Can't find our books? Click here!
ইন্টারনেট আমাদের একা করে দিচ্ছে?

ডিপ্রেসনের বিবর্তনীয় বিশ্লেষণ

 
ডিপ্রেসন! ডিপ্রেসন! ডিপ্রেসন! সবাই ডিপ্রেসড! যেখানে যাই,  সেখানেই কেউ না কেউ ডিপ্রেসনে আছে! কেউ ভালো নেই! কেউ বলছে, আমি মনে হয় বেশিদিন থাকব না! কেউ বলছে, আমার মহাবিশ্বের কোনোকিছু জানার আর আগ্রহ নেই! কেউ বলছে, এতকিছু করে কি হবে মরেই তো যাব! কি যে করি! যেখানে আমেরিকার প্রায় ৩০-৫০ ভাগ মানুষ ডিপ্রেসড, আমি নিজেই ডিপ্রেসড, যেখানে সারাবিশ্ব ডিপ্রেসড তখন  অগত্যা  একজন আমাকে প্রশ্ন করে বসল, ডিপ্রেসন এটা আবার কী জিনিস! আমি প্রশ্ন করি, কেন? তুমি জান না? সে বলল, না, আমি জানি না!
 
আমি তো বিস্ময়ে হতবাক! সারাবিশ্ব করোনা আক্রান্ত! এমতাবস্থায় কেউ যদি বলে, করোনা আবার কি! তখন আমি যতটা বিস্মিত হতাম ঠিক ততটাই আমরা বিস্মিত হই যখন কেউ প্রশ্ন করে বিস্ময় আবার কি জিনিস? ডিপ্রেসন আবার কেমন! আমরা যেটার মধ্যে ডুবে আছি, যা আমাদের সুইসাইডিয়াল করে তুলছে, ধুমড়ে মুচড়ে মেরে ফেলছে, আমরা যার একটা নামও  দিয়েছি, আমরা জানি না যে সেই নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ডিপ্রেসন জিনিসটা আসলে কি! এটা কেন সৃষ্টি হয়? কেন ডিপ্রেসন আমাদেরকে এলোমেলো করে দেয়! কেন মৃত্যু ভয় কাজ করে! সব মরেছে, জগতে এমন কোন মানুষ নেই যে মরেনি, একে বারে ফিজিক্সের সূত্রের মতো মৃত্যু যেনো চিরসত্য কিন্তু আমরা মৃত্যুকে মানতে পারি না, আমরা তাকে ভয় পাই, “ল্য অভ গ্রেভেটি” নামক যে আইন আমাকে উপরের দিকে উড়তে দেয় না তাকে আমরা মেনে নিয়েছি কিন্তু থার্মোডায়নামিক্স ও জেনেটিক্যাল ভুল যার জন্য আমরা বৃদ্ধ হই তাকে আমরা মানতে পারিনি! না,  আর ইতিহাস লিখব না, মূল প্রসঙ্গে আসি, ডিপ্রেসনকে জানতে গিয়েই যদি পাঠকের জীবন থেকে এক ঘন্টা সময়ের মৃত্যু হয় তবে , সেটাও হয়তো আর একটা ডিপ্রেসনের কারণ হবে?
 
বন্ধুগন! ডিপ্রেসন সম্পর্কে যে শুধু আমরা জানিনা তা নয়! বিজ্ঞানীদের কাছে ডিপ্রেসন একটি প্যারাডক্স। আমাদের  মস্তিষ্ক যদি আমাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করে তবে ন্যাচারাল সিলেকশনের অবশ্যই আমাদের উপর এমন কোন প্রেসার প্রয়োগ করা উচিত ছিল যা আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর থেকে ডিপ্রেসনের মতো ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যগুলো দূরীভূত করত  কিন্তু কেন তবুও আমাদের মাঝে ডিপ্রেসন দেখা যায়, আমাদের ব্রেন কেন এটাকে কন্ট্রোল করতে পারে না? এ প্যারাডক্সটি সমাধান করার জন্য অনেকে বলেন  বয়স বাড়ার সাথে ডিপ্রেসন বেড়ে যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের বডি সিস্টেম, ব্রেন ক্ষয় হয় আর তাই ডিপ্রেসনও বেড়ে যায়;  এটা একেবারেই লো- গ্রেডের একটা যুক্তি । কারণ ডিপ্রেসন সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তরুণ ও কিশোরদের মাঝে!
 
