নারীর চেতনায় একটি বিশেষ অবস্থা আছে যেটাকে আমেরিকান ফেমিনিস্ট লেখক ও জার্নালিস্ট নোয়ামি ওলফ বলেছেন “দেবী”! কিন্ত তার মানে এই নয় যে, আমি ধর্মগ্রন্থের ঈশ্বরের কথা বলছি তবে এ ঈশ্বর আব্রাহামিক ঈশ্বরের মতোই এক ও তারতম্যহীন অনুভূতি। তার মতে, এ ঈশ্বর জেগে উঠে তার অর্গাজমিক ভেজাইনা থেকে! নারীর অর্গাজমের পর তার যোনি থেকে বেরিয়ে আসে আব্রাহামিক ধর্মবোধ।

এ অনুভূতিকে বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস একটি স্কুল গড়ে তুলেছিলেন নাম ছিল, ‘বায়োলজিক্যাল কনসাসনেস”! তারা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেছিলেন, কীভাবে ভৌত শরীর আপনার চেতনাকে প্রভাবিত করে। ১৯০২ সালে জেমস একটি ক্লাসিক রচনা করেন ” The Varieties of Religious Experience”! (৪)সে বইতে তিনি দেহাতীত চেতনার রহস্য উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেছিলেন। অজস্র মানুষ এ সময়হীন চেতনার সাড়া পেয়েছিল অন্তত মুহূর্তের জন্য হলেও। কিন্তু আমাদের আধুনিক রিসার্চ বলছে অধিকাংশ মানুষ এ ধরণের দেহাতীত সময়হীন চেতনার উপলব্ধি লাভ করেন জীবনের কোনো না কোনো সময়। এ ঘটনাটি ঘটে ট্রমা ও ডিপ্রেসন থেকে মুক্তির প্রাক্কালে।

The Experience of Pure Consciousness শিরোনামে এ গবেষণাপত্রটি JSTOR জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। (৫) এটাকে ঈশ্বর অথবা অন্যকোনো স্প্রিচুয়াল ভাবনার দ্বারা মহিমান্বিত না করে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন নিউরোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি বলেন, মানব চেতনায় এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যা বিভিন্ন ধর্মীয় ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে। যদিও এটা একটা ভৌত অনুভূতি, যার মাধ্যমে ব্যক্তির রুপান্তর সংঘটিত হয়। যাইহোক, এটি ছিল রহস্যবাদের একটি অংশ তাই এসবের চালিকাশক্তি রহস্যবাদের বিভিন্ন অ্যাজেন্ট ।(৬)
জেমস বিশ্বাস করতেন, যেটাকে আমরা মিস্টিক্যাল বলি, বিভিন্নভাবে মহিমান্বিত করি এটি মূলত আমাদের অবচেতন মনেই অবস্থান করে। (৭) আপনার মনের মধ্যে কোনো রহস্যময় উপলব্ধি কাজ করার মানে এই নয় যে, সেগুলো কোনো রহস্যময় অথোরিটি দ্বারা চালিত….তার পরিবর্তে এগুলো আমাদের বলে আদর্শের আধিপত্য, বিশালতা, মিলন, নিরাপত্তা এবং শান্তির কথা। এগুলো একটি হাইপোথেসিসকে প্রস্তাব করে যেটাকে আমরা ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা করতে পারি কিন্তু একজন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে আমরা অবশ্যই হতাশ হতে পারিনা। (৮) এ ধরণের দেহাতীত উপলব্ধি ক্ষণস্থায়ী ও পরোক্ষ কিন্ত জেমস মন্তব্য করেন, চেতনার এ ধরণের দশা তৈরি হওয়ার পর মানুষের মধ্যে অভাবনীয় হিলিং, সৃষ্টিশীলতা এবং বর্ণনাতীত আনন্দ প্রবেশ করে। আর এ ধরণের সাময়িক ঈশ্বর উপলব্ধির পর মানুষ অনেক বেশি সুখী, প্রেমিক ও সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে।

