Can't find our books? Click here!
ম্যাক্রো ইভোল্যুশনের প্রমাণ নেই?

ম্যাক্রো ইভোল্যুশনের প্রমাণ নেই?

বর্তমানে গণতান্ত্রিকভাবেই সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা বলে বেড়াচ্ছে ম্যাক্রো-ইভোল্যুশনের সাপেক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বিবর্তনকে সমর্থন করেন এমন মানুষদের বলতে শুনি, মাইক্রো-ইভোল্যুশন প্রমাণিত হলেও ম্যাক্রো-ইভোল্যুশনকে প্রমাণ করা যায় না। রিচার্ড ডকিন্স এই সর্বজনীয় অবিশ্বাসের পেছনে মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, বিবর্তন ঘটে মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের টাইম স্কেলে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক ইমিডিয়েট রেসপন্স করার জন্য বিবর্তিত। ৩১৩ মিলিয়ন বছর পূর্বের সিনাপসিড অথবা ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বের থেরাপসিড প্রোটো ম্যামালরা ডায়নোসরের উপস্থিতিতে ইমিডিয়েটলি রেসপন্স করত, তারা মিলিয়ন মিলিয়ন বছর পর্যন্ত পালানোর জন্য অপেক্ষা করত না। আসলে আমাদের জীবন এতটাই সংক্ষিপ্ত যে আমরা মিলিয়ন বছরের টাইম স্কেলে চিন্তা করতে প্রস্তুত নই। আমাদের কাজ শর্ট-কার্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করা।

ম্যাক্রো ইভোল্যুশনের প্রমাণ নেই?
৩০০ মিলিয়ন বছর পূর্বের থেরাপসিড

আজও সে মনোভাব আমাদের অবচেতন প্রবণতার মধ্যে রয়ে গিয়েছে, যে জন্য আমরা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত নই যে অস্ট্রোলোপিথকাসের পক্ষে ভাইরাসদের মতো রূপান্তরিত হয়ে মানুষে পরিণত হওয়া সম্ভব। কারণ আমরা ২০ মিনিটের ভেতরেই ল্যাবরেটরিতে বিবর্তনের প্রমাণ দেখতে অস্থির হয়ে যাই, আমাদের মনের ভেতর সরীসৃপদের অস্থিরতা।

প্রশ্ন হলো, কেন ম্যাক্রো-ইভোল্যুশন দেখা যায় না? এর অত্যন্ত সাধারণ একটি উত্তর দিতে চাই আমি প্রথমে। কম্পিউটার স্ক্রিনের একটি ছবি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিট বা পিক্সেল দিয়ে তৈরি। এই পিক্সেলকে আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু অসংখ্য পিক্সেল মিলিত হয়ে একটি সামগ্রিক পিকচার তৈরি হয়। আমরা পিক্সেলকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারি না বলে সামগ্রিক ছবিটি কী মিথ্যা? কোয়ান্টাম গ্রেভেটি অনুসারে, স্পেস-টাইমও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিক্সেল বা ইউনিটের তৈরি, যেটাকে বলে স্পেস-টাইম অ্যাটম, এই ইউনিট আমাদের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব। তাই বলে কী আমাদের এই ইউনিভার্স মিথ্যা যেটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিট দিয়ে গঠিত হয়েছিল? আচ্ছা, এত কঠিন উদাহণ বাদ দেন, মহাবিশ্ব পরমাণুর তৈরি আমরা পরমাণু দেখি না বলে গ্যালাক্সিক ক্লাস্টার মিথ্যা? আমি আবারও বলছি, এটি একটি সিম্পল অ্যানালজি।

বিবর্তন প্রতিনিয়তই ঘটছে কিন্তু আমরা চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পারছি না কারণ ম্যাক্রোস্কোপিক বিবর্তন বলতে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই, বিবর্তন সবসময় মাইক্রোস্কোপিক স্কেলেই ঘটে, অত্যন্ত ক্ষুদ্রতর স্কেলে। এই মিউটেশনগুলো খুবই ক্ষুদ্র, আর বেশিরভাগ মিউটেশন নেগেটিভ। যার অর্থ হলো মিউটেশনের একটি ক্ষতিকর প্রভাব আছে। খুবই সিম্পল কিছু উদাহরণ দেই:

  • যদি আকস্মিক বড় মাপের একটি মিউটেশনে মানুষের হাতের তালু তার পায়ের তালুর হাড়ের মতো শক্ত হয়ে যায়। মানুষ তার আঙুল মুভ করতে পারবে না ঠিক যেমনি আমরা পা দিয়ে ক্রিকেট বল ধরতে পারি না। আঙুলগুলো একে অপরের বিপক্ষে গতিশীল করতে না পারলে সে তার মস্তিষ্কের চিন্তাগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে না, তার মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে যাবে। রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার অথবা ইন্টারনেট সব অর্থহীন হয়ে যাবে। তার মানে দেখা যাচ্ছে, বড় মাপের মিউটেশন যে কেবল নেগেটিভ হতে পারে তা নয়, এটি মানব সভ্যতার ব্রেনকেই অচল করে দিতে পারে। সভ্যতাকে থামিয়ে দিতে পারে মুহূর্তেই।
  • আরও একটি এক্সাম্পল দেয়া যেতে পারে এক্ষেত্রে, আকস্মিক একটি মিউটেশনের কারণে যদি সিংহের সামনের দুটি পা জিরাফের মতো বড় হয়ে যায় সে আর দ্রুত গতিতে দৌড়াতে পারবে না। গতিশীল হওয়ার সাথে সাথেই তার পা মচকে ভেঙে যাবে, সে এক জায়গায় স্থির বসে পড়বে, একটি তুচ্ছ হরিণও তার পক্ষে শিকার করা সম্ভব হবে না। সিংহ জঙ্গলকে শাসন করা তো দূরে থাক সে বিলুপ্তই হয়ে যাবে।
  • যদি আকস্মিক বড় মাপের একটি মিউটেশনে মানুষের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স ছোট হয়ে যায় তার কল্পনাশক্তি ও নৈতিকতাবোধ নষ্ট হয়ে যাবে, যদি আকস্মিক প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বড় হয়ে যায়, তার মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, দেহের অন্যান্য সেন্সরি অর্গ্যান দূর্বল হয়ে যাবে।
  • যদি কোনো একটি মিউটেশন নিউরনকে চিকন করে দেয়, একই স্থানে অসংখ্য নিউরন রাখা যাবে, নিউরনগুলো চিকন হওয়ার কারণে আপনার এক্সনের ভেতর দিয়ে কেমিক্যাল ও ইলেক্ট্রিক্যাল সিগন্যাল রান করতে পারবে না। আপনার ব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার কোনো একটি মিউটেশন যদি নিউরনের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে দেয়, দ্রুত গতিতে সিগন্যাল রান করবে, মস্তিষ্ক অতিরিক্ত শক্তি শোষণ করবে এবং উত্তপ্ত হয়ে যাবে, এতে করে ব্রেন সাইজ বড় হয়ে যাবে, সিগন্যাল ডেস্টিনেশনে যেতে যেতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাবে, আপনি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারবেন না। যদি এই ঘটনাটি থেরাপসিডদের সাথে ঘটত তবে তারা ২৫০ মিলিয়ন বছর আগেই ধবংস হয়ে যেত কারণ ব্রেন সিগন্যাল স্লো হওয়ার কারণে তারা ডায়নোসরদের সামনে থেকে পালাতেই পারত না। মানুষের সাথে যদি এই ঘটনা ঘটে তবে মানুষ কয়েকশত বছরেই শেষ হয়ে যাবে।

বিবর্তন এজন্যই ক্ষুদ্রতর স্কেলে ঘটে, যেন প্রাণীরা নেগেটিভ কিছু টের না পায়। এটা অনেকটা একটি ছবির পিক্সেলের মতো, যেন এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিউটেশনগুলোর সাথে একটি জীব নিজেকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারে। বিবর্তন জীবদের মিলিয়ন মিলিয়ন বছর সময় দেয়, এভাবে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিট মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে পুঞ্জিভূত হয়ে একটি জীবের মধ্যে দৃশ্যমান পর্যায়ে পরিবর্তন ঘটায়। অতএব আপনি কয়েক হাজার বছর এবং এমনকি মিলিয়ন বছরের মধ্যেও বিবর্তনকে চোখে দেখবেন কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কারণ ম্যাক্রোস্কোপিক স্কেলে বিবর্তন ঘটেই না! একটা ছবির অসংখ্য ইউনিট মিলে যেমন একটি হোল পিকচার তৈরি করে ঠিক তেমনি অনেকগুলো পজেটিভ মিউটেশন একত্রিত হয়ে কোনো একটি জীবের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। আর এই হাজার হাজার মাইক্রো বিবর্তনের সমষ্টিকেই আমরা আমরা ম্যাক্রো-ইভোল্যুশন বলে জানি। ম্যাক্রো ইভোল্যুশনের সাপেক্ষে প্রমাণ:

1) ফসিল রেকর্ড: অর্কিয়া, ব্যাক্টেরিয়া এবং ইউক্যারিয়ট থেকে শুরু করে হোমো স্যাপিয়েন্স পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন জিওগ্রাফিক্যাল টাইম পিরিয়ডে ফসিল রেকর্ড খুঁজে পেয়েছি। আমরা জেনেছি এরা পৃথিবীর সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের পূর্বসূরি। আমরা ফসিল রেকর্ড থেকে জেনেছি বিলুপ্ত প্রজাতি সম্পর্কে, ফসিল রেকর্ড আমাদের দেখিয়েছিল কীভাবে সময়ের সাথে আমাদের পূর্বসূরিরা পরিবর্তিত হয়ে আর্ডিওপিথিকাস থেকে মানুষে পরিণত হয়েছে।

2) কম্পারেটিভ অ্যানাটমি: শরীরবিদ্যা আমাদের কাছে বিভিন্ন প্রজাতির সমতা ও অসমতা তুলে ধরে। আমরা যে একটি সাধারণ পূর্বসূরি থেকে এসেছি অ্যানাটমি তা পরিস্কারভাবে সমর্থন করে।

3) কম্পারেটিভ জেনেটিক্স: জেনেটিক্সের মাধ্যমে আমরা জেনেছি আজ থেকে দুই লক্ষ বছর পূর্বে আমাদের পূর্বসূরির সংখ্যা ছিল ২০,০০০। যদি তা নাই হবে তবে আমাদের জিনের মধ্যে এত বেশি সাদৃশ্যতা দেখা যেত না। এ পদ্ধতিতে আমরা নির্ণয় করতে পেরেছি তারা কোথাও ছিল এবং কখন মাইগ্রেশন শুরু করেছিল। আমরা এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির জিনোম তুলনা করে বুঝতে পারি কোন জীবের সাথে আমরা ঠিক কতটা জিন শেয়ার করেছি। এভাবে যার সাথে আমাদের জিনগত দূরত্ব কম হবে তারা আমাদের নিকটতম আত্মীয় যেমন নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভান। আর যারা জিনগতভাবে আমাদের থেকে দূরে অবস্থান করছে তারা আমাদের দূরবর্তী আত্মীয় যেমন বনবোর সাথে সেক্স করলে আমরা সন্তান জন্ম দিতে পারব না। কিন্তু নিয়ান্ডারথালদের সাথে সেক্স করে ঠিকই আমরা সন্তান জন্ম দিয়েছি। যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সোয়ান্তো প্যাবো 2022 সালে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। এছাড়া কম্পারেটিভ জেনেটিক্স বিজ্ঞানীদের স্পেসিফিক জিন ও জেনেটিক চেঞ্জ নিয়ে স্টাডি করার অনুমোদন প্রদান করে যা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের জিনোম তুলনা করে, বিজ্ঞানীরা আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন কোন জিন তাদের আলাদা সাইজ ও শেইপের কারণ যা তাদের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে ও খাবারের সোর্সের সাথে অভিযোজিত হতে সাহায্য করে। সামগ্রিকভাবে আমরা কম্পারেটিভ জেনেটিক্সের মাধ্যমে প্রজাতির মধ্যে ইভোল্যুশনারী সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারি, আমরা বুঝতে পারি কোন ধরণের জেনেটিক চেঞ্জ তাদের অভিযোজনকে পরিচালিত করেছিল। এ ইনফরম্যাশন তাদের জীবনের বিবর্তনীয় মেকানিজম ও জীবনের বৈচিত্র্যতা বুঝার জন্য অপরিহার্য।

