মূলপাতা সাহিত্য রবীন্দ্র-বিদূষণ ও কিছু ফ্যালাসির বিশ্লেষণ

রবীন্দ্র-বিদূষণ ও কিছু ফ্যালাসির বিশ্লেষণ

লিখেছেন বিপ্লব রায়
187 বার পঠিত হয়েছে

ইংরেজি ‘Fallacy’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘হেত্বাভাস’ (বাংলা একাডেমি ডিকশেনারি অনুসারে) সহজে বললে, ভুল/মিথ্যা ধারণা বা যুক্তি।Contact Us

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত কিছু fallacy বা ভ্রান্ত ধারনা প্রচলিত আছে। যেমন –

আগুন্তকঃ আপনি কি জানেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে বলেছিলেন, “মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়, তারা তো ঠিকমতো কথাই বলতে জানেনা!”

শ্রোতাঃ ও তাই নাকি? তা উনি কবে, কোথায়, কখন এ উক্তি করেছিলেন?

আগুন্তকঃ তা জানি না তবে কোন এক জনসভায় তিনি এ কথা বলেছিলেন।

শ্রোতাঃ কোনো এক জনসভায়!!আপনি কি নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন কোন জনসভায়?

আগুন্তকঃ আ আ…আজ্ঞে না, তবে ইন্টারনেটে দেখেছি। যেহেতু সেখানে লেখা আছে, নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তিনি এ কথা বলেছেন।

Hearsay বা শোনা কথা’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। কোন কথা যাচাই বাছাই না করে কিছু লোক কেবল শুনেই বিশ্বাস করবে। যদিও এর সত্যতা নেই। সেটা ‘গুজব’ বললে ভুল হবে না। কেউ যদি বলে ‘চিলে কান নিয়ে গেছে’ তাহলে সেটাও বিশ্বাস করবে। কানটি স্বস্থানে আছে কিনা সেটা যাচাই করার চেষ্টাও করবে না।

আবার একগুঁয়ে টাইপের কিছু লোক বলবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন একটি কবিতায় বলেছিলেন, “সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।” এখানে তিনি বাঙালিদের অপমান করেছেন, কটাক্ষ করেছেন।

তাদেরকে বলি, ভাই, সম্পূর্ণ কবিতাটি একবার পড়ে দেখেছেন কি??


“পূণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ স’য়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।”

                           (বঙ্গমাতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)



‘চৈতালি” কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘বঙ্গমাতা’ কবিতাটি রচিত হয় ২৬ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দে। যে সময়টা-কে ভারতে ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রাক-সূচনা পর্ব বলা যেতে পারে। অর্থাৎ, কবিতাটি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পূর্বে লেখা হয়েছিল। সে সময় রবীন্দ্রনাথ চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সূচনা পূর্বে বাঙ্গালিদের মাঝে নিস্ক্রিয়তার ও আত্মকেন্দ্রিকতা দেখতে পেয়েছিলেন। সমাজের অবক্ষয়ের মুখে বাঙ্গালীদের এই নিষ্ক্রিয়তা উত্তরণের পথনির্দেশনা দিতেই এ কবিতাটি লিখেছিলেন।
এ কবিতায় তিনি সমগ্র বাঙালীদের চেতনা বিকাশের আহ্বান করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, যে কোন অবস্থায় যেন বাঙালি প্রকৃত মানুষ হতে পারে। যেন ঘরকুনো হয়ে, মায়ের আঁচল ধরে বসে না থাকে। যেন বিশ্বসভায় নিজের জায়গা করে নিতে পারে। মায়ের নিষেধ শুনে, ভালো ছেলে হয়ে, খোকাবাবু হয়ে যেন জীবন পার করে না দেয়। যেন শীর্ণ, শান্ত, সাধু সন্তানরা গৃহছাড়া, লক্ষ্মীছাড়া হয়েও
ভালো মন্দ যে কোন পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করতে পারে।

যখন আক্ষেপ করে কবিগুরু এই কবিতাটি লিখেছিলেন, তখন তার প্রেক্ষাপট ছিল নিশ্চয়ই ভিন্ন।

