অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান

Last updated:
 
 
 

আর অমি এ-কী শুনলাম
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।

_নির্মলেন্দু গুণ

 
 
 
আজ থেকে ৪.৪ মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের প্রাইমেটরা হর্ড ও হারেম গঠন করতো এবং সেখানেই বাস করতো । শত শত পুরুষ ও নারী অবাধে যৌনাচার করে কাটিয়েছিল লক্ষ লক্ষ বছর। মাতৃত্বের অস্তিত্ব ছিল কিন্ত কোন সন্তান জানতোনা এ মহাবিশ্বে পিতা বলে কিছু আছে কারণ একজন নারীই জানতোনা সে কার সন্তান গর্ভ ধারণ করেছে! হারেম ও হর্ডে থাকাকালীন একজন স্বাস্থ্যবান ও সুন্দরী নারীর জন্য অজস্র পুরুষের ভেতর প্রতিযোগিতা হতো। আর এ জন্য তারা তাদের বিশাল বিশাল তলোয়ার সদৃশ দাঁত দিয়ে একে অন্যকে করেছিল আঘাত। কিন্তু আকস্মিক ৪.৪ মিলিয়ন বছর পূর্বে এ গ্রহে নতুন এক প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে, যারা শিম্পাঞ্জি থেকে পৃথক, মানব সভ্যতার আদিম পূর্বসূরী, দেখতে তারা মানুষের মতই ছিল , তাদের নাম দেয়া হয় আর্ডিলোপিথিকাস , চার পায়ের বদলে তারা দু-পায়ে হাঁটতো, কিন্তু এদের মুখে তলোয়ার সদৃশ সে দাঁতগুলো ছিলনা, তাদের ক্যানাইন দন্তগুলো ছোট হয়ে যায় । আর এখান থেকেই এনথ্রোপোলজিস্ট লাভজয় হাইপোথিসাইজ করেন, তারা এখন আর হারেম অথবা হর্ডে বাস করেনা, গ্রুপ সেক্স করেনা, নারীর দেহকাব্য পড়ার  জন্য ওরা এখন আর তলোয়ার সদৃশ ক্যানাইন  দাঁতগুলো ব্যবহার করেনা। তারমানে এ বৃত্তাকার পিলেন্ডার্স পুরুষ ও নারীরা , তাদের মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের সেই আদিম স্বভাব ছেড়ে দিয়েছে, তারা এখন  একগামী, তারা এখন একে অপরের সাথে ভালোবাসার পারমাণবিক বন্ধন গড়ে তোলে! আর আবিষ্কৃত সেই মাথার খুলিটি ছিল আর্দির, একজন জটিল বালিকা, কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মতোই আর্দির মধ্যে ছিল মারপ্যাঁচ, এখনো তার মাথার খুলি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছেন আর্দির মনে কি ছিলো! আচ্ছা, আর্দি কে কী আদি বলে ডাকা যায়? আদি!!!
 
 
 
অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান
চিত্রঃ মানব সভ্যতার আদিম পূর্বসূরী, দেখতে তারা মানুষের মতোই ছিল , তাদের নাম দেয়া হয় আর্ডিলিথিপিকাস
 
           
 
 
 
 
 
আণবিক পর্যায়ের প্রমাণ দেখিয়েছিলো আমরা শিম্পাঞ্জির সাথে যে পূর্বসূরী ভাগ করেছিলাম তারা এ গ্রহে বাস করতো আজ থেকে আনুমানিক ৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে। আর এ পার্থক্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। তিন মিলিয়ন বছর পূর্বে ইথিওপিয়াতে একটি বিখ্যাত ফসিল খুঁজে পাওয়া যায় যার নাম লুসি। এদের নামকরণ করা হয় অস্ট্রোলোপিথেকাস আফারেনসিস। লুসির মাথার খুলির কিছু টুকরো প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পান কিন্তু বিস্ময়করভাবে তার নিচের চোয়ালটা ছিল সুরক্ষিত।
 
 
লুসি ছিল আকারে ছোট তবে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ফ্লোরেনসিয়েসিসের মতো ছোট না যাদেরকে অযৌক্তিকভাবে নামকরণ করা হয়েছিল হবিট। তারা সোজা হয়ে হাঁটতো কিন্তু গাছে উঠার ক্ষেত্রেও তারা দক্ষ ছিল আর তাইতো কোন হিংস্র প্রাণী দেখলেই তারা লাফিয়ে গাছে উঠে যেতো। ঠিক সে সময় লুসির মতো আরো প্রায় ১৩ টি জীবাশ্ম পাওয়া যায় আর তারা সবাই একই পরিবার থেকেই এসেছিল। ১৩ টি জীবাশ্মের মধ্যে অধিকাংশই ছিল ভাঙাচোরা কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে একটি সম্পূর্ণ মাথার খুলি পাওয়া গিয়েছিল যার নাম AL 444-2 যা ১৯৯২ সালে ( এক বছর পর আমি জন্মাই) আবিষ্কৃত হয়েছিল ইথিওপিয়ায় আর এ ফসিল প্রমাণ করে যে অস্ট্রোলোপিথিকাসদের আগের সম্ভাব্য কাল্পনিক পূনর্গঠনটি সঠিক ছিল।
 
 
 
অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান
চিত্রঃ AL 444-2 যা ১৯৯২ সালে ( এক বছর পর আমি জন্মাই) আবিষ্কৃত হয়েছিল ইথিওপিয়ায় আর এ ফসিল
 
                             
 
 
 
লুসিকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার উপসংহার হচ্ছে, লুসি শিম্পাঞ্জিদের থেকে ব্যতিক্রম, তারা সোজা হয়ে হাঁটত পেছনের পায়ের উপর ভর করে, যেমনটি আমরা করি। কিন্তু আমরা অস্ট্রোলোপিথিকাস সম্পর্কে এ সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে কী বুঝতে পেরেছি? এখানেও কী ভালোবাসা ও রোমান্টিক এটাচম্যান্টের কোন এনাটমি লুকিয়ে আছে? বলতে পারেন, মাথার খুলির ভাঙা টুকরো, সুরক্ষিত চোয়াল আর পেছনের পায়ের উপর ভর করে সোজা হয়ে হাঁটা এর মধ্যে তো আমি কোনো প্রেম ভালোবাসা দেখছিনা?
 
বেশ! শুনতে যতই অবাক লাগুক, আমি এখানেও প্রেম দেখি। মূলত, অস্ট্রোলোপিথিকাসদের দাঁতও ছিল ছোট, যেটা প্রমাণ করে তারা নারীর  যৌনির ভেতর অর্গাজম তৈরি করার নেশায় তলোয়ারের মতো দাঁতগুলো প্রতিযোগী পুরুষের বিপক্ষে  ব্যবহার করতোনা( Vice Versus)  ) ।  আর দু-পায়ে ভর করে হাঁটার কারণে তাদের সন্তানকে কোমরের একপাশে রেখে গাছে ওঠা ছিলো খুবই কঠিন। যখন তারা সিংহ বা কোন হিংস্র জন্তুর মুখোমুখি হতো, তখন তাদের লম্বা আঙুলগুলো দ্রুত চালিয়ে গাছে উঠা সহয ছিলো ঠিকই কিন্তু এক হাতে কোমরের মধ্যে সন্তান নিয়ে অন্যহাত ব্যবহার করে গাছে চড়া তাদের জন্য হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত কঠিন। এর কারণ তারা এখন শিম্পাঞ্জির মতো নয়, তারা এখন দ্বিপদী, অনেকটা আমাদের মতোই। আর ঠিক এ জন্য আমাদের পূর্বসূরী দ্বিপদী অস্ট্রোলোপিথদের পাশে সব সময় তার সঙ্গী উপস্থিত থাকতো কারণ নয়তোবা তাদের সন্তান বাঘের খাবারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো  যা ছিলো স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিকোণে  অত্যন্ত ক্ষতিকর! আর এ জন্যই লুসির পাশে হয়তো সবসময় তার সঙ্গী উপস্থিত থাকতে বাধ্য হয়েছিল। আর এভাবেই অস্ট্রোলোপিথরা বহুগামীতার পরিবর্তে একগামীতার দিকে পা বাড়ায়! বিশ্বের বুকে এ প্রথম নারী ও পুরুষের মধ্যে দীর্ঘকালীন সম্পর্ক গঠিত হয়!
 
 
 
আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে!
তোমার চন্দ্র সূ্র্য তোমায় রাখবে কোথায় ঢেকে?।
কতকালের সকাল-সাঝেঁ তোমার চরণধ্বণি বাজে,
গোপনে দূত হৃদয়-মাঝে গেছে আমায় ডেকে।।
ওগো পথিক, আজকে আমার সকল পরান ব্যেপে
থেকে থেকে হরষ যেন উঠছে কেঁপে কেঁপে।
 
 
 
কিন্তু প্রশ্ন করতে পারেন, আদিম অস্ট্রোলোপিথরা একে অন্যের সাথে হাতে হাত রেখে এ গ্রহে পথ চলতো ; তার সাপেক্ষে কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে?  তবে তাদের জন্য বেদনার অনুভূতি জাগানো ও হৃদয় স্পর্শী এক গুচ্ছ পায়ের ছাপ উপহার দিতে চাই যা আবিষ্কার করেছিলেন মেরি লিকির টিমের সদস্যরা জীবাশ্মীভূত হওয়া আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের উপর। ইথিওপিয়ার আরো দক্ষিণে তানজানিয়ার লায়েতলিতে এই পায়ের ছাপগুলি আবিষ্কৃত হয়, তারা ছিলো লুসি অথবা AL444-2 থেকেও আরো প্রাচীন, প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন বছর। রিচার্ড ডকিন্স তার The Greatest Show on Earth গ্রন্থে বলেন, মনে করা হয়, এ পায়ের ছাপগুলো সৃষ্টি হয়েছিল একজোড়া অস্ট্রোলোপিথেকাস আফারেনসিসের পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার কারণে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, তারা কী হাতে হাত রেখে পথ চলেছিলো?
 
 
 
অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান
A famous trail of footprints at Laetoli, Tanzania, may belong to four individuals, new research finds. (Image credit: Charles Musiba, Live science)
 
 
 
 
তারা হাতে হাত রাখুক বা না’ই রাখুক! আমি হাইপোথিসাইস করছি, ৩.৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের পূর্বসূরীরা এভাবেই একে অন্যের সাথে এক সাথে পথ চলতো, সম্ভবত এটাই ছিল যুগল ভালোবাসার সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক চিহ্ন। ৩ মিলিয়ন বছর পূর্বের তিন বছর বয়সী একটি শিশুর ফসিল পাওয়া যায় যে শিশুটিকে ঈগল আক্রমণ করেছিল, যে আক্রমণের চিহ্ন বহন করছে জীবাশ্মটির চক্ষুকোটর, সেই একই ধরণের দাগ তৈরি করে আধুনিক ঈগলরা যখন তারা বানরের চোখ ঠুকরে তুলে নেয় , এ শিশুটির নাম টং চাইল্ড । রিচার্ড ডকিন্স বলেন, দুর্ভাগা ক্ষুদ্র এই শিশুটি, ঈগলের ঠোঁটের হিংস্র আক্রমণে যখন বাতাসে ভেসে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, এমন দৃশ্যটি কল্পনা করলে আড়াই মিলিয়ন বছর পর অস্ট্রোলোপিথেকাস আফারেনসিসদের টাইপ স্পেসিমেন হিসেবে বিখ্যাত হবার বিষয়টি আমাদের একটুও শান্তি দেবেনা। হতভাগা শিশুটির মা সেই পাইলোসিন যুগে ক্রন্দনরত!
 
 
 
 
অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান
চিত্রঃ পাইলোসিন যুগের একটি শিশুর মাথার খুলি। ঈগল যার চোখ তুলে নিয়েছিলো।
 
 
                                          
 
 
 
যে শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য অস্ট্রোলোপিথরা একগামী হয়েছিলো, সভ্যতার দিকে পা বাড়িয়েছিলো, যার জন্য তারা অন্যকোনো নারীর সাথে নিজেদেরকে সকল প্রকার সেকচুয়াল একটিভিটিজ থেকে অন্তত তিন বছর দূরে রেখেছিল, তাদের সেই পরম আদর,যত্ম ও মমতার গড়া সন্তান যখন ঈগলের ঠোঁটের তীব্র কামড়ের ভেতর  বাতাসে ভেসে বেড়ায় মর্মান্তিক যন্ত্রণায়! তখন কেমন লেগেছিলো পাইলোসিন যুগে বসে থাকা সে অস্ট্রোলিপিথ মায়ের? থোরের টাইম মেশিনে ভ্রমণ করে একবারের জন্য দেখে আসতে ইচ্ছে করে !!

 

পিতৃত্ব ও শেয়ালের ভালোবাসা

 
প্রকৃতিতে যুগল ভালোবাসার সম্পর্ক খুবই দূর্লভ। কিন্তু নেইল ক্রোকোডাইল, আমেরিকান ব্যাঙ, ডামসেল মাছ, স্টারফিশ, উড কালবোস, গুবরে পোকা, শিংযুক্ত পোকা এবং মরুভূমির কিছু উঁকুন একগামী। পাখিদের মধ্যে ৯০ শতাংশ যুগল ভালোবাসার সম্পর্ক গঠন করে।
শুধু তিন শতাংশ স্তন্যপায়ী দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে একজন স্বতন্ত্র পুরুষের সাথে। তাদের মধ্যে রয়েছে ছুঁচা, কিছু বাদুড়, এশিয়াটিক ক্ললেস, ভোঁদড়, বীবর, বামন বেজি, ক্লিপস্প্রিঙ্গার, রেডবাক, ডিক-ডিক এবং কিছু এন্টিলোপ, গিবন ও সাইয়ামাং, কিছু সীল, সাউথ আমেরিকার কিছু বানর এবং সকল বন্য কুকুর,শেয়াল, নেকড়ে, কোয়োটি, জ্যাকেল, সাউথ এশিয়ার নেকড়ে, জাপানারে কুকুর রেকুন, সবাই যুগল ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং তাদের স্বামী ও সন্তানের যত্ম নেয়।
 
মামেলদের মধ্যে একগামীতা আসলেই খুবই দূর্লভ। কারণ একজন নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার মধ্যে কোন জিনগত উপযোগ নেই। অধিক সংখ্যক নারীর সাথে সহবাস করলেই তারা জেনেটিক্যাল এডভ্যান্টেজ প্রাপ্ত হয়। আর সেজন্য, গরিলার মতোই অধিকাংশ প্রজাতি হারেম গঠন করে।  তারা এটা কয়েকটি উপায়ে করতে পারে। যেমন- কোন একজন পুরুষ যদি একটি সম্পত্তির উপর নির্ভর করে, তবে সেখানে স্বভাবতই সে সম্পত্তির লোভে অজস্র নারী একত্রিত হয়, পুরুষটির রাজত্বে, উদাহরণস্বরুপ তারা চেষ্টা করে বড় একটি চারণভূমি জয় করতে যেখানে তাদের রাখাল পুরুষটি ঘুরে বেড়ায়। যদি সম্পত্তি ভু-দৃশ্যের সর্বত্র সমানভাবে ডিস্ট্রিবিউট করা থাকে যে ভূমিটি আসলে নির্ভরযোগ্য নয়, তবে একজন পুরুষ চেষ্টা করবে নিজেকে একদল নারীর সাথে সম্পৃক্ত করতে যারা একসাথে ভ্রমণ করে  এবং পরিপার্শ্বকে অনুপ্রবেশকারীদের থেকে রক্ষা করবে, যেমনটি সিংহ করে থাকে৷ যখন পুরুষটি কোনভাবেই আর হারেমকে অন্তরাল করতে পারেনা তখন সে অনেক বড় একটা টেরিটরি প্রতিষ্ঠা করে, নারীদেরকে দূর দুরান্তে ছড়িয়ে দেয় এবং দুধ বিক্রেতা যেমন এক একটি ঘরে গিয়ে এক এক গ্লাস দুধ দিয়ে আসে ঠিক তেমনি সেও দূর দূরান্তে এক একজন নারীর কাছে স্বতন্ত্রভাবে গিয়ে চুপি চুপি সেক্স করে আসে!
 
নারীদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় একগামিতা আসলে খুব একটা এডাপ্টিভ নয়। একজন পুরুষের যতটা না লাভ হয় সে তার থেকেও বেশি নিজের ক্ষতি করে। অনেক প্রজাতির নারী আছে যারা মহিলাদের সাথেই বাস করে এবং আগন্তুকের সাথে সহবাস করে; নারী হাতিরাও ঠিক একই কাজ করে। যদি একজন নারীর অধিক নিরাপত্তা প্রয়োজন হয় তবে সে কেনো একাধিক পুরুষের সাথে সঙ্গম করবেনা? যেটা শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কমন।
 
মনোগামী বা একগামীতা নির্ভর করে ইকোলজিক্যাল ও বায়োলজিকাল ফাংশনের উপর। অনেকক্ষেত্রে এটি ছাড়ার  আর উপায় থাকেনা, এটাই হয় একমাত্র বিকল্প। এক্ষেত্রে আমরা ইস্টার্ন ফক্স ও রবিনের কথা এখন আলোচনা করবো। আমরা দেখবো কিভাবে পরিস্থিতি তাদের একগামীতার মধ্যে আটকে থাকতে ফোর্স করে। এবং আমরা তাদের জীবন বিশ্লেষণ করে একগামীতা, ডিভোর্স ও রিম্যারেজ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবো।
 
নারী রেডফক্সরা অত্যধিক অসহায়, অপরিপক্ক বাচ্ছা, একটি চিহ্ন যেটিকে বলে, আল্ট্রিসিয়ালিটি। তার শিশু জন্মগ্রহণ করে অন্ধ ও বধির হয়ে। শুধু তাই নয় একটি শেয়াল প্রায় ৫ টার মতো বাচ্ছা দেয়। তাছাড়া একটি ইঁদুরের দুধ হয় খুবই সমৃদ্ধ, তারা তাদের নতুন জন্ম নেয়া আলট্রিক্যাল শিশুদের বাসার মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে যায়, নারী শিম্পাঞ্জির এমনকিছু দুধ রয়েছে যা নিন্মমানের প্রোটিন সম্পর্ন। অতএব সে তার বাচ্ছাকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কয়েক সপ্তাহ দুধ পান করাতে হয়। সে তার শিশুটিকে  একেবারেই পরিত্যাগ করতে পারেনা।
 
এ অবস্থায়  নারী শেয়ালের কোনোকিছুই করার থাকেনা, তার জন্য একমাত্র বিকল্প মৃত্যু, মৃত্যু ছাড়া তার সামনে আর কোন পথ খোলা থাকেনা,  যদি না  তার পাশে কোন সঙ্গী  থাকে। মনোগামী বা একগামীতা পুরুষ শেয়ালদের জন্য প্রয়োজনীয়, যাহোক। এই প্রাণীটি একটি টেরিটোরিতে বাস করে যেখানে রিসোর্স ছড়িয়ে আছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে একজন পুরুষ এক খন্ড প্রপার্টি অর্জন করতে সক্ষম নয় যেখানে সে দুজন নারী একসাথে রাখতে পারে। কিন্তু এস্ট্রাসের সময় সে ভিন্ন ভিন্ন নারীর কাছে যেতে সক্ষম, অন্যান্য পুরুষদের রোধ করা সম্ভব আর তার পক্ষে সম্ভব সে সকল আলট্রিক্যাল শিশুর লালনপালন করা।
 
 
 
আর এদিক থেকে শেয়ালদের মধ্যে নারী ও পুরুষ দুজনের জন্যই একগামীতা সবচেয়ে শেরা পথ, আর এ জন্য রেড ফক্স যুগল প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে যেটাকে আমি এখানে P-Bond বলবো। এরপর থেকে নারী ও পুরুষের ভেতরকার বন্ধনকে আমরা পি-বন্ড বলেই মনে রাখবো। কিন্তু এ লাল শেয়ালও সারাজীবনের জন্য পিবন্ড গঠন করেনা। ফেব্রুয়ারীতে সে তার মেটিং ড্যান্স শুরু করে আবার নতুন সম্পর্ক, সন্তান ও সন্তানের দেখাশুনা। সন্তানের জন্মের পর রাতের বেলায় সে স্ত্রীর জন্য ইঁদুর শিকার করে আনে, রাতের অন্ধকারে, এছাড়া থাকে মাছ ও অন্যান্য সুস্বাদু খাবার। গ্রীষ্মের উত্তেজনাময় দিন ও রাত্রিতে, নারী ও পুরুষ দুজনেই গুহা পাহারা দেয়, সন্তানদের প্রশিক্ষণ দেয়, পিতা গুহায় এক সময় আসা যাওয়া কমিয়ে দেয়। আগস্টে মায়ের ম্যাটারনাল টেম্পারও ক্রমস কমে যায়। সে তার বাচ্ছাকে বন্য পশুর একটি ডেরায় নিয়ে যায় এবং নিজেই ছেড়ে চলে আসে। শেয়ালদের মধ্যে যুগল প্রেমের সম্পর্ক শুধু ব্রিডিং সিজনেই কাজ করে।
 
ব্রিডিং এর সময় একগামীতা পাখিদের মধ্যেও কমন। অধিকাংশ পাখি ঠিক একই কারণ পিবন্ড তৈরি করে ঠিক যে কারণে শেয়ালরা তৈরি করে। যেমন- ইস্টার্ন রবিনরা মাঝেমাঝে খুব ক্ষুদ্র একটা টেরিটোরি অর্জন করে যেখানে সে একজন নারীকে সন্তান লালন পালনে সাহায্য করে, কারণ বাচ্ছাগুলোকে তা’ দেয়ার সময়  একজন নারীকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে একটা নির্দিষ্ট স্থানে থাকতে হয়। আর এ জন্য তারা খাবার সংগ্রহ করতে পারেনা। এ সময়টাতে সঙ্গীও যদি তাকে একা রেখে চলে যায় তবে এটা অত্যন্ত খারাপ ব্যাপার হবে। আর ঠিক এ জন্যই ইস্টার্ন রবিন পি-বন্ড তৈরি করে।
 
কিন্তু এখানেও একটা ভেজাল আছে। রেড ফক্সের মতোই। ইস্টার্ন রবিন সারাজীবনের জন্য মেটিং করেনা। তারা বসন্তে জুটি গঠন করে এবং এক বা একাধিক শাবক তৈরি করে অবস গ্রীষ্মে। যখন আগস্টে বাচ্ছারা উড়তে শেখে তখন নারী ও পুরুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নতুন একটি ঝাঁকে যোগদান করে। পক্ষীবিদ ইউজিন মোর্টন এমনটি অনুমান করেছেন, যে কমপক্ষে ৫০% এভিয়ান প্রজাতি একগামী। নারী ও পুরুষ শুধু ব্রিডিং সিজনেই জুড়ি গঠন করে। আর তার ভালোবাসার দৈর্ঘ্য সন্তান বড় হওয়া পর্যন্ত।
 

 

একগামীতার সাপেক্ষে হেলেন ফিশারের একটি থিয়োরিঃ

 
আমাদের প্রথম পূর্বসূরিদের মধ্যে এমনকিছু ব্যাপার ছিলো যে রেড ফক্স ও ইস্টার্ন রবিনদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মানবতার দোলনায় আমাদের পূর্বসূরিরা সার্ভাইভ করেছিল হেঁটে হেঁটে বাদাম, বেরি, ফল ও মাংস সংগ্রহের ভেতর দিয়ে। একজন পুরুষের পক্ষে তখন যথেষ্ট রিসোর্স যোগাড় করা সম্ভব ছিলনা একটি হারেম আকর্ষণ করার জন্য। আর তাছাড়া তারা ব্রিড করার জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেতনা যেহেতু তারা এটা বিশ্রামরত অবস্থায় করে। এমনকি যদিও সে একদল নারীকে প্রতারিত করে তাকে অনুসরণ করার জন্য কিভাবে সে তাদের প্রোটেক্ট করবে? যখন সম্পূর্ণ দল সিংহের কবলে পড়বে তখন তার পক্ষে কি সম্ভব প্রতিটি নারীকে রক্ষা করা? অতএব দেখা যাচ্ছে যে সাধারণ পরিস্থিতিতে একগামীতা কাজ করেনা।
 
কিন্ত একজন পুরুষ একজন স্বতন্ত্র নারীর পাশে পথ চলতে পারে। সে তাকে অন্য পুরুষদের থেকে এস্ট্রাসের সময় নিরাপদও রাখতে পারে। এবং তার সন্তানদের লালন পালন করার জন্য সাহায্যও করতে পারে৷
 
এটা খুবই অসম্ভাব্য যে আমাদের পূর্বসূরি নারীরা খুবই কোমল সন্তান লালনপালন করতো, আমরা বর্তমানে যে সকল আল্ট্রিক্যাল শিশু  দেখি ঠিক তেমন। মূলত তারা যখন দু-পায়ে দাঁড়াতে শিখেছিল, তখন শিশুরা তাদের জন্য অনেক বড় একটা প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দেয়। তাদের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, নিয়ম ও নিরাপত্তা, অন্তত যতদিন তারা তাদের সন্তান বড় করতে পারছেনা। আর এ জন্য যুগল ভালোবাসার সম্পর্কই তাদের জন্য একমাত্র বিকল্পে পরিণত হয়েছিলো, আর ঠিক তখনই রোম্যান্টিক এট্রাকশন ও সেন্স অব এটাচমেন্ট বিবর্তিত হয়। আর তাই আমরা এটা প্রায় নিশ্চিত করে বলতে পারি,
 
 
 
ভালোবাসা কোনদিনও অনন্ত বা অসীম নয়, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে ভালোবাসার অস্তিত্ব ছিলোনা আর মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর এ মহাবিশ্ব ভালোবাসা শূন্য ছিল , আমাদের এ গ্রহ কক্ষপথে এসেছে আজ থেকে ৪ বিলিয়ন বছর পূর্বে, যুগল ভালোবাসার সম্পর্কের বিবর্তন ঘটে ৪.৪ মিলিয়ন বছর পূর্বে আর বিস্ময়করভাবে এটি ঘটেছিল আর্দির বা আদির ধারালো দাঁতের ক্রমাগত ক্ষয়ে এবং রোম্যান্টিক ভালোবাসা ও গভীর এট্যাচমেন্টের পেছনে ক্রিয়াশীল নিউরাল সার্কিট Evolve হয়েছিল আজ থেকে ৩.৩ মিলিয়ন বছর পূর্বে, লুসির মস্তিষ্কের কর্টেক্সের ভেতর, তার নিউরনে, তার খুলির ভেতর ঘুরে বেড়িয়েছিলো প্রথম প্রেম বিলিয়ন বিলিয়ন ইলেক্ট্রিক্যাল সিগনাল হয়ে। আর তাইতো রবি ঠাকুর বলেছেন-
 
 
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
শত রূপে শত বার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
গাঁথিয়াছে গীতহার,
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,
নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।

যত শুনি সেই অতীত কাহিনী,
প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে
দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমিররজনী ভেদিয়া
তোমারি মুরতি এসে,
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।

 

 
শেয়াল, রবিন ও অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীরা শুধুমাত্র ব্রিডিং এর সময় পি-বন্ড তৈরি করে। এটি তিন থেকে চার বছর স্থায়ী থাকে। মাঝেমাঝে সন্তান মারা যায় আর এটা নারীদের সাইকেলকে ট্রিগার করে, যা তাকে সম্পর্ক করতে অনুপ্রানিত করে। আবার কেউ কেউ বন্ধ্যাত্বকে অতিক্রম করেই একে অন্যের পাশাপাশি থাকে কারণ অন্য কোনো সঙ্গী নেই। কিন্তু আমাদের প্রথম পূর্বসূরিরা অন্তত চার বছর যুগল ভালোবাসার সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিল, যাতে তাদের সন্তান পর্যাপ্ত বয়সে উপনিত হয়, শিশুটিকে জীবনের নিষ্ঠুরতম সময়ে যেনো সে টিকে থাকে এ জন্যই তার পিতামাতা একগামী হয়ে উঠে। তিন থেকে চার বছরের রি-প্রোডাক্টিভ সাইকেল সম্ভবত বায়োলজিক্যাল পেনোমেনন।

 

প্রকৃতি দাঁত ও নখে রক্তিম

 
সিরিয়াল বন্ডিংও এডাপ্টিভ। মার্গারেট মিডকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার বিয়ে ব্যার্থ হয়েছে কেনো? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, কারণ তিনবার বিয়ে করেছি আর প্রতিটি বিয়েতে আমি সফল। মার্গারেটকে সমাজের ভাষায় বলা হয় অভদ্র লোক। কিন্তু অনেক ব্যক্তি জীবনের দৈর্ঘ সমান বৈবাহিক সম্পর্ককে আইডিয়ালাইজ করে নেয়। আর এদিকে ডারউইন মনে করেন, মিলিয়ন বছর পূর্বে সিরিয়াল যুগল প্রেমের সম্পর্ক আমাদের পূর্বসূরীদের সুবিধা দিতো।
 
আমাদের পূর্বসূরিরা যত অধিক পার্টনারের সাথে সম্পর্ক করতো, জিনের ভেরাইটি তত বেশি তৈরি হতো, আর ততই ভবিষ্যতের অনিশ্চিত পরিবেশে তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যেতো। আর এ জন্য পুরুষরা আরো তরুণ ও সতেজ শরীর খুঁজতো, আর একজন নারীর সুযোগ ছিল, এমন একজন সঙ্গী নির্বাচন করার যে তাকে আরো অধিক নিরাপত্তা ও সমর্থন দিতে পারবে।
এখনো আমাদের মধ্যে ঠিক একই প্যাটার্ন রয়ে গেছে। পুরুষরা আরো তরুণ ও স্বাস্থ্যকর শরীর চায় আর নারীরা চায় এমন একজন পুরুষ যে আরো বেশি যত্মশীল ও সাপোর্টিভ। যদিও এ ধরণের চক্র ব্যাথাদায়ক সামাজিক জট তৈরি করে। ডারউইনের দৃষ্টিকোণ থেকে একজনের তুলনায় অধিক পরিমাণের বৈচিত্র্যময় সন্তান জেনেটিক্যাল সেন্স তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সে সন্তানদের দেখাশুনা করতো কে? হেলেন ফিশার বলেন, আমাদের আধুনিক সময় গ্র্যান্ড প্যারেন্টিং এর মধ্যে অনেক উথানপতন ঘটেছে। আজকের ওয়েস্টার্ন পিতা মাতারা নিজেরাই তাদের সন্তানদের লালন পালন করেন, কিন্তু তাদের পড়াশুনার খরচ অনেক উচ্চমাত্রিক। আজ শিশুরা চায় আইফোন, কম্পিউটার ও কলেজ এডুকেশন আর এ জন্য স্টেপ প্যারেন্টিং একটি অসুবিধায় পরিণত হয়েছে কিন্তু সে সময় স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি ছিলোনা বা শিশুরা কম্পিউটার বা আইফোন চাইতোনা। যে জন্য সে সময় দাদা দাদির মমতা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আর এভাবেই নারী ও পুরুষ সন্তানকে স্টেপ প্যারেন্টদের কাছে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা অন্য কোন পার্টনার অনুসন্ধান করতো।
 