অনেকে মাঝেমাঝে ডিপ্রেসনকে স্থুলতার সাথে তুলনা করেন কারণ সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে আমাদের আধুনিক পরিবেশে যা যে পরিবেশে আমরা বিবর্তিত হয়েছি তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন আগে খাবারের অভাবে অনেক মানুষ মারা যেত আর এখন বেশি খেয়ে অনেক মানুষ মারা যায়, এখন না খেয়ে মরার চেয়ে বেশি খেয়ে মরে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। স্টিফেন হকিং বলেন, ভবিষ্যতে অজস্র মানুষ স্থুলতার কারণে মরবে কারণ তারা এক সময় খাবারের জন্য অনেক সংকট পোহাত। আমরা এখন যত সহজে খাবার সংগ্রহ করি, লাখ লাখ বছর আগে আমাদের আদি পূর্বসূরিরা কিন্তু এত সহজে খাবার পেত না, খাবারের জন্য তাদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হত। সে অতীতের স্মৃতি এখনো তাদের রয়ে গেছে, বিশেষ করে মাংস জাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙখা যা তাদের মধ্যে স্থুলতার জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করেন, ডিপ্রেসন ব্যপারটাও স্থুলতার মতো যেটি আদিম পরিবেশে ছিল না, কিন্তু আকষ্মিক পরিবেশ পরিবর্তনের ফলে ডিপ্রেসন দেখা দিয়েছে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি বলেন, দুই লাখ বছর পূর্বেও হোমো সেপিয়েন্স খাদ্য শৃংখলের মাঝামাঝি পর্যায়ের একটি প্রাণী ছিল, আগুনের ব্যবহার শেখার ফলে, তারা খাদ্যশৃংখলের চুড়ান্তে চলে আসে, ব্যাপারটা ছিল তাদের জন্য এক্সিডেন্সিয়াল যেখানে অন্য সকল প্রাণী লাখ লাখ বছর খরচ করে এ স্তরে আসে সেখানে সেপিয়েন্সরা এসেছে প্রায় মুহূর্তে, আর এ জন্য তারা এ নতুন পরিবেশের সাথে নিজেদের পুরোপুরিভাবে অভিযোজন করে নিতে পারেনি যা তাদের মধ্যে একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা ও হিংস্রতার জন্ম দিয়েছে! তারা তাদের অবস্থান হারানোর অনিশ্চয়তা থেকে তাদের অন্যান্য প্রজাতিগুলোকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে!

ঠিক তেমনি আমাদের আজকের যে সভ্যতা, তার বয়স বেশিদিন নয়, আমাদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের একটি ঘটনা। সেপিয়েন্সরা বিবর্তিত হয়েছিল শিকারি ও সংগ্রাহক হিসেবে, আধুনিক রোবটিক্স সভ্যতার সাথে সমন্বিত হয়ে তাদের বিবর্তন ঘটেনি, আর এ জন্য তারা এ আধুনিক পরিবেশের সাথে নিজেদের ডিএনএ কে সম্পূর্ণ সিনক্রোনাইজ করতেও  পারছে না! এটাই তাদের মধ্যে একাকীত্ব ও ডিপ্রেসন তৈরি করে!

 
বোঝাই যাচ্ছে যে, এটি অনেক ক্ষমতাবান যুক্তি। কিন্তু এ যুক্তির মাঝে ত্রুটি আছে। ত্রুটিটা ব্যক্তিগতভাবে আমার চোখে পড়ে অল্পকিছুদিন আগে! আমি বেশ কয়েকবার এ ত্রুটিটি সম্পর্কে লিখার চেষ্টা করি কিন্তু অত্যন্ত মজার একটা ব্যাপার হওয়া স্বত্ত্বেও আমি ব্যাপারটা লিখিনি বরং নিজেকে সময় দিয়েছি, আরও সুক্ষ্মভাবে চিন্তা করে দেখার জন্য! ইউভাল নোয়াহ হারারির যুক্তি থেকে ত্রুটি বের করা এটা কী এত সহজ ব্যাপার? যে কি না ওয়ার্ল্ড সেলিব্রেটি? যাক, আমার চিন্তাটা খুবই সহজ, মেনে নিলাম সেপিয়েন্সরা সাম্প্রতিক সময়ের সাথে সমন্বিত হয়ে অভিযোজিত হয়নি, তারা অভিযোজিত হয়েছে লাখ লাখ বছর পূর্বের শিকারী সংগ্রাহক হিসেবে, আর ডিএনএ তে একটি সিঙ্গেল মিউটেশন ঘটতে লাখ থেকে মিলিয়ন বছর সময় লেগে যায়, এ জন্য মানুষ এখনো নিজেকে আধুনিক পরিবেশে সমন্বয় করতে পারেনি!