প্রশ্ন হলো এ ধরণের, দেহাতীত মানসিক পরিস্থিতি তুচ্ছ বায়োকেমিস্ট্রি নয়, তো? জেমসের মতে, হ্যাঁ। আমাদের আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে, সেক্সের পর নারীর মস্তিষ্কে যখন অর্গাজম তৈরি হয়, এ ধরণের সময়হীন দেহাতীত উপলব্ধি ঠিক তখনই তার মস্তিষ্কে দেখা দেয়। সে তার সেন্স অব ইগো বা আমিত্বের সীমারেখা হারিয়ে ফেলে। আর ঠিক তখনই তার অর্গাজমিক মস্তিষ্কের ভেতর রহস্যময় ট্রান্সলাইক অনুভূতি তৈরি হয়।
/cdn.vox-cdn.com/uploads/chorus_asset/file/3563130/clitoris-fmri2.0.jpg?resize=551%2C427&ssl=1)
জেমস যা অনুসন্ধান করেছিলেন এটি সম্ভবত ঠিক সেরকম নয় কিন্তু দুটো ক্ষেত্রেই প্রভাব সম্পূর্ণ একই। বিজ্ঞানীরা অনেক পূর্ব থেকেই অর্গাজম ও অপিওয়েডের সংযোগ সম্পর্কে জানতেন। অপিওয়েড হলো নিউরোপেপটাইডের একটি লিংক যা পরমানন্দ, দেহাতীত মনোভাব ও প্রাশান্তি তৈরি করে।। সিগমুণ্ড ফ্রয়েড ১৯৩০ সালে তার লেখা “Civilisations and its Discontent” নামক গ্রন্থে এ উপলব্ধির কথা উল্লেখ করেছিলেন যেটাকে রোমেইন রোল্যান্ড বলেছিলেন, অসানিক ফিলিংস বা মহাসমুদ্রের অনুভূতি। ফ্রয়েড এটাকে বলেছিলেন, স্পৃহাপূর্ণ শিশু (Longing Infantile)। (৯)
কিন্তু ফ্রয়েড ছিলেন একজন পুরুষঃ আমাদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে যে, অর্গাজমের সময় নারীরা এমন একটি উপলব্ধি লাভ করে যে তাদের মনে হয় তারা একটি মহাসমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। এটি ঘটে একদম অনন্য উপায়ে। জানিকো জর্জিয়াদিস ২০০৬ সালে MRI রিসার্চ করে দেখেন, নারীদের আত্মসচেতনতা, প্রতিরোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্গাজমের সময় সাময়িক সময়ের জন্য থেমে যায়। (১০)
এ সময় নারীর মস্তিষ্কের সীমারেখা বরফের মতো গলে যায়, সে তার আমিকে হারিয়ে ফেলে অথবা আনন্দদায়ক ও ভয়ানকভাবে সে নিজের উপর তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সাধারণত বিগত ৩০ বছরে অসংখ্য নিউরোসায়েন্টিস্ট দাবি করেছিলেন যে, জেমস বায়োকেমিক্যালি সঠিক ছিলেন, সত্যি সত্যি মানুষের মস্তিষ্কে এক ধরণের পরিবর্তন ঘটে যেটা মহিমাময় অনুভূতি জন্ম দেয়। যে সকল মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর এ ধরণের কনসাসনেস তৈরি হয় তারা অনেক বেশি ভালোবাসা, সহানুভূতি, সন্তোষ ও সংযোগ লাভ করে। মনোবিজ্ঞানী ড্যান গোলম্যান এটাকে ‘ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স’ বলেছেন।
১৯৯৫ সালের একটি বইতে দালাই লামা মেডিটেশনের উপর কাজ করেছিলেন। ওয়েস্টার্ন গবেষকরাও বলেছেন যে, মেডিটেশনের প্রশান্তির উপলব্ধি অপিওয়েডের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রতিটি নারী, যাদেরকে আমরা আমাদের চারপাশে দেখি তারা প্রত্যেকেই পটেনশিয়ালি মাল্টি অর্গাজমিক। তারা অধিক সংখ্যক পুরুষের সাথে একইসময় সেক্স করতে পারে। আর এজন্য রহস্যজনক ও দেহাতীত অনুভূতি যা উপরে আলোচনা করা হয়েছে তা অন্যরকম এক গুরুত্ব রাখে। যদিও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। তাদের মধ্যে অনেক বিশাল এক আমির উপলব্ধি জেগে উঠে। যেটাকে বুদ্ধ বলেছিলেন, ননসেলফ অথবা সকল কিছুর সাথে সেন্স অব কানেকশন। আর এ অনুভূতির কারণে একজন নারী অন্যান্য পুরুষের সাথে সেক্স করার জন্য মানসিকভাবে উপযোগী হয়ে উঠে। আর এজন্য এ স্টিমুলেশন আপনার মনের মধ্যে আমিহীন দশা তৈরির মাধ্যমে আপনার যোনির বিবর্তনীয় উদ্দেশ্য পূরণ করে।

