প্রযুক্তিগত স্বর্গ-অমরত্ব ও ঈশ্বরের মনস্তত্ব

Last updated:

ভগবত পুরাণে বর্ণিত আছে, একদা দেবতা ও রাক্ষসের মাঝে শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ! কে পান করবে অমৃত!কে হবে অমর! পরবর্তীতে দেবতারা ছলচাতুরী করে ভাগ নিয়ে নেন অমৃতের। ব্যস,অমরত্ব তখন থেকে দেবতাদের একচেটিয়া সম্পত্তি! এমন কল্পকাহিনী প্রচলিত হয়েছে কোন শিম্পাঞ্জী বা বেবুনের মুখে নয় কিন্তু। আমরা যারা এখন এই লেখাটা পড়ছি তাদেরই কোনো খুড়তুতো দাদামশাইয়ের মাসতুতো ভাই কিংবা আরো দূর সম্পর্কের কেউ এই কল্পকাহিনী গড়ে তুলেছেন। গোষ্ঠী গঠনের জন্য একই কল্পকাহিনীতে বিশ্বাস স্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল! মানব মনের অমরত্বের প্রতি তীব্র হাহাকার রূপ নেয় দেবতার অমরত্ব প্রাপ্তিতে । সে তীব্র সুখ অনুভব করে এটা ভেবে,যাক যিনি আমার স্রষ্টা তিনি তো অমর! আর সেখান থেকেই তারা ধারণা করে সেই অমর ঈশ্বরের রচিত স্বর্গেও অমরত্ব পাওয়া যায়।


 

তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে,মৃত্যুকে মেনে নিয়েই কিন্তু বিবর্তিত হয়েছে মানব মস্তিষ্ক । যে তাগিদের বশে মানুষ ছুটে চলে ,সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে সেই তাগিদ সে কখনোই পেত না যদি না সে মরণশীল হতো। অমরত্ব বিশ্বে নামিয়ে আনত স্থবিরতা। বাস্তুসংস্থানের মধ্যে এমন বিশাল এক শূন্যস্থান তৈরি হতো যে এটা কখনোই প্রাকৃতিক নির্বাচন চাপের মুখোমুখি পড়ত না ! বিবর্তন তত্ত্ব নিজেই সমাহিত হয়ে যেতো এই অমরত্বের জাঁতাকলে!



মস্তিষ্ক তখন শাশ্বত এক ধারণার মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলতো আর নজরুলের মতো আওড়াতো “আমি অজড় অমর অক্ষয় ,আমি অব্যয়!” ন্যানোবটের ( Nanobot)  মাধ্যমে আমরা এক সময় রোগ ও বার্ধ্যকের বিপক্ষে ইমিউনিটি সিস্টেম গড়ে তুলব। আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু ন্যানোবট রয়েছে যারা আমাদের শরীরের ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়াগুলোর বিপক্ষে কাজ করে কিন্তু বিজ্ঞান খুব শীঘ্রই এমনকিছু ন্যানোবট তৈরি করবে যারা রোগ ও বার্ধক্যের বিপক্ষে কাজ করে। আর এতে করে আমরা অমরত্ব লাভ করতে সক্ষম হবো। কিন্তু সব মানুষ অমর হতে পারবেনা, ইমোর্টালিটি পাবে কিছু মানুষ যারা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ , তারা মিলিয়ন ডলার খরচ করে অমরত্ব ক্রয় করবে। কিন্তু এ অমরত্বেরও সমস্যা আছে। অমরত্ব ধনী গরীবের বৈষ্যম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে। এতদিন গরীবদের কাছে একটা সান্ত্বনা ছিল যে মানুষে মানুষে যতই বৈষ্যম্য থাকুক না কেন সকল মানুষই একদিন মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু যখন গরীবরা দেখবে যে ডলারের বিনিময়ে ধনীরা অমরত্ব ক্রয় করছে তখন তাদের দুঃখের কোনো শেষ থাকবে না। আবার অন্যদিকে ধনীরাও হয়তোবা অমরত্ব নিয়ে শান্তি পাবে না! কারণ অমরত্বের পেছনে তারা এত মিলিয়ন ডলার অপচয় করবে যে সামান্য ভুলের কারণেও তারা সেটি হারানোর ঝুঁকি নেবে না যা তাদেরকে হয়তোবা গৃহবন্দি করে তুলবে!