প্রশ্ন হল, জিনের মধ্যে একটি মিউটেশন ঘটতে যদি মিলিয়ন বছর সময় লাগে তবে সেটা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই সত্য! কোনো প্রাণীর শরীরই তার সাম্প্রতিক সময়ের সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ না! তারা সবাই প্রতিনিয়ত সমন্বিত হওয়ার জন্য স্ট্রাগল করছে! আর অজস্র প্রাণী আছে যাদের মধ্যে কোনো একটি বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হয়েছে কোটি বছর পূর্বে, আকস্মিক যদি পরিবেশে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়, তবে তাদের সে আদিম ডিএনএ সাম্প্রতিক সময়ের সাথে নিজেকে অভিযোজন করতে পারবে না, অতএব তারাও একাকীত্ব বোধ করবে, তাদের মধ্যেও ডিপ্রেসন কাজ করবে, তাই নয় কী?

ডায়নোসর থেকে যে পাখিগুলো বিবর্তিত হয়েছে তাদের মন মানসিকতার মধ্যেও আদিম ডায়নোসরের আদিম স্বভাব থেকে যেতে পারে। তাহলে পাখিরাও কি এখনো অচেতনভাবে কোটি কোটি বছর পূর্বের তাদের সেই ডায়নোটিক সময়ে বাস করে? তাদের ডিএনএনও কি তাদের আদিম প্রতাপের কথা মনে রাখে? মহাকাশে উড়ার সময় কি তারা নিজেদের আদিম বিরাটত্বের মাঝে ডুবে থাকে? তাদেরও কী মন খারাপ হয় ? আমার যুক্তির বাড়াবাড়ি থেকে ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই, আমার উপমার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে আমার চিন্তার প্রসেসটাতে জোর দিন।
 
দেখা যাচ্ছে, সে হিসেবে যে সব প্রাণী দ্রুত পরিবেশের সাথে নিজেদের অভিযোজন করে নিতে পারে,  তাদের মধ্যে ডিপ্রেসন বা একাকীত্ব কাজ করবে না। আমরা জানি যে, একটা ভাইরাস প্রতি বিশ মিনিটে তার জিনের প্রকরণ বদলায়, প্রতি বিশ মিনিটে তাদের মিউটেশন হয়, তারা কী নতুন পরিবেশের সাথে নিজেদের অভিযোজন করতে পারে, নাকি তাদের মাঝে অস্থিরতা আরও অনেক ভয়াভহ? ভাইরাসরাও কী তবে ডিপ্রেসড?
 
যাক সায়েন্টিফিক আমেরিকানে “Depression’s Evolutionary Roots” নামক একটি আর্টিকেলে পল ডব্লু এন্ড্র লিখেছেন, এ ধরণের সিন্ড্রোম প্রায় সব ধরণের সমাজেই পাওয়া যায়৷ প্যারাগুয়ের অ্যাচে প্রজাতির মাঝেও গবেষকরা ডিপ্রেসনের অস্তিত্ব পেয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কুং নামক একটি সমাজ আছে যেখানকার মানুষকে ভাবা হয় তারা এখনো লাখ লাখ বছর অতীতের সে শিকারী সংগ্রাহক জীবনেই বাস করছে, তাদের মধ্যেও ডিপ্রেসনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এখন প্রশ্ন হল, যদি আধুনিক প্রযুক্তি ও জীবন যাপন পদ্ধতির ভিন্নতাই সেপিয়েন্সদের ডিপ্রেসনের কারণ হয় তবে আফ্রিকার কুং সমাজের মানুষদের মধ্যে কেন তবে ডিপ্রেসন দেখা যায়, তারা তো বিবর্তনীয় অতীতেই বাস করছে!


