রবীন্দ্র-বিদূষণ ও ফ্যালাসি
মূলপাতা সাহিত্য রবীন্দ্র-বিদূষণ ও ফ্যালাসি, পর্ব-২

রবীন্দ্র-বিদূষণ ও ফ্যালাসি, পর্ব-২

লিখেছেন বিপ্লব রায়
33 বার পঠিত হয়েছে

কেউ কেউ অভিযোগ করে, রবীন্দ্রনাথ জমিদার থাকাকালীন প্রজা নিপীড়ক ছিলেন। এটা ভ্রান্ত ধারণা, বরং জমিদারের পেশা সম্পর্কে তিনি নিজেই বিরক্ত হয়ে, প্রমথনাথ চৌধুরির ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধটি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কালান্তর’ প্রবন্ধে লিখেন-

“আমার জন্মগত পেশা জমিদারি, কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারি। এই কারণেই জমিদারির জমি আঁকড়ে থাকতে আমার অন্তরের প্রবৃত্তি নেই। এই জিনিসটার ‘পরে আমার শ্রদ্ধার একান্ত অভাব। আমি জানি জমিদার জমির জোঁক; সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব।… প্রজারা আমাদের অন্ন জোগায় আর আমলারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেয়– এর মধ্যে পৌরুষও নেই, গৌরবও নেই”। (রায়তের কথা/কালান্তর)

উল্লেখ্য, প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীর স্বামী। আর সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগদানকারী প্রথম ভারতীয়। সেসময় কেবলমাত্র ব্রিটিশ অফিসারেরাই সেখানে যোগদান করতে পারত I পরবর্তীতে ১৮৬১ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে আইন করা হলে ভারতীরা এ পেশা যোগদান করা শুরু করে। সেসময় তাদের পরীক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংরেজদের সাথে প্রতিযোগিতায় পাশ করে সরকারি উচ্চপদে যোগদান করতে হত। শুরুতে, সেখানে যোগদান করতে ঘোড়া চড়া পরীক্ষায় পাশ করা বাধ্যতামূলক ছিল। ( রবীন্দ্র-বিদূষণ ও কিছু ফ্যালাসির বিশ্লেষণ )

অনেক আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ মুসলিম কৃষকদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতেন। পল্লী উন্নয়নের জন্য শান্তিনিকেতনের পাশে সুরুল গ্রামে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষিতে আধুনিকতায়ন আনার চেষ্টা করেন।
১৯০৫ সালে কবি মহাজনদের হাত থেকে কৃষকদের মুক্ত করার জন্য পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। এমনকি নিজের নোবেল পুরস্কারের ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন। কৃষি ঋণ পেয়ে চাষিরা মহাজনদের ঋন মিটিয়ে দেন। মাত্র ২০ বছরে ব্যাংক দেউলিয়া হলে রবীন্দ্রনাথ নিজেই সকল দায়-দেনা পরিশোধ করেন। পতিসরের প্রজারা কিন্তু বেশির ভাগ মুসলিম ছিলেন। আবার ১৯৩৭ সালে পতিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সব সম্পদ প্রজাদের মধ্যে দান করে দিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু পতিসরেই নয়, শাহজাদপুরেও (সাজাদপুরে) মুসলিম প্রজাদের গরু পালনের জন্য নিজের জায়গা দিয়ে দিয়েছিলেন। তার মতে, ধনী -গরীব বৈষম্য কখনো কল্যান বয়ে আনতে পারে না। তার ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় এরূপ দেখতে পাই-
“এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।”

জাতীয় সংগীত নিয়ে নিন্দুকদের মানসিক অন্তর্ঘাতঃ

কেউ কেউ বলেন, জাতীয় সংগীত ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক।
রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানে যে মায়ের বন্দনা করা হয়েছে সেটা দেবদেবী মা নয়, মাতৃভূমি মা। মুসলিম কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘কান্ডারী হুশিয়ার’ কবিতায় ও ‘জননী মোর জন্মভূমি’ গানেও মাতৃভূমিকে মা হিসেবে বন্দনা করেছেন। জাতীয় সংগীতের মূল লক্ষ্য হলো স্বদেশের বা মাতৃভূমির বন্দনা করা। প্রায় সব মুসলিম রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতে স্বদেশ বা মাতৃভূমির বন্দনা করা হয়েছে। যেমন সৌদি, মিশর। ইন্দোনেশিয়া তাদের মাতৃভূমিকে মা হিসেবে সম্বোধন করে।

অনেক দেশের জাতীয় সংগীতের কথা ও সুর ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির রচনা করা এবং তারা কোনো প্রসিদ্ধ গীতিকার বা সুরকারও ছিলেন না বরং শৌখিন ছিলেন। কিন্তু ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্য বিধাতা’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত একই ব্যক্তির রচনা।
পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতে আগে সুর, পরে কথা রচিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে যখন ইরান ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্র প্রধানরা পাকিস্তানে সফর এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় তখন পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত না থাকায় এক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় পাকিস্তানের একজন সুরকারের পূর্বের কোনো গানের সুরকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে এই সুরের সাথে মানানসই সংগীত কি হবে এ জন্য প্রতিযোগিতা আহ্বান করা হয় এবং হাফিজ জলন্ধরির ‘পাক সার জমিন শাদ বাদ’ গানটি গ্রহণ করা হয়। পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকে জন্মের পর এভাবে জাতীয় সংগীত খুজতে হয়নি।