4) বায়োজিওগ্রাফি: বিশ্বের সর্বত্র প্রজাতির ডিস্ট্রিবিউশন আমাদের প্রদর্শন করছে যে, একটি প্রজাতি অন্য প্রজাতির সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং তারা সুনির্দিষ্ট জিওগ্রাফিক্যাল এলাকায় বিবর্তিত হয়েছিল। এমন অনেক জীব আছে প্লেট টেকটোনিকের কারণে তারা দুটি মহাদেশে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে কিন্তু জেনেটিক্যালি তারা একে অন্যের সাথে একই সাধারণ পূর্বসূরি শেয়ার করে কারণ এক সময় দুটি মহাদেশ একত্রেই ছিল। উদাহরণ হিসেবে আমরা মার্সুপিয়াল ও প্ল্যাসেন্টাল অ্যানিমেলদের কথা বলতে পারি। মার্সুপিয়াল প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ক্যাঙ্গারু ও কোলাস। এদেরকে প্রধানত অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। আর অন্যদিকে প্ল্যাসেন্টাল বা জরায়ুর ভেতর সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম জীব যেমন প্রাইমেট ও রোডেন্টরা বিশ্বের সর্বত্র বসবাস করে। কিন্তু ফসিল অ্যাভিডেন্স আমাদের দেখিয়েছিল যে, মার্সুপিয়াল ও প্ল্যাসেন্টাল প্রাণীরা এক সময় একই জিওগ্রাফিক্যাল এলাকায় বাস করেছিল। প্লেট টেকটোনিকের কারণে যখন দক্ষিণ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তারা একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিন্ন ভিন্ন জিওগ্রাফিক্যাল এলাকায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এর আর একটি উদাহরণ হলো গ্যালাপ্যাগোস ফিঞ্চ পাখি। এরা হলো ক্লোজলি রিলেটেড পাখির গ্রুপ যাদেরকে গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জে পাওয়া যায়। কিন্তু এই ফিঞ্চরা বিবর্তিত হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার মেইনল্যান্ডে। সেখানেই তাদের সাধারণ পূর্বসূরিরা অস্তিত্বশীল ছিল। যাইহোক গ্যালাপ্যাগোস আইল্যান্ড মেইনল্যান্ড থেকে মহাদেশীয় পাত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারা মূল পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা প্রজাতিতে পরিণত হয় এবং এ পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা ভিন্ন পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হয়। প্রশ্ন হলো, গ্যালাপ্যাগোস ফিঞ্চ কী ম্যাক্রো ইভোল্যুশনের সাপেক্ষে দৃশ্যমান প্রমাণ নয়?

5) এমব্রায়োলজি: ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির প্রতিটি ভ্রুণ বিকাশের শুরুতে দেখতে একই রকম হয়। উদাহরণস্বরূপ, মেরূদণ্ডী প্রাণী যেমন মাছ,পাখি ও ম্যামাল ভ্রুণ অবস্থায় দেখতে সমান। ভ্রুণ অবস্থায় প্রতিটি মেরূদণ্ডী জীবের মধ্যে ফ্যারিঞ্জিয়াল আর্চ নামক একটি স্ট্র্যাকচার দেখা যায়। যেটি পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্ট্র্যাকচার তৈরি করে যেমন মাছের মধ্যে ফুলকা, স্তন্যপায়ীদের মধ্যে চোয়াল, কানের হাড় ও গালের হাড়, সরিসৃপ ও পাখিদের মুখ ও ঘাড়ের হাড়। ভ্রুণের আদিম বিকাশের সময়কার এ সাদৃশ্যতা প্রমাণ করে যে তারা একই সোর্স থেকে এসেছিল, তারা একই সাধারণ পূর্বসূরি শেয়ার করেছিল। যার অর্থ হলো সকল মেরুদণ্ডী প্রাণীর সাধারণ পুর্বসূরির মধ্যে একই রকমের বিকাশের প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। সময়ের সাথে তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বৈচিত্র্যতা অর্জন করে এবং বৈচিত্র্যময় প্রজাতির জন্ম দেয় আমরা আজ যাদের দেখতে পাই।

6) অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স: পৃথিবীর সকল জীব ও উদ্ভিদের আদি পূর্বসূরি ছিল অর্কিয়া, ব্যাক্টেরিয়া ও ইউক্যারিয়ট। ইউক্যারিয়ট যখন ব্যাক্টেরিয়াকে খেয়ে ফেলে তখন এদের মধ্যে মিথোজীবিতার সম্পর্ক তৈরি হয় ও মাইটোকন্ড্রিয়ার বিবর্তন ঘটে যেটি পৃথিবীর সকল প্রাণীর পূর্বসূরী। আর একটি লিনিয়েজে ইউক্যারিয়ট যখন ব্যাক্টেরিয়ামকে গিলে ফেলে ক্লোরোফ্লাস্টের বিবর্তন ঘটে যা পৃথিবীর সকল উদ্ভিদের পূর্বসূরি। তার মানে দেখা যাচ্ছে, আমরা আজকের পৃথিবীতে যে সকল ব্যাক্টেরিয়া দেখছি তারা আমাদের বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে তৈরি করেছিল। আমরা আজ আমাদের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ব্যাক্টেরিয়ার বিপক্ষে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করি কিন্তু তারা তার বিপক্ষে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স তৈরি করতে গিয়ে পরিবর্তিত হয়ে যায়। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স আমাদেরকে ন্যাচারাল সিলেকশন ও বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে।

7) অ্যাডাপটেশন: বিভিন্ন জীবের মধ্যে আমরা শিকার ধরা ও শিকারী প্রাণী থেকে পালানোর জন্য বিভিন্ন অভিযোজন দেখি যেমন ক্যামোফ্লেজ ও মিমিক্রি। একবার ডারউইন মথের কথাই চিন্তা করুন। মাদাগাস্কার ফুলের ৩০ সেঃমি নেক্টার রাখার থলির ভেতর তার সূড় ঢুকিয়ে যে পরাগায়ন ঘটাত। ফুলের সাথে সে এমনভাবে সহ বিবর্তিত হয়েছিল যে তার সূড় ৩০ সেঃমি লম্বা হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এই সূড় কী সহ-বিবর্তনের সাপেক্ষে দৃশ্যমান প্রমাণ নয়? কিছু কিছু পিঁপড়া আছে যাদের মাথাটি দেখতে ঘরের দরজার মতো। তারা তাদের এই দরজা বা ঢাল ব্যবহার করে যেন তাদের গর্তে অন্য কোনো অনুপ্রবেশকারী যেন প্রবেশ করতে না পারে। এছাড়া কিছু কিছু অর্কিড আছে বানরের মতো দেখতে। এরা পরিবেশকে মিমিক্রি করেছিল শিকারকে প্রতারিত করার জন্য এবং প্রাণীর মতো দেখতে এই রূপ তাদেরকে মানব শিকারি থেকেও রক্ষা করেছে। ফ্লোরেনসিয়েসরা ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা ছিল। ফসিল রেকর্ড আমাদের বলছে এই ক্ষুদ্র মানব প্রজাতি মূল ভুখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে বন্দী হয়ে পড়ে। যে দ্বীপে খাদ্যের পরিমাণ ছিল খুবই কম। তীব্র প্রতিযোগিতায় দ্বীপের সে সকল জীবই কেবল টিকে থাকতে সক্ষম ছিল যাদের আকার তুলনামূলক ক্ষুদ্র। আর এভাবে লাখ লাখ বছরের বিবর্তন তাদেরকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে তোলে আর তারা হবিটে পরিণত হয়েছিল। ফসিল রেকর্ড আমাদের বলছে, সে দ্বিপের হাতিরাও ছিল তাদের মতোই ছোট ছোট। এটা কি ম্যাক্রো ইভোল্যুশনের সাপেক্ষে কোনো প্রমাণই বহন করছে না? তাদের আকারের এই ক্ষুদ্রতা আপনি ঠিক কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