এখানে উল্লেখ্য যে, ডিভাইড অ্যান্ড রুল-এর নীতিতে বঙ্গভঙ্গ হলে বাংলা দেশাত্ববোধক গানে বঙ্গ মাতা গুরুত্ব পেতে শুরু করে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’ এবং ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ সহ বহু দেশাত্ববোধক সংগীত এ সময় রচিত হয়।

কেউ কেউ বলে, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ও সাম্প্রদায়িক। তাই কোন মুসলমান চরিত্র তার সাহিত্যে নাই।

ভাই, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না। তিনি জন্মসূত্রে ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী ছিলেন যেটা রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তন করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ কোনো মূর্তি পূজার উপাসনা পছন্দ করতেন না এবং তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ কবিতার প্রথম দুই স্তবকে তিনি সুর দেন যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা আছে। কিন্তু কবিতার পরবর্তী অংশে মাকে দূর্গা হিসেবে পূজা করার কথা উল্লেখ থাকায় বাকি অংশের সুর দিতে রাজী হন নি। এখনো শান্তিনিকেতনে কোনো মূর্তি পূজা করতে দেয়া হয় না, অথচ, বেদ, বাইবেল, কোরআন বা ত্রিপটকের মতো ধর্মশাস্ত্র পাঠ করতে ও ব্যাখ্যা করতে উৎসাহিত করা হয়।

তার পূর্ব পুরুষ ছিল পিরালি ব্রাহ্মণ আর পদবি ছিল কুশারী বংশের, ঠাকুর নয়। আদি অবস্থান পূর্ব বাংলার যশোর- খুলনা অঞ্চলে, কোলকাতায় নয়।

কুশারী কেন বলা হয়ঃ

রবীন্দ্র-জীবনীকার শ্রী প্রভাত মুখোপাধ্যায় তার “রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্র সাহিত্য প্রবেশিকা” গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “কুশারীরা হলেন ভট্টনারায়ণের পুত্র দীন কুশারীর বংশজাত; দীন মহারাজ ক্ষিতিশূরের নিকট “কুশ” নামক গ্রাম (বর্ধমান জিলা) পাইয়া গ্রামীণ হন এবং কুশারী নামে খ্যাত হন ৷দীন কুশারীর অষ্টম কি দশম পুরুষ হলেন জগন্নাথ কুশারী।”

পিরালি ব্রাহ্মন ও কুশারী হতে ঠাকুর পদবি কিভাবে আসলঃ

কথিত আছে, একজন হিন্দু লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে ‘মোহাম্মদ তাহির খান’ নাম গ্রহণ করে। যিনি ‘পীর আলী’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সেনাপতি ও ধর্ম প্রচারক খান জাহান আলীর সহযোগী। তাহিরের ষড়যন্ত্রে গো-মাংস ভক্ষণে যশোর- খুলনা অঞ্চলের কিছু লোক ব্রাহ্মণ জাত হারান। এদের মধ্যে জয়দেব ও কামদেব নামে দুজন ব্রাহ্মণ ছিলেন। শুকদেব নামে তাদের এক ভাই ছিল। ভাইদের ত্রুটির কারণে সেও জাত হারায়। তার কন্যাকে বিয়ে করে পিরালী দোষে দুষ্ট হন পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী। এই জগন্নাথ কুশারীর সপ্তম প্রজন্মে পঞ্চানন কুশারী জ্ঞাতিকলহে দেশ ত্যাগ করে কোলকাতার জেলেপল্লীতে বসবাস শুরু করেন। জেলেরা নবাগত ব্রাহ্মন কুশারীদের পুরানো ইতিহাস জানত না। যেহেতু তারা ব্রাহ্মণ, তাই জেলেরা তাদের ঠাকুর বলে ডাকত। এভাবে কুশারী পদবী ঠাকুর হিসেবে পরিচিতি পায়। পঞ্চানন কুশারীর ছেলে জয়রাম ঠাকুর, তার ছেলে নীলমণি ঠাকুর। নীলমণির সাথে তার ভাইয়ের বিবাদ বাধায় সে ঘর ত্যাগ করে জোড়াসাঁকোতে বসতি স্থাপন করেন। নীলমণির তিন পুত্রের একজন রামমুনি। এই রামমনির দ্বিতীয় পুত্র হলেন রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। কোলকাতার কোনো কুলীন ব্রাহ্মণ কলুষিত পিরালি ব্রাহ্মণের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হত না। তাই ৩০০ বছর ধরে এই পরিবারের জন্য যশোর- খুলনা অঞ্চলে পিরালি গোত্র হতে কনে সংগ্রহ করে বিয়ে দেয়া হত। রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথের স্ত্রী ও পিতা দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী এই অঞ্চলের বাসিন্দা। কেবল মাত্র পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোর-খুলনার পিরালী ব্রাহ্মণ কন্যারাই ঠাকুর পরিবারে বধূ হয়ে আসতেন।