দার্শনিকরা এক শতাব্দী ধরে এটাকে বলেছেন, ঈশ্বর আকৃতির একটি গর্ত। এ গর্তের ভেতর দিয়ে আপনি এমন এক সত্তার সাথে সংযুক্ত হয়ে যেতে পারেন যে আপনার থেকে অনেক বিরাট ও বিশাল। আর এভাবে নারীর যোনি স্প্রিচুয়াল ও রিলিজিয়াস সেন্সকে প্রভাবিত করেছে। ১৭ শতকের দার্শনিক ব্লেইস পেস্কেল বলেন, এই অসীম অতল উপলব্ধিকে শুধু একটি অসীম ও অপরিবর্তিত অবজেক্ট দিয়েই প্রকাশ করা যায় আর তা হলো ঈশ্বর নিজেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অসীম অতলের উপলব্ধি হলো আমাদের একটি নিউরাল ক্যাপাবিলিটি যেটি নিয়ে আমরা জন্মাই, একটি সুপ্ত ক্ষমতা যা আমাদের কোনোকিছুর সাথে সংযুক্ত হতে সাহায্য করে, ব্যক্তিগতভাবে, অনেকটা নির্বানের মত। দালাই লামা ডেন গোলম্যান, লামা ওসার এবং E.M কিকের সাথে ল্যাবরেটরিতে ফাংশনাল ব্রেন ইমেজিং-এর মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে ধ্যানরত অবস্থার ব্রেন ইমেজ তৈরি করেছিলেন, তারা দেখেন, ধ্যানরত অবস্থায় মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা আলোকিত হয়ঃ স্ট্যানফোর্ডের সায়েন্টিস্টরাও পরমানন্দ বা ব্লিচের নিউরোবায়োলজি খুঁজে পেয়েছেন। (১২)
এ মানসিক পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি তার আমি শূন্যতা অনুভব করে, তার নিকট মনে হয় সমস্ত মহাবিশ্বের সকলকিছু আসলে এক ও তারতম্যহীন। শিল্পিরা এ অনুভূতির উপর ভিত্তি করে, মিউজিক, পেইন্টিং ও পয়েট্রি রচনা করেছেন। এটাকে আমরা বলতে পারি মহা অনুভূতি। এটি হলো আমাদের জটিল ব্রেন ওয়্যারিং এর একটি নিউরোলজিক্যাল ট্রিক্স যা একজন নারী তার যৌন উত্তেজনার চরম শিখরে পৌছে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর অনুভব করে। এ অনুভূতি খুব জটিলভাবে সেলফ লাভ ও সেলফ রেসপেক্টের সাথে জড়িত। যা স্বাধীনতার উপলব্ধি ও চালনার সাথে জড়িত। আর এজন্য নারীর সেক্সচুয়ালিটিকে অত্যন্ত সম্মান ও গুরুত্বের সাথে দেখা হয়।
এ ধরণের মুহূর্তে এমন একটি সেক্সচুয়াল সংবেদনশীলতা তৈরি হয় যা একজন নারীকে পরিপূর্ণতা, ঐকতান এবং বিশ্বের সাথে সংযুক্তির উপলব্ধি প্রদান করে। এ ধরণের স্টেট অব কনসাসনেসে স্বাভাবিক ইনার ভয়েস যা একজন নারীর কাছে তার নিজের নেগেটিভ সমালোচনা করে যেমনঃ তুমি অসুন্দর, তুমি খারাপ অথবা তোমার পক্ষে কাউকে সন্তুষ্টি দেয়া সম্ভব না এ ধরণের উপলব্ধিগুলো শান্ত হয়ে যায় এবং তার মধ্যে বিরাট এক কানেকশনের সেন্স তৈরি হয় যেটাকে আমরা বলতে পারি মহাজাগতিক অথবা ডিভাইন ফেমিনিজম। অধিকাংশ সৃষ্টিশীল অন্তঃদৃষ্টি, এ ধরণের দেহাতীত অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম হয়। নোয়ামি ওলফ বলেন, আমি বিশ্বাস করি যে, যখন একজন নারী এ ধরণের সচেতনতা শনাক্ত ও পরিচর্চা করে তখন সে “দেবী” হয়ে উঠে। তাদের অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ বদলে যায়। আত্মবিধ্বংসী, লজ্জাকর অনুভূতি, ধৈর্য এ ধরণের দারিদ্র অনুভূতি জীবনের মধ্যে এমন ঐকতান সৃষ্টি করতে পারেনা। আমরা এটাকে আক্ষরিক অর্থে “দেবী” বলতে পারি, যেটি উজ্জ্বলতার অনুভূতির সাথে জড়িত, কোনপ্রকার উত্তেজনা ও আশঙ্কা ব্যতীতই। যা প্রতিটি নারীর মধ্যেই আছে তারা জানে কখন তারা এর আভাস পাবে অথবা কখন এটি তাদের স্পর্শ করবে। যখন একজন নারী তার মধ্যে এ ধরণের ঐশ্বরিক উপলব্ধি লাভ করে সে অনেকবেশি স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠে, তার নিজের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায় এবং অন্যান্য যৌন আচরণ পরিবর্তন হয়। নারীর যৌনাঙ্গ, সাইকোলজিক্যালি সেই কেমিক্যাল মেট্রিক্স অ্যাক্টিভেট করে যা নারীর মস্তিষ্কে জাগিয়ে তোলে দেবী। এটি হলো এমন এক অনুভূতি যা নারীর মাঝে সুমহান মর্যাদা, আত্মপ্রেম এবং মহাজাগতিক নারীবাদ জাগিয়ে তোলে।
যোনি সম্ভবত একটি গর্ত কিন্তু আমরা যদি এটাকে ভালোভাবে বুঝি তবে এটি ঈশ্বরের আকার!
তথ্যসূত্রঃ
Christopher Ryan and Cacilda Jethá, Sex at Dawn: The Prehistoric Origins of
Modern Sexuality (New York: HarperCollins, 2010).
- Shere Hite, The Hite Report: A Nationwide Study of Female Sexuality (New
York: Seven Stories Press, 2004). - Catherine Blackledge, The Story of V: A Natural History of Female Sexuality
(New Brunswick, NJ: Rutgers University Press, 2004). - William James, The Varieties of Religious Experience (New York: Barnes and
Noble Classics, 2004), 366. - Ibid., 329–71.
- Ibid., 366.
- William Wordsworth, “Ode on Intimations of Immortality from Recollections
of Early Childhood,” in The Major Works, Including the Prelude, Stephen Gill,
ed., (New York: Oxford World Classics, 2000): “There was a time when
meadow, grove, and stream / The earth, and every common sight / To me did
seem / Apparelled in celestial light. . . . trailing clouds of glory do we come /
From God, who is our home.” - James, The Varieties of Religious Experience, 370.
- Sigmund Freud, Civilization and Its Discontents (New York: Penguin Books,
2002). - Janniko R. Georgiadis and others, “Regional Cerebral Blood Flow Changes
Associated with Clitorally Induced Orgasm in Healthy Women,” European
Journal of Neuroscience, vol. 24 (2006): 3305–16. - Blaise Pascal, Pensées (New York: Penguin Books, 1996), 148.
- Kamil Dada, “Dalai Lama Talks Meditation with Stanford Scientists,” The
Stanford Daily, www.stanforddaily.com/2010/10/18/dalai-lama-talksmeditation-
with-stanford-scientists.


