Can't find our books? Click here!
একটি ব্রেন ও দুটি বিশ্ব 

একটি ব্রেন ও দুটি বিশ্ব 

The molecule of More: How a Single Chemical in Your Brain Drives Love, Sex, and Creativity--and Will Determine the Fate of the Human Race

জন ডগলাস পেটিগ্রুর নাম শুনেছেন? তিনি ইউনিভার্সিটি অব কুইনসল্যান্ডের  সাইকোলজির প্রফেসর। ডগলাস একজন নিউরোসায়েন্টিস্ট হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন এবং উড়ন্ত প্রাইমেট তত্ত্বের জন্য তিনি ছিলেন সুপরিচিত, যা বাদুড়কে আমাদের দুরবর্তী কাজিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ফ্লাইং প্রাইমেট তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ডগলাসই সর্বপ্রথম পরিস্কার করেন কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ক মহাবিশ্বের ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরি করে।  কিন্তু আশ্চার্যজনকভাবে মহাবিশ্বের থ্রি-ডায়মেনশনাল মডেল তৈরির সাথে মস্তিষ্কের একটি অণুর সম্পর্ক ছিল যার নাম ডোপামিন,  যেটিকে রসায়নে C8H12NO2 সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।  এটি কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন দ্বারা গঠিত।।  এতদিন আমরা জনতাম ডোপামিন আবেগীয় ভালোবাসার সাথে জড়িত। অথচ ডগলাসের কনসেপ্ট দেখে মনে হয়, ডোপামিন রোম্যান্টিক ভালোবাসা থেকে অনেক দূরের কোনো অণু। কিন্তু ডগলাসের তত্ত্বই বিস্ময়করভাবে আমাদের নিকট প্রথম ডোপামিন ও ভালোবাসার মূল ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্বের মডেলের সাথে ডোপামিন ও ভালোবাসার সম্পর্কটা কোথায়?

একটি ব্রেন ও দুটি বিশ্ব


ডগলাস দেখান যে, আমাদের মস্তিষ্ক এক্সটারনাল  মহাবিশ্বকে দুটি রাজ্যে ভাগ করে। একটিকে বলা হয় পেরিপারসোনাল আর অন্যটি এক্সট্রাপারসোনাল_ যদি সহজ ভাষায় বলি তবে ব্যাসিকলি এ দুটোকে বলা হয়, কাছে ও দূরে। পেরিপারসোনাল রিয়েল্ম বলতে আমরা সে বাস্তবতাকে বুঝি যে বাস্তবতাকে আপনি এ মুহূর্তে আপনার হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। যেমন আপনার হাতের সেলফোন, আপনার মাথার চুল অথবা আপনার জানলার পর্দা। এটি হলো সেই জগত যেটি বাস্তব এবং ঠিক এ মুহূর্তেই অস্তিত্বশীল।  এক্সট্রা-পারসোনাল স্পেস বলতে আমরা সে বাস্তবতা বুঝি যা এ মুহূর্তে আপনার দু-হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেটা তিন ফুট দূরত্ব থেকে শুরু করে CMB দেয়াল পর্যন্ত হতে পারে যা আপনার শরীরের নিয়ন্ত্রণে এ মুহূর্তে নেই। এ  আপনি মুভ করা ব্যতীত এ জগত স্পর্শ করতে পারবেন না। এটাকে বলা হয় রিয়েল্ম অব পসিবিলিটি বা সম্ভাবনার জগত। 