কুং সম্প্রদায়



আরও বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা আছে। একটি তত্ত্ব অনুসারে, ডিপ্রেসন হলো ভাইরাসের সংক্রমণ। কারও শরীরে ভাইরাস বা কোন জীবাণু সংক্রমিত হলে সে ডিপ্রেসনে চলে যায়, একা থাকতে পছন্দ করে, সে তখন কারও সাথে কথা বলতে চায় না। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর মায়ের মেজাজ খিটখিটে থাকে কারণ সে তখন কোনো জীবাণু সংক্রমিত। তাই সে তখন সন্তানের কাছে খুব একটা যায় না, তাদেরকে উপেক্ষা করে, বকা দেয়, বিরক্ত হয়,তাড়া করে , যেন তাদের দ্বারা অন্যরা জীবাণু সংক্রমিত না হয়। এ তত্ত্ব ডিপ্রেসনকে টিকে থাকার ক্ষেত্রে উপযোগী একটি সংযোজন মনে করে থাকে! কিন্তু যাদের শরীরে ভাইরাস নেই তারা কেন ডিপ্রেসনে আক্রান্ত হয়? এর কী কোন ব্যাখ্যা আছে? ম্যাথ করার সময় কেন ডিপ্রেসড হই? এক্সামের সময় কেনো ডিপ্রেসড হই? কেউ আমাকে বকা দিলে কেন ডিপ্রেসড হই? কোন ভাইরাসের কারণে?
 
২০০৯ সালে, সায়েন্টিফিক আমেরিকানের, একটি আর্টিকেলে এন্ড্রু একটি মডেল প্রস্তাব করেছিলেন যেখানে দেখানো  হয় , তারা ডিপ্রেসনকে মানসিক ডিসঅর্ডার মনে করেন না, তারা এটাকে অ্যাডাপসন হিসেবে দেখেন, যদিও এ অভিযোজনের কারণে প্রজাতিকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয় কিন্তু ডিপ্রেসনের কারণে মানব সভ্যতা বাস্তবসম্মতভাবে কিছু উপকার পেয়ে থাকে! এজন্য তারা বলছেন,, ডিপ্রেসন একটি অ্যাডাপসন, এটি কোনো ম্যালফাংশন নয়। এটি আমাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা প্রদান করে, কোনো অসুবিধা তৈরি করে না। তারা একটি মলিকিউলের উপর গবেষণা করেছিলেন যার নাম 5HT1A রিসেপ্টর যেটি  সেরোটোনিনকে বাইন্ডিং করে , এটি  আরও একটি ব্রেন মলিকিউল যা ডিপ্রেসনের সাথে গভীরভাবে জড়িত, সাম্প্রতিক বহু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট মেডিকেশনের লক্ষ্য এই মলিকিউল। যে সকল ইঁদুরদের মধ্যে এটির অভাব রয়েছে তারা কিছু ডিপ্রেসিভ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, যা থেকে আমরা বুঝতে পারি এগুলো যেকোনোভাবে ডিপ্রেসনের সাথে জড়িত! যখন বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের 5HT1A এর ফাংশনাল পার্টের কম্পোজিশন মানুষের সাথে মিলিয়ে দেখলেন , উভয়ের মধ্যে , দেখা গেল ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে! অতএব এটা স্পষ্ট  যে , প্রাকৃতিক নির্বাচন আসলে আমাদের মাঝে এ মলিকিউল  প্রিজার্ভ করে। ডিপ্রেসনকে “Turn On” করার ক্ষমতা সম্ভবত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এর মানে আমরা বলতে পারি যে , এটা কোনো অ্যাক্সিডেন্ট নয়।
 