অতীতে আমাদের পূর্বসূরি শিশুরা মাল্টি-এজ প্লে গ্রুপে যোগ দিতো, বয়বৃদ্ধ ভাইবোনদের সাথে, গ্র্যান্ড প্যারেন্টস এবং অন্যান্য কমিউনিটি এবং অন্যান্য কমিউনিটিরা তাদের যত্ম করতে সহযোগিতা করতো। ডে-কেয়ার ছিল ফ্রী। শিক্ষা ও বিনোদন ছিল স্বস্তা। আর এ জন্য গ্র্যান্ড প্যারেন্টিং তখন খুব একটা ব্যায়বহুল ছিলোনা। আর এ জন্য প্রাচীন সংস্কৃতিতে স্টেপ প্যারেন্টিং ছিল খুবই কমন আর সম্ভবত ঠিক এ কারণেই।
 
যখন পুরুষ সিংহরা কোন একটি প্রাইড দখল করে তখন তারা পূর্বের নেতার সকল শিশুসন্তানদের খুন করে ফেলে। ডারউইনের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যের সন্তান লালন পালন করাটা তাদের জন্য সুবিধাজনক ছিলোনা। আর পূর্বের দলনেতার স্ত্রীরা খুব শীঘ্রই নতুন দলে যোগ দিতো আর তাদের ভেতর এ নতুন সিংহ তার জিন প্রচার করতো। আধুনিক মানুষদের মধ্যে হত্যার এ প্রতিরুপ খুব ভয়াভহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গ্রেন্ডপ্যারেন্ট শিশুদের হত্যা করে। যদিও চার বছর বয়স হলে এ হত্যার পরিমাণ হ্রাস পায়। শিশুরা হাঁটতে শিখলে নারীরা নতুন পার্টনারদের সাথে সেক্স করতে কম্পোর্ট ফিল করে। আজ অনেক উদ্যানপালক ব্যক্তি যারা আফ্রিকা, এমাজোনিয়া ও নিউ গিনিতে বাস করে তারা সন্তানসহ বিয়ে করতো যেনো বন্ধুত্ব ধরে রাখা যায় কিন্তু এ প্রথম বিয়ে বেশিদিন স্থায়ী হতোনা। সুস্পষ্টভাবে কেউ এ ডিভোর্সে আপসেট ছিলনা । বিয়ের চুক্তিকে সম্মান করা হতো। বাচ্ছাদের সুস্থ্য অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া হতো। কোনো নাতি তৈরি করতোনা। এবং মা-বাবা তাদের সন্তান পেয়ে আনন্দিত ছিল।।
 
 
 
হেলেন ফিশার বলেন, যদি এই মানসিকতার অদৃশ্য কালি মিলিয়ন বছর পূর্বেও থেকে থাকে, তারা কেনো একের অধিক বিয়ে করবেনা? প্রতিটি যুগল বন্ধনের সাথে সামাজিক সম্পর্কও প্রসারিত হত। আর কোন সংশয় ছাড়াই আমাদের আদিম পূর্বসূরীরা DNA এর কথা ভেবে একে অন্যের থেকে দূরে সরে যায়নি, মানুষ এখনো জেনেটিক প্রভাব সম্পর্কে খুব বেশি বিস্মৃত। কিন্তু এই আদিম নারী ও পুরুষ সিরিয়াল বন্ডিং চর্চা করতো চার মিলিয়ন বছর পূর্ব থেকে। লুসির সময় ঠিক এভাবে অধিক শিশু টিকে থাকতো। আমাদের আদিম পূর্বসূরীরা মিলিয়ন বছর কাটিয়েছিল সিরিয়াল পেয়ারিং এর মধ্য দিয়ে।
 
তারমানে এই নয় যে,  আমাদের আদিম পূর্বসূরীদের মধ্যে ডিভোর্সের ফলে কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা তৈরি হতোনা। সে সমাজেও বিশৃঙ্খলা ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় শোনা যায়, আলাদা হওয়ার ফলে অনেকে আত্মহত্যা  করেছে। শিশুরাও আতঙ্কগ্রস্ত হয়, কনফিউজড হয় ও স্থানান্তরিত হয়। প্রতিবেশিদের সাথে যুদ্ধ হয়। আবার কখনো সম্পূর্ণ কমিনিটি জড়িয়ে পড়ে। এমনকি অন্য প্রাইমেটদের মধ্যেও পূনরায় সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য জঘন্য যুদ্ধ বিগ্রহের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু তারমানে এই নয় যে, শিশুরা তিন থেকে চার বছর বয়সের মধ্যেই স্বাধীন হয়ে উঠে, নিউট্রেশন ও ইমোশনের দিক থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক শিকার সংগ্রাহক শিশুরাও মাল্টি-এজ প্লে-গ্রুপে যোগদান করে। বয়স্ক ভাইবোন, ফ্রেন্ড এবং কমিউনিটির অন্যান্যরা তাদের যত্মে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। অন্যান্য প্রজাতিতে এই বৃদ্ধ ভাইবোনদের বলা হয় “Helper at the Nest”!
 
কোনো সন্দেহ ছাড়াই এ ধরণের এক্সট্রা বাবা-মা অন্য প্রজাতির মধ্যেও দেখা যায় এবং মানুষের সকল গোষ্ঠীতে, যা উপস্থিত ছিল আমাদের প্রাগৈতিহাসিক ব্যান্ডে। কিন্তু তার মানে সব মা-বাবাই এ কাজটি করতো? সম্ভবত না! হেলেন ফিশার বলেন, কিছুকিছু পিতামাতা সন্তান বড় হওয়ার পরও তাদের ত্যাগ করতোনা। আমাদের আধুনিক ডেটা দেখাচ্ছে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে Lifelong Monogamy সংঘটিত হতো,  যে পরিস্থিতিগুলো আমাদের পূর্বসূরিদেরকেও একসাথে রেখেছিল। হেলেন ফিশার তার Anatomy of Love গ্রন্থটিতে এমন কিছু পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন। আসলে দীর্ঘকালীন যুগল বন্ধন ক্রোনোলজিক্যাল বয়সের সাথে বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রেকর্ড থেকে দেখা যায় ৩৪ বছর বয়সের ভেতর ডিভোর্সের পরিমাণ অনেক কমে যায়। সম্ভবত চার মিলিয়ন বছর পূর্বেও বয়স্ক নারীরা একে অপরের পাশাপাশি থেকে যেতো তাদের নাতিনাতনিদের সাপোর্ট দেয়ার জন্য।
 
দ্বিতীয়ত, যে সকল ব্যক্তিদের তিন থেকে চারজন নির্ভরশীল সন্তান আছে তাদের মধ্যে ডিভোর্সের পরিমাণ কমে যায় যেটা আদিম সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হয়েছিল। আর এভাবে আপনার যত বেশি সন্তান হবে আপনি ততবেশি কাছাকাছি থাকতে চাইবেন। আমাদের আদিম এনসেস্টরদের মধ্যেও একই প্রবণতা কাজ করেছিল, কয়েকজন সন্তানের পিতামাতা একে অন্যকে ত্যাগ করতোনা আর এভাবে বড় পরিবার অটুট থাকতো।  যদি তাদের মধ্যে সুস্থ্য সমন্বয় থাকে তবেই তারা এতগুলো শিশুর দেখাশুনা করতে পারবে আর এটা ঠিক এভাবে জিনগত দিক থেকেও সুবিধাজনক। তৃতীয়ত, ডিভোর্সের পরিমাণ সে সকল সমাজে কমে যায় যেখানে নারী ও পুরুষ অর্থনৈতিকভাবে একে অন্যের উপর নির্ভরশীল__ বিশেষ করে এগ্রিকালচারাল সমাজে। হার্ডিং কালচার ও অন্যান্য সমাজেও ডিভোর্স নিন্মমানের, পুরুষ অধিকাংশ সময় কঠোর পরিশ্রমের কাজ করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স যার উপর নির্ভর করে নারীরা। কিন্তু যদি আদিম সমাজে কোনভাবে নারী ও পুরুষ উভয়েই একে অন্যের উপর নির্ভর করে তবে Lifelong Monogamy হয়ে উঠে একটি নিয়ম।
 
আমি সন্দেহ করি যে, এটি একটি সাধারণ মামলা। যাইহোক, আমাদের প্রথম পূর্বসূরিরা কিছু যাযাবর গ্রুপে ঘুরে বেড়াতো যেখানে ছিলো ৪-৫ টি যুগল বন্ধন ও তাদের সন্তান, ছিল একক আত্মীয় ও বন্ধু। মাংস ছিল বিলাসিতা। নারী ছিল একজন দক্ষ সংগ্রাহক। ডাবল আয়ের ফ্যামলিই ছিল নিয়ম। প্রাচীন নারীরা ঠিক পুরুষের মতোই সফল। আর এ জন্য যখন কোন একটি বিবাহিত জীবনে ঝগড়া শুরু হতো, তারা দুজনই একে অন্যকে নিমিষে ছেড়ে দিতে পারতো এবং যোগ দিতো অন্য আর একটি গ্রুপে। সিরিয়াল মনোগামী সম্ভবত আমাদের প্রাগৈতিহাসিক সমাজে অত্যন্ত সাধারণ রি-প্রোডাক্টিভ স্ট্র্যাটেজি ছিল।
 
 
 

প্রেমের অত্যাচার; এটাচম্যান্ট ও এডিকশনের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা

 
 
তার হাসি, কন্ঠস্বর অথবা তার হাঁটার স্টাইল মস্তিষ্কের মধ্যে ভুমিকম্প তোলে। শুধু চোখের একটি পলকে মস্তিষ্কে ঝড় উঠে যায়। এ ভুমিকম্প, এ প্রলাপ কোটি কোটি মানুষ নয় , কোটি কোটি কোটি মানুষ অনুভব করেছেন। কবি অথবা প্রেসিডেন্ট, প্রযুক্তিবিদ অথবা শিক্ষক কাউকেই এ রোম্যান্টিক ফিলিংস ছেড়ে দেয়নি, সবার মস্তিষ্কের নিউরন চেপে ধরেছে। সবার মধ্যেই কাজ করেছে, একই আশা, সুখ ও যন্ত্রণা। কিন্তু মস্তিষ্ক এ সতেজতা অনন্তকাল উপলব্ধি করেনা। কিছু মানুষ কেবল সপ্তাহ ও মাসের জন্য তীব্র অনুভূতি বজায় রাখেন। কিন্তু যদি প্রেমিক প্রেমিকার মাঝখানে মহাসাগর থাকে তবে তাদের রোম্যান্টিকতার দৈর্ঘ অনেক বিরাট হয়ে যায়। আমাদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা গেছে কখনো কখনো বৈবাহিক জীবনে এ রোম্যান্টিক অনুভূতির দৈর্ঘ্য বিশ থেকে একুশ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে, আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে ভালোবাসা মাঝেমাঝে কয়েক শতাব্দী অব্যাহত থাকে। কিন্তু এই প্রারম্ভিক উচ্ছ্বাস প্রায়শই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে এবং এ হিসেবে উত্তেজনা ও অভিনবত্ব হ্রাস পায়, গভীর ইউনিয়নের শান্ত অনুভূতি শুরু হয়। মনোবিজ্ঞানী এলেন হ্যাটফিল্ড এটিকে “সহচর ভালোবাসা” বলেছেন, কারো সাথে এক সাথে থেকে ভালো থাকা, আপনার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া। হেলেন ফিশার বলেন, আমি বিশ্বাস করি এই Compassionate Love মস্তিষ্কের স্বতন্ত্র সিস্টেম থেকে জন্মগ্রহণ করে। সারাবিশ্ব জুড়ে নারী ও পুরুষের মাঝে রোমান্টিক ভালোবাসা ও আকর্ষণ স্বতন্ত্রভাবে খুব সহযে পৃথক করা সম্ভব হয়েছে। কেনিয়ার তাইতা বলেছেন, ভালোবাসার দুটি ফর্ম আছে, দুর্দমনীয় দৈর্ঘ যেটি এক প্রকার অসুস্থ্যতা আর অন্যটি গভীর, ও স্থিতিশীল এফেকশন। ব্রাজিলিয়ানরা বলেন, ভালোবাসা জন্মে দৃষ্টি ও হাসি থেকে। কোরিয়ানদের জন্য সারাং হল এমন একটি শব্দ যা ওয়েস্টার্ন কনসেপ্ট রোমান্টিক ভালোবাসার সমরূপ যেখানে Chong হলো, লং টার্ম এটাচমেন্ট।
 
ভালোবাসার উন্নতি সমস্ত বিশ্বজুড়েই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অ্যাবিগাইল অ্যাডামস, আমেরিকার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্টের বউ তার স্বামীকে লিখেছেন, Years subdue the ardor of passion but in lieu thereof friendship and affection deep-rooted subsists.
 
এর পূর্বে আমরা কালাহারি মরুভূমির নিশার কথা আলোচনা করেছিলাম। যে নিজেও এ চাপটা অনেক স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন, যে বলেছিল, যখন দুটি আত্মা পরস্পর কাছাকাছি আসে, তাদের হৃদপিন্ডে আগুন ধরে যায় ও আবেগ হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। এরপর এ আগুন আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে যায় আর এরপর এটি ঠিক সেরকমই থাকে। তারা একে অপরকে তখন নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভালোবাসতেই থাকে। কিন্তু ভিন্ন উপায়ে। উষ্ণ ও নির্ভরশীল।
 
 
এই সাধারণ প্রেম সত্ত্বেও, ফিশার প্রস্তাব করেছেন তিনটি ব্রেন সিস্টেম __ Lust, Romantic Love and Attachment যেকোনো ক্রমেই জ্বলে উঠতে পারে। কিছু লোক প্রথমে সেক্স করে এবং তারপর প্রেমে পড়ে। কেউ অত্যন্ত উন্মাদভাবে যে কারো প্রেমে পড়ে এবং শুধু দেখা করে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পথিমধ্যে তারা সেক্স করে। আবার কেউ সোশ্যাল সার্কেলের কারো সাথে ডিপ এটাচম্যান্ট তৈরি করে, তারপর প্রেমে সাইকো হয়ে যায় ও তার সাথে সেক্স করে। তারপরও, আসক্তি ও রোম্যান্টিক ভালোবাসা প্রথমেই ট্রিগার হয়, যা একসময় গভীর আকর্ষণে পরিণত হয় যেটাকে মনোবিজ্ঞানী থিওডোর রেইক বলেছিলেন “afterglow”!
 