একটি ব্রেন ও দুটি বিশ্ব


স্থানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, আরও একটি দিক অনুসরণ করতে হয়, সুস্পষ্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মুভ করতে সময় লাগে অতএব এক্সট্রা পারসোনাল স্পেসে আপনি যে সকল ইন্টারেকশন করবেন সেগুলো ভবিষ্যতে সংঘটিত হয়। এটাকে আপনি আর একটি উপায়ে সংযুক্ত করতে পারেন যে দূরত্ব সবসময় সময়ের সাথে জড়িত।  মনে করুন, আপনি আম খেতে চান কিন্ত মার্কেটের এক কোণায় একটি ঝুড়ি আছে। আপনি এখন আম  খেতে পারবেন না, ঝুড়িটি নিয়ে গিয়ে আম নিয়ে আসতে হবে। আপনি এটা ভবিষ্যতে উপভোগ করতে পারবেন।  ভবিষ্যতে কোনো কিছু অর্জন করার জন্য আপনার পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেমন ঘরের অন্ধকার দূর করার জন্য আলো জ্বালানো, আম সংগ্রহের জন্য মার্কেটে অনুসন্ধান অথবা চন্দ্রে যাওয়ার জন্য ভালো রকেট নির্বাচন। এগুলো হলো এক্সট্রাপারসোনাল স্পেসের দৃষ্টান্ত। এগুলো অর্জন করার জন্য আপনার শ্রম, সময় ও পরিকল্পনা লাগবে। কিন্তু যা কিছু পেরিপারসোনাল তা এখন ও এখানে। এগুলো হলো ইমিডিয়েট অভিজ্ঞতা। আপনি কোনোকিছু স্পর্শ করতে পারেন, স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন, ধরতে পারেন অথবা মোচড়াতে পারেনঃ আমি সুখ, দুঃখ, রাগ ও আনন্দ অনুভব করি। 

একটি ব্রেন ও দুটি বিশ্ব


এটি আমাদের নিকট বায়োকেমিস্ট্রির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার ক্লিয়ার করেঃ মস্তিষ্ক একটি উপায়ে পেরিপারসোনাল স্পেসে কাজ করে এবং অন্য আর একটি উপায়ে কাজ করে এক্সট্রাপারসোনাল স্পেসে।  আপনি যদি মানব মনের একজন ডিজাইনার হতেন তবে আপনি অবশ্যই মানব মনকে এভাবে ডিজাইন করতেন। যেন এটি এ দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। একটি সিস্টেম হলো আপনার কী আছে আর অন্য সিস্টেমটি হলো আপনার কী নেই। আদিম মানুষদের ক্ষেত্রে আমাদের পরিচিত প্রবচন ” হয়তো তোমার এটি আছে অথবা নেই” অনুবাদ করা হতো ” হয়তো তোমার এটি আছে অথবা তুমি মৃত।”  


বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে যে খাদ্য আপনার নেই তা গুরুত্বপূর্ণভাবে আপনার যে খাদ্য আছে তার থেকে আলাদা৷। এটি পানি, আশ্রয় এবং যন্ত্র সব ক্ষেত্রেই সত্য। আপনার কাছে পানি নেই মানে আপনাকে পানি অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করতে হবে। যার অর্থ পানির জন্য আপনার ফিউচার প্রয়োজন, ফিউচার প্লান প্রয়োজন। পানি আপনার পেরিপারসোনাল স্পেসে নেই। মিলিয়ন মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের আদিম পূর্বসূরিদের  জন্য এ দুটির তারতম্য এতটাই ফান্ডামেন্টাল ছিল যে মস্তিষ্কের ভেতর এদের ফান্ডামেন্টাল তারতম্য বোঝার জন্য আলাদা নিউরাল পথ বিবর্তিত হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে কেমিক্যাল যার মাধ্যমে  আমাদের মস্তিষ্ক  পেরিপারসোনাল ও এক্সট্রাপারসোনাল রিয়েলিটিকে মোকাবিলা করতে পারে।

আপনি যখন নিচের দিকে তাকান আপনি তখন পেরিপারসোনাল রিয়েলিটির দিকে তাকান।  তখন মস্তিষ্ক সে সকল কেমিক্যাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যেগুলো Here and Now– এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু যখন মস্তিষ্ক এক্সট্রা-পারসোনাল স্পেসে জড়িত হয় একটি কেমিক্যালের দাপট অন্য সব কেমিক্যালকে ছাড়িয়ে যায়, যে কেমিক্যালটি প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে সকল বস্তু আমাদের থেকে দূরে, যে সকল বস্তু আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি, ব্যবহার অথবা ভোগ করিনি, যেগুলোকে আমরা শুধুই প্রত্যাশা করি।