8 ) ইনভ্যাডর বা অনুপ্রবেশকারী প্রজাতির উপস্থিতি: জেবরা মুসেল হলো একটি ইনভ্যাসিভ স্পিসিজ যারা ইউনাইটের স্টেটের গ্রেট লেক অ্যারিয়ায় অনুপ্রবেশ করে । দ্রুত এরা গ্রেট লেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ও ইকোসিস্টেমের উপর মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করে। তারা স্থানীয় প্রাণীদের সাথে খাদ্যের জন্য তুমুল যুদ্ধ করে এবং ফুড ওয়েব অল্টার করে দেয়। এই উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারব কিভাবে বিবর্তন বিশেষ সময় অ্যাকশনে আসে। যখন জেবরা মুসেল নতুন পরিবেশে এসেছিল সে সফলতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল ও অন্যান্য প্রজাতির সাথে তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল। সময়ের সাথে জেবরা মুসেল ও অন্যান্য অনুপ্রবেশকারী প্রজাতিদের উপস্থিতিকে উপযুক্ত জবাব দেয়ার জন্য ইকোসিস্টেম পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং নতুন স্পিসিজ জন্ম দেবে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য অথবা নতুন পরিবেশগত প্রেসার মোকাবিলা করার জন্য নতুন স্থানীয় প্রজাতি বিবর্তিত হয়েছে যেমন গ্যালাপ্যাগোস ফিঞ্চ, লেক ওয়াটার ফিশ ও গ্রীন টোড।

  • ফিঞ্চ: গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপে আকস্মিক ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফিঞ্চ পাখিদের সাথে ইঁদুর তীব্রভাবে প্রতিযোগিতা করে। এই দ্বীপে ইঁদুরের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে তারা ভিন্ন ভিন্ন সাইজ ও শেইপ ধারণ করে, তা না হলে তারা ফুড সোর্সের ওপর নিজেদের আধিপত্য পতিষ্ঠা করতে পারত না।
  • লেক ওয়াটারফিশ: গ্রেট লেকে, একটি স্থানীয় ওয়াটারফিশ বিবর্তিত হয়েছিল একজন আক্রমণাত্মক অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করার জন্য যার নাম ছিল রাউন্ড গোবি। এটিও একটি মাছ। রাউন্ড গোবি ছিল একটি লোভী প্রিডেটর তারা স্থানীয় প্রজাতিদের ডিম খেয়ে ফেলত যেখানে লেক ওয়াটারফিশের ডিমও ছিল। এই নতুন প্রেসার থেকে লেক ওয়াটারফিশরা মৌসুমের একদম প্রথম দিকে ডিম পাড়তে শুরু করেছিল যেন রাউন্ড গোবিরা তাদের ডিম খেতে না পারে।

৯) ভেস্টিজিয়াল স্ট্র্যাকচার: জীবদের শরীরে এমন অনেক স্ট্রাকচার আছে যেগুলোর কোনো ফাংশন নেই যেটা আমাদের কাছে প্রমাণ করে এমন কোনো সময় ছিল যখন আমাদের পূর্বসূরিদের দেহে এ সকল স্ট্র্যাকচারের একটি ফাংশন ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যে সকল পাখিরা উড়তে পারে না তাদেরও পাখা আছে যেমন অস্ট্রিচ ও পেঙ্গুইন। তাদের পাখাগুলো উড়ার জন্য এখন আর ফাংশনাল নয়। কিন্ত পাখিদের প্রজাতির মধ্যে যে পাখার হাড় ও গঠন দেখা যায় তারা সেটা বহন করছে। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পাখা তার ফাংশন হারায় ভিন্ন পরিবেশ ও লাইফ স্টাইলের সাথে অভিযোজিত হতে গিয়ে। যেমন কোনো এলাকায় যদি খাবারের পরিমাণ প্রচুর হয় সেখানে অযথা উড়ে অনর্থক সময় ও শক্তি খরচ করা প্রজননগত দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকর। শুধু শুধু উড়ে কেন তখন সে শক্তি খরচ করবে? এই শক্তি দিয়ে সে সন্তান জন্মদান ও লালন পালন করবে। অথবা যে এলাকায় শিকারী প্রাণীর পরিমাণ কম সেখানেও পাখিদের অযথা উড়াউড়ি করার দরকার হয় না। এভাবে তাদের পাখা একসময় তাদের ফাংশন হারায় যেটি ভেস্টিজিয়াল অর্গান হিসেবে টিকে থাকে। ভেস্টিজিয়াল স্ট্র্যাকচারের আর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো তিমিদের পেছনের পায়ের উপস্থিতি। তিমি পুরোপুরিভাবে সামুদ্রিক প্রাণী। তারা দৌড়ানো অথবা হাঁটার জন্য পেছনের পা ব্যবহার করে না। কিন্তু তাদের লেজের ভেতর পেছনের পায়ের হাড়ের অবশিষ্টাংশ তাদের টেরিস্টিয়াল আদি পূর্বসূরিদের একটি চিহ্ন যা আমাদের কাছে ইভোল্যুশনারী হিস্টরি সম্পর্কে প্রমাণ উপস্থাপন করে। যদি কোনো মহান ঈশ্বর পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রাণীদের তৈরি করত, তবে তাদের শরীরে তাদের পূর্বসূরীদের নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া অঙ্গগুলো থেকে যেত না। ভেস্টিজিয়াল অর্গান মূলত আমাদের মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের বিবর্তনীয় অতীতেরই রিফ্লেকশন। মানুষের এপেন্ডিক্স, উইজডম টিথ, থাইবোন, Goosebumps ইত্যাদি ম্যাক্রো বিবর্তনের সাপেক্ষে প্রমাণ।