যেহেতু ঠাকুর বাড়িতে কন্যা সম্প্রদানে কোনো কুলীন ব্রাহ্মণ রাজি নয়, রবীন্দ্রনাথকেও তাই ২২ বছর বয়সে খুলনায় জমিদার বাড়ির এক কর্মচারীর ১০ বছরের নিরক্ষর মেয়ে
মৃণালিনী দেবীকে বিয়ে করতে হয়। এর খেশারত দিতে হয় তার তিন মেয়েদেরকেও। পিরালী ব্রাহ্মণ হওয়ায় তার মেয়েদের জন্য সহজে বর পাওয়া যেত না। ১ম কন্যা মাধুরীলতা(বেলা) ১২ বছরে বিয়ে হয় বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে শরতকুমারের সাথে। ২য় কন্যা রেনুকার বিয়ে ১০ বছর বয়সে। ৩য় কন্যা মীরা দেবীর বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে। সবার বিয়ে হয় পণপ্রথায়। দুঃখের বিষয় হলো, তার জীবদ্দশায় তিন মেয়ে ও এক ছেলে এবং স্ত্রী অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করে। স্ত্রী ৩০ বছর বয়সে, বড় মেয়ে ২৯, ২য় মেয়ে বিয়ের এক বছর পর অর্থাৎ ১১ বছর বয়সে আর ছোট মেয়ে ৩০ বছর বয়সে মারা যায়। তার দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে শমীন্দ্রনাথ অল্প বয়সে মারা যায়।

এবার মুসলিম সাহিত্যে আসা যাক,
রবীন্দ্রনাথ হিন্দু দলিত সম্প্রদায় গল্পের(শাস্তি, পণ রক্ষা) তুলনায় মুসলিম গল্প(দালিয়া, কাবুলিওয়ালা, সমস্যা পূরণ, ক্ষুধিতপাষাণ, দুরাশা, মুসলমানির গল্প, মুকুট) বেশি লেখেন।এছাড়া শা- জাহান কবিতা, রাজর্ষি উপন্যাসের সম্রাট সুজা, কথা ও কাহিনী কাব্য গ্রন্থের ০৪ টি কবিতা(বন্দিনী, মানি, প্রার্থনাতীত দান, শেষ শিক্ষা) মুসলিম চরিত্র উল্লেখযোগ্য।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি বরং উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।
‘কথা ও কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থের ‘মানি’ কবিতায় ‘আরঙজেব ভারত যবে/ করিতেছিল খান খান’ লাইনটি মুসলিমরা তাদের “পূর্বপুরুষদের” অপমানিত করা হয়েছে বলে দাবী করে রবীন্দ্রনাথকে ক্ষমা চাইতে বলেছিল। বলেছিল, ঐ লাইন তুলে নিতে হবে। এছাড়া সঞ্চয়িতা কাব্যে পূজারিণী কবিতার চারটি স্তবক বাদ দিয়ে দেন।

মূলত, রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অগ্রদূত। (চলবে….)

আরও পড়ুন

1 মন্তব্য

Risad Roni February 23, 2021 - 7:08 pm

চলবে।

প্রতিউত্তর

Leave A Comment...

হাইপারস্পেস
চিন্তা নয়, চিন্তার পদ্ধতি জানো...!
%d bloggers like this: