিল অ্যানিমিস্টিক বা সর্বপ্রাণবাদী, তাদের দেখা প্রায় প্রত্যেকটি স্থানে তারা এজেন্টদের লক্ষ করেছিলেন এবং প্রায়শ সেগুলোকে তারা দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, স্টিফেন ফাই তার মিথোস নামক একটি গ্রন্থে এটি খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন। সারা পৃথিবীতে আজ দেব দেবতার কোনো অভাব নেই, বজ্রপাতের দেবতা, সূর্য দেবতা, চন্দ্র দেবতা, অগ্নি দেবতা ।ডকিন্স বলেছিলেন, ইয়াওহে মানুষের মনে বিবর্তিত হয়ে ইহুদীদের একমাত্র দেবতায় পরিণত হয়েছিল  এবং কালক্রমে তিনি খ্রিষ্ঠান ও মুসলিমদের একমাত্র  দেবতাতেও পরিণত হয়েছেন। কিন্তু এর আগে তিনি একজন ঝড়ের দেবতা ছিলেন, কানানাইট জনগোষ্ঠীর উপাস্য বহু দেবতার মধ্যে একজন, ইয়াওয়ের পাশাপাশি যাদের উপাসনা করা হতো, তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল উর্বরতার দেবতা ‘বাল’, দেবতাদের প্রধান ‘এল’, এবং তার স্ত্রী দেবী ‘আশেরাহ’। ধর্মের ইতিহাসের কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে ইয়াওয়ে পরে মানুষের মনে ‘এল’ এবং ‘আশেরাহ’র একত্রিত হয়ে ইহুদীর এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরের পরিণত হয়েছিল। সুতরাং ব্রোঞ্জ যুগের সর্বপ্রাণবাদ পরবর্তীতে ক্রমশ এর বাহুল্য বর্জন করে লৌহ যুগের একেশ্বরবাদে (একজন ঈশ্বর) পরিণত হয়েছিল। পরে খ্রিষ্ঠধর্ম ও ইসলাম ইহুদীদের একমাত্র ঈশ্বরকে  তাদের ঈশ্বর বলেও গ্রহণ করে নিয়েছিল  । এবং আরো পরে কানানাইটদের সে ঝড়ের দেবতা আরো জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছিল   এবং হার্ভাড আর অক্সফোর্ডের পণ্ডিত অধ্যাপকদের ধর্মতত্ব বইগুলোর একজন ‘নায়কে’ রুপান্তরিত হয়েছিল  ! কিন্তু প্রশ্ন জাগতে পারে, এজেন্সির প্রতি সাধারণ বিশ্বাস মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করে মেনে নিলেও মানুষ কেনো এসব দেবতাদের সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য পশুপাখি উৎসর্গ করে সেটি ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়। আবহাওয়া ও জলবায়ুর দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য কেনো তারা নিরিহ প্রাণীর জীবন নেবে? আমরা জানি যে আমাদের মস্তিষ্ক প্যাটার্ন চ্যাকার। ডঃগাজাঙ্গিয়া বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের লেফট ব্রেন বিশৃংখলা বা Chaos এর ভেতরেও অর্ডার খোঁজার চেষ্টা করে, সবকিছুকে একটি গল্পের মধ্যে ফিট করতে চায় এবং সবকিছুকে কন্টেক্সটের ভেতর রাখতে চায়। এটি মহাবিশ্বকে হাইপোথিসাইজ করতে চায়, যদিও সেখানে প্যাটার্নের কোনো এভিডেন্সই নেই  ! এবং এখান থেকেই আমাদের 𝑆𝑒𝑛𝑠𝑒 𝑜𝑓 𝑈𝑛𝑖𝑓𝑖𝑒𝑑 𝑆𝑒𝑙𝑓  জন্ম হয়। যদিও কনশাসনেসের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা এবং যুদ্ধ হচ্ছে, এটা তার টেন্ডেন্সি। কিন্ত লেফট ব্রেন এই অসঙ্গতিকে ইগনোর করে এবং শূন্যস্থানগুলোতে পেপারিং করে যার কারণে আমরা 𝑆𝑚𝑜𝑜𝑡ℎ 𝑠𝑒𝑛𝑠𝑒 𝑜𝑓 𝑠𝑖𝑛𝑔𝑙𝑒 𝑠𝑒𝑙𝑓 কে অনুভব করতে পারি। অন্য কথায় লেফট ব্রেন বিশ্বের মডেল তৈরির জন্য প্রতিনিয়ত এক্সকিউজ তৈরি করে,  এদের এক্সকিউজগুলোর অধিকাংশই  ভ্রান্ত ও অযৌক্তিক।