পশ্চিমারা রোম্যান্টিক ভালোবাসা পছন্দ করে। আমাদের মুভি, নাটক, ওপেরা, বেলেট, সং অথবা পয়েম একই আবেগ উদযাপন করে। যেটাকে প্রাচীন গ্রীকরা মেডনেস অব গড বলতেন। আমরাও সেক্স ড্রাইভ উপভোগ করি। কিন্তু আমি মনে করি সংযুক্তি __যেটি হলো সন্তুষ্টির উপলব্ধি, শেয়ারিং এবং মহাজাগতিক একতা, আর অন্যটি হলো এ তিনটি বেসিক ড্রাইভের মধ্যে সবচেয়ে মার্জিত। আপনারা একসাথে স্টেডিয়ামে খেলা দেখেন, একইসাথে সিনেমা দেখা বা গান, হাত হাত রাখে হেঁটে চলা। যেনো গ্রহ নক্ষত্রের সাথে পদার্থবিজ্ঞানের সুত্র দ্বারা সমস্ত মহাবিশ্বের সাথে একই তান, লয়, রাগ আর রাগীনিতে মিশে যাওয়া।
 
 
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাই নি,
তোমায় দেখতে আমি পাই নি।
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে..
 
তুমি মোর আনন্দ হয়ে
ছিলে আমার খেলায়,
তুমি মোর আনন্দ হয়ে
ছিলে আমার খেলায়,
আনন্দে তাই ভুলেছিলেম,
আনন্দে তাই ভুলেছিলেম,
কেটেছে দিন হেলায়।গোপন রহি গভীর প্রাণে
আমার দুঃখ-সুখের গানে,
গোপন রহি গভীর প্রাণে
আমার দুঃখ-সুখের গানে,
সুর দিয়েছ তুমি,
আমি তোমার গান তো গাই নি,
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাইনি,
তোমায় দেখতে আমি পাইনি।
 
 
 
সম্ভবত আজ থেকে ৩.২ মিলিয়ন বছর পূর্বে লুসির মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম এই শান্তি, এ স্বর্গ, এ মহাজাগতিক একতা নেমে এসেছিলো, সম্ভবত সে তার স্পেশাল ফ্রেন্ডের বাহুতে মাথা রেখে দীর্ঘক্ষণ শুয়েছিলো। আমি বলতে চাইছি যে পার্টনারের প্রতি ডিপ এটাচম্যান্ট উত্তপ্ত হয়েছিল ম্যামেলদের মস্তিষ্কে। আর এই এট্যাচম্যান্ট সম্ভবত হয়তো পেয়ার বন্ডিং এর সাথেই বিবর্তিত হয়েছিলো একসাথে হাতে হাত রেখে। স্পেশাল ফেন্ড্ররা ছিলো মূলত বেবুনদের একদল থেকে অন্য আর একটি দলে প্রবেশের সার্টিফিকেট। বেবুনরা ৬০-৭০ জনের এক একটি দলে বাস করতো। যখনই তারা নতুন কোনো দলে যোগ দিতে চাইতো তখন তারা সে দলের একজন নারীর সাথে প্রেম করতো। সে নারীটির সাথে অন্য কোনো পুরুষ প্রেম করতে চাইলে তাদের স্পেশাল ফ্রেন্ডরা তাদের এ কর্মকান্ডে ইন্টারফেয়ার করতো আর যার ফলে নারী ও পুরুষ একে অন্যের সাথে একসাথে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। আমাদের পূর্বসূরি লুসিরও হয়তো তেমন কোনো স্পেশাল ফ্রেন্ড ছিলো। হয়তোবা ৩.৬ মিলিয়ন বছর পূর্বের সেই পায়ের ছাপ তারই কোন স্পেশাল ফ্রেন্ডের। আমাদের পূর্বসূরি পুরুষ ও নারীরা প্রায়ই বয়সন্ধীতে তাদের জন্মগত গ্রুপ ত্যাগ করতো আর এ জন্য তরুণরা তাদের রেসিডেন্ট পরিবর্তন করেছিল। তারা এভাবে বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে বিরাট নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলতো। আর এ জন্য তারা স্পেশাল ফ্রেন্ড তৈরি করতো। কিন্তু কোন কারণে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হলে তারা একে অপরকে ত্যাগ করতো এবং নতুন কোনো স্পেশাল ফ্রেন্ড তৈরি করতো। আর এভাবে হয়তো তাদের মধ্যে যুগল প্রেম আরো গভীর হয়ে উঠে।
 
পুরুষরা অধিক আকর্ষণীয় এস্ট্রাস নারী খুঁজতো আর নারীরা খুঁজতো অধিক বন্ধুসূলভ, মনোযোগী ও খাদ্য ভাগ করতে ইচ্ছুক বন্ধু। ৩ মিলিয়ন বছর পূর্বে লুসি যদিও সিরিয়াল মনোগামী গঠন করতো, তারপরও সে মাঝেমাঝে এডাল্ট্রিতে জড়িত হতো, গোপন পরকীয়ার সম্পর্ক! তরুণরা যুগল প্রেম গঠন করতো, সন্তান বড় হলে সেটি ভেঙে ফেলতো আবার গঠন করতো নতুন প্রেম।
 
 

সহচর ভালোবাসা

মোরা আর জনমে হংস–মিথুন ছিলাম নদীর চরে
যুগলরূপে এসেছি গো আবার মাটির ঘরে।।
তমাল তরু চাঁপা–লতার মত
জড়িয়ে কত জনম হ’ল গত,
সেই বাঁধনের চিহ্ন আজো জাগে হিয়ার থরে থরে।।
বাহুর ডোরে বেঁধে আজো ঘুমের ঘোরে যেন
ঝড়ের বন–লতার মত লুটিয়ে কাঁদ কেন।
বনের কপোত কপোতাক্ষীর তীরে
পাখায় পাখায় বাঁধা ছিলাম নীড়ে
চিরতরে হ’ল ছাড়াছাড়ি নিঠুর ব্যাধের শরে।।
 
 
 
এটাচমেন্টের সাইকোলজিক্যাল ইনভেস্টমেন্টের উপর ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট জন বোলবি ও আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট মেরি আইনওয়ার্থ ১৯৭৩ সালে Cognitive Vulnerability and attachmentশিরোনামে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন। তারা প্রস্তাব করেন, তরুণদের টিকে থাকাকে প্রমোট করার জন্য প্রাইমেটদের মধ্যে একটি সহযাত এটাচম্যান্ট সিস্টেম ডিজাইন করা হয়েছে, যা শিশুদেরকে আনন্দ ও নিরাপত্তা অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে তাদের প্রাথমিক কেয়ার গিভারের কাছ থেকে, বিশেষ করে মা। এরপর এর উপর আরো গভীর গবেষণা পরিচালিত হয়। বিশেষ করে এটাচমেন্ট সিস্টেমের সাথে সম্পৃক্ত বায়োলজিক্যাল ম্যাকানিজম,আচরণ ও অনুভূতি নিয়ে। কিন্তু কিভাবে এ ব্রেন সিস্টেম জেনারেট হয়েছে, কেনো আমরা প্রাণপ্রিয়ের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করি তা জানার জন্য আমরা আবারও আমেরিকার প্রেইরি ভোলদের সাথে পরিচিত হবো।।

 

স্যাটিসফ্যাকশন হর্মোনঃ

 
এক ধরণের বাদামী ইঁদুর আছে যারা নির্দিষ্ট পার্টনারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রণীদের মস্তিষ্কের এ ম্যাগনেটিজম আসলে স্তন্যপায়ীদের ডোপামিন সিস্টেমের সাথে সম্পৃক্ত। আমরা জানি যে অধিকাংশ মামেলই যুগল বন্ধন গঠন করেনা। কিন্তু প্রেইরি ভোল তাদের তরুণদের লালন পালন করার জন্য যুগল প্রেম গড়ে তোলে। তারা তাদের জীবনের ৯০ ভাগ সময় যুগল বন্ধনে বন্ধী থাকে। আর বিজ্ঞানীরা এই আকর্ষণের প্রাইমারি কারণ এক্সপ্লোর করেছেন। একজন পুরুষ যখন নারীর যৌনিতে বীর্য স্থাপন করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট এলাকার ভেসোপ্রেসিন নির্গত হয়। এটি স্পাউজাল ও প্যারেন্টিং এর আগ্রহ ক্রিয়েট করে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে The Oxytocin- Vasopressin pathway in the brain নামক একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয় NCBI জার্নালে। সেখানে বলা হয় ভেসোপ্রেসিন ও অক্সিটোসিন হলো স্বতন্ত্র মলিকউল; এর পেপটাইব ও রিসেপ্টর (OT receptor(OTR) and V1 receptor( V1ar)] বিবর্তিত হয়েছে একটি অখন্ড ও অভিযোজনীয় সিস্টেম হিসেবে। আর এই ইন্টেগ্রেডেট ও এডাপ্টিভ সিস্টেমের নাম OT-VP Pathway। এটি হলো সুদূর প্রাচীন পেপটাইড, VP ও V1aR একজন ব্যক্তির সার্ভাইভালে সাপোর্ট করে এবং প্রতিরক্ষামূলক কাজে একটি ভূমিকা পালন করে যার মধ্যে অস্থিরতা ও আগ্রাসন জড়িত। OT ও OTR ইতিবাচক সামাজিক আচরণের সাথে এটি জড়িত ও এটি সামাজিক এটাচম্যান্ট ও ভালোবাসার বায়োলজিকাল মেটাপর।
 
কিন্তু প্রশ্ন হলো ভেসোপ্রেসিন কী আসলেই পুরুষের মস্তিষ্কে এটাচম্যান্ট তৈরি করে? আধুনিক গবেষণা অনুসারে এর উত্তর, হ্যাঁ। কারণ ল্যাবরেটরিতে যখন ভার্জিন পুরুষ প্রেইরি বোলের মস্তিষ্কে ভেসোপ্রেসিন ইনজেক্ট করা হয়েছিল, সে সাথেসাথেই মেটিং এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে এবং টেরিটরিকে অন্যান্য পুরুষ থেকে রক্ষা করতে শুরু করলো। এবং যখন নারীদের সাথে তাদের সাক্ষাৎ করানো হয়, তারা নারীর প্রতি অনেক বেশি আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। কিন্তু যখন তার মস্তিষ্কে বেসোপ্রেসিনের প্রোডাকশন কমিয়ে দেয়া হলো তখন সে একটি নারীর সাথে সহবাস করার পর , সে নারীটিকে পরিত্যাগ করেছিল যাতে সে অন্যদের সাথে মেটিং করতে পারে। কিন্তু লক্ষনীয়ভাবে, যখন নিউরোসায়েন্টিস্ট ল্যারি ইয়ং এবং তার সহকর্মী একটি ভালো ভাইরাস ডেভেলপ করলো যার মধ্যে ভেসোপ্রেসিনের জেনেটিক কোড রয়েছে এবং অন্য এক প্রজাতির মিডো ভোলের মধ্যে ইনজেক্ট করেন  এ প্রাণীটিও ( যে Pair-bond ক্রিয়েট করেনা) সাথেসাথে তার সাম্প্রতিক সেকচুয়াল পার্টনারের প্রতি সলিড  এটাচমেন্ট অনুভব করতে শুরু করে এবং আমার এ আর্টিকেলের আরো একটি উল্লেখযোগ্য বার্তা হলো যা হেলেন ফিশারও মনে করেন, যে সকল পুরুষের ভেসোপ্রেসিন ট্রান্সমিশনের সাথে সম্পৃক্ত জিন রয়েছে তাদের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক গঠন করার একটি প্রবণতা দেখা যায়।
 
এই পার্টনারাল প্রবণতা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে৷ এর পেছনে অন্তত একটি বায়োলজিক্যাল উপাদান রয়েছে। হেলেন ফিশার তার এনাটমি অব লাভ গ্রন্থে বলেন, আমাদের মস্তিষ্কে এ নিউরাল সার্কিট Evolve হয়েছে আজ থেকে ৩.২ মিলিয়ন বছর পূর্বে লুসি ও তার স্পেশাল ফ্রেন্ডের সময়কালে, যখন তারা হেঁটেছিল এ পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায়।
 
 

 

কেনো রিয়েলিটি ও ফ্যান্টাসির তারতম্য মুছে যায়? কেনো মনে হয় সে ছাড়া এ মহাকাশ একটা ড্যাস?

 
 
 
আমাকে ভালবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,
বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চূড়োতে,
ঘাস ভেবে দু-পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,
লাল টুকটুকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।
না-খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে
থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়
ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।
তোমার যে ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক,
আমাকে ভালবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খঁসে প’ড়ে
সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।
আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।
নিজেকে দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত মনে হবে যেনো তুমি শতাব্দীর পর শতাব্দী
শুয়ে আছো হাসপাতালে। পরমুহূর্তেই মনে হবে
মানুষের ইতিহাসে একমাত্র তুমিই সুস্থ, অন্যরা ভীষণ অসুস্থ। (হুমায়ুন আজাদ)
 
 
 
অজস্র কবি এটাচম্যান্ট নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কেউ বলেছেন, ভালোবাসা কোয়ান্টাম এন্ট্যাংগেলমেন্টের মতো, সিঙ্গুলারিটি পয়েন্টের মতো, যে গ্যালাক্সির ব্যাসার্ধ মানেনা, যার নিকট নেই স্থান ও কালের উপলব্ধি। এটাকে বলা হয় Sense of Cosmic Oneness! যখন দুজন মানুষ একে অন্যের সাথে গভীর এটাচম্যান্টে আসে , তখন তাদের দুজন ছাড়া এ মহাবিশ্বে আর কোন গ্রহ নেই, নক্ষত্র নেই, যেনো তারা একা ও একমাত্র! আর এটাচম্যান্টের এ উপলব্ধির সাথে আরো একটি কেমিক্যাল জড়িতঃ অক্সিটোসিন, একটি নিউরো-কেমিক্যাল যেটি খুব ক্লোজলি ভেসোপ্রেসিনের সাথ সম্পৃক্ত, প্রকৃতিতে যেটি সমানভাবে সর্বব্যাপী।
 
 
তুমি পাশে থাকলে মহাবিশ্ব এক মুঠো ছাই, চাইলেই মিল্কিওয়েকে ”ফুঁ” দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যায়!
 
