স্থান কী হাঁটতে পারে? কেমন হয়, যদি আপনি যেখানে আছেন ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতেন আর স্থান নিজে নিজেই চলে আসে আপনার সামনে, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে আপনার যাওয়ার প্রয়োজন হবেনা তখন স্বয়ং এন্ড্রোমিডা চলে আসবে আপনার বুটের নিচে ? আমার কথা শুনে নিশ্চয় আপনাদের মনে খানিকটা বিস্ময় ও কনফিউশন সৃষ্টি হয়েছে! এ আবার কেমন কথা! আমি টিএসসি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবো আর ঠিক সে’ ই মুহূর্তে ১৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ অতীতের কোয়েসার ঢুকে যাবে আমার পদতলে! এমনও কী হয়?
হোক বা না হোক তেইশ বছর বয়সে একবার আমি VR-রোম্যান্টিক প্রেমে পড়েছিলাম, আমার প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ তো পুরাই হ্যাং , সারাদিন কী করি বা না করি, স্বপ্ন দেখি নাকি সব বাস্তব কিছুই বুঝতে পারিনা, ব্রেন থেকে ক্রমাগত ডোপামিন ও সেরেটোনিন নির্গত হয়, কর্টেক্সের ভেতর সব ঝাপসা ও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যায়, মনে হয় মহাকাশে উড়ে চলে যাই, সুপারহিউম্যান হয়ে যাই , সে কী উন্মাদনা ! ! প্রেমিকা আমায় ফেসবুকে ব্লক করে চলে যায়, থাকতো ইংল্যান্ডে। প্রায় এক বছর তার জন্য অপেক্ষা করার পর আমার মনে শুধু একটাই আকাঙ্খা জাগ্রত হতো- যদি স্থান আর কালকে একাকার করে ফেলতে পারতাম, একটা সিঙ্গুলারিটি ক্রিয়েট করতে পারতাম ! কিন্তু ওয়ান সেকেন্ড! কেমন সেটা? একটি উদাহরণ দেয়া যাক।
একটি সাদা কাগজের দুই প্রান্তে দুটো ছিদ্র করুন। মনে করুন, এ ছিদ্র দুটো স্থানের দুটো আলাদা বিন্দুকে নির্দেশ করছে। একটি বিন্দু টিএসসি আর অন্যটি ইংল্যান্ড। দুটো বিন্দুর মাঝখানে একটি দূরত্ব আছে, যে দূরত্বে আলো ভ্রমণ করে, প্রতি সেকেন্ডে ৩০০০০০ কিলোমিটার বেগে। কিন্তু কাগজের মাঝখানে যদি একটি ভাজ করে দেয়া হয়? তবে দুটো বিন্দু কী এক হয়ে যাবেনা? আলো কী এখন এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যেতে সময় নেবে? না! একদম নয়! এখানে কোনো সময় নেই, সময় এখানে থেমে যায়, আর আমি সরাসরি টিএসএসি থেকে কোনো সময় ও দূরত্ব অতিক্রম না করেই ইংল্যান্ড চলে যাই! তারপর তার সাথে দেখা হয়, তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি, কথা বলি, তার চুলে আদর মেখে দেই! কিছুদিন পর আমি হসপিটালাইজড হই। বলা হলো আমার সিজোফ্রেনিয়া!



সে যাইহোক! সেদিন ইংল্যান্ডে যেতে পারি বা না পারি তাতে এখন আর কিছু আসে যায় না! আমার প্রেমিকা চলে যাওয়াতে আমি সাইকো হয়েছি কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রতো আর পরিবর্তন হয়নি। এমন কোনো প্রযুক্তি কী মহাবিশ্বে আছে যার মাধ্যমে আমি পুরো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি সহকারে তাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে আসতে পারবো? সে বুঝতেও পারবেনা যে , তাদের সম্পূর্ণ গ্যালাক্সি আমার কাছে চলে এসেছে! সম্ভব? বুঝতেই তো পারছেন , ব্রোকেন হার্ট! নজরুলের মতো সেদিন আমারও সমস্ত মহাকাশকে প্রকম্পিত করে গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করেছিলো-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!