ডোপামিনের খুবই নির্দিষ্ট একটি কাজ আছে আর তা হলো আমাদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করা, যেগুলি ভবিষ্যতে অবস্থান করে আরও উন্নততর বস্তুর সাধনা। জীবনের প্রতিটি খন্ড দুই ভাগে ভাগ করা। একটিতে আমরা যা চাই তা নিয়ে ডিল করি আর অন্যটিতে আমাদের যা আছে আমরা তা ডিল করি।। একটি বাড়ির প্রতি প্রত্যাশা, আমাদের কঠোর পরিশ্রমকে জাগিয়ে তোলে সে বাড়ি ক্রয় করার ক্ষমতা অর্জনের জন্য। আর এজন্য আমাদের দুটি ব্রেন সার্কিট কাজ করে।প্রত্যাশা আমাদের ফিউচার অরিয়েন্টেড ডোপামিন অ্যাক্টিভিটি বাড়িয়ে দেয়। এটি আমাদের Here and Now এক্সপেরিয়েন্স থেকে ভিন্ন যেমন তৃতীয়বারের মত বড় একটি চেক গ্রহণ করা। স্থিতিশীল ভালোবাসা থেকে ভালোবাসার অনুসন্ধান ভিন্ন সেটের দক্ষতা গ্রহণ করে। ভালোবাসা একদিন এক্সট্রাপারসোনাল অভিজ্ঞতা থেকে পেরিপারসোনাল অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় __প্রচেষ্টা থেকে অধিকার; প্রত্যাশা করা থেকে কোনোকিছুর যত্ম করা।  এগুলো বিশালভাবে ভিন্ন দক্ষতা। আর এজন্যই সময়ের সাথে ভালোবাসার প্রকৃতি পরিবর্তন হয়। আর তাই রোম্যান্সের ডোপামিন থ্রিল শেষ হওয়ার পর ভালোবাসা উড়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ পরিবর্তন তৈরি করে।  তারা এটা কীভাবে করে? কীভাবে তারা ডোপামিনের প্রলোভনকে বোকা বানায়? 


গ্ল্যামার


গ্ল্যামার হলো একটি সুন্দর ইল্যুশন- “গ্ল্যামার” শব্দটি মূলত আক্ষরিক অর্থে জাদু মন্ত্র বোঝায়-  যা জীবনকে অতিক্রম করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং একটি আদর্শ বাস্তব জগত নির্মানের অনুপ্রেরণা।  এটি রহস্য ও লাবণ্যের একটি সমন্বয়। ___ভার্জিনিয়া পোস্ট্রেল 


গ্ল্যামার তখনই জাগ্রত হয় যখন আমরা এমনকিছু দেখি যা ডোপামিনার্জিক ইমাজিনেশন জন্ম দেয়। যা আমাদের Here and Now রিয়েলিটি বোঝার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। এর একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে বিমান ভ্রমণ? এ সময় কোন ধরণের চিন্তা ও অনুভূতি ট্রিগার হয়? অনেক মানুষ প্লেনে ভ্রমণ করার আকাঙ্খা প্রকাশ করে, এখান থেকে অনেক দূরের একটি উত্তেজনাকর লোকেশনে ভ্রমণ __একটি উদ্বেগমুক্ত পথ যা শুরু হবে মেঘের ভেতর রাইড করার মাধ্যমে। অবশ্যই, আপনি যদি প্লেনে থাকেন আপনার Here and Now সেন্স আপনাকে বলবে এ আকাশের প্যারাডাইস আপনার শহরের পাবলিক বাস ভ্রমণের মতোই: সঙ্কুচিত, ক্লান্তিকর এবং অপ্রীতিকর – সুন্দর হওয়ার পরিবর্তে। 