 
 
ভেসোপ্রেসিনের মতোই অক্সিটোসিন হাইপোথালামাসে তৈরি হয়। সকল নারী মামেলের মধ্যে জন্ম প্রক্রিয়ার সময় অক্সিটোসিন রিলিজ হয়। এটি জরায়ু সংকোচনের সূচনা করে এবং ম্যামারি গ্ল্যান্ডকে উদ্দীপিত করে যার ফলে দুধ তৈরি হয়। এই অক্সিটোসিনের কারণেই মা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন তৈরি হয়। এবং অধিক থেকে অধিকতর ডেটা বলছে যে, অক্সিটোসিন এটাচম্যান্টের ফিলিংস তৈরি করে পছন্দের কোন একজন পার্টনারের প্রতি। ফ্রয়েড বলেছিলেন, সন্তানের সাথে মায়ের সেকচুয়াল সম্পর্ক বিদ্যমান। যদি অক্সিটোসিন প্রেমের অনুভূতি জন্ম দেয় এবং একই অক্সিটোসিন গড়ে তোলে মাতৃত্বের বন্ধন তবে আমরা কোনোভাবেই ফ্রয়েডের কথাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিতে পারিনা। এবং রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কবিতায়ও তার মায়ের প্রতি সাব- কনসাস সেকচুয়াল ইনটেনশন প্রকাশিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। সে যাইহোক।  অক্সিটোসিনই সন্তান ও প্রেমিকের সাথে বন্ডিং ক্রিয়েট করে। একটিতে ফিজিক্যাল এটাচম্যান্ট কাজ করে আর অন্যটিতে কাজ করে শুধু একতা। আমরা যখন সেক্স করি তখন আমাদের ব্রেন Now’ তে যেনো স্থির হয়ে যায়, মনে হয় যেনো গতকাল বা আগামীকাল কোনোটাই নেই, এ মুহূর্তই সবকিছু। আর আমাদের মধ্যে এ Connection ক্রিয়েট করে অক্সিটোসিন। অন্য আর কোন শক্তি নয়।
 
 
 

ভালোবাসার ওয়েভ ফাংশনঃ

 
হেলেন ফিশার তার  ”The anatomy of Love” গ্রন্থে লিখেন আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে তিনটি ক্ষমতাবান সিস্টেম কাজ করছে যা আমাদের সামাজিক ও প্রজননগত জীবনের মেট্রিক্স।
 
 
১. সেকচুয়াল ড্রাইভঃ যেটি আমাদের মধ্যে বিভিন্ন সঙ্গী অনুসন্ধানের জন্য অনুপ্রেরণা দেয়। এ পর্যায়ে পৃথিবীর সকল নারীই বা পুরুষই আমাদের পটেনশিয়াল লাভার।
 
২. রোম্যান্টিক ভালোবাসাঃ যে জন্য আমরা কোন একজন নির্দিষ্ট পার্টনারের প্রতি মনোযোগে দেয়ার এনার্জি প্রাপ্ত হই।
 
৩. ডিপ এটাচম্যান্টঃ যার জন্য কিনা আমরা বিশেষ কারো সাথে অবস্থান করি, যে ছাড়া এ মহাবিশ্বে একটা হিলিয়াম বা হাইড্রোজেনও নেই, সে আমাদের কাছে এক, অদ্বিতীয়, চুড়ান্ত ও বিশেষ। আর এই Sense of Unity আমাদেরকে গ্রেভিটেশনাল ফোর্সের মতোই টেনে ধরে রাখে আর এ জন্য সম্পর্কটি অন্তত সন্তান জন্মের ৪ বছর পর পর্যন্ত টিকে যায়।
 
 
এ প্রতিটি ব্যাসিক ড্রাইভ ভিন্ন ভিন্ন আচরণ তৈরি করে, আশা, অনুভূতি ও স্বপ্ন। এবং প্রতিটি জড়িত ভিন্ন ভিন্ন নিউরোকেমিক্যাল সিস্টেমের সাথে। প্রবল আগ্রহ জড়িত প্রাথমিকভাবে হর্মোন টেস্টোটেরনের সাথে, নারী ও পুরুষ উভয়ের মাঝেই। রোম্যান্টিক ভালোবাসা সম্পৃক্ত ন্যাচারাল স্টিমুলেশন ডোপামিনের সাথে, এবং সম্ভবত নরপাইনফ্রাইন ও সেরেটোনিনের নিন্মমাত্রিক একটিভিটি জড়িত রয়েছে। যেখানে ডিপ এটাচম্যান্ট তৈরি হয় নিউরোপেপটাইড, অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিন দ্বারা।
এবং সকল সার্ভাইভাল ম্যাকানিজম যা মানব মনের প্রাইভেটিভ সার্কিটে চলাচল করে। এ জন্য হেলেন ফিশার প্রস্তাব করছেন যে, লালসা, রোম্যান্টিক ভালোবাসা এবং এট্যাচমেন্ট শুরু হয়েছে আমাদের পূর্বসুরীদের থেকে যারা বৃক্ষ থেকে নেমে প্রথম দু-পায়ে ভর করে হাঁটতে শেখে এবং যুগন বন্ধন গঠন করে, অসহায় তরুণ শিশুদের লালন পালন করার জন্য অন্তত তাদের কিশোরে পরিণত করা পর্যন্ত।’
 
 
৩.২ মিলিয়ন বছর পূর্বে। লুসি অনুভব করেছিল যৌন লালসা, অনুভব করেছে পরমানন্দ, তার সঙ্গীর প্রতি গভীর এটাচম্যান্ট। সে অনুভব করেছিল মহাজাগতিক সিম্ফোনি, কখনো কখনো আবার সুরের অনৈক্য, এক্সাইটিং এবং প্রশান্তিময় কোন এক সংবেদন আর একটা সময় যখন সন্তান বড় হয়ে যায় লুসি আকস্মিক তার প্রেমিকের প্রতি তার ভালোবাসা হারায়, তার মস্তিষ্ক আর সুখ পায়নি,আর হয়তোবা লুসির শব্দহীন ফেশিয়াল এক্সপ্রেসনে সেদিন ভেজে উঠেছিলো বিমূর্ত সংগীত –
 
 
ভালোবেসে যদি সুখ নাহি তবে কেন,
তবে কেন মিছে ভালোবাসা।
মন দিয়ে মন পেতে চাহি। ওগো কেন,
ওগো, কেন মিছে এ দুরাশা॥
হৃদয়ে জ্বালায়ে বাসনার শিখা, নয়নে সাজায়ে মায়ামরীচিকা,
শুধু ঘুরে মরি মরুভূমে। ওগো, কেন
ওগো, কেন মিছে এ পিপাসা॥
 
 
 
Early Humans | HISTORY Channel
 
 
কিন্তু মস্তিষ্কের এ সিস্টেমের বিবর্তন লুসির জীবনে হয়তো একটি দূর্যোগ নিয়ে এসেছিল। যেমন দূর্যোগ আজও নেমে আসে। এটি প্রকৃতিরই একটি লিলা। কারণ এ তিনটি ব্রেন সিস্টেম একে অপরের সাথে পুরোপুরিভাবে Connected নয়। আর জন্য আপনি যদি আপনার সঙ্গীর প্রতি দীর্ঘকালীন বন্ধনের আকর্ষণ অনুভব করেন, তবে আপনি সোশ্যাল সার্কেলের কারো কারো প্রতি অনুভব করবেন রোম্যান্টিক অনুভূতি আবার এদিকে অন্যদের প্রতি কাজ করবে যৌন বাসনা। মূলত আমরা আবেগগতভাবেই অসম্পূর্ণ, আমাদের মনে বিপুল জটিলতা __যা আমাদের মধ্যে জেলাসি ও পসেসিভনেস ও ঘৃণা, তীব্র লালসা ও ভালোবাসার জন্ম দেয়। আর এগুলো সবই আদিম, সর্বব্যাপী ও দীর্ঘস্থায়ী ল্যাগেসি যা আর্দি ও লুসির যুগ থেকেই এসেছে।
 
 
 

সন্দেহ ও জেলাসি

 
সম্পর্ক রক্ষা করার জন্য জেলাসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইমোশন। বুসের মতে, মূলত সেকচুয়াল স্বতন্ত্রতা রক্ষা করার জন্যই জেলাসি বিবর্তিত হয়। সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীতাগুলো পূরণ করার জন্য বিশেষ করে তার খাদ্য ও তাকে শিকারী প্রাণীদের থেকে রক্ষা করা। আমরা যদি মুরগীর বাচ্ছাকে স্পর্শ করি তবে তাদের মা আমাদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ করে। অতএব দেখা যাচ্ছে, জেলাসি আমাদের বিবর্তনীয় অতীতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছিল। এই তত্ত্ব অনুসারে, সেকচুয়াল স্বতন্ত্রতা হারিয়ে ফেলা পুরুষের জন্য খুবই ব্যয়বহুল। কারণ একজন পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে অন্যকোনো নারীর সাথে DNA এক্সচেঞ্জ করার অনুমোদন দেয় তবে তার জিন ভবিষ্যত প্রজন্মে যেতে পারবেনা। জেনেটিক্যালি এটা খুবই অযৌক্তিক যে আমাদের পূর্বসূরিরা তাদের সঙ্গীর গর্ভে অন্য কারো জিন প্রবেশ করতে দেবে। নিজের মূল্যবান সময় ও শক্তি অপচয় করে অন্য কারো জিনকে প্রমোট করবে। আর এ জন্য পুরুষরা সেকচুয়ালি অনেক বেশি জেলাস হয়।
 
আর অন্যদিকে, এ তত্ব অনুসারে, গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি রক্ষা করা আমাদের এনসেস্ট্রাল নারীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যাতে করে তারা সন্তানদের টিকে থাকাকে সুনিশ্চিত করতে পারে । অতএব পুরুষ সদস্যটি যদি অন্য কোন নারীর সাথে সম্পর্কে জড়ায় তবে এক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের সাথে সম্পত্তি ডাইভার্সন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর মানে হল যে , নারীরা বিবর্তিত হয় ইমোশনালি অধিক জেলাস হয়ে। ১৯৯২ সালে বুস এ নিয়ে একটি স্টাডি পরিচালনা করেছিলেন সেখানে দেখা হয় যে, একজন পুরুষ তার সঙ্গীর সাথে অন্য পুরুষের সেকচুয়াল সম্পর্ককে অনেক বেশি কষ্টদায়ক মনে করেন( 60% Compared to 40%) , যেখানে খুবই তাৎপর্যপূর্ণভাবে অধিক সংখ্যক নারী বলছেন যে, ইমোশনাল দৃশ্য অনেক বেশি যন্ত্রণার( 83% Compared to 17%)।
 
 
 
 
২০১৫ সালে পরিচালিত একটি এক্সপেরিমেন্টে এ তত্ত্বটি আবারও সত্য প্রমাণিত হয়। যখন পুরুষদেরকে তাদের পার্টনাদের সেকচুয়াল বিশ্বস্ততার ফেচবুক মেসেজ প্রদর্শন করা হয় তারা খুবই পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠেছিল। আর নারীরা সে সকল ফেচবুক মেসেজের প্রতি মনোযোগ প্রদান করেছিল যেগুলো আবেগীয় অবিশ্বস্ততার প্রতিনিধিত্ব করে৷ পরবর্তী একটি গবেষণায় যে আর্টিকেলটি Are we still jealous? Infidelity in the age of Social Media‘ শিরোনামে প্রকাশিত হয় সেখানে বলা হয়, যখন পার্টিশিপেন্টদেরকে স্ন্যাপচেটের আরো রিয়েলিস্টিক অবিশ্বস্ততা প্রদর্শন করা হয়েছিল , তারা ফেচবুকের তুলনায় আরো বেশি জেলাসি প্রদর্শন করেছিল। এক্ষেত্রে আরো একটি মজার বিষয় বেরিয়ে আসে, দেখা যায় যে, একজন নারীর নিকট তার পার্টনার ছাড়া যখন অন্য কোন নারী  মেসেজ সেন্ড করে সে খুব ডিসকম্পোর্ট ফিল করে। এ স্টাডি পূর্বের একটি গবেষণাকে সত্যায়িত করে, যে নারীরা সামঞ্জস্যতাহীন এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিকতার সাথে পুরুষকে অবিশ্বস্ত মনে করতে পারে। এ গবেষণাপত্রটি The International objects of Jealousyশিরোনামে APA Psynet এ প্রকাশিত হয়েছিল। সায়েন্টিফিক আমেরিকা  ও ন্যাচারে  Dog Experience Jealousy শিরোনামে  আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে বলা হয়, কুকুরও জেলাসি ফিল করে। সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে জেলাসি মানুষের মধ্যেই কমন কারণ তাদের আবেগ জটিল ও তাদের মধ্যে রিলেশন প্রোটেক্ট করার জটিলতা কাজ করে। অধিকাংশ গবেষণাই বলছে জেলাসি রোম্যান্টিসিজমের সাথে সম্পৃক্ত এবং Potential Infidelity এর সাথে। কিন্তু সায়েন্টিফিক আমেরিকানে বলা হয়, গবেষকরা এটাও উল্লেখ করেন যে জেলাসি সবসময় সেক্সের সাথে সম্পৃক্ত নয়, যা সন্তান, ভাইবোন অথবা সহকর্মীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। তারা বলছেন, Its Most basic level, Evolved to Protect any Social relationship from interloper. এর মানে হলো জেলাসি সম্ভবত সামাজিক প্রাণীদের মধ্যেই অস্তিত্বশীল।
 
১৯৮৩ সালে পরিচালিত র্যাঙ্কর আফেরিয়ারির একটি গবেষণাপত্রে বলে বলা হয়, একবার Gombe Stream Reserve, তানজানিয়ার একটি নারী শিম্পাঞ্জি একজন তরুণকে আলাদা করেছিল সেক্স করার জন্য। কিন্ত পুরুষটি মহিলাটির যৌন অঙ্গভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করে তার কন্যার সাথে সেক্স করতে শুরু করেছিল , যার নাম POM। আর এতে মহিলাটি রাগান্বিত হয়ে ছুটে এসে তাকে প্রচন্ড জোরে চড় মারে। একবার নৃবিজ্ঞানী ডেভিড বারাস Blue Bird দের এনুয়াল সেক্সে ডিস্টার্ব করে, যখনই মাত্র তারা সেক্সে যোগ দেবে ঠিক তখন তিনি একটি স্টাফ ( নকল) ব্লু-বার্ড এক মিটার দূরে রেখে দেন।। পুরুষটি বাসা থেকে বেরিয়ে আসে, কর্কশ স্বরে শব্দ করে, ঘুরতে থাকে, এবং ডামিতে কামড় বসায়। সে তার স্ত্রীকেও আক্রমণ করে, তার ডানা থেকে কিছু প্রাথমিক পালক তুলে নেয়। সে উড়ে যায়। দুদিন পর নতুন স্ত্রী প্রবেশ করে। আসলে পসেসিভনেস একটি জেনেটিক্যাল লজিক। জেলাস পুরুষরা খুবই জ্বালাময়ীভাবে তার পার্টনারকে গার্ড দেয়।
 
 
পুরুষটি আসলে নারীর বডিগার্ড। আর এভাবে জেলাস মেল খুব সহযে তার জিনকে ভবিষ্যত প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে পারে। আর জেলাস নারী যারা অন্য নারীদের প্রতিহত করে তারা অধিক প্রোটেকশন ও সম্পত্তি অর্জন করতে পারে যা তারা তাদের সন্তানের জন্য বিনিয়োগ করে। জেলাসি মহিলাদেরকে পরকিয়া করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আর পুরুষও নারীকে খুব সহযে ছেড়ে দিতে পারেনা।
 
কিন্তু কিভাবে মানুষের মস্তিষ্কে জেলাসি তৈরি হয়? খুব সম্ভবত ভেসোপ্রেসিন জেলাসির সাথে সম্পৃক্ত কারণ এ ভেসোপ্রেসিনের উপস্থিতিতেই পুরুষ প্রেইরি ভোল তার সঙ্গিনীকে খুব তীব্রভাবে গার্ড দেয়। এবং ন্যাশনাল লাইব্ররী অব মেডিসিন বা NCBI এর ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলেও বলা হয় ভেসোপ্রেসিনের কারণেই একজন পুরুষ সবসময় নারীর পেছনে বডিগার্ড ও সিকিরিটি গার্ডের মতো লেগে থাকে। সেখানে বলা হয়, Vasopressin is considered the more ancient molecule, with a central role in defense. OT, especially in a context of safety, may override the defensive functions of VP helping to facilitate the evolution of the complex cognition and selective sociality associated with human behavior, including social attachment and love.
 
সেক্সের প্রতি আমাদের যে কামনা, রোম্যান্টিকতার প্রতি যে আসক্তি; সঙ্গীর জন্য আমাদের Sense of attachment আমাদের পসেসিভ জেলাসি, দীর্ঘকালীন সম্পর্কে আমাদের অস্থিরতা; পরবর্তী কোন নারীর জন্য তার মধ্যে অন্তহীন আশাবাদ, এ সকল আবেগ আমাদের ঘুড়ির মতো আকাশে ওড়ায়, এক অনুভূতি থেকে অন্য অনুভূতিতে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু এ সকল ক্যালিডোস্কোপিক আবেগ আমাদের সিরিয়াল মনোগামীর প্রাচীন স্বভাবের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সম্ভবত কোনোটাই ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যত হওয়ার বা তার ঘৃণায় পরিণত হওয়ার চেয়ে কম যন্ত্রণাদায়ক নয়__যা আমাদের মধ্যে ভালোবাসার আসক্তি জন্ম দেয়।
 

 

ভালোবাসার কী এডিকশন?

 
ভালোবাসা মানুষকে আসক্ত করে ফেলে। সে এ আসক্তি ততদিন পর্যন্ত তার জীবনের জন্য মঙ্গলজনক যতদিন সবকিছু ঠিক থাকে। কিন্তু এই এডিকশন নেগেটিভ আকার ধারণ করতে পারে যখন সম্পর্ক ভেঙে যায়। আমাদের ভালোবাসার এ আসক্তিও Evolve হয়েছিল ৩.২ মিলিয়ন বছর পূর্বে ইস্ট আফ্রিকাতে। রোমান্টিক প্রেমে অনেক সময় সুখী প্রেমিকরাও এডিকশনের শিকার হয়। নারী ও পুরুষ তাদের ভালোবাসার মানুষের প্রতি ফিজিক্যাল ইউনিয়ন অনুভব করে। কামনা হলো তাদের এডিকশনের সেন্ট্রাল উপাদান। একজন প্রেমিক যখনই তার প্রেমিকার কথা ভাবে তখনই তার মধ্যে এক প্রকার উল্লাস তৈরি হয় এবং গঠিত হয় ইনটক্সিকেশন।
 
একবার যখন তাদের অবসেশন বিল্ডাপ হয়ে যায় তারা তাদের প্রেমিকার সাথে বারবার দেখা করতে চায়। এর কারণ আমরা যখন কারো প্রেমে পড়ি তখন আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম ট্রিগার হয়, আমরা সুখ লাভ করি, মস্তিষ্কের ডোপামিন,  রিলিজ হলে আমরা আনন্দ পাই, আর এ আনন্দের উপলব্ধি আমাদের মস্তিষ্কের প্রেমিকার স্মৃতি গেঁথে দেয়। আমাদের পূর্বসূরীদের ব্রেন যখন কোনকিছুর প্রভাবে ইমোশাল হয়ে উঠতো বা রিওয়ার্ড সিস্টাম ট্রিগার হতো, তখন তাদের মস্তিষ্কে সেই স্মৃতি গেঁথে যেতো আর এর ফলে তারা বারবার আনন্দের সে সোর্সের কাছে ফিরে যেতো। ফেচবুকের লাইক, কমেন্ট, শেয়ার এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন সার্কিটকে ট্রিগার করে যার ফলে আমাদের মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ মেমরিজুড়ে এখন ফেচবুক, ইউটিউব ইত্যাদি ঘুরে বেড়ায়। আর আমরা বারবার একই স্টিমুলেশন পাওয়ার জন্য ফেসবুকের কাছে ছুটে আসি।। একইভাবে প্রেমে পড়লে আমাদের মস্তিষ্কে সাধারণত সুখের সাথে জড়িত নিউরাল সার্কিট ট্রিগার হয়, আমাদের মস্তিষ্কে প্রেমিকার স্মৃতিগুলো গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠে আর আমরা ফেচবুক বা কম্পিউটার গেইমস বা পর্ণের  মতোই প্রেমিকার কাছে বারবার ছুটে যাই। আর এভাবেই এটি এডিকশনে পরিণত হয় যায়। আমাদের ব্রেন বারবার একই স্টিমুলেশন পেতে চায়। প্রেমিকের মস্তিষ্কে অনির্থক জটিল চিন্তা তৈরি হয় যা ফান্ডামেন্টালি ড্রাগের উপর নির্ভর করে। তার বাস্তবতা বিকৃত হয়ে যায় ভালোবাসার মানুষের সাথে নিজেকে সমন্বয় করার জন্য, সে তার জীবনের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করে ফেলে। এমনকি তাদের ব্যক্তিত্বও পরিবর্তন হয়ে যায় যেটাকে বলা হয় “Affect Disturbance”! আবার কেউ কেউ প্রেমিকার জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, মৃত্যুও তার কাছে তুচ্ছ ও নগন্য একটা অনু বা পরমাণু হয়ে যায়।
 
একজন ড্রাগ এডিক্টেড ড্রাগ থেকে পৃথক হওয়ার পর তার মধ্যে যে উপলব্ধি তৈরি হয়, ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পৃথক হওয়ার পরও তার মধ্যে একপ্রকার Separation anxiety তৈরি হয়। সত্যি সত্যিই দূর্যোগে শুরু হয়ে যায়, যখন প্রেমিক প্রত্যাখ্যাত হয়। ড্রাগ ছাড়ার পর নারী ও পুরুষের মধ্যে যেমন উপলব্ধি হয় অনেকটা তেমন। তারা প্রতিবাদ করে, কান্নায় ফেটে পড়ে, অস্বাভাবিকভাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যায়, উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং তার মধ্যে ঘুমের অনিয়ম দেখা দেয়( অনেক সময় তারা অনেক বেশি ঘুমায় আবার কখনো একদম ঘুম আসেনা), খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, রোষ প্রবণতা এবং ক্রোনিক লোনলিনেস দেখা দেয়। এডিক্টেডদের মতো প্রেমিকের অবক্ষয় ঘটে। সম্পর্ক শেষ হওয়ার দীর্ঘদিন পরও, অতীতের ঘটনা, অতীতের স্থান, অতীতের গান এবং অন্যান্য বাহ্যিক সুত্রগুলো যা হারানো প্রেমিকার সাথে সম্পৃক্ত তা মেমরি ট্রিগার করে। আপনি ভালোবাসার মানুষের সাথে অতীতে যে সকল স্থানে ভ্রমণ করতে গিয়েছিলেন, সে সকল কবিতা আপনি তার জন্য লিখেছিলেন, তার জন্য যত ছবি আর গান রচনা করেছিলেন। তার ভালোলাগা রঙ, তার পছন্দের খাবার। সবকিছু আপনার চোখের পানির কারণ হবে। অন্তর ব্যাথায় রাইম্যানের বক্র জ্যামিতির মতো কুচকে যাবে। কাউকে বলতেও পারবেন না আর না পারবেন নিজের ভেতরের স্মৃতির নির্যাতন সহ্য করতে। আর এখান থেকেই কামনার দ্বিতীয় পর্য শুরু হয়, অতিরিক্ত চিন্তা, অমোঘ আহাজারি, লিখালিখি, প্রদর্শনী__ সবকিছুই পূনরুজ্জীবন রোম্যান্টিক আশা। একজন প্রেমিক এ স্মৃতির যন্ত্রণায় একসময় সর্বশান্ত হয়ে হয়তো এরকম কোনো কবিতা আবৃত্তি করতে পারে-
 
 
 

যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,

অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-

                      বুঝবে সেদিন বুঝবে!

                  ছবি আমার বুকে বেঁধে

                  পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে

                  ফিরবে মর” কানন গিরি,

                  সাগর আকাশ বাতাস চিরি’

                  যেদিন আমায় খুঁজবে-

                      বুঝবে সেদিন বুঝবে!

 

 

হেলেন ফিশার মনে করেন রোম্যান্টিক ভালোবাসা একটি এডিকশন। এটি তখনই পজেটিভ এডিকশন হয় যখন দুজনের পারস্পরিক সম্মতি ও মমতা থাকে, নন-টক্সিক হয় এবং এপ্রোপিয়েট। কিন্তু এটি খুব দুর্যোগময় হয়ে যায় যখন একজন ব্যক্তি অসম্পূর্ণ, পয়জনিয়াস ও পারস্পরিক সম্পর্কহীন রোম্যান্টিক ভালোবাসা অনুভব করে অথবা ফর্মালি রিজেক্টেড হয়।
 
 

পদত্যাগ ও হতাশা

 
 
 

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই

কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,

শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য।

বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই

কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে

কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না।

আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ

নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে।

আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক-

আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে কিনা,

পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা

তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা।

এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই

কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের দরোজা

খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।

কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে

জিজ্ঞেস করুক- তোমার চোখ এতো লাল কেন? (নির্মলিন্দু গুণ)

 
 
 
হতাশার এক দীর্ঘ রাত্রির শুরু হয়। একটা সময় সে তাকে খোঁজা বন্ধ করে দেয়। যেটি রোম্যান্টিক প্রেমের দ্বিতীয় দশা রেজিনেশন/ডিচপেয়ার। সে অলসতার এক মহাসমূদ্রে পা পিছলে পড়ে যায়। নিরাশা, ভগ্নহৃদয় ও ডিপ্রেসনই হয় তার জীবনের একমাত্র প্রতিক্রিয়া। ১৯৯১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১১৪ জন নারী ও পুরুষ সারা বিগত ৮ সপ্তাহ পূর্বে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্লিনিক্যালি পরিমাপ যোগ্য ডিপ্রেসনে ভুগেছে। কোন কোন ব্রোকেন হার্টেড প্রেমিক হার্ট এটাকে মারা গিয়েছিলে এবং ডিপ্রেসন থেকে তাদের স্ট্রোক হয়েছিল। এবং অন্যরা সুইসাইড করেছিলেন। নিশ্চিতভাবে প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকরা প্রতিবাদের এ সময়টিতে দুঃখ অনুভব করেন। তবে সমস্ত আশাই যখন শেষ হয়ে যায় তখন এটি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
 
এই হতাশার সাথে সাথে কয়েকটি ব্রেন নেটওয়ার্ক জড়িত। আবারও ডোপামিন সার্কিট খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। যখন রিজেক্টেড পার্টনার বুঝতে পারে যে রিওয়ার্ড আর কখনোই আসবেনা, ডোপামিন উৎপাদন কারী সেলগুলো তাদের একটিভিটি কমিয়ে দেয় যেখান থেকে অলসতা, হতাশা ও নৈরাশ্য তৈরি হয়। স্বল্পকালীন চাপ বৃদ্ধি করে ডোপামিন এবং নোরপাইনফ্রাইন। দীর্ঘকালীন চাপ নিউরোকেমিক্যালগুলোর একটিভিটি প্রতিরোধ করে এবং এতে করে হতাশার জন্ম দেয়। এই যে প্রতিবাদ, চাপ, ক্রোধ, পদত্যাগ এবং হতাশা; রিজেকশনের এ বিপর্যয়কর প্রতিক্রিয়াগুলোকে মনে হয় খুবই প্রোডাক্টিভ। প্রত্যাখ্যানের পর নারী ও পুরুষ কোর্টশিপের অত্যন্ত মূল্যবান সময় এবং মেটাবলিক এনার্জি অপচয় করে। তারা প্রয়োজনীয় ইকোনোমিক ও ফাইন্যান্সিয়াল রিসোর্স হারিয়ে ফেলে। তাদের সামাজিক জোট হয় ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের প্রাত্যহিক রিচুয়াল ও হেভিট বিকৃত হয়ে যায়। তারা তাদের প্রপার্টি ও সন্তান হারায়। ব্যক্তিগত সুখ ও আত্মসম্মান একসময় দূর্ভোগে পতিত হয়। এমনকি একজন রিজেক্টেড পার্টনার তার প্রধান প্রজননগত সুযোগ হারিয়ে ফেলতে পারে, বিশেষ করে তারা তাদের সন্তান লালন পালন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। রোমান্টিক রিজেকশনের রয়েছে সামাজিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও জেনেটিক কনসিকোয়েন্স। কেনো তাহলে আমরা থেমে যাই? কেনো এক অন্তহীন লুপে আমরা আটকে যাই? কেনো তাকে ছাড়া আমি এ মহাবিশ্বে পথ চলতে পারিনা? কেনো এত দূর্বলতা? কেনো এত ক্লান্তি? কেনো এত অন্তহীন অনিশ্চয়তা? কেনো প্রতিটি রাত হাজার হাজার আলোকবর্ষ সমান হয়ে যায়? আর শিল্পি গেয়ে উঠে মর্মভেদী গান-
 
সেই তুমি, কেন এত অচেনা হলে?
সেই আমি, কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম?
কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি?
কীভাবে এত বদলে গেছি এই আমি?
ও বুকেরই সব কষ্ট দু’হাতে সরিয়ে
চলো বদলে যাই…
কত রাত আমি কেঁদেছি
বুকের গভীরে কষ্ট নিয়ে।
শূন্যতায় ডুবে গেছি আমি
আমাকে তুমি ফিরিয়ে নাও।
 
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিবাদের অনুভূতি এবং হতাশাও এডাপ্টিভ। প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া সম্ভবত বিবর্তিত হয়েছে সম্ভবত সে প্রেমিকাকে পূনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে জন্য প্রলুব্ধ করার জন্য। আর যেখানে বিসর্জনের আবেগ বিবর্তিত হয়েছে বিচ্ছেদকে আরো ত্বরাণ্বিত করার জন্য যাতে করে সে নতুন কোনো সঙ্গী অনুসন্ধান করতে পারে। Despair Response বা হতাশার প্রতিক্রিয়া বিবর্তিত হয়েছে প্রতিবেশি ও বন্ধুদের সিগনাল পাঠানো যে আমার সহযোগিতা প্রয়োজন। আর ডিপ্রেসন বিবর্তিত হয়েছে প্রেমিককে যথেষ্ট সময় দেয়ার জন্য যাতে সে রেস্ট করতে পারে এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে। আর মৃদু হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিজেদের ও অন্যান্যদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।
 
আমরা উত্তারাধিকার সূত্রে খুবই শক্তিশালী অনুভূতি ও আচরণ পেয়েছি যার মাধ্যমে আমরা অন্যদের জন্য ডেডিকেটেড হতে পারি ও ব্যর্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুন সম্পর্ক গঠন করতে পারি। দুটোই আমাদের প্রজননের ক্ষেত্রে সুবিধা প্রদান করে। এগুলো সম্ভবত এখানে ছিল তিন মিলিয়ন বছর পূর্ব থেকে, আমাদের হিউম্যান ড্রাইভের মধ্যেই যার জন্য আবার একের পর এক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। লুসি যদি সিরিয়াল মনোগামীতে  না জড়াতো, তবে সম্ভবত আজ আমরা প্রেমের ব্যর্থতার অন্তহীন ফাঁদ থেকে বের হতে পারতাম না। আমাদের প্রাচীন বহুগামী ব্রেন সার্কিটই আমাদেরকে বিচ্ছেদের এই অন্তহীন চক্র থেকে রক্ষা করে, নয়তো কোন প্রেমিকই তাদের প্রেমিকার স্মৃতির অত্যাচার থেকে মুক্ত হতে পারতোনা, চিরকাল তারা অবরুদ্ধ হয়ে যেতো বিরহ,যন্ত্রণা, হতাশা ও নৈরাশ্যের কারাগারে।
 
 
 
 

প্রেম ছেড়ে দাও

 
মনোবিজ্ঞানী রবার্ট ইউস, সেল্ফ হেল্প গ্রুপের মধ্যে মেরিটাল সেপারেশন নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন, এদের মধ্যে সে সকল প্যারেন্টস যাদের পার্টনার নেই এবং পৃথকদের জন্য সেমিনার। ১৫০ জন মহিলার সাথে আলোচনা করা হয়। তিনি তাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন দেখেন আর তা ছিল Pattern of detachment, ডেটা যা সাইকোলজিক্যাল উপাদান সংযুক্ত করে -প্রেম ছেড়ে দাও।
রিজেক্টেড নারী ও পুরুষ প্রাথমিক পর্যায়ে আহত হয় প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হয়, জঘন্য যুদ্ধ, অবমাননা কন্তু তা সত্ত্বেও একজন তার সঙ্গীর কাছে বারবার ছুটে যেতে চায় ; অন্য কোথাও নির্বাসিত হয়। যদি সম্পর্কটি আকস্মিক শেষ হয়ে যায়, প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি কয়েকদিন এটা অস্বীকার করে, এবং মাঝেমাঝে এর দৈর্ঘ্য হয় কয়েকদিন আবার মাঝেমাঝে একেবারে বরাবর ২ সপ্তাহ। একটা পর্যায়ে তারা রিয়েলিটি বুঝতে পারে।
 
তারপর দশা স্তানান্তর শুরু হয়।এ সাইকোলজিক্যাল স্টেট একটাসময় বায়োলজিক্যাল দশায় স্থানান্তরিত হয়, প্রোটেস্ট এবং রিসাইনেশন। সময় ক্রমশ ভারী হয়ে যায়। জীবনের অনেক নিয়মকানুন বাষ্পের মতো উড়ে যায়। একজন প্রেমিক কী করবে না করবে সব হারিয়ে ফেলে, ভুলে যায়, Blank হয়ে যায়। প্রতিবাদ, রাগ, ব্যাথা, অস্বীকৃতি, আত্মদ্বন্দ এবং শোষক দুঃখ সেই বিচ্ছেদ আক্রান্ত ব্যক্তিটিকে অতিক্রম করে, সে ডুবে যায়, চলে যায় নিজের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অতীতে। কেউ কেউ আবার ইউপোরিয়া অথবা সেন্স অফ ফ্রীডম অনুভব করে। কিন্তু এ আনন্দ বেশিক্ষণ স্থিতিশীল থাকেনা। নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে মুড সুইং করে, সকালে ডিসিশন গ্রহণ করলে, বিকেলে সেটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।। প্রেমিকের মন হয়ে উঠে অস্থির এক মহাকাশ, যেখানে প্রতিনিয়ত সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কেউ কেউ এলকোহল অথবা ড্রাগের আশ্রয় নেয়, আবার কেউ কেউ সাইকিয়াট্রিস্ট, কাউন্সিলর, সেল্ফ হেল্প বুক ইত্যাদি। কেউ কেউ হাস্যকর সব কম্প্রোমাইজ করে এবং জঘন্য সব আঘাত সহ্য করে তাকে হারানোর ভয় থেকে। হেরোয়িন এডিক্টেডদের যেমন হয়। তারা কেমিক্যালি তাদের প্রেমিকার সাথে মস্তিষ্কের ভেতর মিলিত হয়।
 
তারা তাদের রিলেশনশিপকে অবসেসিভলি রিভিও করতে থাকে। ঘন্টার পর ঘন্টা তারা প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকার স্মৃতিগুলোকে রি-ওয়াইন্ড করে, আরামদায়ক সন্ধ্যাগুলোতে এবং মর্মস্পর্শী মুহূর্তগুলো, তর্ক ও নিরবতা, জোক্স ও স্লাইড বক্তব্য, অন্তহীনভাবে তারা একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজ করে, কেনো সে চলে গেলো! আর এ জন্য কবি নির্মলিন্দু হয়তো লিখেছেন-
 
 
 
এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ?
একটু দাঁড়াও আমি তৈরী হয়ে নিই ।
এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ?
তেমার জন্মান্ধ চোখে শুধু ভুল অন্ধকার । ওটা নয়, ওটা চুল ।
এই হলো আমার আঙ্গুল, এইবার স্পর্শ করো,–না, না, না,
-ওটা নয়, ওটা কন্ঠনালী, গরলবিশ্বাসী এক শিল্পীর
মাটির ভাস্কর্য, ওটা অগ্নি নয়, অই আমি–আমার যৌবন ।সুখের সামান্য নিচে কেটে ফেলা যন্ত্রণার কবন্ধ–প্রেমিক,
ওখানে কী খোঁজ তুমি ? ওটা কিছু নয়, ওটা দুঃখ ;
রমণীর ভালোবাসা না-পাওয়ার চিহ্ন বুকে নিয়ে ওটা নদী,
নীল হয়ে জমে আছে ঘাসে,–এর ঠিক ডানপাশে , অইখানে
হাত দাও, হ্যাঁ, ওটা বুক, অইখানে হাতা রাখো, ওটাই হৃদয় ।অইখানে থাকে প্রেম, থাকে স্মৃতি, থাকে সুখ, প্রেমের সিম্পনি ;
অই বুকে প্রেম ছিল, স্মৃতি ছিল, সব ছিল তুমিই থাকো নি ।
 
 
 
তারপর সময়ের সাথে নিপিড়ীত ব্যক্তি কে কার সাথে কি করছে তার একটি একাউন্ট তৈরি করে। সে শুরু, মধ্য ও শেষের একটি প্লট তৈরি করে। এই একাউন্ট অনেকটা অটো এক্সিডেন্টের মতো। সংবেদন বিকৃত হয়ে যায়। কিন্তু এ প্রসেসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটা স্থানে, গল্পটি শুরু করা যায়৷ এটি নিয়ে কাজ করা যায় এবং আল্টিমেটলি প্রত্যাখ্যান করা যায়। মাঝেমাঝে এ সাইকোলজিক্যাল ট্রান্সজিশন কয়েক বছর চলতে থাকে। যেকোন ধাক্কা, একটি ব্যার্থ পুনর্মিলন বা নতুন প্রেমিকের ধাক্কা তার যন্ত্রণা আবার বাড়িয়ে তুলতে পারে। কিন্তু সে একটা সুসঙ্গত লাইফ স্টাইল তৈরি করে নেয়, পূনরায় দশা রি-কভার করে। ধীরে ধীরে ব্যক্তি নতুন আইডেন্টিটি অর্জন করে, কিছু আত্মসম্মান, নতুন বন্ধু, নির্মল কিছু আগ্রহ ও কিছু স্থিতিস্থাপকতা।
 
অতীত আস্তে আস্তে তার দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলে। এখন সে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু উইস তার গবেষণায় দেখেছেন, রিজেকশন ও রিকভারির এ সামগ্রিক প্রসেসটি দুই থেকে চার বছর স্থিতিশীল হতে পারে৷ শুধুমাত্র একটি যুগল প্রেমের সম্পর্ক চার বছর স্থায়ী থাকে তা নয় কোন একটি সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ার পর সেটি রিকভার করতেও চার বছর সময় লাগে। মানুষ নামক এ প্রাণীরা অনুভূতির একটি জোয়ার দ্বারা পরিচালিত হতে পারে যেটি ইন্টারনাল বিটের মতো হ্রাস ও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, এ রিদমটি শুরু হয়েছিল তখন যখন আমাদের পূর্বসূরিরা বৃক্ষ থেকে নেমে এসেছিলো এবং তাদের মধ্যে রিলেশনশিপের টেম্পো গড়ে উঠেছিল যার সাথে ছিল তাদের ন্যাচারাল ব্রিডিং সাইকেলের একটি সিনক্রোনোসিটি, তিন থেকে চার বছর। সম্ভবত ডোপামিন, ভেসোপ্রেসিন, অক্সিটোসিন এবং ব্রেন সিস্টেমের অন্যান্য নিউরোক্যামিকাল এই রিদম পরিচালনা করে, প্রেমে পড়লে বাড়িয়ে তোলে যার ফলে আপনি Deep attachment and Cosmic Union অনুভব করেন, এরপর এ সংবেদনগুলো অতিরিক্ত বা বোঝায় পরিণত হয়, উদাসীনতার দিকে পরিচালিত হয়, অস্থিরতা ক্রমশ আপনার প্রেমকে খেতে থাকে, একাকীত্বের নেতৃত্ব দেয়, একটি কষ্ট যাকে বলে সকল এডিকশনের মা, সঙ্গীর প্রতি এডিকশন।
ব্যক্তি বিশেষে আমরা সবাই অনন্য। এ সকল প্রভাব যে আমাদের সবাইকে সমানভাবে গ্রাস করবে তা নয়। যে সকল পিতামাতা ছোটবেলা থেকেই তাদের সন্তানদেরকে সে সকল মানুষদের সাথে সম্পৃক্ত করেন যারা অধিক আত্মবিশ্বাসী এবং দ্রুত ফ্রেন্ডশিপ চেঞ্জ করতে পারেন তবে এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি কিছু মানসিক সুবিধা পাবে। সে খুব  দ্রুত বাউন্স করে রিজেকশন থেকে ছুটে চলে আসবে। কিন্তু আমরা এ ধরণের এডিক্টিভ ভালোবাসা অনুভব করতে পারে সম্ভবত সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে!
 

রোম্যান্স জাঙ্কিসঃ

 
 
হেলেন ফিশার তার The anatomy of love গ্রন্থে লিখেছেন, মানব সভ্যতার মাঝে বিবর্তিত হয়েছে ৪ টি সুবিস্তৃত, চিন্তার ব্যাসিক স্টাইল এবং আচরণ এবং এগুলোর প্রতিটি আমাদের মস্তিষ্কের ৪ টি ব্রেন সিস্টেমের সাথে সম্পৃক্তঃ ডোপামিন, সেরেটোনিন, টেস্টাস্টোরন ও ইস্ট্রোজেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি, নারী ও পুরুষের জ্ঞানীয় ও আচরণগত স্টাইল সম্ভবত পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট হয়েছে ব্যাথাকে প্রশমিত করার জন্য এবং ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ভালোবাসায় আকৃষ্ট হতে।
 
ডোপামিন ব্রেন সিস্টেমের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের বলা হয় “Explorers”। এরা রোম্যান্টিক প্রেমে অনেক বেশি পরিমাণ আসক্ত হয়। এ ধরণের নারী ও পুরুষ সবসময় নতুনত্ব পছন্দ করে। তারা অনুসন্ধান করে থ্রিল ও এডভ্যান্সার _ খেলাধুলা পছন্দ করে, তারা অনেক বেশি আবেগ প্রবণ, মেন্টালি খুবই ফ্লেক্সিবল, উৎসাহী, কৌতুহলী, এনার্জিটিক, আইডিয়া পরিপূর্ণ, তারা নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি খুবই উন্মোক্ত এবং সৃষ্টিশীল। অতএব, রোম্যান্টিক আবেগের প্রতি তাদের তীব্র অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও, এক্সপ্লোরাররা দীর্ঘকালীন সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখ্যীন হয়। এবং যখন তারা কোন দীর্ঘকালীন সম্পর্ক গঠনও করে, তাদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে, তারা পরকিয়ার প্রতি অনেক বেশি ফ্লেক্সিবল, নতুন নতুন রোম্যান্স খুঁজে পাওয়ার জন্য, তারা তাদের সঙ্গীকে খুব দ্রুত পরিত্যাগ করে__ এরা রোম্যান্সের জন্য মাদকাসক্ত।
 
 
 

এটাচম্যান্ট জাঙ্কিস

ফিশার, এদের নাম রেখেছেন “Builder” যারা সেরেটোনিন সিস্টেমের সাথে সম্পৃক্ত তারা অধিকতর এ ধরণের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, তারা অনেক বেশি আকৃষ্ট হয়। তারা সামাজিক রীতি নিয়ম পর্যবেক্ষণ করে। নিয়ম পালনের প্রতি তাদের একটি সহযাত প্রবণতা আছে, তারা ভালো পরিকল্পনাকারী, সময়নিষ্ঠ। তারা সতর্ক, প্রচলিত এবং মাঝেমাঝে ধার্মিক। তারা চেনা পরিচিত স্থান পছন্দ করে, জানাশুনা কাজ বেশি করে। এদের আবেগ ও অনুভূতি নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও স্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তারা তাদের পরিবার ও সমাজের নিয়ম রক্ষা করার জন্য নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে, নিয়মের সাথে নিজেদের ফিট করে নেয়। সামগ্রিক সমাজের কথা ভেবে তারা তাদের আপন ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিতে পারে। সেরেটোনিন চালিত এই নির্মাতারা তাদের ম্যারিটাল ডিউটি খুবই মারাত্মকভাবে পালন করে। হেলেন ফিশার বলেন, আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি যে, এরা একটি সম্পর্ক লুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরও সে সম্পর্কে জড়িয়ে থাকার তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, তারা তাদের ব্রতগুলি ভাঙতে রাজি হতে চায়না, তাদের ব্যাথা ও একাকীত্ব নির্বিশেষে। সেরেটোনিস সিস্টেমে দ্বারা চালিত কোন ব্যক্তি সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও সম্পর্ক থেকে বের হতে প্রতিবন্ধকতাবোধ করে। আর তাই বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় এরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। এখন ভাবুন ডোপামিন চালিত কোনো নারীর সাথে সেরেটোনিন চালিত কোন পুরুষের প্রেম হলে সম্ভাব্য কী বিপদ ঘটতে পারে? ডোপামিন চালিত নারীটি নতুন নতুন রোম্যান্স চাইবে আর সেরেটোনিন চালিত পুরুষটি ঐ নারীটিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাইবে…!এর থেকে যন্ত্রণাদায়ক এ মহাবিশ্বে কী হতে পারে…?
 
 
 
 

ভায়োলেন্স জাঙ্কিস

 
টেস্টাস্টোরন সিস্টেম দ্বারা চালিত এ সকল নারী ও পুরুষকে বলা হয় “Director”! এদেরকে যখন আপনি রিজেক্ট করবেন, এরা নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে অনেক বেশি ভায়োলেন্ট হয়ে যাবে। এরা একশন পছন্দ করে ও একশন গ্রহণও করে। এদের মধ্যে সহানুভূতি খুব কম, তারা ভাষার মাধ্যমে তাদের ফ্রাস্টেশন খুব কমই প্রকাশ করতে পারে, এদের সামাজিক দক্ষতা কম। আর এ জন্য এরা শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকে।
 
কিছু ডেটা ফিশারের এই হাইপোথেসিস সাপোর্ট করেছে। পুরুষরাই নারীদের তুলনায় বেশি রিজেক্ট করে, এমনকি কখনো কখনো তাকে পিটিয়ে মেরেও পেলে। এ আর্টিকেলটি রিসার্চ গেটে Risk Factor for Violence among Stalker শিরোনামে ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। এবং এ ধরণের পুরুষরা প্রত্যাখাত হওয়ার পর অনেক সময় সুইসাইড করে। হ্যাটফিল্ড ও র্যাপসনের গবেষণা অনুসারে এ আত্মহত্যার হার নারীর তুলনায় ২-৩ শতাংশ বেশি। তাদের এ গবেষণস ১৯৯৬ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশনে প্রকাশিত হয়েছিল Love and Sex : Cross Culture Perspective শিরোনামে। একবার ভাবতে পারেন, যদি ডোপামিন দ্বারা চালিত কোন ব্যক্তি টেস্টাস্টোরণের সাথে সম্পর্ক করে কী ভয়ানক বিপর্যয় এর সম্মুখ্যীন হবে? ডোপামিন চালিত কোন নারী বা পুরুষ যদি টেস্টাস্টোরণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে সবসময় নির্যাতিত হবে এবং তার মৃত্যুত ঝুঁকি হয়তো বেড়েও যেতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, যেমন কুকুর তেমন মুগুর নীতি এখানে কার্যকর হবে। ডোপামিন সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত পুরুষ রোমান্সের অভাবে কষ্ট পাবে ঠিকই কিন্তু এরা অন্য কারো সাথে সম্পর্ক করতে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত থাকবে। আর এতে করে একটি পারফেক্ট জুটিও তৈরি হতে পারে, যদিও  ধরণের সম্পর্কে রক্তারক্তির সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই স্কুল কলেজের উঠতি বয়সী ছেলে মেয়েদের না জেনে ও না বুঝে কারো টেস্টোস্টোরন ব্রেন নিয়ে খেলা করা উচিত নয়, কারণ এতে করে মেয়েদের উপর ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ অথবা মর্মান্তিক মৃত্যুর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। টেস্টোস্টোরন পুরুষ হয়তো তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেবে। এমন রক্তারক্তির ঘটনা কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুন নয় ।
 
 

ডিসপায়ার জাঙ্কিস

 
” Negotiator” এরা হলো তারা যারা ইস্ট্রোজেন ও অক্সিটোসিনের সাথে সম্পৃক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বেশি প্রকাশ করে। এগুলো তুলনামূলকভাবে ব্যাথাদায়ক স্মৃতিরোমন্থন এর সাথে জড়িত, যেটিকে বলে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেসন এবং attempted Suicide! এদেরকে হেলেন ফিশার হতাশ জাঙ্কিস বলেছেন।
 
এ ধরণের নারী ও পুরুষ খুবই অমায়িক, শাব্দিকভাবে দক্ষ, প্রজ্ঞাময়, এম্পেথেটিক, বিশ্বাসযোগ্য, যত্নশীল এবং সোশ্যাল এট্যাচমেন্টের দিকে পরিচালিত। এরা আবেগীয়ভাবে অভিব্যাক্তিপূর্ণ, অন্তঃর্মুখী এবং এদের রয়েছে ভালো মেমরি। আর এজন্য এ ধরণের মানুষদের মধ্যে পার্টনারশিপের প্রতি আসক্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়__নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাদের মধ্যে ভূত জেগে উঠে এবং নিজেদের রি-ট্রমাটাইজ করে। এমন স্মৃতি রোমন্থন তাদের মধ্যে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেসন ও আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি করে। ২০১৪ সালে Rumination as a mechanism linking Stressful life event to symptom of Depression and anxiety… নামক আর্টিকেলে এ আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলেও বলা হয়, রিজেক্টেড মহিলারা তীব্র ডিপ্রেসনের স্বীকার হয়। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাদের মধ্যে ক্রোনিক স্ট্রেইন ও স্মৃতিরোমন্থনের অভ্যাস দেখা যায়। নারীরা অন্তহীনভাবে নিজেদের ট্রামা প্রকাশ করে।
 
 

 

লুসির এক রাত্রি

 
মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন প্রাণীর মাঝেও কী আকর্ষণের উল্লাস, আসক্তির শান্তি,পরিত্যাক্ত হওয়ার বেদনা অথবা নতুন সঙ্গীর প্রতি পূনরায় নিজের আবেগ জেগে উঠার বাসনা তৈরি হয়েছিল? বিজ্ঞানীরা আজ বিশ্বাস করেন যে, মানুষের মৌলিক আবেগ ও অনুপ্রেরণাগুলো স্বতন্ত্র ব্রেন সিস্টেম থেকে এসেছে এবং মস্তিষ্কের এ নেটওয়ার্কগুলি নির্গত হয়েছে স্তন্যপায়ীদের থেকে এবং পাখিদের পূর্বসূরি। ডেভিডসন ও প্যানস্ক্যাপ ১৯৯৮ সালে Broken heart: the nature and risk of Romantic love নামক একটি গবেষণাপত্রে এ কথা বলেছিলেন। উদাহরণস্বরুপ, পাখি ও স্তন্যপায়ীদের মস্তিষ্কের গভীরে হিপ্পোক্যাম্পাস রয়েছে। একটি ক্ষুদ্র ফ্যাক্টরি যেটি সেকচুয়াল আচরণ চালনা করতে সাহায্য করে। এটি বিগত ১৭ মিলিয়ন বছরে খুব অল্প পরিমাণই পরিবর্তিত হয়েছে এবং এটি অন্যান্য মামেলিয়ান প্রজাতিদের মধ্যে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রাণীরা লালসা অনুভব করে। মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম যেটি উত্তেজনা, ভয় ও আনন্দের সাথে সম্পৃক্ত এটি সরীসৃপদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে শুরু হয়। কিন্তু এটি বার্ড ও মামেলদের মধ্যে Well Develop! উচ্চতর প্রাণীরা ক্রোধ, সন্ত্রাস এবং আনন্দ করতে সক্ষম।
 
ডোপামিন, ভেসোপ্রেসিন ও অক্সিটোসিন সিস্টেমের সাধারণ পথ __ যা এট্রাকশন ও এটাচম্যান্ট এর সাথে জড়িত __প্রেইরি ভোলদের(ইঁদুর) মধ্যেও এটি একই ভুমিকা পালন করে। আমাদের কাছে ভেসোপ্রেসিন সিস্টেমের ঠিক একই জিন রয়েছে যা নির্দেশনা দিচ্ছে যে হিউম্যান এটাচম্যান্টে এ সম্পর্কযুক্ত জৈবিক সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।সার্বাধিক উদঘাটিত একটি সত্য হলো, প্লানেটের কোন অবিচ্ছিন্ন প্রাণীই যেই তার সামনে এসেছে তার সাথে সেক্স করেনি। তারা কারো কারো প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং উপেক্ষা করেছে অন্যদের। হেলেন ফিশার তার ২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে এটাকে এনিমেল ম্যাগনেটিজম বলেছিলেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি প্রাণীরা বিশেষ কারো প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করে যেটাকে আমরা বলি রোম্যান্টিক ভালোবাসা। তাদের সে ভালোবাসার সম্পর্ক অন্তত সন্তান বড় হওয়া পর্যন্ত টিকে ছিল। সম্ভবত বিশ্বের সকল পাখি ও স্তন্যপায়ী তাদের মস্তিষ্কের নার্ভাস সিস্টেমের কিছু কেমিক্যাল যা আন্দোলিত হয় যা আকর্ষণের প্রবাহের মধ্যে তারতম্য তৈরি করে এবং এটাচম্যান্ট ও ডিটাচম্যান্ট তাদের ব্রিডিং সাইকেলকে পরিপূর্ণ করার জন্য।
 
যদি পশুরা ভালোবাসে, লুসিও অবশ্যই ভালোবেসেছিল।
 
লুসি হয়তোবা কোন একজন ছেলের সাথে ফ্লার্টারিং করেছিল যখন শুকনো মৌসুমের শুরুতে কমিউনিটি মিলিত হয় এবং সে হয়তো সম্মোহিত হয়েছিল একটি ছেলের প্রতি যে তাকে মাংস উপহার দিয়েছিল। কিন্তু আজ আপনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত কোন একজন  সুন্দরী নারীর হাতে টিএসসির মোড় গিয়ে এক টুকরো মাংস উঠিয়ে লুসির লেজহীন বয়ফ্রেন্ডের মত হাঁটু গেড়ে বসে বলেন- I love You! বিবিসি, গার্ডিয়ান সহ বিশ্বের বড় বড় সব সংবাদ মাধ্যমে আপনি নিউজ হয়ে যাবেন, হয়তোবা News of the Year! হয়তোবা গ্রীনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ডেও আপনার নাম উঠে যেতে পারে। অথচ আজ থেকে ৩.২ মিলিয়ন বছর পূর্বে এক টুকরো মাংস হাতে দাড়িয়ে থাকা একজন অস্ট্রোলোপিথ পুরুষের উপর লুসি ক্রাশ খেয়েছিল। সে তার পাশে শিশির ভেজা ঘাসের ঢগায় সকালের চকচকে সোনা রোধে হয়তো শুয়ে পড়েছিল  লজ্জায় লাল হয়ে, কিস করেছিল ও জড়িয়ে ধরেছিল, তারা হয়তো সারারাত জেগে জেগে উচ্ছ্বসিত চোখে মহাকাশের নক্ষত্রের দিকে তাদের আদিম ও অজ্ঞ চোখে তাকিয়েছিল, তারা জানতো না  বিশ্বতত্ব কী, গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা কত আর কেনোই বা ঐ মহাশূন্যে নক্ষত্ররা দেদীপ্যমান! তারা শুধু চির বর্তমান এক ভবিষ্যতহীন চেতনার উপলব্ধি নিয়ে হারিয়েছিল অসীমতায়! সে ও তার স্পেশাল ফ্রেন্ড হয়তো একসাথে হেঁটে হেঁটে ভাঙ্গি, বাদাম ও বেরি কুড়িয়ে বেড়িয়েছিল। হয়তো সেদিন সে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। যখন লুসির স্পেশাল ফ্রেন্ড তার শরীর স্পর্শ করে ঠিক তখন তার মস্তিষ্ক হয়তো অক্সিটোসিনের প্রভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলো, হারিয়ে ফেলেছিলো গতকাল ও আগামীকালহীন এক বর্তমানে, মহাজাগতিক ঐক্য (Cosmic Oneness) হয়তো সেদিন সেও অনুভব করেছিল, সেদিন তার ভাষা ছিলনা, ছিলো শুধু ফেশিয়াল এক্সপ্রেসন, কি লিখা ছিল লুসির চোখ, ঠোঁট আর নাকে তা আমি জানিনা, আমি শুধু জানি লুসিও নিজেকে কিছুক্ষণ সময়ের জন্য স্বয়ং মহাবিশ্ব ভেবে বসেছিল, অক্সিটোসিন জাগিয়ে তুলেছিল লুসির মস্তিষ্কে ঈশ্বরত্ব!
 
 
 
 
 
তারপর একদিন লুসি অন্য কোনো পুরুষের কাছে নিজের মস্তিষ্ককে সমর্পন করে, আজ থেকে ৩.২ মিলিয়ন বছর পূর্বে হয়তো লুসি ছিনালি করতে গিয়ে তার সঙ্গীর কাছে ধরা পড়ে।  টেস্টাস্টোরন চালিত তার তার এক্স বয়ফ্রেন্ড হয়তো সেই তরুণকে বেদম  পেটায়, কলেজের সেই গাড়ত্যাড়া ছেলেটির মতো সেই পরকিয়া প্রেমিকের হাত-পা ভেঙে ছুঁড়ে ফেলে দেয় গভীর কোন খাদে। তারপর একদিন হয়তো লুসিও তার প্রেমিককে অন্য কারো সাথে পিল্যান্ডারিং করতে দেখে! লুসির নারী কন্ঠ চিতকার দিয়ে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে কেঁদে উঠে আর তারপর কামড় বসায় সেই অসভ্য অস্ট্রোলিপিথ প্রেমিকের পিঠে। একদিন হয়তো দিন রাত একসাথে থাকতে থাকতে  লুসি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে যায়, আর রাতের অন্ধকারে সে বেরিয়ে পড়ে জঙ্গলে, চুমু খায় কোন উঠতি বয়সী তরুণের গাড়ে, আর তারপর ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় গাছের ডালে, জড়িয়ে ধরে দু-পায়ে। আর আমরা হয়তোবা লুসির গোপন অভিসার থেকে জন্ম নেয়া জিন থেকেই পেয়েছি আজকের সভ্যতা ! তারা একদিন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়! লুসি কান্নায় ভেঙে পড়ে! মানব সভ্যতার আদি মাতা লুসির কোলে হয়তোবা ঝুলে ছিল আমার আর আপনারই কোন না কোন পূর্বপুরুষ। তারপর সে হয়তো অন্য কারো প্রেমে পড়ে। আর আমরা লুসির ছিনালি থেকেই জন্ম নিয়েছি, সঙ্গীকে ঘুম পাড়িয়ে রাতের অন্ধকারে দু-পা দিয়ে জড়িয়ে প্রবল শক্তিতে যে স্পার্ম নিক্ষিপ্ত হয়েছিল লুসির জেনিটালে, তারই জরায়ু ছিটকে বেরিয়ে এসেছি আমরা। আর আজো মানব সভ্যতা  আমরা  তার মস্তিষ্কের বায়োকেমেস্ট্রি বহন করছি, একই বেসিক নিউরাল সার্কিট, লুসি আদি মানবের মস্তিষ্কে ভেতর ৩.২ বিলিয়ন বছর পূর্বে যে প্রেম ঢেলে দিয়েছে সেই ভালোবাসার ব্রেন সার্কিট আমরা, আর তাই আমরাও প্রেমে পড়ি, বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় রাইম্যানের বক্র জ্যামিতির মতো কুকড়ে যাই, নিরাশা আর হতাশায় অসহায় হয়ে নিজেকে উঠিয়ে দেই নিষ্কাম নিরপেক্ষ পদার্থবিদ্যার সুত্রের কাছে, হে ফিজিক্স! আমাকে তুমি তুলে নাও, ঠিক যেভাবে তুমি তুলে নিয়েছো মিলিয়ন মিলিয়ন গ্রহ নক্ষত্র আর ছায়াপথকে, আমার আর তার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিনা,আমাকে মুক্ত করে দাও, আমি মুক্তি চাই!
 
 
 
 

প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলঃ

অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান অস্ট্রোলোপিথের ভালোবাসার সন্তান

 
   
 
 


hsbd bg