জাতীয় সংগীত একটি দেশের জনগণকে কেবল উজ্জীবিতই করে না, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এর গুরুত্বও বহন করে।
১৯০৪ সালে দেশপ্রেমে রচিত পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবালের ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা’ ভারতবর্ষ বিভক্তির পরও এখনোও ভারতের রণসংগীত হিসেবে বাজানো হয়।

নিন্দুকেরা বলে, শিলাইদহের ডাক পিয়ন গগন হরকরার (আসল নাম- গগনচন্দ্র দাস) ‘আমার মনের মানুষ যে রে, আমি কোথায় পাব তারে’ বাউল গানের সুর নকল করে রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেছেন। ভ্রান্ত কথা, বরং প্রকাশ্যে রবীন্দ্রনাথ বলেন, এ গানের সুরে প্রভাবিত হয়ে তিনি গানটি লিখেন। এখানে লুকোচুরির কিছু নাই এবং সবাই এ ব্যাপারে জ্ঞাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাউল’ পত্রিকায় এই গানটি (জাতীয় সংগীত) ছাপিয়েছিলেন এবং স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, এই গানের সুর বাউলগান থেকে নেওয়া। ১৯০৫ সালের ০৭ সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথের নিজ স্বাক্ষরে গানটি প্রথম ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনের সম্পাদিত হারামণি (১৯৩৬) গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

“শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাত-সারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন্‌-এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল–

কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে!
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে”

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ফ্রান্সে প্রদত্ত An Indian Folk Religion শীর্ষক বক্তৃতায় গগনের উক্ত গানের উদ্ধৃতি দিয়ে মন্তব্য করেন, ‘The first Baul song, which I chanced to hear with any attention, profoundly stirred my mind.’ ।

উল্লেখ্য, গগন হরকরা চিঠি বিলি করার জন্য প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতেন। পরিচয়ের সূত্র ধরে পরে রবীন্দ্রনাথ গুণমুগ্ধ হয়ে তাঁর কণ্ঠে লালনসহ অন্য বাউলের গান শুনতেন এবং বাউল সাধনা ও গানের বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সংগীত চর্চা করতেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার বিশেষ অন্তরঙ্গতা তৈরি হয় এবং রবীন্দ্র-মানসে বাউলের দর্শন প্রভাব বিস্তার করে।

জাতীয় সংগীতকে নিয়ে ষড়যন্ত্র কেবল আজকে নয়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে রবীন্দ্রচর্চার বিধি-নিষেধ আসে। ২৩ জুন, ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার এই বাংলায় রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এদেশে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট দালালদের রবীন্দ্র বিরোধী কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়।

বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সেরা বাংলা গান হয়েছে এই ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি। অলিম্পিকে জাতীয় সংগীতের একটা ranking গানটি পৃথিবীর সব জাতীয় সংগীতকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে।

নিন্দুকদের বলতে চাই, ভাই, এ সংগীতকে আবর্তন করিয়া রবিবাবুকে ‘লেখা-চোর’ বা ‘সুর-চোর’ বলিয়া আখ্যায়িত করিবার জন্য যেভাবে আপনারা সময় ক্ষেপণ করিয়া সাহিত্য জগতে ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হইয়াছেন, ঐ সময়টুকু নিজ অন্তরের নানা অপরূপ কল্পনাচিত্র আঁকিয়া প্রতিভা বিকশিত করিলে হয়ত আপনারও এতদিনে বিখ্যাত লেখক হইয়া উঠিতে পারিতেন।

রবীন্দ্রবিরোধীরা অভিযোগ করে, ভারত সরকার নাকি বাংলাদেশের উপর জাতীয় সংগীত চাপিয়ে দিয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচারণা। বঙ্গবন্ধু স্বয়ং জাতীয় সঙ্গীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি বলেন —

“এই সঞ্চয়িতা সঙ্গে থাকলে আমি আর কিছুই চাই না। নাটক নয়, উপন্যাস নয়, কবিগুরুর গান ও কবিতাই আমার বেশি প্রিয়। সব মিলিয়ে এগারো বছর কাটিয়েছি জেলে। আমার সব সময়ের সঙ্গী ছিল এই সঞ্চয়িতা। কবিতার পর কবিতা পড়তাম আর মুখস্থ করতাম। এখনও ভুলে যাইনি। এই প্রথম মিয়ানওয়ালি জেলের ন’মাস সঞ্চয়িতা সঙ্গে ছিল না। বড় কষ্ট পেয়েছি। আমার একটি প্রিয় গানকেই- ‘আমার সোনার বাংলা’ আমি স্বাধীন দেশের জাতীয় সঙ্গীত করেছি”

এ প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর লিখেন, “১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন-দেখুন-আমি যা চেয়েছিলুম সব কিছুই তো পেলুম। বাংলাদেশ চেয়েছিলুম, বাংলাদেশ হয়েছে। বাংলার রাষ্ট্রভাষা হলো। জাতীয় সঙ্গীত ‘সোনার বাংলা’ চেয়েছিলুম। জাতীয় সঙ্গীত ‘সোনার বাংলা’ হলো। আমি এখন তৃপ্ত। আমার জীবনের কাজ সম্পন্ন।” (আমার ভালোবাসার দেশ; পৃ.নং-১৩২)

সুতরাং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ কেউ চাপিয়ে দেয়নি।

 

 

আরও পড়ুন

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!