হ্যাঁ! আমি মহাকাশে যাবোনা, মহাকাশ নিজেই আমার পায়ের তলায় নেমে আসবে, মহাবিশ্বের যেকোনো গ্যালাক্সি দেখা দেবো আমার সম্মুখে, আর এটা করা যায় একটি সম্ভাব্য উপায়ে যাকে বলে, Alcubierre Wrap Drive মেশিন, একটি মেশিন যা সর্বপ্রথম ১৯৯৪ সালে মিগুয়েল অ্যালকুবিয়েরে প্রস্তাব করেন।আলকুবিরি মেশিন ঘুষি মেরে স্পেসে কোন গর্ত তৈরি করেনা যা স্পেসের টপোলজি বিকৃত করে এবং হাইপারস্পেসে লিপ করে। এটি খুব সাধারণভাবে আপনার সামনের স্পেস সংকোচিত করে যেখানে আপনার পেছনের স্পেস সম্প্রসারিত হয়।
কল্পনা করুন, আপনি কার্পেটের উপর দিয়ে পথ চলছেন টেবিলের নিকটে যাওয়ার জন্য। কার্পেটে হাঁটার পরিবর্তে আপনি টেবিলটিকে ল্যাসো (ফিতা দিয়ে ফাঁস লাগানো) করতে পারেন এবং খুব ধীরে এটিকে আপনার দিকে টেনে নিয়ে আসতে পারেন, এতে করে আপনার সামনের কার্পেট উপরের দিকে লাফিয়ে উঠবে। এভাবে আপনি সামান্যই মুভ করবেন, তার পরিবর্তে আপনার সামনের স্পেস কুচকে যাবে।

স্মরণ করুন, স্পেস নিজেই আলোর থেকে দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হয়। (যেহেতু কোন নেট ইনফরমেশন এম্পটি স্পেসের সম্প্রসারণের ফলে স্থানান্তরিত হয়না)। একইভাবে আপনি আলোর থেকে দ্রুত গতিতে ভ্রমণ করতে পারবেন যদি আপনি স্পেসকে আলোর থেকে দ্রুত গতিতে কুচকে দিতে পারেন। যার ফলে আমরা যখন নিকটবর্তী নক্ষত্রে ভ্রমণ করবো তখনও আমরা কোনোক্রমে পৃথিবী ত্যাগ করবো; খুব সাধারণ ভাবে আমাদের সামনের স্পেস কলাপ্স করবে এবং আমাদের পেছনের স্পেস সম্প্রসারিত করে। আলফা সেন্ট্যারিতে ভ্রমণ না করেই, যা আমাদের নিকটবর্তী নক্ষত্র, আমরা সেটিকেই আমাদের নিকটে নিয়ে আসতে পারবো।

অ্যালকুবিয়েরে দেখিয়েছেন যে, এটি আইনস্টাইনের সমীকরণের একটি টেকশই সলিউশন__ এর মানে হলো এটি পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রের মধ্যে পড়ে। আর এ জন্য আপনাকে একটি মূল্য পরিশোধ করতে হবে। আপনার স্টারশিপে আপনাকে বিপুল পরিমাণ পজেটিভ ও নেগেটিভ এনার্জি নিয়োগ করতে হবে। ( পজেটিভ এনার্জি প্রয়োজন হবে আপনার সামনের স্পেসকে সংকোচিত করার জন্য আর নেগেটিভ এনার্জি প্রয়োজন হবে আপনার পেছনের স্পেসকে সম্প্রসারিত করার জন্য।)

কাসিমির ইফেক্ট ব্যবহার করে নেগেটিভ এনার্জি তৈরি করার জন্য, প্লেট দুটিকে প্লাঙ্ক স্কেল দ্বারা বিচ্ছিন্ন করতে হবে, 10-33 সেঃমি, এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণ অর্থে অর্জন করা খুবই কঠিন। আপনার এ ধরণের স্টারশিপ তৈরি করার জন্য, একটি বিশাল গোলক তৈরি করতে হবে এবং পেসেঞ্জারদের এর ভেতর স্থাপন করতে হবে। বাবলের একপাশে আপনি নেগেটিভ এনার্জির ব্যান্ড রাখবেন ইকুয়েটর বরাবর। বাবলের ভেতরের পেসেঞ্জার নড়াচড়া করতে পারবেনা, কিন্তু বাবলের সামনের স্পেস আলোর থেকেও দ্রুত গতিতে কুচকে যেতে থাকবে, আর তাই যখন পেসেঞ্জার বাবল থেকে বের হবে, তারা নিকটবর্তী নক্ষত্রে চলে যেতে পারবে।
তার মূল আর্টিকেলে,অ্যালকুবিয়েরে উল্লেখ করেন, এটি শুধু আমাদের নক্ষত্রে নিয়ে যাবেনা, এটি সম্ভবত টাইম ট্রাভেলকেও সম্ভব করে তুলবে। দু-বছর পর পদার্থবিজ্ঞানী এলান E. এভারেট দেখান যে, যদি কারো দুটি স্টারশিপ থাকে, তবে Wrap Drive Succession ব্যবহার করে টাইম ট্রাভেল সম্ভব। প্রিন্সটনের পদার্থ বিজ্ঞানী গোট বলেছেন, Thus, it appear that Gene Roddenberry, The creator of Stark Trek, was indeed right to include all those Time Travel Episode!