তার মানে আবার  এটাও না  যে , ডিপ্রেসন কো সমস্যা না, ডিপ্রেসন আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকান্ডের মধ্যে বাঁধা সৃষ্টি করে, ডিপ্রেসডরা,  তাদের কাজে মনোযোগ দিতে পারে না, তারা নিজেদের একা করে নেয়, কোয়ারেন্টিনে চলে যায়, তারা অলস হয়ে ওঠে, মাঝেমধ্যে তাদের সেক্স ও খাবার থেকে আগ্রহ উঠে যায়। কেউ কেউ মারাত্মক, দীর্ঘ এবং লাইফ থ্রেটেনিং ডিপ্রেসনের মধ্যে পড়ে যায়। তাহলে ডিপ্রেসনের উপকারীতা কী? এটাকে বলে রোমন্থন, এটা অবিরাম হয়, তারা কোনোকিছুই চিন্তা করতে পারে না। অজস্র স্টাডি দেখিয়েছে যে, তাদের থিংকিং স্টাইল উচ্চমাত্রিকভাবে অ্যানালিক্টিক্যাল, তারা জটিল সমস্যা নিয়ে থাকে, সেটাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদানে ভাগ করে, যেগুলোকে একটা সময় এক ও অভিন্ন মনে হয়।
 
চিন্তার এ অ্যানালিক্টিক্যাল স্টাইল খুবই প্রোডাক্টিভ, অবশ্যই অনেক বেশি প্রোডাক্টিভ হতে পারে। চিন্তাকে যেহেতু তারা বিভিন্ন খন্ডে ভাগ করে পেলে, অতএব এ খন্ড খন্ড উপাদানগুলো কিন্তু এত বেশি জটিল নয় , যার ফলে সমস্যা অনেক বেশি সহজ হয়ে ওঠে।। মূলত, যখন আপনি কঠিন সমস্যার সম্মুখ্যীন হবেন। যেমন- ম্যাথমেটিক্স সংক্রান্ত, আপনার মধ্যে ডিপ্রেশনের অনুভূতি জন্ম হবে,  এটা খুব উপকারী  কারণ তখন ডিপ্রেসন আপনাকে ম্যাথটি অ্নায়লায়েজ ও সলভ করতে সাহায্য করবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন লোকজন কোনো জটিল সমস্যার মধ্যে পড়ে তখন সে বারবার ডিপ্রেসড হয়ে যায়, বা তার মস্তিষ্কে ডিপ্রেসন সুইচ অন হয়, আর যাদের মস্তিষ্কে ডিপ্রেসন বেশি দেখা দেয় তারাই সবচেয়ে High Score করে!

বিশ্লেষণ করার জন্য ধারাবাহিক নিরবিচ্ছিন্ন চিন্তা প্রয়োজন এবং ডিপ্রেসন শরীরের মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসে একটি সমস্যাকে কোনোরকম বিভ্রান্তি ছাড়াই সঠিকভাবে অ্যানালায়েজ করতে। এ প্রক্রিয়ার সময় মস্তিষ্কের ভেন্ট্রোল্যাটারিয়াল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিউরনগুলো নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ফায়ার হয়,  যাতে করে একজন ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চিন্তা করে যেতে পারে যেন তার চিন্তায় ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। কিন্তু এর জন্য VLPFC এর প্রচুর পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, ঠিক যেমনি একটি গাড়ির ইঞ্জিন পাহাড় বেয়ে ওঠার সময় অনেক ফুয়েল শোষণ করে। তাছাড়া, এভাবে নিরবিচ্ছিন্ন নিউরাল ফায়ারের কারণে নিউরন ভেঙে যায়, ঠিক যেমন একটি গাড়ির ইঞ্জিন প্রচন্ড চাপে ব্রেক ডাউন করে। ডিপ্রেসনের উপর গবেষণায় দেখা গেছে 5HT1A রিসেপ্টর যা নিউরনকে ফুয়েল দেয়ার কাজটি করে, সেটি একইসাথে এ ভাঙনও রোধ করে। আর এ গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া থেকে অলসতা তৈরি হয়, শরীরে দূর্বলতা কাজ করে, কারণ এই সময় দেহ বাড়তি শক্তি নিউরনে বিনিয়োগ করে যেন নিউরনের ভেতর তেমন কোনো ক্ষয় করা ছাড়াই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চিন্তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। আর এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি কেনো 5HT1A রিসেপ্টর বিবর্তনীয় ভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।
 