১০) ডিএনএ অ্যাভিডেন্স: ডিএনএ অ্যাভিডেন্স আমাদেরকে বিবর্তনের সাপেক্ষে দুর্দান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে। ডিএনএ হলো জেনেটিক ইনস্ট্র্যাকশন যা সকল জীবের বিকাশ ও ফাংশনের জন্য নির্দেশনা বহন করে। বিভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ তুলনা করে আমরা তাদের সম্পর্কের দূরত্ব ও নৈকট্য নির্ণয় করতে পারি। যেমন শিম্পাঞ্জি ও মানুষের ডিএনএর সাদৃশ্য ৯৮%। যা আমাদের কাছে দৃঢ় প্রমাণ উপস্থাপন করছে যে, তারা একটি সাধারণ পূর্বসূরি শেয়ার করেছিল আবার অন্যদিকে মানুষ ও পাখির ডিএনএ কম সাদৃশ্যপূর্ণ যা আমাদের বলছে যে তারা আরও দূরবর্তী পূর্বসূরি শেয়ার করেছিল। এছাড়া বিজ্ঞানীরা সময়ের সাথে ডিএনএর পরিবর্তন ট্র্যাচ করতে পারে। যেমন তারা মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ গবেষণা করতে পারে যা মা থেকে সন্তানের দিকে প্রবাহিত হয় যেটি বিভিন্ন প্রজাতির সাথে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের উদ্ভব ব্যাখ্যা করে। অতএব ডিএনএ একটি প্রজাতির সাথে অন্য প্রজাতির সম্পর্ক, তাদের সাধারণ পূর্বসূরি ও সময়ের সাথে তাদের বিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করে। একই প্রমাণ আমরা ফসিল রেকর্ড, কম্পারেটিভ অ্যানাটমি, কম্পারেটিভ এমব্রায়োলজি থেকেও পেয়ে থাকি যা আমাদের কাছে বিবর্তন সম্পর্কে উপলব্ধিযোগ্য বোধ প্রদান করে।

আজ ডারউইন দিবস ও একইসাথে ডারউইনের জন্মদিন। ডারউইনের স্মরণে এ আর্টিকেলটি লেখা। পাশাপাশি এ বছরেই বিবর্তনের ওপর আমাদের বেশকিছু বই প্রকাশ হবে যার মধ্যে একটি স্যাপিয়েন্স আফ্রিকা ছাড়েনি। ম্যাক্রো ইভোল্যুশন সম্পর্কে যারা যুক্তি প্রদর্শন করেন আসলে তারা ম্যাক্রো ইভোল্যুশন সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই রাখেন না। এ যুক্তিগুলো বহু আগেই খণ্ডন করা হয়েছে তারপরও ইভানজেলিস্ট খ্রিষ্ঠান ও আরব মুসলিমরা সে প্রাচীন খোড়া যুক্তিগুলো বারবার রিপিট করছেন। বিশুদ্ধ লজিকে তারা বিশ্বাসী নয়। বিবর্তনে সমর্থন করেন এমন অনেকেও ম্যাক্রো ইভোলিউশন সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। আশা করি আর্টিকেলটি সবাই সময় নিয়ে পড়বেন।

আরও পড়ুন: কেন বিবর্তন সত্য?