একইভাবে হলিউড থেকে অধিক গ্ল্যামারাস আর কী হতে পারে? সুন্দর নায়ক নায়িকারা পার্টিতে যায়,সুইমিং পুলের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে এবং তারা ফ্লার্ট করে। বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ ১৪ ঘন্টা উত্তপ্ত রোধের মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়। নারী অভিনেত্রীদের সেক্সচুয়ালি শোষণ করা হয় আর পুরুষদেরকে তাদের প্রকাণ্ড শরীর তৈরি করার জন্য স্টেরয়েড এবং গ্রোথ হর্মোন নিতে বাধ্য করা হয় যা আমরা স্ক্রিনে দেখি। গুইনেথ প্যালট্রো, মেগান ফক্স, চার্লিজ থেরন এবং মেরিলিন মনতো এই “কাস্টিং কোচ( সেক্সচুয়ালি নিজেকে বিনিময় করা)” অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছিলেন ( ম্যারিলান মনরো ছাড়া বাকি সবাই লোভনীয় ভূমিকার জন্য যৌনতার ব্যবসার ব্যাপারটি প্রত্যাখ্যান করেছেন)। নিক নলতে, চার্লি শিন, মিকি রাউর্ক এবং আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার সবাই স্টেরয়েড ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন, যা লিভারের ক্ষতি করতে পারে,  মুড সুয়িং বৃদ্ধি করে, হিংসাত্মক বিস্ফোরণ ও সাইকোসিসের কারণ হয়। এটি শুধুই একটি চটকদার ব্যবসা।  


পাহাড় তো আর তুচ্ছ নয়। এটি রাজকীয়। যেটি আমাদের থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। হিমালয়ের জন্য আমাদের মস্তিষ্ক উচ্চমাপের ডোপামিন তৈরি হয় এতে আরোহন করার জন্য, আবিষ্কার করার জন্য এবং জয় করার জন্য। কারণ নিচে দেখে দেখলে মনে হয় এটি নরম, কোমল, রাজকীয় এবং সাদা মেঘের আস্তরনে ঘেরা এক ঐশ্বরিক রূপ। কিন্তু আসলে এগুলো অস্তিত্বশীল নয়। হিমালয় নিজে অস্তিত্বশীল কিন্তু আমরা মনে মনে যে কাল্পনিক বাস্তবতাকে পাহাড়ের শীর্ষে অর্জন করতে চাই তা অর্জন করা অসম্ভব। বাস্তবতা হলো যে, আপনি বেশিরভাগ সময় হিমালয়েই থাকেন যদিও আপনি জানেন না। আমাদের চারপাশে বেশিরভাগ সময় বৃক্ষ ঘেরা থাকে এবং আমরা তাদের দেখি। মাঝেমাঝেই আপনি এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপেক্ষা করে মাইলের পর মাইল দূরে কোনো উপত্যকার দিকে তাকিয়ে থাকেন।  কারণ অনেক দূরের উপত্যকা আপনার জন্য প্রতিজ্ঞা ও সৌন্দর্য ঘেরা। গ্ল্যামার আমাদের মাঝে এমন সব আকাঙখা তৈরি করে যা কখনো পূরণ করা সম্ভব না কারণ এ আকাঙখিত বস্তুগুলো কেবলমাত্র আমাদের কল্পনার জগতেই অস্তিত্বশীল। এটি আকাশের কোনো উড়োজাহাজ হোক,  হলিউড মুভি অথবা দূরবর্তী পর্বত হোক, যে সকল বস্তু আমাদের ধরাছোঁয়ার উর্ধ্বে এগুলো গ্ল্যামারাস। এগুলো সে বস্তু যেগুলো অবাস্তব।  গ্ল্যামার আসলে মিথ্যা। 

তথ্যসূত্র:

The Molecule of More: How a Single Chemical in Your Brain Drives Love, Sex, and Creativity–and Will Determine the Fate of the Human Race

আগের পর্ব:

মনের মলিকিউল