ডিপ্রেসনে আক্রান্ত রোগীরা যখন নিরবিচ্ছিন্নভাবে কোনো কিছু বিশ্লেষণ করে তখন তাদের মধ্যে বিভিন্ন সিন্ড্রোম দেখা যায়। তারা সামাজিক কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন চায়। মানুষ থেকে তারা দূরে থাকার চেষ্টা করে। আর ডিপ্রেসন আক্রান্ত ব্যক্তিরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে কারণ তারা সে সকল পরিস্থিতি অ্যাভোয়েড করতে চায় যেগুলো সম্পর্কে হয়তো তাদের ভাবতে হবে। তারা সেক্স বা অন্যকোনো কাজ করতে চায় না কারণ এগুলো তাদের চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাবে, এমনকি তারা অনেক সময় খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ হারায় কারণ চিবানো ও অন্যান্য ওরাল অ্যাক্টিভিটিজ তাদের মস্তিষ্কের ইনফরমেশন প্রসেসের অ্বিয়লিটিতে আঘাত করে।

কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ কী আছে জটিল সমস্যা সমাধান করার জন্য ডিপ্রেশন উপকারী? একটি ব্যাপারের জন্য, যদি হতাশাগ্রস্তদের অনুধ্যান ক্ষতিকর হত, যেমনটা অনেক চিকিৎসক ও গবেষক কল্পনা করেছেন, তাহলে ডিপ্রেসনের প্রবাহকে আরও ধীর হতে হত সমাধান করার ক্ষেত্রে যখন মানুষকে এমনভাবে হস্তক্ষেপ করা হয় যা অনুধ্যানকে উৎসাহিত করে যা তাদের মধ্যে কঠিন চিন্তা ও অনুভব লিখতে বাধ্য করে । যাহোক, বিপরীতটাও সত্য মনে হয়, এক্সপ্রেসিভ রাইটিং বা ডিপ্রেসন আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন সুস্পষ্টভাবে কিছু লিখে তখন তাদের ডিপ্রেসন  এই সমস্যাটির দ্রুততর সমাধান প্রদান করে এবং এটি নির্দেশ করে যে , এর কারণ হল হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা তাদের সমস্যার উপর গভীর অন্তদৃষ্টি অর্জন করে!
 
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা খুব দ্রুত সামাজিক ডিলেমা সমাধান করতে পারে। এর থেকে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট করে এমন কিছু কঠিন সমস্যা আছে যেগুলো অ্যানালায়সিস করা প্রয়োজন এবং সেগুলো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ যা বিবর্তনকে এত ব্যায়বহুল একটি আবেগের দিকে চালিত করেছে। কল্পনা করুন, একজন মহিলার একজন তরুণ বাচ্চা আছে, তার স্বামী অন্য কোনো মহিলার সাথে সম্পর্কে জড়িত, ঐ মহিলার কী এ ব্যাপারটা উপেক্ষা করা উচিত, নাকি তার স্বামীকে ফোর্স করা উচিত দুজনের কোন একজনকে গ্রহণ করতে? ল্যাবরেটরির একটি এক্সপেরিমেন্ট দেখিয়েছে ডিপ্রেসড মহিলারা এ সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণাত্মকভাবে নিতে পারে এবং তারা সেই অপশনটিই গ্রহণ করে যেটি তাদের জন্য লাভ জনক! আউটগ্রোয়িং গড
 
তাহলে দেখা যাচ্ছে ডিপ্রেসন হল প্রকৃতির একটি উপায় যা আপনাকে সমাজের জটিল সমস্যাগুলো কিভাবে সমাধান করতে হয় সে ব্যাপারে সাহায্য করে। থেরাপিস্টরা কখনো ডিপ্রেসনকে বন্ধ করার চেষ্টা করে না, তারা এটিকে রোমন্থন করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন ,তারা একজন ব্যক্তিকে ডিপ্রেসনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে সাপোর্ট করেন। সকল প্রকারের প্রমাণ একত্রিত করার পর আমরা বুঝতে পারি ডিপ্রেসনকে আসলে তেমন কোনো মানসিক বিশৃঙ্খলা মনে হয় না যেখানে ব্রেন এলোমেলো ভাবে কাজ করে অথবা ক্ষতিকারক।
 
 

তথ্যসুত্র:

 
Depression’s Evolutionary Roots , Two scientists suggest that depression is not a malfunction, but a mental adaptation that brings certain cognitive advantage, Scientific American