মূলত প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদের মস্তিষ্কে প্যাটার্ন বা বিন্যাস বোঝার এ প্রবণতা তৈরি করে দিয়েছে, যেন আমরা প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর ভেতরকার ধারাবাহিকতা বুঝতে পারি। আমরা দেখি বিদ্যুৎ চমকের পর বৃষ্টি হয়, ধুসর কালোমেঘ আকাশে জমলে বৃষ্টি হয় , যদি বৃষ্টি না হয় খাদ্য শস্য উৎপাদিত হয়না। দেখা গিয়েছিল , কোন ঘটনার পর সব সময় কোন ঘটনা ঘটে এ ধারাবাহিকতার অর্থ সবসময় একটি ঘটনার পর অন্য ঘটনাটি ঘটবে তা নয় বরং মাঝেমাঝে সে ঘটনাটির পর অন্য ঘটনাটি ঘটে, যেমন- যৌন মিলনের পর নারী গর্ভবতী হলেও,  এর মানে এই না যে সবসময়ই যৌন মিলনের পর নারী গর্ভবতী হবে, বরং এটি মাঝেমাঝে ঘটে। প্রায়শ আমাদের মধ্যে এমন হেলোসিনেসন তৈরি হয় যে মনে হয় যেনো আমরা কোনো বিন্যাস দেখছি যদিও সেখানে কোনো বিন্যাস নেই, যেমন- আকাশে মেঘের মধ্যে কোনো প্রাণীর ছবি দেখা, আমাদের ব্রেন প্রতিনিয়ত তার ভেতরে বিভিন্ন হেলোসিনেসন তৈরি করে, আবার মাঝেমাঝে এমনও হয় যে আমরা কোথাও প্যাটার্ন দেখতে ব্যর্থ হই, যদিও সেখানে প্যাটার্ন আছে। পরিসংখ্যানবিদরা যখন আমরা কোনো বিন্যাস বুঝতে ভুল করি তখন সেই ভুল করার পেছনে দুটি উপয়ায়কে চিহ্নিত করেছেন। এদের একটিকে বলা হয় ফলস পজেটিভ এবং অন্যটি ফলস নেগেটিভ। কুসংস্কার হচ্ছে খুব সাধারণ একটি ফলস পজেটিভ ভ্রান্তি। আর ফলস নেগেটিভ হলো যখন আপনি কোনো একটি বিন্যাস দেখতে ব্যার্থ হচ্ছেন যদিও সেখানে বিন্যাস উপস্থিত আছে। মশার কামড়ের সাথে ম্যালেরিয়ার একটি সম্পর্ক আছে,  কিন্তু অনিবার্যভাবে সবসময় এ ঘটনাটিই ঘটবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু ১৮৯৭ সালে স্যার রোনাল্ড রসের পূর্বে এ বিন্যাসটি নিয়ে কেউই সময় ব্যয় করেন নি। গতবছর বৃষ্টির দেবতার প্রার্থনা করেছিলাম বলে বৃষ্টি হয়েছিল  , এ ধারাবাহিকতার কী কোনো অর্থ আছে? না নেই! এটি একটি ফলস পজিটিভ! একটি শিশু অসুস্থ্য ছিল  , তার সুস্থ্যতার জন্য গতবছর একটি ছাগল কোরবানী করেছিলাম তাই সে সুস্থ্য হয়েছে! পরবর্তীতে তার জ্বর আরো বেড়ে গেলে আমাদের অবশ্যই উচিত ছাগল হত্যা করা। আমাদের দেহের ইমিউন সিষ্টেম যে রোগ প্রতিরোধ করে সেটা আপনি সে ব্যাক্তিকে বুঝানোর চেষ্টা করুন যে বিশ্বাস করে কেবল ছাগল হত্যা করলেই ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে!

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী, বি এফ স্কিনার কবুতরদের মধ্যে কুসংস্কারের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিলেন। তার পরীক্ষিত কবুতরগুলো তাদের মাঝে কিছু প্যাটার্ন দেখতে পেয়েছিলেন,  যে প্যাটার্নগুলি সেখানে ছিল না; ফলস পজেটিভ। তিনি আটটি কবুতরকে, প্রথমত, স্কিনারবক্স নামক পৃথক বক্সে রাখেন, প্রতিটি বক্সে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রিত ফিডিং বা খাদ্য সরবরাহের যন্ত্র ছিল। প্রতিটি স্কিনারবক্স ছিল ছোটখাটো কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা। কবুতরগুলোর কোনো একটি আচরণ পড়ে ফিডিং যন্ত্রটি তাদের অটোম্যাটিক্যালি খাবার পরিবেশন করতো। কবুতররা প্রথমে জানতোনা ক্ষুদা লাগলে তাদের আসলে কী করা উচিত। কোন এক সময় আকষ্মিক দেয়ালে ঠোকর দেয়ার পর ফিডিং বক্সটি সক্রিয় হয়ে উঠে এবং কবুতরদের মস্তিষ্কে একটি প্যাটার্ন তৈরি হয় যে দেয়ালে ঠোকর দেয়ার সাথে ফিডিং বক্সের একটি কার্যকারণগত সম্পর্ক আছে বা তারা এ ধারাবাহিকতাটিকে ডিফাইন করলো। স্কিনার এবার তার বক্সগুলি থেকে পাখিদের আচরণ ও ফিডিং বক্সের মাঝখানে যোগাযোগ স্থাপন করে এমন সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। এবার পরিস্থিতি এমন হলো যে কবুতররা যাই করুক না  কোনো  তাদের কোন আচরণই ফিডিং বক্সটিকে প্রভাবিত করবেনা! এ পরীক্ষাটির ফলাফল ছিল খুবই বিষ্ময়কর। দেখা যায় একটি পাখি ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরতে থাকতো , খাদ্য পুরস্কার পাবার মধ্যবর্তী বিরতি পর্বে সাধারণত