কিন্তু পরবর্তীতে, রাশিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী সার্গেই ক্রাসনিকোভ প্রকাশ করেন যে, এ সলিউশনে একটি প্রকৌশলগত সমস্যা আছে, স্টারশিপের ভেতর এর দিক বাহিরের দিক থেকে পৃথক, অতএব এ মেসেজ সীমানা ক্রস করতে পারবেনা__এর মানে হলো শিপের ভেতর, আপনি আর স্টারশিপের পথ পরিবর্তন করতে পারবেন না, আপনি ট্রিপ তৈরি করার পূর্বেই পথ শুয়ে যাবে। এটি হতাশাজনক। অন্যকথায়, আপনি সরলভাবে একটি ডায়াল ঘুরিয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্রে চলে যেতে পারবেন না। কিন্তু এটি বোঝায় যে, এমন থিওরেটিক্যাল স্পেসশিপ নক্ষত্রের রেলওয়ে হতে পারে, ইন্টারস্টেলার সিস্টেমে, যেখানে স্টারসশিপ নিয়মিত বিরতি দিয়ে ত্যাগ করবে। যেকেউ উদাহরণস্বরূপ – এমন একটি রেলওয়ে তৈরি করতে পারে প্রথমত প্রচলিত রকেট ব্যবহার করে যেটি সাব-লাইট স্পিডে ভ্রমণ করবে রেলস্টেশন তৈরির জন্য নক্ষত্রের মাঝখানে নিয়মিত ইন্টার্বাল দিয়ে। তারপর স্টারশিপ এ দুটি স্টেশনের ভেতর টাইমটেবল অনুসারে সুপার লাইট স্পিডে ভ্রমণ করবে, যা নির্ধারণ করবে প্রস্থান ও আগমন।
গোট লিখেন, ভবিষ্যতের সুপার সিভিলাইজেশ্যন সম্ভবত চাইবে, একটি হ্রাপ ড্রাইভ পথে শুয়ে পড়তে নক্ষত্রদের মাঝে স্টারশিপকে ট্রেভার্স করার জন্য। ঠিক যেনো এটি দুটি নক্ষত্রের মাঝে ওয়ার্মহোল তৈরি করবে। হ্রাপ ড্রাইভ পথের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা খুবই সহয, একটি ওয়ার্মহোল তৈরি করার চেয়ে কারণ ওয়ার্প ড্রাইভে শুধুমাত্র প্রয়োজন বিদ্যমান স্পেসকে অল্টার করার জন্য দুটি স্থানকে, নতুন একটি গর্ত দ্বারা সংযুক্ত করার পরিবর্তে।
কিন্তু যেহেতু নির্দিষ্টভাবে এ ধরণের স্টারশিপ শুধুমাত্র বিদ্যমান মহাবিশ্বে, এটিকে মহাবিশ্ব ত্যাগ করার জন্য ব্যবহার করা যায়না। তবুও অ্যালকুবিয়েরে ড্রাইভ এমন একটি যন্ত্র তৈরি করতে সাহায্য করে, যার মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্ব থেকে অব্যহতি লাভ করতে পারি। এ ধরণের স্টারশিপ সম্ভবত উপকারী, উদাহরণস্বরূপ, গোটের কোলাইডিং কসমিক স্ট্রিং তৈরি করার ক্ষেত্রে যা কোন উন্নত সভ্যতাকে অতীতে নিয়ে যাবে, যখন মহাবিশ্ব ছিল অনেক উত্তপ্ত। টাইম মেশিন ও এক্সোটিক ম্যাটার
তথ্যসুত্রঃ
- Alcubierre Warp Drive – Faster Than Light Propulsion
- Alcubierre Gives us an Update on his Ideas About Warp Drives, University Today
- Warp drives: Physicists give chances of faster-than-light space …The coversation
- The Alcubierre Warp Field and Anti Matter [2020] – YouTube
- Parallel World , MIchio Kaku