আর অমরত্বের সাথে সুখের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা কেন অমর হতে চাই? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকে উত্তর দিতে পারেন, আমরা সুখী হওয়ার জন্য অমর হতে চাই! দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো সুখী হওয়ার জন্য অমরত্বের প্রয়োজন নেই, সুখী হওয়ার জন্য প্রয়োজন ডোপামিন, সেরেটোনিন ও অক্সিটোসিন। আপনি যদি সবসময় সুখী থাকতে চান তবে আপনার মস্তিষ্কের ভেতর নিরবিচ্ছিন্নভাবে ডোপামিন ও সেরেটোনিন তৈরি করতে হবে, আর যদি নিরবিচ্ছিন্নভাবে ডোপামিন ও সেরেটোনিন তৈরি হয় আপনার মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস ডেমেজ হয়ে যাবে, অকেজো হয়ে যাবে রিওয়ার্ড সিস্টেম, আপনার স্মৃতি ও স্মরণ ডেমোলিস হয়ে যাবে, আপনি নতুন কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন না, আপনার বয়স যদি হয় ২৫ , আপনার নিকট সারাজীবনই আপনার বয়স ২৫ মনে হবে কারণ হিপ্পোক্যাম্পাস ডেমেজ হয়ে যাওয়ার কারণে আপনি নতুন নতুন মুহূর্তগুলোর মেমরি সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন!



ব্রেন রিওয়ার্ড সিস্টেম ডেমেজ হয়ে যাওয়ার পর আপনাকে যদি সমস্ত মাল্টি ইউনিভার্সের ক্ষমতাও দিয়ে দেয়া হয় , প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের কোটি কোটি প্রেমিকা উপহার দেয়া হয় তবুও আপনার ব্রেনে আর এক ফোটাও ডোপামিন ও সেরেটোনিন ক্রিয়েট হবেনা, কোয়ান্টাম ম্যানি ওয়ার্ল্ডসের সবচেয়ে সেক্সি নারীও যদি আপনার পেনিসে তার যৌনি ইনসার্ট করে কয়েক লাখ বছর বসে থাকে আপনার কোনো ফিলিংসই কাজ করবেনা! আপনি অমরত্ব পাবেন কিন্তু মানসিক সুস্থ্যতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে, অমরত্ব হারানোর ভয়ে আপনি নারীদের মতো চুড়ি আর কানের দুল পরে ঘরে বসে থাকবেন, কারণ এত বিলিয়ন ডলারের অমরত্ব কারো ঘুষি খেয়ে নষ্ট হয়ে যাক এটা নিশ্চয় আপনি চাইবেন না! আপনি হবেন সাইকো, অস্থিতীশীল , এক মহান লজ্জাবতী নারী … হ্যাঁ , আর সাথে প্রচন্ড পরিমাণ অলস।





আপনি কোনো কাজই সঠিক সময়ে করতে চাইবেন না , কারণ আপনার সামনে কাজ করার জন্য শত শত বছর সময় পড়ে আছে! একইসাথে অমর ও অসীম সুখী মানুষ মানসিকভাবে সুস্থ্য হতে পারেনা! সে হয় অসুস্থ্য, নৈতিকতা বিবর্জিত! মস্তিষ্কে স্টিমুলেশনের মাধ্যমে হাইপোথিটিক্যালি একজন অমর মানুষকে যদি হাসিখুশি রাখা হয়, সে অন্যায়, অনৈতিকতা, মৃত্যু ও অমানবিকতা দেখলেও খুশি হবে! আর তাই ঈশ্বর যদি সত্যও হয়, আর সে যদি আমাদের মৃত্যুর পর অসীম সুখের একটি স্বর্গ উপহারও দেয় , তবে সে ঈশ্বর কোনোদিন করুণাময় হতে পারেন না, সে সেলফিশ জিনের মতোই স্বার্থপর, মেগার্ভার্সের সবচেয়ে বড় সাইকো (পাগলা) ! একজন করুণাময় ঈশ্বর জেনেশুনে তার প্রিয় ব্যক্তিদের পাগলাগারদে পাঠাতে পারেন না! এতে ঈশ্বরের নিজের সুস্থ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়! কারণ যদি তার প্রদত্ত অমরত্ব সাইকো করে তোলে তার খাস বান্দা মানুষকে তবে কে করবে তাঁর আরাধনা! তবে এবার বলুন ,আপনিও কি চান এমন অমরত্ব!?



তথ্যসুত্রঃ

নিউ এম্পেরর অব হোমো ডিউস- লিহন

প্রযুক্তিগত স্বর্গ-অমরত্ব ও ঈশ্বরের মনস্তত্ব

প্রযুক্তিগত স্বর্গ-অমরত্ব ও ঈশ্বরের মনস্তত

hsbd bg