দুই থেকে তিনবার সে এ কাজটি করতো। এর থেকে বোঝা যায় পাখিটির মধ্যে এমন কোনো কুসংস্কার জন্মেছিল   যে তার মনে হয়েছিল ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরতে থাকলেই বুঝি খাবার পাওয়া যাবে। অন্যদুটি পাখির মধ্যে পেন্ডুলাম সুলভ আচরণের জন্ম নেয়, তারা প্রথমে দ্রুত মাথাটাকে ডানে ঘোরায় তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসে। আরেকটি পাখির কুসংস্কাচ্ছন্ন অভ্যাস ছিল মাথাটি উপরের দিকে নাড়ানো যেনো সে অস্তিত্বহীন কোনো বস্তুকে উপরের দিকে ছুঁড়ে মারছে! ষষ্ঠ পাখিটি ঠোঁট  দিয়ে মেঝ ঠোকরাতো কিন্তু মেঝের সাথে ঠোঁট ম্পর্শ করতো না! স্কিনার যে সিদ্ধান্তে আসেন তা সত্যি ছিল। আসলে কোনো একটি পাখি হয়তো প্রথমবার বাক্সের একটি কোণা দিয়ে মাথা বের করার পর খাদ্য পেয়েছিল এবং দ্বিতীয়বারও তার সাথে ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল , এভাবে প্রতিটি পাখিই প্রথমে কোনো কুসংস্কার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল এবং পরে সে আচরণ তারা পূণরাবৃত্তি করেছিল দ্বিতীয়বার খাওয়ার পাবার ঠিক পূর্বেই, আর এতে করে ঐ কুসংস্কার তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলো! এখন ঘড়ির কাটার বিপরীতে মাথা ঘুরালে সে খাবার পায়না ঠিকই কিন্তু তার মস্তিষ্কের সে কুসংস্কার থেকে সে আর কোনোদিন বের হতে পারেনা, সেটি সে এতোটাই দক্ষতার সাথে করতে শেখে যেনো এ আচরণটি করলেই সে খাবার পাবে! আমরা স্কিনারের এ পরীক্ষাটি থেকে বুঝতে পারি, কেনো আমাদের পূর্বসুরিরা শিশুদের জ্বর হলে প্রার্থনা করে অথবা ছাগল বিসর্জন দেয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে! আমরা করোনা ভাইরাসের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য কেনো স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দলবদ্ধভাবে উপাসনা করি অথবা কেনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের  মানুষরা স্কিনার বক্সের ছয়টি কবুতরের মতো নিজেদের মধ্যে ভূতুড়ে সব ধর্মীয় আচরণ গড়ে তুলে ! আমরা কেনো নতুন বিল্ডিং তৈরির পূর্বে অদৃশ্য ভুতের বিরুদ্ধে দলবদ্ধভাবে উপাসনা করি, রোগাক্রান্ত হলে কেনো আমরা ডাক্তার না দেখিয়ে ধর্মগ্রন্থ পড়ি, কেনো আমরা ফুলের ডালা সাজিয়ে মূর্তির আরাধনা করি, আর কেনোই বা আমরা দলবদ্ধভাবে মসজিদ অথবা গীর্জায় উপাসনা করি ! আমরা অনেক সময় ল্যাপটপ বা সেলফোন কাজ না করলে ব্যাটারি খুলে রেখে মাটিতে ঠান্ডা করি, অথবা প্রিন্টিং মেশিন কাজ না করলে প্রচন্ড জোরে চাপড় মারি, যদিও এটা আমরা নিশ্চিত জানি যে কম্পিউটার আমার ভাষা বুঝেনা! আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা আমাদের অবচেতনেই এমন অনেক কুসংস্কার গড়ে তুলেছি যেগুলি সম্পর্কে আমাদের নিজেদেরই কোনো ধারণা নেই। ঠিক যে ফলস পজেটিভ পাখিদের ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘোরায় ঠিক একই ফলস পজেটিভ কাবাকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্পিন করার কারণ ! এটা সত্যি যে, বিবর্তন আমাদের মস্তিষ্কে বিশ্বাসের সাধারণ নীতি হিসেবে ঈশ্বর নামক একটি এজেন্সি তৈরি করেছে আবার বিবর্তন তত্ব জানলেই আমরা সে এজেন্সিকে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন সেল থেকে তাড়িয়ে দিতে পারবো। অতএব এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে , ডারউইনই ঈশ্বরের মৃত্যুর জন্য দায়ী; বিদায় ঈশ্বর!

তথ্যসুত্র-
 
আমাদের প্রাসঙ্গিক আরর্টিকেলগুলি পড়ুন-

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!